বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ক্যাথরিন দ্য গ্রেট: রাশিয়াকে ইউরোপীয় পরাশক্তিতে রূপ দেওয়া সম্রাজ্ঞীর ইতিহাস

Series: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

  • Author: Admin
  • August 30, 2026
ক্যাথরিন দ্য গ্রেট: রাশিয়াকে ইউরোপীয় পরাশক্তিতে রূপ দেওয়া সম্রাজ্ঞীর ইতিহাস
রাশিয়ার সাম্রাজ্য বিস্তার ও আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান স্থপতি ক্যাথরিন দ্য গ্রেট

রাশিয়ার ইতিহাসে খুব কম শাসকের নামের সঙ্গে একটি যুগ এত গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে, যতটা ক্যাথরিন দ্য গ্রেটের সঙ্গে যুক্ত আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধ। জন্মসূত্রে তিনি রুশ ছিলেন না, এমনকি রাশিয়ার সিংহাসনের সরাসরি উত্তরাধিকারীও ছিলেন না। বর্তমান জার্মানির একটি ছোট রাজপরিবারে জন্ম নেওয়া এক কিশোরী রাজকন্যা শেষ পর্যন্ত কীভাবে রুশ সম্রাজ্ঞী হয়ে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসকদের একজন হয়ে উঠলেন—সেই কাহিনি একই সঙ্গে ক্ষমতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কূটনীতি, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক বাস্তববাদের ইতিহাস। ১৭৬২ থেকে ১৭৯৬ সাল পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ শাসনে রাশিয়ার ভূখণ্ড ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়, কৃষ্ণসাগরের দিকে সাম্রাজ্যের পথ খুলে যায় এবং পূর্ব ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্যে রাশিয়া নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হয়।

ক্যাথরিনের জন্ম ১৭২৯ সালের ২ মে, প্রুশিয়ার স্টেটিন শহরে। তাঁর জন্মনাম ছিল সোফি ফ্রিডেরিকে অগুস্টে ফন আনহাল্ট-জার্বস্ট। তাঁর বাবা ছিলেন আনহাল্ট-জার্বস্টের রাজপরিবারের সদস্য ক্রিশ্চিয়ান অগুস্ট এবং মা ইয়োহানা এলিজাবেথ। পরিবারটি অভিজাত হলেও ইউরোপের প্রধান রাজবংশগুলোর তুলনায় খুব শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু ইউরোপীয় রাজপরিবারগুলোর বিবাহভিত্তিক কূটনীতি সোফির জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথ পেত্রোভনা তাঁর উত্তরাধিকারী পিটার ফিওদোরোভিচের জন্য উপযুক্ত স্ত্রী খুঁজছিলেন। ভবিষ্যতের এই পিটারই পরবর্তীকালে সম্রাট তৃতীয় পিটার হন। সোফিকে রাশিয়ায় আনা হয় এবং তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন, নতুন দেশে টিকে থাকতে হলে তাঁকে শুধু রাজপরিবারে বিয়ে করলেই হবে না—নিজেকে রুশ সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে।

তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে রুশ ভাষা শেখেন এবং লুথেরীয় বিশ্বাস ত্যাগ করে রুশ অর্থোডক্স খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ধর্মান্তরের পর তাঁর নতুন নাম হয় ইয়েকাতেরিনা আলেক্সেয়েভনা—ইতিহাসে যিনি ক্যাথরিন নামে পরিচিত। ১৭৪৫ সালে তাঁর সঙ্গে পিটারের বিয়ে হয়। কিন্তু এই বিবাহ সুখের ছিল না। তাঁদের ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে গভীর দূরত্ব তৈরি হয়।

ক্যাথরিন এই অসুখী দাম্পত্যের মধ্যেও রাজদরবারে নিজের অবস্থান গড়ে তুলতে থাকেন। তিনি ব্যাপকভাবে বই পড়তেন এবং বিশেষভাবে ইউরোপীয় আলোকায়ন যুগের চিন্তাবিদদের রচনা অধ্যয়ন করতেন। ভলতেয়ার, মন্টেস্কিয়ু, দিদেরোসহ বিভিন্ন দার্শনিকের চিন্তা তাঁর ওপর প্রভাব ফেলেছিল। একই সঙ্গে তিনি রুশ অভিজাত, সামরিক কর্মকর্তা এবং রাজদরবারের প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন। এই নেটওয়ার্কই পরে তাঁর ক্ষমতা দখলের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

১৭৬২ সালে সম্রাজ্ঞী এলিজাবেথের মৃত্যুর পর পিটার তৃতীয় পিটার হিসেবে রাশিয়ার সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাঁর শাসন মাত্র কয়েক মাস স্থায়ী হয়। প্রুশিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য অনুরাগ, সামরিক নীতির পরিবর্তন এবং রুশ অভিজাত ও গার্ড রেজিমেন্টগুলোর সঙ্গে সংঘাত দ্রুত তাঁর বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগান ক্যাথরিন। ১৭৬২ সালের জুনে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৃতীয় পিটারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং ক্যাথরিন নিজেকে রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী ঘোষণা করেন। অরলভ ভাইদেরসহ গার্ড বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা তাঁকে সমর্থন করেছিলেন। পিটার সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং অল্প কিছুদিন পর বন্দিদশায় রহস্যজনক পরিস্থিতিতে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি আজও বিতর্কিত, যদিও ক্যাথরিন সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

ক্ষমতা দখলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় ক্যাথরিন শুরু থেকেই বুঝেছিলেন, তাঁকে সফল শাসক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। তিনি নিজেকে প্রথম পিটারের আধুনিকায়ন প্রকল্পের উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল রাশিয়াকে প্রশাসনিকভাবে আরও কার্যকর করা, ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত করা এবং সামরিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে সাম্রাজ্যকে সম্প্রসারণ করা।

১৭৬৭ সালে তিনি একটি নতুন আইনসংহিতা তৈরির লক্ষ্যে লেজিসলেটিভ কমিশন আহ্বান করেন। এর জন্য রচিত তাঁর বিখ্যাত নাকাজ বা নির্দেশনায় মন্টেস্কিয়ু ও অন্যান্য আলোকায়ন চিন্তাবিদের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। সেখানে আইনের শাসন, নির্যাতনের বিরোধিতা এবং যুক্তিনির্ভর প্রশাসনের ধারণা উঠে আসে। কিন্তু বাস্তবে রাশিয়ার বিশাল সামাজিক কাঠামো, অভিজাতদের স্বার্থ এবং কৃষিদাসপ্রথার ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি তাঁর সংস্কারের সীমা নির্ধারণ করে দেয়।

এই দ্বৈততা ক্যাথরিনের পুরো শাসনকালেই দেখা যায়। তিনি আলোকায়নের ভাষায় কথা বলতেন, কিন্তু একই সময়ে স্বৈরতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের সর্বময় শাসক ছিলেন। তিনি ভলতেয়ারের সঙ্গে দীর্ঘদিন পত্রালাপ করেন, দিদেরোর সঙ্গে আলোচনা করেন এবং ইউরোপীয় শিল্প, বিজ্ঞান ও সাহিত্যকে উৎসাহ দেন। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নে তিনি কখনো রাজতন্ত্রের মৌলিক কর্তৃত্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন না।

শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর আমলে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৭৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত স্মোলনি ইনস্টিটিউট রাশিয়ায় নারীদের জন্য রাষ্ট্রসমর্থিত শিক্ষার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রদেশে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৭৮৬ সালের শিক্ষাবিধির মাধ্যমে আরও সংগঠিত বিদ্যালয়ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করা হয়। শিল্পসংগ্রহের ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ অসাধারণ ছিল। তাঁর সংগ্রহ পরবর্তীকালে সেন্ট পিটার্সবার্গের বিখ্যাত হার্মিটেজ জাদুঘরের বিশাল সংগ্রহের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তবে তাঁর শাসনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছিল সাম্রাজ্যের সীমান্তে। রাশিয়ার দীর্ঘদিনের একটি কৌশলগত লক্ষ্য ছিল দক্ষিণে উষ্ণ সমুদ্রবন্দর এবং কৃষ্ণসাগরের দিকে প্রবেশাধিকার অর্জন। এই লক্ষ্য সরাসরি রাশিয়াকে অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংঘর্ষে নিয়ে যায়।

১৭৬৮ থেকে ১৭৭৪ সালের রুশ-অটোমান যুদ্ধ ক্যাথরিনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। রুশ বাহিনী স্থল ও সমুদ্র উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ১৭৭৪ সালের কুচুক কাইনারজা চুক্তি রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল। এর মাধ্যমে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং ক্রিমিয়ান খানাত অটোমান রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এই সাফল্যের পর ক্যাথরিনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক গ্রিগরি পোটেমকিন দক্ষিণাঞ্চলীয় সম্প্রসারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। অবশেষে ১৭৮৩ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে। এটি ছিল ক্যাথরিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অর্জন। ক্রিমিয়া অধিগ্রহণের মাধ্যমে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার অবস্থান আমূল বদলে যায় এবং ভবিষ্যৎ শতাব্দীগুলোতে রুশ পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়।

নতুন দক্ষিণাঞ্চলে শহর, দুর্গ এবং বন্দর গড়ে তোলা হয়। সেভাস্তোপোল রুশ কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হতে শুরু করে। সাম্রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন বসতি স্থাপন, কৃষি সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে অঞ্চলটিকে রুশ সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা চলে।

অটোমান সাম্রাজ্য ক্রিমিয়ার ক্ষতি সহজে মেনে নেয়নি। ফলে ১৭৮৭ থেকে ১৭৯২ সালে আবার রুশ-অটোমান যুদ্ধ শুরু হয়। রুশ বাহিনী আবারও গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে এবং ইয়াসি চুক্তির মাধ্যমে ক্রিমিয়ার ওপর রাশিয়ার কর্তৃত্ব আরও দৃঢ়ভাবে স্বীকৃত হয়। ক্যাথরিনের শাসনের শেষদিকে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়া এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যাকে উপেক্ষা করা অটোমান বা ইউরোপীয় কোনো শক্তির পক্ষেই সম্ভব ছিল না।

কিন্তু তাঁর সাম্রাজ্য শুধু দক্ষিণেই বাড়েনি। পশ্চিমে পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান কমনওয়েলথের দুর্বলতা রাশিয়ার জন্য আরেকটি সুযোগ তৈরি করে। পোল্যান্ডের রাজনীতিতে রুশ হস্তক্ষেপ ক্রমেই গভীর হয়। ক্যাথরিনের সাবেক ঘনিষ্ঠ পরিচিত স্তানিসোয়াফ অগুস্ট পোনিয়াতোভস্কি পোল্যান্ডের রাজা হলেও দেশটির ওপর রুশ প্রভাব ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে।

১৭৭২, ১৭৯৩ এবং ১৭৯৫ সালের তিনটি বিভাজনের মাধ্যমে রাশিয়া, প্রুশিয়া ও অস্ট্রিয়া পোলিশ-লিথুয়ানিয়ান রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। তৃতীয় বিভাজনের পর স্বাধীন পোল্যান্ড ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। রাশিয়া বিপুল নতুন ভূখণ্ড ও জনসংখ্যা লাভ করে এবং পূর্ব ইউরোপে তার প্রভাব নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে এই ঘটনা ক্যাথরিনের সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির কঠোর বাস্তবতাও প্রকাশ করে।

দেশের ভেতরে তাঁর সবচেয়ে বড় সংকট ছিল ১৭৭৩–১৭৭৫ সালের পুগাচেভ বিদ্রোহ। ইয়েমেলিয়ান পুগাচেভ নিজেকে মৃত সম্রাট তৃতীয় পিটার দাবি করে কৃষক, কসাক এবং সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করেন। বিদ্রোহ দ্রুত বিস্তৃত হয় এবং একসময় ক্যাথরিনের সরকারের জন্য গুরুতর হুমকিতে পরিণত হয়।

শেষ পর্যন্ত রুশ সেনাবাহিনী বিদ্রোহ দমন করে এবং পুগাচেভকে বন্দি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু এই বিদ্রোহ ক্যাথরিনকে রুশ সমাজের গভীর অসন্তোষ সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়। এরপর তিনি স্থানীয় প্রশাসন পুনর্গঠন করেন এবং প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করেন। একই সঙ্গে অভিজাত শ্রেণির ওপর তাঁর নির্ভরতাও বাড়তে থাকে।

এই কারণেই কৃষিদাসপ্রথা ক্যাথরিনের উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি। আলোকায়নের আদর্শে আকৃষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তিনি কৃষিদাসদের মুক্ত করতে পারেননি; বরং তাঁর শাসনের কিছু পর্যায়ে অভিজাত ভূস্বামীদের কর্তৃত্ব আরও শক্তিশালী হয় এবং কৃষিদাসপ্রথা নতুন অঞ্চলেও বিস্তৃত হয়। ১৭৮৫ সালের চার্টার টু দ্য নোবিলিটি অভিজাতদের বিভিন্ন বিশেষাধিকার নিশ্চিত করে।

ফরাসি বিপ্লব শুরু হওয়ার পর ক্যাথরিনের আলোকায়নপ্রীতির সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব এবং রাজতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক চিন্তার বিস্তার তাঁকে আতঙ্কিত করেছিল। যে দার্শনিক স্বাধীনতার ভাষাকে একসময় তিনি মর্যাদা দিয়েছিলেন, সেই ধারণাই যখন ইউরোপীয় রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লবী অস্ত্রে পরিণত হলো, তখন তিনি সেন্সরশিপ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের দিকে আরও ঝুঁকে পড়েন।

ক্যাথরিনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও অসংখ্য গল্প প্রচলিত হয়েছে। তাঁর একাধিক প্রেমিক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজন রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষত গ্রিগরি অরলভ ও গ্রিগরি পোটেমকিন তাঁর জীবনে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পরবর্তী যুগে তাঁর যৌনজীবন নিয়ে তৈরি অনেক কাহিনি ছিল অতিরঞ্জিত, বিদ্বেষপূর্ণ অথবা নারী শাসককে হেয় করার উদ্দেশ্যে প্রচারিত। এসব গল্পের আড়ালে তাঁর প্রকৃত রাজনৈতিক দক্ষতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য অনেক সময় ঢাকা পড়ে যায়।

১৭৯৬ সালের ১৭ নভেম্বর ক্যাথরিনের মৃত্যু হয়। তাঁর পুত্র পল প্রথম রাশিয়ার সিংহাসনে বসেন। ক্যাথরিন যখন ১৭৬২ সালে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, তখন রাশিয়া ইতোমধ্যেই ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি ছিল; প্রথম পিটারের সংস্কার সেই ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু ক্যাথরিন সেই শক্তিকে আরও বিস্তৃত, সমৃদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।

তাঁর দীর্ঘ শাসনে রাশিয়া কৃষ্ণসাগরের তীরে পৌঁছায়, ক্রিমিয়া অধিগ্রহণ করে, পোল্যান্ডের বিশাল ভূখণ্ড দখল করে এবং ইউরোপীয় কূটনীতির কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়। একই সময়ে শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, প্রশাসন এবং ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগও গভীর হয়। কিন্তু এই আধুনিকায়নের ভিত্তির নিচেই রয়ে গিয়েছিল স্বৈরতন্ত্র, কৃষিদাসপ্রথা, সামাজিক বৈষম্য এবং সাম্রাজ্যিক সম্প্রসারণের কঠোর বাস্তবতা।

এই বৈপরীত্যই ক্যাথরিন দ্য গ্রেটকে এত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চরিত্রে পরিণত করেছে। তিনি নিছক একজন সংস্কারক ছিলেন না, আবার শুধু ভূখণ্ড দখলকারী সম্রাজ্ঞীও ছিলেন না। তিনি বুঝেছিলেন যে আঠারো শতকের ইউরোপে একটি সাম্রাজ্যের শক্তি নির্ধারিত হয় সেনাবাহিনী, অর্থনীতি, প্রশাসন, সংস্কৃতি, কূটনীতি এবং ভূখণ্ড—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবে। তাঁর প্রায় চৌত্রিশ বছরের শাসনে এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাশিয়ার অবস্থান বদলে যায়।

জার্মানির এক ছোট রাজপরিবারের সোফি থেকে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনা দ্বিতীয় হয়ে ওঠার যাত্রা তাই শুধু ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার গল্প নয়। এটি এমন একজন নারীর ইতিহাস, যিনি পুরুষপ্রধান রাজদরবারে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন করে তিন দশকেরও বেশি সময় সেই ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন এবং ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তনে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিলেন। ক্যাথরিনের মৃত্যুর সময় রাশিয়া আর ইউরোপের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সাম্রাজ্য ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল ইউরোপীয় ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণকারী অন্যতম প্রধান পরাশক্তি।


You may also like