জাটল্যান্ডের যুদ্ধ ও সমুদ্র অবরোধ: ব্রিটেন ও জার্মানির বৃহত্তম নৌযুদ্ধ কে জিতেছিল?
Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী
- Author: Admin
- September 01, 2026
জাটল্যান্ডের যুদ্ধ ও সমুদ্র অবরোধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই ব্রিটেন ও জার্মানির মধ্যে একটি প্রশ্ন ইউরোপীয় যুদ্ধের সামগ্রিক ফলাফলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল—উত্তর সাগরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তির অন্যতম ভিত্তি ছিল তার বিশাল রয়্যাল নেভি। অপরদিকে যুদ্ধের আগে সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্মের জার্মানি দ্রুত একটি আধুনিক যুদ্ধজাহাজ বহর গড়ে তুলেছিল, যা ব্রিটিশ সমুদ্রশক্তিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখত। এই দীর্ঘ নৌ প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় সরাসরি সংঘর্ষ ঘটে ১৯১৬ সালের ৩১ মে ও ১ জুন জাটল্যান্ডের যুদ্ধে। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বৃহত্তম নৌযুদ্ধ এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ড্রেডনট যুদ্ধগুলোর একটি। কিন্তু যুদ্ধটি শেষ হওয়ার পরই একটি অদ্ভুত বিতর্ক শুরু হয়—যুদ্ধে আসলে কে জিতেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়, কারণ জাটল্যান্ডে জার্মানি ব্রিটেনের তুলনায় বেশি ক্ষতি করলেও যুদ্ধের পর সমুদ্রের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতেই থেকে যায়। ফলে কৌশলগত ফলাফল এবং যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব একে অন্যের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই ব্রিটেন ও জার্মানির নৌ প্রতিযোগিতা ইউরোপীয় উত্তেজনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। ব্রিটেনের জন্য সমুদ্র ছিল সাম্রাজ্যের প্রাণরেখা। ভারত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন উপনিবেশের সঙ্গে যোগাযোগ, খাদ্য আমদানি, কাঁচামাল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য—সবকিছুই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাই ব্রিটিশ নৌনীতি দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি বহর বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল, যা সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী নৌবাহিনীর চেয়ে শক্তিশালী হবে।
জার্মানিতে অ্যাডমিরাল আলফ্রেড ফন টিরপিৎসের নেতৃত্বে দ্রুত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ শুরু হলে ব্রিটেন এটিকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। ১৯০৬ সালে ব্রিটেন এইচএমএস ড্রেডনট চালু করার পর নৌযুদ্ধের প্রযুক্তিগত মানই বদলে যায়। বিশাল কামান, উচ্চ গতি এবং উন্নত বর্ম নিয়ে নতুন ড্রেডনট যুগ শুরু হয়। জার্মানিও দ্রুত একই ধরনের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ব্রিটিশ গ্র্যান্ড ফ্লিট উত্তর সাগরের কৌশলগত প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে। এর প্রধান ঘাঁটি ছিল স্কাপা ফ্লোসহ উত্তর ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থান। জার্মান হাই সিজ ফ্লিট প্রধানত উত্তর সাগরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে ঘাঁটি করে থাকত। জার্মানরা বুঝত, পুরো ব্রিটিশ নৌবহরের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে নামা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তাদের কৌশল ছিল ব্রিটিশ বহরের ছোট অংশকে প্রলুব্ধ করে আলাদা অবস্থায় ধ্বংস করা এবং ধীরে ধীরে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন করা।
১৯১৬ সালে জার্মান হাই সিজ ফ্লিটের কমান্ডার অ্যাডমিরাল রাইনহার্ড শেয়ার এই ধরনের একটি অভিযান পরিকল্পনা করেন। জার্মান ব্যাটলক্রুজার বাহিনীর কমান্ডার ফ্রানৎস ফন হিপার উত্তর সাগরে বেরিয়ে ব্রিটিশ উপকূল বা নৌবাহিনীকে উসকে দেবেন। ধারণা ছিল, ব্রিটিশ ব্যাটলক্রুজার বাহিনী তাদের অনুসরণ করলে শেয়ারের প্রধান যুদ্ধবহর পেছন থেকে এসে সেই অংশকে ধ্বংস করবে।
কিন্তু জার্মানদের একটি গুরুতর সমস্যা ছিল—ব্রিটিশরা তাদের নৌসংকেতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভাঙতে সক্ষম হয়েছিল। ব্রিটিশ নৌ গোয়েন্দা বিভাগের রুম ফোরটি জার্মান বেতার যোগাযোগ বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে যে একটি বড় নৌ অভিযান আসছে। ফলে ব্রিটিশ গ্র্যান্ড ফ্লিটের কমান্ডার অ্যাডমিরাল স্যার জন জেলিকো এবং ব্যাটলক্রুজার বাহিনীর কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ডেভিড বিটি আগে থেকেই সমুদ্রে বেরিয়ে জার্মানদের মোকাবিলার অবস্থানে চলে যান।
৩১ মে বিকেলে প্রথম বড় সংঘর্ষ হয় বিটির ব্রিটিশ ব্যাটলক্রুজার এবং হিপারের জার্মান ব্যাটলক্রুজারের মধ্যে। দুই বাহিনী বিপরীত দিকে চলতে চলতে ভারী কামানের গোলা ছুড়তে শুরু করে। এই পর্যায়কে পরে ‘রান টু দ্য সাউথ’ বলা হয়, কারণ হিপার দক্ষিণে নিজের প্রধান বহরের দিকে সরে যাচ্ছিল এবং বিটি তাকে অনুসরণ করছিল।
এই সংঘর্ষে ব্রিটিশ ব্যাটলক্রুজারগুলোর একটি মারাত্মক দুর্বলতা প্রকাশ পায়। গতি ও ভারী কামানের জন্য তাদের বর্মের কিছু অংশ তুলনামূলক দুর্বল ছিল, এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে গোলাবারুদ ব্যবস্থাপনায় বিপজ্জনক অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। দ্রুত গুলি চালানোর জন্য কামানের টারেট ও ম্যাগাজিনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কখনো কখনো শিথিলভাবে পরিচালিত হতো। ফলে শত্রুর গোলা ভেতরে প্রবেশ করলে আগুন সরাসরি প্রধান গোলাবারুদের ম্যাগাজিনে পৌঁছানোর ঝুঁকি তৈরি হতো।
এইচএমএস ইনডেফ্যাটিগেবল জার্মান গোলায় আঘাত পেয়ে বিস্ফোরিত হয়ে ডুবে যায়। কিছুক্ষণ পর এইচএমএস কুইন মেরিও প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়। হাজারের কাছাকাছি নাবিক মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ হারায়। ব্রিটিশ জাহাজগুলোর এই দ্রুত ধ্বংস দেখে বিটির সঙ্গে যুক্ত বিখ্যাত মন্তব্যের সারমর্ম ছিল—আজ তাদের জাহাজগুলোতে যেন কোনো সমস্যা হচ্ছে।
কিন্তু হিপারকে অনুসরণ করতে গিয়ে বিটির বাহিনী শেষ পর্যন্ত জার্মান হাই সিজ ফ্লিটের প্রধান অংশের সামনে এসে পড়ে। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তিনি শুধু কয়েকটি ব্যাটলক্রুজার নয়, শেয়ারের বৃহৎ যুদ্ধবহরের দিকেই এগিয়ে গেছেন। বিটি দ্রুত উত্তরদিকে ফিরে জার্মানদের নিজের প্রধান গ্র্যান্ড ফ্লিটের দিকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করেন। এই পর্যায়কে বলা হয় ‘রান টু দ্য নর্থ’।
এখন জার্মানরাই ব্রিটিশদের অনুসরণ করছিল, কিন্তু তারা জানত না সামনে জেলিকোর বিশাল গ্র্যান্ড ফ্লিট অবস্থান করছে। এখানেই জাটল্যান্ডের কৌশলগত নাটকীয়তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
জেলিকোর সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল—কোন দিক দিয়ে তার যুদ্ধজাহাজের সারি মোতায়েন করবেন? ভুল সিদ্ধান্ত নিলে জার্মানরা পালিয়ে যেতে পারে, এমনকি ব্রিটিশ বহরের একটি অংশও বিপদে পড়তে পারে। কিন্তু সঠিক সময়ে তিনি তাঁর বহরকে এমনভাবে মোতায়েন করেন যে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজগুলো জার্মান লাইনের সামনে আড়াআড়ি অবস্থান নিতে সক্ষম হয়।
নৌযুদ্ধের ভাষায় এটি ছিল অত্যন্ত সুবিধাজনক পরিস্থিতি, যাকে প্রায়ই ‘ক্রসিং দ্য টি’ বলা হয়। এতে ব্রিটিশ লাইন তার পাশের প্রায় সব প্রধান কামান ব্যবহার করতে পারে, অথচ সামনে এগিয়ে আসা জার্মান জাহাজগুলোর অনেকেই সীমিত সংখ্যক সামনের কামান দিয়ে পাল্টা গুলি চালাতে পারে।
জার্মান অ্যাডমিরাল শেয়ার হঠাৎ সামনে পুরো ব্রিটিশ গ্র্যান্ড ফ্লিট দেখে দ্রুত বিপদ বুঝতে পারেন। তিনি জার্মান যুদ্ধজাহাজগুলোকে একসঙ্গে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে বিপরীত দিকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই জটিল কৌশলকে গেফেখটসকেয়ার্টভেন্ডুং বলা হতো। জার্মান নাবিকদের প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলার কারণে যুদ্ধের মাঝেও এটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
কিছু সময় পর শেয়ার আবার ব্রিটিশ লাইনের দিকে ফিরে আসেন—কেন তিনি এমন করেছিলেন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আবারও তিনি ব্রিটিশ প্রধান বহরের সামনে বিপজ্জনক অবস্থানে পড়েন। এবার পালানোর সুযোগ তৈরি করতে জার্মান ব্যাটলক্রুজার ও টর্পেডো নৌযানগুলোকে আক্রমণে পাঠানো হয়। হিপারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটলক্রুজারগুলো কার্যত আত্মঘাতী ধরনের আক্রমণ চালিয়ে প্রধান জার্মান বহরকে সরে যাওয়ার সময় তৈরি করে।
এই পর্যায়ে ব্রিটিশ ব্যাটলক্রুজার এইচএমএস ইনভিন্সিবল বিস্ফোরিত হয়ে ডুবে যায়। জার্মানদেরও গুরুতর ক্ষতি হচ্ছিল। বিশেষ করে এসএমএস লুট্জো এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে পরে সেটি পরিত্যাগ করে ডুবিয়ে দিতে হয়।
রাত নামার পর যুদ্ধ আরও বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। জার্মান নৌবহর ব্রিটিশ বহরের পেছন দিয়ে নিজ ঘাঁটির দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। রাতের অন্ধকারে ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার এবং যুদ্ধজাহাজের মধ্যে একাধিক কাছাকাছি সংঘর্ষ হয়। ব্রিটিশদের কিছু অবস্থানগত সুবিধা থাকলেও যোগাযোগের সমস্যা, অসম্পূর্ণ তথ্য এবং রাতের যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে জেলিকো জার্মান বহরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সক্ষম হননি।
১ জুন সকালে জার্মান হাই সিজ ফ্লিট নিরাপদ ঘাঁটির দিকে ফিরে যায়। যুদ্ধ শেষ।
ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেখলে জার্মানির সাফল্য স্পষ্ট মনে হয়। ব্রিটিশরা মোট ১৪টি জাহাজ হারায় এবং প্রায় ৬,০০০-এর বেশি নাবিক নিহত হয়। জার্মানি হারায় ১১টি জাহাজ, আর তাদের নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ২,৫০০-এর বেশি। জাহাজের মোট টনেজের হিসাবেও ব্রিটিশ ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
এই কারণে জার্মান প্রচারণা জাটল্যান্ডকে বড় বিজয় হিসেবে ঘোষণা করে। তারা যুক্তি দেয়, সংখ্যায় বৃহত্তর ব্রিটিশ নৌবহরের বিরুদ্ধে জার্মান নৌবাহিনী বেশি ক্ষতি করেছে এবং সফলভাবে ঘাঁটিতে ফিরে এসেছে। কৌশলগত বা ট্যাকটিক্যাল ক্ষয়ক্ষতির বিচারে জার্মানরা সত্যিই ভালো ফল করেছিল।
ব্রিটেনে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল অনেক বেশি হতাশার। জনসাধারণ দীর্ঘদিন ধরে ট্রাফালগারের মতো সিদ্ধান্তমূলক নৌবিজয়ের ঐতিহ্যে অভ্যস্ত ছিল। তারা আশা করেছিল রয়্যাল নেভি জার্মান বহরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করবে। পরিবর্তে সংবাদ এলো যে ব্রিটেন নিজেই বেশি জাহাজ ও নাবিক হারিয়েছে। ফলে শুরুতে অনেকে জাটল্যান্ডকে ব্যর্থতা হিসেবেও দেখেছিল।
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আসে—যুদ্ধের পর উত্তর সাগর কে নিয়ন্ত্রণ করছিল?
উত্তর ছিল ব্রিটেন।
জার্মান হাই সিজ ফ্লিট জাটল্যান্ডে ধ্বংস হয়নি, কিন্তু ব্রিটিশ গ্র্যান্ড ফ্লিটও তার প্রধান শক্তি অক্ষুণ্ণ রেখেছিল। ব্রিটেনের কাছে জার্মানির তুলনায় বেশি যুদ্ধজাহাজ ও রিজার্ভ ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, জার্মান নৌবহর ব্রিটিশ সমুদ্র আধিপত্য ভাঙতে পারেনি। জার্মান বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে উত্তর সাগরে স্বাধীনভাবে চলাচল করার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি এবং ব্রিটিশ নৌ অবরোধও শেষ হয়নি।
এই সমুদ্র অবরোধ ছিল জাটল্যান্ডের বৃহত্তর অর্থ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের শুরু থেকেই ব্রিটেন জার্মানি ও কেন্দ্রীয় শক্তির দিকে সমুদ্রপথে খাদ্য, কাঁচামাল এবং সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য পণ্য প্রবাহ সীমিত করার চেষ্টা করছিল। ব্রিটিশ নৌবাহিনী জার্মান উপকূলের সামনে খুব কাছাকাছি অবস্থান না করে উত্তর সাগরের প্রবেশপথগুলো নিয়ন্ত্রণ করত—এটি ছিল কার্যত একটি দূরবর্তী অবরোধ।
জার্মানির অর্থনীতি বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল ছিল। দীর্ঘ যুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, সার, তেল, ধাতু এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ঘাটতি বাড়তে থাকে। তবে জার্মানির খাদ্যসংকটের জন্য শুধু অবরোধই দায়ী ছিল না; কৃষি উৎপাদনের সমস্যা, শ্রমিক ও ঘোড়া সেনাবাহিনীতে নিয়ে যাওয়া, পরিবহন সংকট এবং নীতিগত ব্যর্থতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবু ব্রিটিশ অবরোধ জার্মানির অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিল।
জাটল্যান্ডের পর জার্মান নেতৃত্ব বুঝতে পারে, একটি সরাসরি নৌযুদ্ধে রয়্যাল নেভির সামগ্রিক আধিপত্য ভাঙা অত্যন্ত কঠিন। হাই সিজ ফ্লিট পরবর্তী সময়ে কিছু অভিযান চালালেও আর কখনো ব্রিটিশ গ্র্যান্ড ফ্লিটের সঙ্গে জাটল্যান্ডের মতো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ করেনি।
এর পরিবর্তে জার্মানি ক্রমে ইউ-বোট বা সাবমেরিন যুদ্ধের ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করে। ব্রিটেন যেহেতু সমুদ্রপথে খাদ্য ও সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল, তাই জার্মানির পরিকল্পনা ছিল বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবিয়ে ব্রিটেনের অর্থনীতি ও খাদ্য সরবরাহ ভেঙে দেওয়া। শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ সালে জার্মানি পূর্ণমাত্রায় অনিয়ন্ত্রিত সাবমেরিন যুদ্ধ শুরু করবে—যে সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে প্রবেশের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাটল্যান্ডের ফলাফল নিয়ে তাই আজও দুটি স্তরে আলোচনা করা হয়। ট্যাকটিক্যাল বা তাৎক্ষণিক যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফলে জার্মানি তুলনামূলকভাবে সফল ছিল। তারা কম ক্ষতি সহ্য করে ব্রিটেনকে বেশি জাহাজ ও নাবিক হারাতে বাধ্য করেছিল এবং বহরের প্রধান অংশকে নিরাপদে ফিরিয়ে এনেছিল।
কিন্তু কৌশলগত ফলাফলে ব্রিটেন ছিল বিজয়ী। জার্মান হাই সিজ ফ্লিট ব্রিটিশ নৌ অবরোধ ভাঙতে পারেনি, উত্তর সাগরের নিয়ন্ত্রণ বদলাতে পারেনি এবং রয়্যাল নেভির সামগ্রিক আধিপত্যকে শেষ করতে পারেনি। জাটল্যান্ডের পরও ব্রিটিশ গ্র্যান্ড ফ্লিট এমন এক শক্তি হিসেবে রয়ে যায়, যার উপস্থিতিই জার্মান প্রধান বহরকে ঘাঁটির কাছাকাছি সতর্ক অবস্থানে থাকতে বাধ্য করত।
অ্যাডমিরাল জেলিকোর ভূমিকা নিয়েও পরবর্তী সময়ে বিতর্ক হয়েছে। কেউ তাঁকে অতিরিক্ত সতর্ক বলে সমালোচনা করেন, কারণ তিনি জার্মান বহরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর হাতে ছিল এমন একটি নৌবহর, যার ধ্বংস ব্রিটেনের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারত। উইনস্টন চার্চিল পরে তাঁকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যিনি এক বিকেলের মধ্যে যুদ্ধ হারানোর সক্ষমতা রাখতেন—অর্থাৎ গ্র্যান্ড ফ্লিট ধ্বংস হলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কৌশলগত ভিত্তিই বিপন্ন হতে পারত।
জার্মানির ক্ষেত্রেও জাটল্যান্ড একটি দ্বৈত বাস্তবতা প্রকাশ করে। তাদের জাহাজের বর্ম, ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাবিকদের প্রশিক্ষণ বহু ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু একটি অসাধারণভাবে দক্ষ নৌবাহিনীও যদি শত্রুর বৃহত্তর কৌশলগত ব্যবস্থা ভাঙতে না পারে, তাহলে যুদ্ধক্ষেত্রে বেশি শত্রু জাহাজ ডুবিয়েও সামগ্রিক যুদ্ধজয় নিশ্চিত হয় না।
জাটল্যান্ডের যুদ্ধ তাই “কে বেশি জাহাজ ডুবিয়েছিল?” প্রশ্নের চেয়ে অনেক বড় একটি ইতিহাস। জার্মানি যুদ্ধক্ষেত্রে বেশি ক্ষতি চাপিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু ব্রিটেন সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল। ৩১ মে থেকে ১ জুনের কামানযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও ব্রিটিশ নৌ অবরোধ চলতে থাকে, জার্মান হাই সিজ ফ্লিট আবার ঘাঁটিতে ফিরে যায় এবং উত্তর সাগরের কৌশলগত ভারসাম্য মূলত অপরিবর্তিত থাকে। সেই অর্থে জাটল্যান্ড ছিল একই সঙ্গে জার্মানির ট্যাকটিক্যাল সাফল্য এবং ব্রিটেনের কৌশলগত বিজয়—আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের বিচারে দ্বিতীয়টিই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হয়।
মেরি উলস্টোনক্রাফট: নারীর সমঅধিকারের আধুনিক আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক পথিকৃৎ
ক্যাথরিন দ্য গ্রেট: রাশিয়াকে ইউরোপীয় পরাশক্তিতে রূপ দেওয়া সম্রাজ্ঞীর ইতিহাস
রানী এনজিঙ্গা: পর্তুগিজ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আফ্রিকার কিংবদন্তি প্রতিরোধযোদ্ধার ইতিহাস
ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতন: দ্বিতীয়বার সিংহাসন ত্যাগ, সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন ও ইউরোপে এক যুগের অবসান
প্রুশিয়ানদের আগমন ও ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতন: ওয়েলিংটন ও ব্লুশার কীভাবে ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন?
ওয়াটারলুর যুদ্ধ ১৮১৫: হুগোমোঁ, লা হে সাঁত, ফরাসি অশ্বারোহী আক্রমণ ও নেপোলিয়নের শেষ লড়াইয়ের পূর্ণ ইতিহাস