সোমারটন ম্যান: সমুদ্রসৈকতে মৃত রহস্যময় ব্যক্তিটির পরিচয় জানতে কেন লেগেছিল সাত দশকেরও বেশি?
- Author: Admin
- September 01, 2026
সাত দশক ধরে পরিচয়হীন সোমারটন ম্যানের রহস্য
১৯৪৮ সালের ১ ডিসেম্বর সকালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডের দক্ষিণ-পশ্চিমে সোমারটন সমুদ্রসৈকতে এমন একটি মৃতদেহ পাওয়া যায়, যা পরবর্তী সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের অন্যতম আলোচিত অজ্ঞাত-পরিচয় রহস্যে পরিণত হয়। মৃত ব্যক্তিটি পরিচ্ছন্ন পোশাক পরা, সুগঠিত দেহের মধ্যবয়সী একজন পুরুষ। তাঁর কাছে পরিচয়পত্র ছিল না, মানিব্যাগ ছিল না, এমনকি এমন কোনো ব্যক্তিগত কাগজও ছিল না যার সাহায্যে সহজে তাঁর নাম বা ঠিকানা জানা যায়। আরও অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল, তাঁর পোশাকের অধিকাংশ নির্মাতার পরিচয়সূচক চিহ্ন কেটে বা খুলে ফেলা হয়েছিল। ফলে তদন্তকারীদের সামনে প্রথম এবং সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটিই হয়ে দাঁড়ায়—এই মানুষটি আসলে কে?
মৃতদেহটি সমুদ্রের কাছাকাছি বালুর ওপর একটি বাঁধের পাশে হেলান দেওয়া অবস্থায় ছিল। আগের সন্ধ্যাতেও কয়েকজন মানুষ ওই স্থানে একজন পুরুষকে শুয়ে থাকতে দেখেছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ তাঁর শরীরের সামান্য নড়াচড়াও লক্ষ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা ভেবেছিলেন লোকটি হয়তো মাতাল অথবা ঘুমিয়ে আছেন। পরদিন সকালে পথচারীরা বুঝতে পারেন, তিনি আর জীবিত নেই। তাঁর অবস্থান দেখে প্রথমে এমন কোনো স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি যে সেখানে সহিংস লড়াই হয়েছে বা তাঁকে প্রকাশ্যে আক্রমণ করা হয়েছে।
মৃত ব্যক্তির পোশাকও তদন্তকারীদের কৌতূহল বাড়ায়। তিনি যথেষ্ট পরিপাটি পোশাক পরেছিলেন, কিন্তু তাঁর কাছে পরিচয় নিশ্চিত করার মতো কিছুই ছিল না। পোশাকের বিভিন্ন পরিচয়সূচক চিহ্ন সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে সন্দেহজনক মনে হয়। এটি কি তিনি নিজেই করেছিলেন, যাতে মৃত্যুর পর তাঁকে শনাক্ত করা না যায়? নাকি অন্য কেউ তাঁর পরিচয় গোপন করতে চেয়েছিল? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর আঙুলের ছাপ বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়েও তখন পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ময়নাতদন্ত রহস্য আরও বাড়িয়ে দেয়। শরীরে এমন কোনো বড় বাহ্যিক আঘাত পাওয়া যায়নি যা সরাসরি মৃত্যুর ব্যাখ্যা দিতে পারে। কিন্তু শরীরের ভেতরে কিছু অস্বাভাবিকতা ছিল, যা বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন অঙ্গের অবস্থা দেখে চিকিৎসকেরা সন্দেহ করেছিলেন যে কোনো বিষাক্ত পদার্থ মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকতে পারে। অথচ প্রচলিত পরীক্ষায় পরিচিত কোনো বিষ শনাক্ত করা যায়নি। সে সময়ের পরীক্ষাগারের প্রযুক্তি আজকের মতো উন্নত ছিল না। এমন কিছু বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে যেগুলো খুব অল্প মাত্রায় প্রাণঘাতী হতে পারে এবং মৃত্যুর পর দ্রুত ভেঙে যাওয়ায় শনাক্ত করাও কঠিন। ফলে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি—আর এই অনিশ্চয়তাই পরবর্তী গুপ্তহত্যা ও গুপ্তচর তত্ত্বের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
তদন্তে নতুন মোড় আসে অ্যাডিলেড রেলস্টেশনে জমা রাখা একটি সুটকেস পাওয়ার পর। ধারণা করা হয়, সেটি মৃত ব্যক্তিরই ছিল। সুটকেসের ভেতরে পোশাক, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী এবং আরও কিছু জিনিস পাওয়া যায়। এখানেও অধিকাংশ পোশাক থেকে পরিচয়সূচক চিহ্ন সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি জিনিসে ‘কিন’ বা কাছাকাছি বানানের একটি নাম পাওয়া গেলেও সেই সূত্র ধরে মৃত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। পরে বংশগতিবিদ্যাভিত্তিক অনুসন্ধান থেকে এই নামটির সঙ্গে সম্ভাব্য পারিবারিক যোগসূত্রের গুরুত্ব নতুনভাবে সামনে আসে।
সুটকেসটির সঙ্গে মৃত ব্যক্তির যোগসূত্র স্থাপনে একটি অস্বাভাবিক ধরনের সুতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁর পোশাক মেরামতে ব্যবহৃত সুতার সঙ্গে সুটকেসে থাকা সুতার মিল ছিল। এর ফলে তদন্তকারীরা ক্রমেই নিশ্চিত হন যে সুটকেসটি তাঁরই। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এতগুলো ব্যক্তিগত জিনিস পাওয়ার পরও তাঁর নাম জানা গেল না। সাধারণত একজন মানুষের ভ্রমণের সুটকেসে চিঠি, ঠিকানা, টিকিট, পরিচয়পত্র বা এমন কিছু পাওয়া যায় যা তাঁর সামাজিক পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়। এখানে যেন পরিচয়ের পথগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে ফেলা হয়েছিল।
কিন্তু সোমারটন ম্যানের রহস্যকে কিংবদন্তিতে পরিণত করে তাঁর প্যান্টের একটি ছোট গোপন পকেট থেকে পাওয়া ক্ষুদ্র কাগজের টুকরো। সেখানে ছাপা ছিল ‘তামাম শুদ’—ফারসি উৎসের একটি অভিব্যক্তি, যার অর্থ মোটামুটি ‘সমাপ্ত’ বা ‘শেষ হয়ে গেছে’। অনুসন্ধানে বোঝা যায়, কাগজের অংশটি ওমর খৈয়ামের কবিতার বিখ্যাত সংকলন ‘রুবাইয়াত’-এর একটি সংস্করণের শেষ পৃষ্ঠা থেকে ছেঁড়া।
একজন অজ্ঞাত মানুষ রহস্যজনকভাবে মারা গেলেন, তাঁর পরিচয়সূচক চিহ্নগুলো অনুপস্থিত, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত নয়, আর তাঁর গোপন পকেটে পাওয়া গেল ‘সমাপ্ত’ অর্থবাহী একটি শব্দ—স্বাভাবিকভাবেই ঘটনাটি আত্মহত্যার সম্ভাবনার দিকে তদন্তকারীদের দৃষ্টি টেনে নেয়। কিন্তু এখানেই রহস্য শেষ হয়নি। বরং এই ক্ষুদ্র কাগজের টুকরোটিই তদন্তকে আরও অদ্ভুত একটি পথে নিয়ে যায়।
পুলিশ চেষ্টা করে সেই নির্দিষ্ট বইটি খুঁজে বের করতে, যেখান থেকে কাগজটি ছেঁড়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ‘রুবাইয়াত’-এর এমন একটি কপি সামনে আসে যার শেষ অংশের সঙ্গে উদ্ধার করা কাগজটির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। বইটি একজন ব্যক্তি তাঁর গাড়িতে অজ্ঞাতভাবে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। বইটির পেছনের দিকে কয়েকটি রহস্যময় অক্ষর ও রেখা লেখা ছিল। সেগুলো দেখতে সাংকেতিক বার্তার মতো হওয়ায় নতুন একটি প্রশ্ন জন্ম নেয়—সোমারটন ম্যান কি কোনো গোপন সংকেত বহন করছিলেন?
লেখাগুলোর অর্থ উদ্ধারের জন্য বহু চেষ্টা হয়েছে। সংকেত বিশ্লেষক, গবেষক এবং অপেশাদার রহস্য অনুসন্ধানকারীরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ মনে করেছেন এগুলো কোনো সাংকেতিক বার্তার প্রথম অক্ষর, কেউ বলেছেন ব্যক্তিগত স্মরণসংকেত, আবার কেউ ধারণা করেছেন এগুলোর সঙ্গে ঘোড়দৌড় বা বাজির হিসাবের সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত সমাধান পাওয়া যায়নি যা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে লেখাগুলো কী বোঝাত।
বইটিতে পাওয়া একটি দূরভাষ নম্বর তদন্তকে আরও গুরুত্বপূর্ণ একজন নারীর কাছে নিয়ে যায়। নম্বরটি অ্যাডিলেডের সোমারটন এলাকার কাছাকাছি বসবাসকারী জেসিকা থমসনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পুলিশ তাঁকে মৃত ব্যক্তির মুখের তৈরি প্রতিরূপ দেখায়। পরবর্তী বিভিন্ন বর্ণনায় দাবি করা হয়, সেটি দেখে তাঁর প্রতিক্রিয়া অস্বাভাবিক ছিল। তবে তিনি মৃত ব্যক্তিকে চেনেন—এমন কথা তদন্তকারীদের কাছে স্বীকার করেননি। এখান থেকেই রহস্যের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী অধ্যায় শুরু হয়।
জেসিকার সঙ্গে ‘রুবাইয়াত’-এর একটি আকর্ষণীয় সম্পর্কও ছিল। তিনি অতীতে আলফ বক্সাল নামের একজন ব্যক্তিকে বইটির একটি কপি দিয়েছিলেন। ফলে একসময় তদন্তকারীরা ভেবেছিলেন মৃত ব্যক্তি হয়তো বক্সাল। কিন্তু বক্সালকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায় এবং তাঁর কাছে জেসিকার দেওয়া বইটিও ছিল। অর্থাৎ সোমারটন ম্যান বক্সাল নন। রহস্য আবার আগের জায়গায় ফিরে যায়।
ঘটনার সময়কালও গুপ্তচর তত্ত্বকে শক্তিশালী করেছিল। ১৯৪৮ সাল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক উত্তেজনার যুগ। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে শীতল যুদ্ধ দ্রুত তীব্র হয়ে উঠছিল। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় সামরিক ও প্রতিরক্ষা গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ছিল। ফলে অজ্ঞাত ব্যক্তি, পরিচয়হীন পোশাক, সম্ভাব্য দুর্লভ বিষ, রহস্যময় অক্ষর এবং অস্বাভাবিকভাবে গোপনীয় ব্যক্তিগত যোগাযোগ—সব মিলিয়ে অনেকের কাছে এটি যেন একটি নিখুঁত গুপ্তচর কাহিনি হয়ে ওঠে।
তবে গুপ্তচর তত্ত্ব জনপ্রিয় হওয়া আর তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা এক বিষয় নয়। সোমারটন ম্যান যে কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করতেন, এমন সিদ্ধান্তমূলক প্রমাণ কখনো পাওয়া যায়নি। বরং দীর্ঘদিন তাঁর পরিচয় অজানা থাকায় তথ্যের শূন্যস্থানগুলো নানা অনুমান দিয়ে পূরণ করা হয়েছে। রহস্য যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই বাস্তব ঘটনা ও জনপ্রিয় কল্পনার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়েছে।
তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়েও নানা তত্ত্ব তৈরি হয়েছিল। তাঁর পায়ের পেশির গঠন এবং কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ধারণা করা হয়েছিল তিনি হয়তো নৃত্যশিল্পী, খেলোয়াড় অথবা বিশেষ ধরনের শারীরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছিলেন। এমনকি তাঁর দাঁত ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও শনাক্তকরণের কাজে ব্যবহারের চেষ্টা হয়। কিন্তু বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যক্তিগত তথ্যভান্ডার আজকের মতো সংযুক্ত ছিল না। একজন মানুষ অন্য রাজ্য থেকে এসে মারা গেলে এবং তাঁর কাছে কোনো পরিচয়পত্র না থাকলে তাঁকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারত।
এখানেই বোঝা যায়, সোমারটন ম্যানের পরিচয় এত দশক রহস্য থাকার প্রধান কারণ কোনো একটি অসাধারণ ষড়যন্ত্র নয়; বরং একাধিক তদন্তগত প্রতিবন্ধকতা একই সঙ্গে কাজ করেছিল। তাঁর কাছে পরিচয়পত্র ছিল না, পোশাকের চিহ্ন সরানো ছিল, আঙুলের ছাপ থেকে ফল পাওয়া যায়নি, তাঁর সঙ্গে মেলানো যায় এমন নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য পাওয়া যায়নি, সুটকেসেও নির্ভরযোগ্য পরিচয় ছিল না এবং সে সময় বংশগত ডিএনএ বিশ্লেষণের প্রযুক্তি ছিল অকল্পনীয়।
মৃত ব্যক্তির ছবি বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ করা হয় এবং বহু সম্ভাব্য পরিচয় সামনে আসে। কেউ দাবি করেন তিনি তাঁদের পরিচিত নিখোঁজ ব্যক্তি, কেউ আবার বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সঙ্গে তাঁর মিল খুঁজে পান। কিন্তু একের পর এক সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যায়। তাঁর মৃতদেহ শেষ পর্যন্ত অ্যাডিলেডের ওয়েস্ট টেরেস সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হয়। সমাধিফলকে তিনি নিজের প্রকৃত নামের পরিবর্তে ইতিহাসের দেওয়া পরিচয়েই থেকে যান—সোমারটন ম্যান।
দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও মামলাটি বিস্মৃত হয়নি। বরং নতুন প্রজন্মের গবেষকরা পুরোনো নথি, ছবি, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক ইতিহাস এবং সম্ভাব্য সম্পর্ক নতুন করে পরীক্ষা করতে থাকেন। অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেরেক অ্যাবট দীর্ঘ সময় ধরে এই রহস্য নিয়ে অনুসন্ধান করেন। আধুনিক বংশগতিবিদ্যা ও ডিএনএ বিশ্লেষণ ক্রমে এমন একটি পথ খুলে দেয়, যা ১৯৪৮ সালের তদন্তকারীদের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব।
২০২১ সালে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ সোমারটন ম্যানের দেহাবশেষ কবর থেকে উত্তোলন করে। লক্ষ্য ছিল আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তাঁর বংশগত উপাদান পরীক্ষা করা। একই সময়ে তাঁর মৃত্যুর পর তৈরি করা মুখমণ্ডলের প্লাস্টার প্রতিরূপে আটকে থাকা পুরোনো চুলও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কয়েক দশক আগের সামান্য চুল থেকে পর্যাপ্ত বংশগত তথ্য উদ্ধার করার ক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত এই রহস্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে।
ডেরেক অ্যাবট এবং মার্কিন ফরেনসিক বংশগতিবিদ কোলিন ফিটজপ্যাট্রিক চুল থেকে পাওয়া বংশগত তথ্য ব্যবহার করে দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের সন্ধান করেন। পদ্ধতিটি সরাসরি মৃত ব্যক্তির নাম বলে দেয় না। বরং বংশগত মিল পাওয়া জীবিত ব্যক্তিদের পূর্বপুরুষ, তাঁদের ভাইবোন, সন্তান এবং পারিবারিক শাখাগুলো অনুসরণ করে বিশাল একটি বংশলতা তৈরি করতে হয়। এই অনুসন্ধানে হাজার হাজার মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়।
শেষ পর্যন্ত একটি নাম বিশেষভাবে সামনে আসে—কার্ল ‘চার্লস’ ওয়েব। তিনি ১৯০৫ সালে ভিক্টোরিয়ায় জন্মেছিলেন এবং বৈদ্যুতিক প্রকৌশল ও যন্ত্র নির্মাণসংক্রান্ত কাজে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক বংশলতায় তাঁর অবস্থান, বয়স, নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার সময়কাল এবং বংশগত মিল—সবকিছু সোমারটন ম্যানের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে, তাঁর পারিবারিক সংযোগের মধ্যে ‘কিন’ নামটির উপস্থিতিও পুরোনো সুটকেসে পাওয়া নামের রহস্যকে নতুন অর্থ দেয়।
বংশগত অনুসন্ধানে পিতৃ ও মাতৃ—উভয় দিকের আত্মীয়তার সূত্র মিলিয়ে গবেষকেরা অত্যন্ত উচ্চমাত্রার নিশ্চয়তায় সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে সোমারটন ম্যান ছিলেন কার্ল চার্লস ওয়েব। তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যায়, তাঁর স্ত্রী ডরোথি তাঁর থেকে আলাদা হয়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় চলে গিয়েছিলেন। ফলে ওয়েব কেন মেলবোর্ন অঞ্চল ছেড়ে অ্যাডিলেডের দিকে এসে থাকতে পারেন, তার একটি সম্ভাব্য বাস্তব ব্যাখ্যাও তৈরি হয়। তবে তিনি সত্যিই স্ত্রীর সন্ধানে সেখানে গিয়েছিলেন কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে। গবেষকদের বংশগত ডিএনএ বিশ্লেষণে কার্ল ওয়েবের পরিচয় অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া পৃথকভাবে চলেছে। ফলে জনপ্রিয় আলোচনায় ‘রহস্য সম্পূর্ণ সমাধান হয়ে গেছে’ বলা হলেও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পাওয়া পরিচয় এবং সরকারি বিচারিক স্বীকৃতিকে একই বিষয় ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিচয়ের সম্ভাব্য সমাধান তাঁর মৃত্যুর রহস্যের সমাধান নয়। যদি সোমারটন ম্যান সত্যিই কার্ল চার্লস ওয়েব হয়ে থাকেন, তাহলেও তিনি কেন সোমারটন সৈকতে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর ঠিক আগে কী করেছিলেন, কীভাবে মারা গেলেন, তাঁর কাছে ‘তামাম শুদ’ লেখা কাগজটি কেন ছিল এবং ‘রুবাইয়াত’-এর পেছনের রহস্যময় অক্ষরগুলোর অর্থ কী—এসব প্রশ্নের অনেকগুলোরই নিশ্চিত উত্তর নেই।
বিষক্রিয়ার ধারণাটিও পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। ময়নাতদন্তে সন্দেহ তৈরি হলেও কোনো নির্দিষ্ট বিষ প্রমাণিত হয়নি। আবার আত্মহত্যা, স্বাভাবিক মৃত্যু অথবা অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা—কোনোটিকেই এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি যাতে বিতর্ক শেষ হয়ে যায়। ফলে পরিচয় রহস্যের বড় অংশ উন্মোচিত হলেও মৃত্যুর ঘটনাক্রম এখনও অসম্পূর্ণ।
‘তামাম শুদ’ কাগজটির অর্থও তাই নতুনভাবে ভাবার সুযোগ রয়েছে। এটি কি আত্মহত্যার আগে সচেতনভাবে রাখা প্রতীকী বার্তা? নাকি কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মারক? অথবা কেবল এমন একটি কাগজ, যার উপস্থিতিকে পরবর্তী তদন্ত অস্বাভাবিক গুরুত্ব দিয়েছে? একইভাবে বইয়ের পেছনের অক্ষরগুলো প্রকৃত সাংকেতিক বার্তা নাও হতে পারে। সেগুলো ব্যক্তিগত নোট, কোনো কবিতার শব্দ মনে রাখার পদ্ধতি, হিসাব কিংবা অন্য কোনো সাধারণ উদ্দেশ্যে লেখা হয়ে থাকতে পারে।
সোমারটন ম্যানের ঘটনা তাই অপরাধ ইতিহাসের পাশাপাশি ফরেনসিক বিজ্ঞানের বিবর্তনেরও অসাধারণ উদাহরণ। ১৯৪৮ সালে তদন্তকারীদের হাতে ছিল আঙুলের ছাপ, দাঁতের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, সংবাদপত্রে ছবি প্রকাশ এবং প্রচলিত রাসায়নিক পরীক্ষা। সাত দশক পরে গবেষকেরা একই রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যবহার করতে পেরেছেন লক্ষ লক্ষ বংশগত চিহ্ন, দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মিল এবং ডিজিটাল পারিবারিক বংশলতা। যে মানুষটির নিজের কাছে কোনো পরিচয়পত্র ছিল না, তাঁর পরিচয়ের সূত্র শেষ পর্যন্ত বহন করে রেখেছিল তাঁর শরীরের ক্ষুদ্র একটি চুল।
এই ঘটনাটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত এখানেই। দীর্ঘদিন ধরে রহস্যটির জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল গুপ্তচর, সাংকেতিক বার্তা, দুর্লভ বিষ এবং গোপন প্রেমের সম্ভাবনাকে ঘিরে। কিন্তু পরিচয় অনুসন্ধানের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তর এসেছে অনেক বেশি বাস্তব একটি জায়গা থেকে—পারিবারিক সম্পর্ক ও বংশগত তথ্য থেকে। একজন মানুষ নিজের নাম মুছে ফেলতে পারেন, পোশাকের পরিচয়সূচক চিহ্ন সরিয়ে ফেলতে পারেন, কোনো কাগজপত্র সঙ্গে না-ও রাখতে পারেন; কিন্তু তাঁর বংশগত উত্তরাধিকার তাঁর দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের শরীরেও ছড়িয়ে থাকে।
সাত দশকের বেশি সময় ধরে সোমারটন ম্যানকে ঘিরে রহস্য টিকে থাকার পেছনে তাই একদিকে ছিল ১৯৪৮ সালের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে ছিল তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং পরস্পরবিরোধী সূত্র। পরিচয়হীন মৃতদেহ, কাটা পোশাকের চিহ্ন, রহস্যময় সুটকেস, ‘তামাম শুদ’ লেখা কাগজ, ‘রুবাইয়াত’, অজ্ঞাত অক্ষরের সারি, একটি নারীর দূরভাষ নম্বর এবং সম্ভাব্য বিষক্রিয়া—প্রতিটি সূত্র উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছিল।
আজ কার্ল চার্লস ওয়েবের নাম সেই পরিচয়হীন মুখটির সঙ্গে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে যুক্ত হয়েছে। তবু সোমারটন ম্যানের কাহিনির শেষ পৃষ্ঠা পুরোপুরি লেখা হয়ে যায়নি। তাঁর নামের রহস্য হয়তো আধুনিক বংশগতিবিদ্যা অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে, কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টার ঘটনা এখনও অন্ধকারে। তিনি কে ছিলেন—এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর আমরা পেয়েছি; কিন্তু কেন তিনি সেই সৈকতে মারা গেলেন—সোমারটন ম্যানের প্রকৃত শেষ রহস্য সম্ভবত এখন সেটিই।
অ্যান বোলিনের পতন: বিশ্বাসঘাতকতা, রাজনীতি নাকি সাজানো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রানি?
রিচার্ড তৃতীয় কি সত্যিই দুই রাজপুত্রকে হত্যা করেছিলেন? ইতিহাসের বিতর্কিত রহস্য
পাজ্জি ষড়যন্ত্র: মেডিচি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার রক্তাক্ত পরিকল্পনা ও ফ্লোরেন্সের ক্ষমতার লড়াই
WOW! সংকেত: মহাকাশ থেকে আসা রহস্যময় ৭২ সেকেন্ডের সংকেতটির উৎস কী ছিল?
হিন্টারকাইফেক হত্যাকাণ্ড: নির্জন জার্মান খামারে একই পরিবারের ছয়জনকে কে হত্যা করেছিল?
ডি. বি. কুপার রহস্য: বিমান ছিনতাইয়ের পর মুক্তিপণের টাকা নিয়ে প্যারাসুটে ঝাঁপ দেওয়া লোকটি কোথায় হারিয়ে গেল?