ওয়াটারলুর যুদ্ধ ১৮১৫: হুগোমোঁ, লা হে সাঁত, ফরাসি অশ্বারোহী আক্রমণ ও নেপোলিয়নের শেষ লড়াইয়ের পূর্ণ ইতিহাস
Series: ওয়াটারলুর যুদ্ধ: নেপোলিয়নের শেষ লড়াই ও এক যুগের অবসান
- Author: Admin
- August 30, 2026
ওয়াটারলুর যুদ্ধ ১৮১৫
১৮১৫ সালের ১৮ জুন, বর্তমান বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের দক্ষিণে কয়েকটি ছোট গ্রাম, খামারবাড়ি, শস্যক্ষেত্র ও কাদামাখা ঢালকে ঘিরে এমন একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যার নাম পরবর্তীকালে কোনো সম্পূর্ণ পরাজয়ের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠে—ওয়াটারলু। মাত্র তিন মাস আগে এলবা থেকে ফিরে ফ্রান্সের ক্ষমতা পুনর্দখল করা নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সামনে সেদিন ছিল ডিউক অব ওয়েলিংটনের অ্যাংলো-মিত্র বাহিনী; আর পূর্বদিকে এগিয়ে আসছিল লিনিতে মাত্র দুই দিন আগে পরাজিত ফিল্ড মার্শাল ব্লুশারের প্রুশিয়ান সেনাবাহিনী। নেপোলিয়নের জন্য সমীকরণ ছিল নির্মমভাবে সহজ—প্রুশিয়ানরা পৌঁছানোর আগেই ওয়েলিংটনকে পরাজিত করতে হবে। ব্যর্থ হলে শুধু একটি যুদ্ধ নয়, তার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যও শেষ হয়ে যেতে পারে।
১৭ জুন কোয়াত্র-ব্রা থেকে সরে এসে ওয়েলিংটন মঁ-সাঁ-জঁ রিজের কাছে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। অবস্থানটি তিনি আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তার প্রধান বাহিনীর বড় অংশ রিজের সামনের ঢালের পরিবর্তে বিপরীত ঢালে রাখা হয়েছিল, ফলে ফরাসি কামানের সরাসরি গোলাবর্ষণ থেকে অনেক সৈন্য আড়ালে থাকতে পারে। সামনে কয়েকটি শক্তিশালী অগ্রবর্তী অবস্থান ছিল। ডান দিকে হুগোমোঁ, কেন্দ্রের সামনে লা হে সাঁত, আর বাম দিকের দিকে পাপেলোত ও লা হে এলাকার খামারগুলো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।
আগের রাতের প্রবল বৃষ্টিতে যুদ্ধক্ষেত্র ভিজে কাদায় পরিণত হয়েছিল। কামান ও ভারী সরঞ্জাম সরানো কঠিন হচ্ছিল এবং নরম মাটিতে কামানের গোলার কার্যকারিতাও শুষ্ক জমির তুলনায় কমতে পারত। নেপোলিয়ন সকালেই পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু করেননি। সাধারণভাবে মনে করা হয়, তিনি জমি কিছুটা শুকানোর জন্য অপেক্ষা করেছিলেন, যদিও বাহিনী মোতায়েন ও যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করার বিষয়ও বিলম্বে ভূমিকা রেখেছিল। এই সময়ের মূল্য পরে অসীম হয়ে ওঠে, কারণ পূর্বদিকে প্রুশিয়ানরা ক্রমশ যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে চলে আসছিল।
ওয়াটারলুর প্রথম বড় সংঘর্ষ শুরু হয় হুগোমোঁকে ঘিরে। এটি শুধু একটি বাড়ি ছিল না; প্রাচীরঘেরা বাগান, আঙিনা, ভবন ও আশপাশের বনসহ একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাযোগ্য কমপ্লেক্স ছিল। ওয়েলিংটনের ডান দিকের সামনে অবস্থান করায় এটি ফরাসিদের জন্য আকর্ষণীয় লক্ষ্য হয়ে ওঠে। প্রাথমিকভাবে হুগোমোঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করে ওয়েলিংটনকে তার রিজার্ভ ডান দিকে পাঠাতে বাধ্য করার ধারণা থাকলেও সংঘর্ষ দ্রুত নিজস্ব গতিতে একটি দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়।
ফরাসি সৈন্যরা বারবার হুগোমোঁর প্রাচীর, বন ও প্রবেশপথের দিকে আক্রমণ চালায়। এক পর্যায়ে তারা উত্তর দিকের ফটক ভেঙে আঙিনায় ঢুকতেও সক্ষম হয়। কিন্তু প্রতিরক্ষাকারীরা দ্রুত ফটক বন্ধ করে দেয় এবং ভেতরে ঢোকা অধিকাংশ ফরাসি সৈন্য নিহত বা বন্দি হয়। সারাদিন ধরে হুগোমোঁর ওপর আক্রমণ চলতে থাকে, ভবনের কিছু অংশ আগুনে জ্বলতে থাকে, তবুও অবস্থানটি ওয়েলিংটনের নিয়ন্ত্রণেই থাকে। হুগোমোঁ ফরাসিদের বিপুলসংখ্যক সৈন্যকে এমন একটি লড়াইয়ে আটকে রেখেছিল, যেখানে তারা সিদ্ধান্তমূলক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি।
এরপর নেপোলিয়নের প্রধান আঘাত আসে ওয়েলিংটনের কেন্দ্র-বাম অংশের বিরুদ্ধে। জেনারেল দারলনের প্রথম কোরের বিশাল পদাতিক বাহিনী ঢাল বেয়ে অগ্রসর হয়। কামানের গোলাবর্ষণের পর ঘন বিন্যাসে এগিয়ে আসা ফরাসি পদাতিকরা মিত্রবাহিনীর অগ্রবর্তী অবস্থান ও রিজের দিকে চাপ সৃষ্টি করে। কিছু এলাকায় নেদারল্যান্ডস ও অন্যান্য মিত্র ইউনিট পিছিয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কিন্তু রিজের আড়ালে থাকা ব্রিটিশ পদাতিকরা অপেক্ষা করছিল। ফরাসিরা কাছে আসার পর প্রচণ্ড মাস্কেট ফায়ার শুরু হয়। এরপর মিত্রবাহিনীর ভারী অশ্বারোহীদের পাল্টা আক্রমণ ফরাসি পদাতিকদের ওপর আঘাত হানে। বিশেষভাবে ব্রিটিশ ইউনিয়ন ব্রিগেডের অশ্বারোহীরা কিছু ফরাসি ইউনিটকে বিপর্যস্ত করে এবং ঈগল প্রতীকও দখল করে। কিন্তু সাফল্যের উত্তেজনায় তারা অতিরিক্ত দূর পর্যন্ত এগিয়ে যায়। ফরাসি অশ্বারোহীদের পাল্টা আক্রমণে তাদেরও গুরুতর ক্ষতি হয়। ওয়াটারলুর পুরো যুদ্ধেই এমন দৃশ্য বারবার দেখা যায়—স্থানীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে, কিন্তু তা সিদ্ধান্তমূলক ফলাফলে রূপ নেওয়ার আগেই পাল্টা আঘাত এসেছে।
যুদ্ধের কেন্দ্রস্থলে লা হে সাঁত ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রাসেলস সড়কের পাশে অবস্থিত এই খামারটি ওয়েলিংটনের প্রধান রিজের ঠিক সামনে ছিল। এটি মূলত কিংস জার্মান লিজিয়নের সৈন্যরা রক্ষা করছিল। ফরাসিরা বুঝেছিল, লা হে সাঁত দখল করা গেলে তারা ওয়েলিংটনের কেন্দ্রের খুব কাছে সৈন্য ও কামান নিয়ে যেতে পারবে। ফলে সারাদিন ধরে এখানে একাধিক আক্রমণ চলে।
দুপুরের পর যুদ্ধের সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যগুলোর একটি শুরু হয়—ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনীর বিশাল আক্রমণ। মার্শাল মিশেল নে মনে করেছিলেন মিত্রবাহিনীর কিছু নড়াচড়া সম্ভবত পশ্চাদপসরণের সূচনা। তিনি বিপুলসংখ্যক কুইরাসিয়ার, ল্যান্সার ও অন্যান্য অশ্বারোহী ইউনিটকে রিজের দিকে পাঠান। ভারী অশ্বারোহীদের সারি কাদামাখা ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে।
কিন্তু ওয়েলিংটনের পদাতিকরা পালিয়ে যাচ্ছিল না। তারা দ্রুত স্কোয়ার বা চতুষ্কোণ প্রতিরক্ষা বিন্যাসে অবস্থান নেয়। সৈন্যরা চারদিকে মুখ করে বেয়নেট ও মাস্কেট প্রস্তুত রাখে। প্রশিক্ষিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ পদাতিক স্কোয়ারকে পর্যাপ্ত পদাতিক বা কামান সহযোগিতা ছাড়া অশ্বারোহীদের পক্ষে ভাঙা অত্যন্ত কঠিন ছিল। ফরাসি ঘোড়াগুলো বেয়নেটের দেয়ালের সামনে এসে থেমে যায় বা পাশ দিয়ে চলে যায়; অশ্বারোহীরা গুলি চালায়, আক্রমণ করে, আবার সরে গিয়ে পুনর্গঠিত হয়।
একটির পর একটি অশ্বারোহী আক্রমণে যুদ্ধক্ষেত্র ধোঁয়া, ঘোড়া, চিৎকার এবং কামানের শব্দে ভরে ওঠে। ফরাসিরা সাময়িকভাবে মিত্র কামানের অবস্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায়, কিন্তু কামান স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি। অশ্বারোহীরা সরে গেলে কামানচালকেরা আবার ফিরে এসে গুলি চালাতে থাকে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল অশ্বারোহী, পদাতিক ও কামানের মধ্যে পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাব। নে অসাধারণ ব্যক্তিগত সাহস দেখালেও এই বিশাল আক্রমণে ফরাসি অশ্বারোহী শক্তির একটি বড় অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
এই সময় নেপোলিয়নের জন্য আরও বিপজ্জনক সংবাদ আসছিল। পূর্বদিকে ধুলো ও সৈন্য চলাচল দেখা যাচ্ছিল। তারা গ্রুশির বাহিনী নয়—প্রুশিয়ানরা আসছিল। ব্লুশার লিনিতে পরাজয়ের মাত্র দুই দিন পর নিজের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ওয়েলিংটনের সাহায্যে এগিয়ে আসছিলেন। প্রুশিয়ান জেনারেল ফ্রিডরিখ ভিলহেল্ম ফন বিউলোর চতুর্থ কোর প্রথমে নেপোলিয়নের ডান দিকের দিকে এগিয়ে আসে।
প্রুশিয়ানদের আগমন নেপোলিয়নের পরিকল্পনাকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। এখন তিনি আর শুধু সামনে থাকা ওয়েলিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন না। তাকে পূর্ব দিকেও নতুন ফ্রন্ট তৈরি করতে হচ্ছে। প্লঁসেনোয়া গ্রামকে ঘিরে ফরাসি ও প্রুশিয়ানদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। গ্রামটি হারালে নেপোলিয়নের পশ্চাদপসরণের প্রধান পথ বিপন্ন হতে পারত। ফলে তিনি এমন সৈন্যও সেখানে পাঠাতে বাধ্য হন, যাদের ওয়েলিংটনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আক্রমণে ব্যবহার করা যেত।
তারপরও ফরাসিরা কেন্দ্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে। দীর্ঘ প্রতিরোধের পর লা হে সাঁতের রক্ষাকারীদের গোলাবারুদ সংকট গুরুতর হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার দিকে ফরাসিরা লা হে সাঁত দখল করে। এর ফলে নে ওয়েলিংটনের কেন্দ্রের খুব কাছে সৈন্য ও কামান আনতে সক্ষম হন। মিত্রবাহিনীর কেন্দ্র তখন প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ছিল। কিছু ইউনিট গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত, বহু কর্মকর্তা নিহত বা আহত এবং পুরো রিজে ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়েছিল।
এটি সম্ভবত নেপোলিয়নের শেষ বড় সুযোগগুলোর একটি। কিন্তু সময় তখন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছিল। আরও প্রুশিয়ান বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করছিল এবং প্লঁসেনোয়ায় যুদ্ধ তীব্র হচ্ছিল। ওয়েলিংটনের বাহিনী বিপর্যস্ত হলেও এখনো ভাঙেনি। ফরাসিদের এমন একটি শেষ আঘাত প্রয়োজন ছিল যা মিত্রবাহিনীর কেন্দ্রকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করবে।
নেপোলিয়ন শেষ পর্যন্ত নিজের সবচেয়ে বিখ্যাত রিজার্ভ—ইম্পেরিয়াল গার্ডের অংশকে সামনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। বহু বছরের অভিযানে গার্ড ছিল তার সেনাবাহিনীর মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও শেষ ভরসার প্রতীক। তাদের উপস্থিতি সাধারণ সৈন্যদের মনোবল বাড়িয়ে দিত। সন্ধ্যার দিকে গার্ডের আক্রমণকারী ইউনিটগুলো মঁ-সাঁ-জঁ রিজের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
ফরাসি সৈন্যদের কাছে এটি ছিল সংকেত—সম্ভবত শেষ আঘাত শুরু হয়েছে। কিন্তু ওয়েলিংটন এখনো নিজের কিছু সৈন্য রিজের বিপরীত ঢালে আড়ালে রেখেছিলেন। গার্ডের ইউনিটগুলো ওপরে পৌঁছানোর পর প্রচণ্ড কাছাকাছি দূরত্বের গুলির মুখে পড়ে। ব্রিটিশ গার্ড এবং অন্যান্য মিত্র ইউনিট পাল্টা আক্রমণ করে। কিছু এলাকায় ফরাসি গার্ড এগোলেও শেষ পর্যন্ত আক্রমণ থেমে যায় এবং তারা পিছিয়ে পড়তে শুরু করে।
ইম্পেরিয়াল গার্ডের পশ্চাদপসরণ ছিল যুদ্ধের মনস্তাত্ত্বিক মোড়। যে বাহিনীকে প্রায় অপরাজেয় বলে মনে করা হতো, তারাও ফিরে আসছে—এই দৃশ্য ফরাসি লাইনে দ্রুত আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। “গার্ড পিছিয়ে যাচ্ছে” এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বহু ফরাসি ইউনিটের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। একই সময়ে ওয়েলিংটন তার বাহিনীকে সাধারণ অগ্রযাত্রার নির্দেশ দেন।
সামনে থেকে অ্যাংলো-মিত্র বাহিনী এবং পূর্ব দিক থেকে প্রুশিয়ানদের ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে ফরাসি সেনাবাহিনী ভেঙে যেতে থাকে। প্লঁসেনোয়ার নিয়ন্ত্রণও শেষ পর্যন্ত প্রুশিয়ানদের হাতে চলে যায়। নেপোলিয়নের কিছু গার্ড ইউনিট পশ্চাদপসরণকে আড়াল করার জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করলেও সামগ্রিকভাবে যুদ্ধ আর উদ্ধার করার উপায় ছিল না। নেপোলিয়নের শেষ মহান সেনাবাহিনী রাতের অন্ধকারে দক্ষিণের দিকে বিশৃঙ্খল পশ্চাদপসরণ শুরু করে।
প্রুশিয়ানরা ক্লান্ত ফরাসিদের পিছু নেয়। নেপোলিয়ন নিজেও যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে সরে যান। যে মানুষটি সকালে আশা করেছিলেন ওয়েলিংটনকে পরাজিত করে পরে ব্লুশারের দিকে ঘুরবেন, রাতের শেষে তার নিজের সেনাবাহিনীই দুই মিত্রবাহিনীর সম্মিলিত আঘাতে ভেঙে পড়েছে। তার মূল বেলজিয়াম পরিকল্পনার ঠিক বিপরীত ঘটনাই ঘটেছিল—তিনি শত্রুদের আলাদা করে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন; শেষ পর্যন্ত শত্রুরাই যুদ্ধক্ষেত্রে মিলিত হয়ে তার বাহিনীকে পরাজিত করেছিল।
ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নের পরাজয়কে কোনো একটি ভুল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আগের রাতের বৃষ্টি, আক্রমণ শুরুর বিলম্ব, হুগোমোঁতে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই, দারলনের আক্রমণের ব্যর্থতা, অশ্বারোহীদের অসমন্বিত ব্যবহার, লা হে সাঁত দখলে বিলম্ব, গ্রুশির বিচ্ছিন্ন অবস্থান, প্রুশিয়ানদের দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং ওয়েলিংটনের দৃঢ় প্রতিরক্ষা—সবকিছু মিলেই ফল নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ওয়েলিংটন ও ব্লুশারের সহযোগিতাকে শুধু নেপোলিয়নের ভুলের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মিত্রবাহিনীর নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা এবং একে অপরকে সহায়তা করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত তাদের বিজয়ের কেন্দ্রীয় কারণ ছিল।
হুগোমোঁর গুরুত্ব এখানেই যে এটি ফরাসিদের সারাদিন একটি কঠিন পার্শ্বযুদ্ধে ব্যস্ত রেখেছিল। লা হে সাঁত দেখিয়েছিল কেন্দ্রীয় একটি ছোট প্রতিরক্ষা অবস্থান কত দীর্ঘ সময় একটি বৃহৎ আক্রমণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফরাসি অশ্বারোহী আক্রমণ দেখিয়েছিল অসাধারণ সাহসও সমন্বিত অস্ত্রব্যবহারের বিকল্প নয়। আর প্রুশিয়ানদের আগমন প্রমাণ করেছিল যে লিনিতে দুই দিন আগে অসম্পূর্ণ বিজয়ের মূল্য নেপোলিয়নকে ওয়াটারলুতে দিতে হয়েছে।
ওয়াটারলু ছিল নেপোলিয়নের শেষ যুদ্ধ। পরাজয়ের সংবাদ নিয়ে প্যারিসে ফিরে তিনি রাজনৈতিক সমর্থন পুনর্গঠন করতে ব্যর্থ হন এবং ২২ জুন ১৮১৫ দ্বিতীয়বারের মতো সিংহাসন ত্যাগ করেন। এবার আর এলবার মতো ইউরোপের কাছে ফিরে আসার সুযোগ রাখা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণের পর তাকে দক্ষিণ আটলান্টিকের দূরবর্তী সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়, যেখানে ১৮২১ সালে তার মৃত্যু ঘটে।
১৮ জুন ১৮১৫-এর ওয়াটারলু তাই শুধু একটি সেনাবাহিনীর পরাজয় ছিল না; এটি ছিল নেপোলিয়নিক যুগের সামরিক সমাপ্তি। সকালবেলা হুগোমোঁর দেয়ালের সামনে শুরু হওয়া সংঘর্ষ থেকে সন্ধ্যায় ইম্পেরিয়াল গার্ডের পশ্চাদপসরণ পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইউরোপের ইতিহাসের একটি বিশাল অধ্যায় শেষ হয়ে যায়। যে নেপোলিয়ন অস্টারলিৎস, ইয়েনা ও ওয়াগ্রামের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে পরাজিত করেছিলেন, তার শেষ লড়াইয়ে বিজয় এসেছিল ওয়েলিংটনের দৃঢ় প্রতিরক্ষা এবং ব্লুশারের সময়মতো সহায়তার সমন্বয়ে। ওয়াটারলুর কাদামাখা মাঠে শুধু নেপোলিয়নের শেষ সেনাবাহিনী ভেঙে পড়েনি—সেখানেই শেষ হয়েছিল ইউরোপকে প্রায় দুই দশক ধরে কাঁপিয়ে রাখা এক অসাধারণ সামরিক ও রাজনৈতিক যুগ।
ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতন: দ্বিতীয়বার সিংহাসন ত্যাগ, সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন ও ইউরোপে এক যুগের অবসান
সপ্তম জোট ও বেলজিয়াম অভিযান: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারকে আলাদা করে ধ্বংস করার নেপোলিয়নের শেষ সামরিক পরিকল্পনা
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও ‘হান্ড্রেড ডেজ’: নেপোলিয়ন কীভাবে আবার ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করে ইউরোপকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিলেন?
ভার্দুনের যুদ্ধ: ১৯১৬ সালের দীর্ঘতম রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে ফ্রান্সকে রক্তশূন্য করার জার্মান পরিকল্পনা