আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযান: বিজাপুর, গোলকোন্ডা ও মারাঠাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ
সিরিজ: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস
আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযান
মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযান এক গভীর বৈপরীত্যের গল্প। এই অভিযানের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্য ভৌগোলিকভাবে তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিস্তার লাভ করেছিল, অথচ একই যুদ্ধ সাম্রাজ্যের অর্থ, সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয় করে দেয়। বিজাপুর ও গোলকোন্ডার মতো শক্তিশালী দাক্ষিণাত্য সুলতানাত শেষ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, কিন্তু মারাঠাদের দমন করার প্রচেষ্টা এমন এক অন্তহীন যুদ্ধে পরিণত হয়, যার কোনো স্থায়ী সামরিক সমাধান আওরঙ্গজেব জীবদ্দশায় খুঁজে পাননি।
আওরঙ্গজেবের আগে থেকেই দাক্ষিণাত্য মুঘলদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আকবরের শেষদিকে আহমদনগরের নিজামশাহী রাজ্যের বিরুদ্ধে মুঘল অভিযান শুরু হয়। জাহাঙ্গীরের সময় মালিক আম্বরের প্রতিরোধ মুঘলদের বারবার সমস্যায় ফেলে। শাহজাহানের আমলে ১৬৩৬ সালের দাক্ষিণাত্য বন্দোবস্তের মাধ্যমে নিজামশাহী শক্তির অবসান ঘটে এবং বিজাপুর ও গোলকোন্ডাকে মুঘল প্রাধান্য মেনে নিতে হয়। কিন্তু তারা তখনো স্বাধীন সুলতানাত হিসেবে টিকে ছিল।
আওরঙ্গজেব নিজেও সম্রাট হওয়ার বহু আগে দাক্ষিণাত্যের রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। শাহজাহান তাঁকে দুই দফায় দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত করেছিলেন। ফলে এই অঞ্চলের ভূগোল, সুলতানাতগুলোর রাজনীতি এবং মুঘল প্রশাসনের সমস্যার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল। ১৬৫৮ সালে সিংহাসন দখলের পর তাঁর সামনে দাক্ষিণাত্য তাই কোনো অজানা সীমান্ত ছিল না।
দাক্ষিণাত্যে তখন প্রধান তিন ধরনের শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ছিল—মুঘলদের অধীন বা প্রভাবাধীন অঞ্চল, বিজাপুরের আদিলশাহী ও গোলকোন্ডার কুতুবশাহী সুলতানাত, এবং দ্রুত উত্থানশীল মারাঠা শক্তি। এই তিন পক্ষের সম্পর্কও স্থির ছিল না। কখনো বিজাপুর মারাঠাদের বিরুদ্ধে মুঘলদের সঙ্গে সমঝোতা করত, আবার কখনো মারাঠাদের ব্যবহার করে মুঘলদের মোকাবিলা করার চেষ্টা করত।
এই জটিলতার কেন্দ্রে আবির্ভূত হন শিবাজি ভোঁসলে। তাঁর পিতা শাহজি ভোঁসলে বিজাপুরের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ মারাঠা সামরিক অভিজাত ছিলেন। কিন্তু শিবাজি পশ্চিম দাক্ষিণাত্যের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে নিজের স্বাধীন শক্তিকেন্দ্র গড়ে তুলতে শুরু করেন। একের পর এক দুর্গ দখল, দ্রুত অশ্বারোহী অভিযান এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তিনি এমন একটি শক্তি তৈরি করেন, যা বিজাপুর এবং পরে মুঘল উভয়ের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
শিবাজির সামরিক শক্তির একটি প্রধান ভিত্তি ছিল পশ্চিমঘাটের পাহাড়ি দুর্গগুলোর নেটওয়ার্ক। উত্তর ভারতের সমতলে মুঘল অশ্বারোহী ও কামানবাহিনী যে ধরনের দ্রুত সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ করতে পারত, দুর্গম পাহাড়, সরু গিরিপথ ও মৌসুমি বৃষ্টির অঞ্চলে সেই সুবিধা অনেকটাই কমে যেত।
মারাঠারা দ্রুত অশ্বারোহী বাহিনী ব্যবহার করে মুঘল যোগাযোগপথ, রসদবাহী কাফেলা ও বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত করত। বৃহৎ মুঘল বাহিনী এগিয়ে এলে তারা প্রয়োজনমতো সংঘর্ষ এড়িয়ে যেত। এই গতিশীল যুদ্ধপদ্ধতি পরবর্তীকালে আওরঙ্গজেবের বিশাল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে ওঠে।
১৬৬৩ সালে পুনেতে শায়েস্তা খানের ওপর শিবাজির আকস্মিক আক্রমণ মুঘল মর্যাদায় বড় আঘাত হানে। শায়েস্তা খান ছিলেন আওরঙ্গজেবের মামা এবং দাক্ষিণাত্যে মুঘল অভিযান পরিচালনার জন্য পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি। রাতের আকস্মিক হামলায় তিনি আহত হন এবং তাঁর এক পুত্র নিহত হন। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয় যে শুধু বিশাল বাহিনী মোতায়েন করে শিবাজিকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে না।
পরের বছর শিবাজি সুরাট আক্রমণ করেন। সুরাট ছিল মুঘল ভারতের অন্যতম ধনী বন্দর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শহরটির ওপর হামলা শুধু বিপুল সম্পদ অর্জনের সুযোগ দেয়নি, মুঘল সাম্রাজ্যের মর্যাদাতেও সরাসরি আঘাত করেছিল।
এরপর আওরঙ্গজেব অভিজ্ঞ রাজপুত সেনাপতি মির্জা রাজা জয় সিংহকে শিবাজির বিরুদ্ধে পাঠান। তাঁর অভিযান তুলনামূলকভাবে সফল হয়। একাধিক দুর্গের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পর ১৬৬৫ সালের পুরন্দর চুক্তিতে শিবাজি বহু দুর্গ মুঘলদের হাতে ছেড়ে দিতে সম্মত হন এবং তাঁর পুত্র সম্ভাজিকে মুঘল মনসবদারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার ব্যবস্থা হয়।
এই সমঝোতার ধারাবাহিকতায় শিবাজি ১৬৬৬ সালে আগ্রায় আওরঙ্গজেবের দরবারে উপস্থিত হন। কিন্তু সেখানে তাঁর প্রত্যাশিত মর্যাদা না পাওয়া এবং দরবারে অবস্থান নিয়ে বিরোধের পর তাঁকে কার্যত নজরবন্দি করা হয়। পরে তিনি নাটকীয়ভাবে আগ্রা থেকে পালিয়ে দাক্ষিণাত্যে ফিরে যান।
আগ্রার ঘটনার পর মুঘল-মারাঠা সম্পর্ক আবার শত্রুতায় রূপ নেয়। শিবাজি হারানো দুর্গ পুনর্দখল করতে শুরু করেন এবং ১৬৭০ সালে আবার সুরাটে অভিযান চালান। কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর শক্তি আরও সুসংগঠিত হয়।
১৬৭৪ সালে রায়গড় দুর্গে শিবাজির রাজ্যাভিষেক মারাঠা শক্তির রাজনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তিনি শুধু পাহাড়ি বিদ্রোহী প্রধান নন, একটি স্বাধীন রাজ্যের সার্বভৌম শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। এই নতুন রাজনৈতিক পরিচয় ভবিষ্যতের মারাঠা সম্প্রসারণের ভিত্তি তৈরি করে।
১৬৮০ সালে শিবাজির মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সম্ভাজি ক্ষমতায় আসেন। আওরঙ্গজেব হয়তো আশা করেছিলেন নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে মারাঠা শক্তি দুর্বল হবে। কিন্তু একই সময়ে মুঘল রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ একটি ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
আওরঙ্গজেবের পুত্র যুবরাজ আকবর ১৬৮১ সালে পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং শেষ পর্যন্ত মারাঠাদের আশ্রয় চান। ফলে সম্রাটের কাছে দাক্ষিণাত্যের সমস্যা শুধু সীমান্তের বিদ্রোহ নয়, নিজের পুত্রের বিদ্রোহের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটে ১৬৮১ সালে আওরঙ্গজেব নিজেই বিশাল রাজকীয় শিবির নিয়ে দাক্ষিণাত্যে চলে আসেন।
এটি সাময়িক সামরিক সফর হওয়ার কথা ছিল না। বাস্তবে জীবনের বাকি প্রায় ২৬ বছর তিনি উত্তর ভারতের পুরোনো সাম্রাজ্যিক কেন্দ্র থেকে দূরে দাক্ষিণাত্যেই কাটাবেন। দিল্লি বা আগ্রায় আর স্থায়ীভাবে ফিরে যাওয়া তাঁর ভাগ্যে ছিল না।
প্রথম পর্যায়ে আওরঙ্গজেব বুঝতে পারেন যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় বিজাপুর ও গোলকোন্ডা স্বাধীন থাকলে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মারাঠাদের আশ্রয়, অর্থ বা রাজনৈতিক সুযোগ দিতে পারে। ফলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন দাক্ষিণাত্যের স্বাধীন সুলতানাত দুটিকেই সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে হবে।
বিজাপুরের আদিলশাহী সুলতানাত তখন তার আগের শক্তি হারিয়েছিল। অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, দুর্বল নেতৃত্ব এবং মুঘল চাপ তার অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। তবু বিজাপুরের বিশাল দুর্গ ও প্রতিরক্ষা সহজে ভাঙা সম্ভব ছিল না।
১৬৮৬ সালে আওরঙ্গজেব নিজে বিজাপুর অবরোধের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। দীর্ঘ অবরোধ, খাদ্য ও রসদের সংকট এবং মুঘল সামরিক চাপের পর শহর আত্মসমর্পণ করে। তরুণ সুলতান সিকান্দার আদিল শাহ বন্দি হন এবং আদিলশাহী রাজবংশের স্বাধীন শাসনের অবসান ঘটে।
বিজাপুরের পতন ছিল মুঘলদের বিশাল ভূখণ্ডগত সাফল্য। কয়েক দশক ধরে যে রাজ্য মুঘল সম্প্রসারণের সীমা নির্ধারণ করেছিল, সেটিই এখন সাম্রাজ্যের অংশ। কিন্তু এর ফলে মুঘল প্রশাসনের ওপর নতুন ও বিশাল ভূখণ্ড পরিচালনার দায়িত্বও এসে পড়ে।
পরবর্তী লক্ষ্য ছিল গোলকোন্ডার কুতুবশাহী সুলতানাত। গোলকোন্ডা শুধু রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; এটি ছিল দাক্ষিণাত্যের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। হায়দরাবাদ অঞ্চল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশেষ করে গোলকোন্ডার সঙ্গে যুক্ত বিখ্যাত হীরার বাজার রাজ্যটিকে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
শেষ কুতুবশাহী সুলতান আবুল হাসান তানা শাহ মুঘল চাপের মুখে পড়েন। আওরঙ্গজেব তাঁর প্রশাসনে প্রভাবশালী হিন্দু মন্ত্রী মাদান্না ও আক্কান্নার অবস্থান এবং মারাঠাদের সঙ্গে গোলকোন্ডার সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৬৮৭ সালে মুঘল বাহিনী গোলকোন্ডা দুর্গ অবরোধ করে।
গোলকোন্ডার দুর্গ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দীর্ঘ অবরোধেও প্রতিরোধ ভাঙা কঠিন হয়ে পড়েছিল। অবশেষে ১৬৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে মুঘলরা দুর্গে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। আবুল হাসান বন্দি হন এবং কুতুবশাহী শাসনের অবসান ঘটে।
বিজাপুর ও গোলকোন্ডা পতনের পর কাগজে-কলমে আওরঙ্গজেবের বিজয় ছিল অসাধারণ। দাক্ষিণাত্যের দুই প্রধান স্বাধীন মুসলিম সুলতানাত বিলুপ্ত এবং তাদের বিশাল ভূখণ্ড মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সাম্রাজ্যের মানচিত্র তখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বৃহৎ।
কিন্তু এখানেই আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য প্রকাশ পায়। বিজাপুর ও গোলকোন্ডা স্বাধীন অবস্থায় মুঘল ও মারাঠাদের মধ্যে এক ধরনের রাজনৈতিক বাফার হিসেবে কাজ করতে পারত। তাদের বিলুপ্তির পর মুঘল প্রশাসনকে সরাসরি বিশাল দাক্ষিণাত্য ভূখণ্ড এবং ক্রমবর্ধমান মারাঠা প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়।
মারাঠাদের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেব ১৬৮৯ সালে একটি বড় সাফল্য পান। সম্ভাজি মুঘল বাহিনীর হাতে বন্দি হন। তাঁকে আওরঙ্গজেবের শিবিরে আনা হয় এবং পরে নির্মমভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সম্রাট সম্ভবত আশা করেছিলেন, মারাঠা রাজাকে সরিয়ে দিলে প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে।
ঘটেছিল ঠিক উল্টোটি। সম্ভাজির মৃত্যুর পর তাঁর ভাই রাজারাম নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি পশ্চিম দাক্ষিণাত্য থেকে পালিয়ে দক্ষিণ ভারতের জিঞ্জি দুর্গে আশ্রয় নেন। ফলে মুঘলদের যুদ্ধক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ে।
জিঞ্জি দুর্গ অবরোধ মুঘলদের জন্য দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল অভিযানে পরিণত হয়। দুর্গটি শেষ পর্যন্ত মুঘলরা দখল করলেও রাজারাম আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। অর্থাৎ একটি দুর্গ দখল করেও মারাঠা রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধ্বংস করা গেল না।
এই সময় মারাঠা সেনাপতি সন্তাজি ঘোরপাড়ে ও ধনাজি যাদবের মতো নেতারা দ্রুত অশ্বারোহী অভিযানের মাধ্যমে মুঘল বাহিনীকে বিপর্যস্ত করতে থাকেন। তাঁরা সরাসরি বিশাল মুঘল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নিয়মিত সম্মুখযুদ্ধ এড়িয়ে যোগাযোগপথ, রসদ, বিচ্ছিন্ন বাহিনী এবং প্রশাসনিক কেন্দ্র আক্রমণ করতেন।
এটাই ছিল আওরঙ্গজেবের প্রধান কৌশলগত সমস্যা। তিনি দুর্গ দখল করতে পারতেন, কিন্তু ভূখণ্ড স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল। একটি দুর্গ দখলের জন্য মাস বা বছর ধরে অবরোধ চলত। মুঘল বাহিনী অন্যত্র চলে গেলে মারাঠারা সুযোগ বুঝে আবার সেই অঞ্চল বা কাছাকাছি দুর্গ পুনর্দখল করত।
পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। মুঘল বাহিনীর সঙ্গে ছিল বিপুল কামান, হাতি, ঘোড়া, তাঁবু, খাদ্যশস্য এবং হাজার হাজার অনুসারী। এত বড় সেনাবাহিনীকে পাহাড় ও বর্ষাপ্রবণ অঞ্চলে সচল রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। মারাঠাদের তুলনামূলক হালকা বাহিনী দ্রুত চলাচল করতে পারত, কিন্তু মুঘল সেনাবাহিনীকে প্রতিটি অগ্রযাত্রার সঙ্গে বিশাল রসদব্যবস্থা বহন করতে হতো।
বর্ষা ছিল আরেক শত্রু। রাস্তা কাদায় পরিণত হতো, নদী ফুলে উঠত, খাদ্য পরিবহন ব্যাহত হতো এবং পশু মারা যেত। দুর্গ অবরোধ দীর্ঘ হলে সৈন্যদের রোগ ও খাদ্যসংকট দেখা দিত। মুঘলদের প্রতিপক্ষ শুধু মারাঠা সেনাবাহিনী ছিল না; দাক্ষিণাত্যের ভূগোলও তাদের বিরুদ্ধে কাজ করছিল।
১৭০০ সালে রাজারামের মৃত্যু আবারও আওরঙ্গজেবের সামনে মারাঠা প্রতিরোধ ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু এবার নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন রাজারামের বিধবা তারাবাই। তিনি তাঁর অল্পবয়সী পুত্রের নামে শাসনের দায়িত্ব নিয়ে মারাঠা প্রতিরোধ সংগঠিত করেন।
তারাবাইয়ের সময় মারাঠারা শুধু আত্মরক্ষা করেনি; মুঘল অঞ্চলের ওপর পাল্টা আক্রমণও বাড়ায়। ফলে বৃদ্ধ আওরঙ্গজেবকে একের পর এক দুর্গ দখলের জন্য ব্যক্তিগতভাবে অভিযান চালাতে হয়। সম্রাট যত বেশি দুর্গ দখল করছিলেন, পুরো যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনা যেন ততই দূরে সরে যাচ্ছিল।
দাক্ষিণাত্য যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ে মুঘল অর্থনীতির ওপর। এত দীর্ঘ সময় ধরে বিশাল সেনাবাহিনী পরিচালনা, অবরোধের কামান, ঘোড়া, হাতি, খাদ্য, বেতন এবং পরিবহনের জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন ছিল। উত্তর ভারতের রাজস্বের বড় অংশও দক্ষিণের যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যয় হতে থাকে।
একই সঙ্গে নতুন দখলকৃত বিজাপুর ও গোলকোন্ডা অঞ্চলের জমি মনসবদারদের জাগির হিসেবে বণ্টনের সমস্যা তৈরি হয়। কাগজে যে পরিমাণ রাজস্ব দেখানো হতো, যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বাস্তবে তা সংগ্রহ করা সব সময় সম্ভব ছিল না। ফলে মনসবদারদের প্রত্যাশিত আয় এবং বাস্তব আদায়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকে।
এই সমস্যাকে পরবর্তী মুঘল ‘জাগির সংকট’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হয়। অধিকসংখ্যক মনসবদারের জন্য পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল জাগিরের চাপ, যুদ্ধের ব্যয় এবং স্থানীয় অস্থিরতা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে থাকে।
দীর্ঘ যুদ্ধ সেনাবাহিনীর ওপরও মানসিক ও সাংগঠনিক চাপ সৃষ্টি করে। বহু মুঘল অভিজাত বছরের পর বছর পরিবার ও উত্তর ভারতের নিজস্ব ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরে ছিলেন। সেনাবাহিনীর বেতন বিলম্বিত হওয়া, রসদ সমস্যা এবং অবিরাম অভিযানের কারণে অসন্তোষ বাড়ে।
অন্যদিকে মারাঠাদের জন্য যুদ্ধ নিজেই নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক সুযোগ তৈরি করছিল। স্থানীয় প্রধানেরা মুঘলদের বিরুদ্ধে অভিযানের মাধ্যমে সম্পদ ও মর্যাদা অর্জন করতেন। চৌথ ও সরদেশমুখীর মতো রাজস্ব দাবি ধীরে ধীরে মারাঠা সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ভিত্তিতে পরিণত হয়।
এখানে আওরঙ্গজেবের কৌশলের একটি মৌলিক সমস্যা স্পষ্ট হয়। তিনি সম্ভবত মারাঠা শক্তিকে একটি বিদ্রোহী আঞ্চলিক ক্ষমতা হিসেবে দেখেছিলেন, যাকে দুর্গ দখল এবং নেতৃত্ব ধ্বংসের মাধ্যমে পরাজিত করা সম্ভব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মারাঠারা একজন রাজা বা একটি রাজধানীর ওপর নির্ভরশীল শক্তি থেকে বিকেন্দ্রীভূত সামরিক নেটওয়ার্কে পরিণত হচ্ছিল।
শিবাজি মারা গেছেন—প্রতিরোধ টিকে আছে। সম্ভাজি নিহত—প্রতিরোধ আরও বিস্তৃত হয়েছে। রাজারাম মারা গেছেন—তারাবাই নেতৃত্ব নিয়েছেন। একটি দুর্গ পড়েছে—অন্য দুর্গে নতুন বাহিনী সংগঠিত হয়েছে। মুঘল সামরিক শক্তি প্রতিটি ব্যক্তিকে পরাজিত করতে পারছিল, কিন্তু পুরো রাজনৈতিক আন্দোলনকে শেষ করতে পারছিল না।
আওরঙ্গজেবের বয়সও ক্রমে বাড়ছিল। ১৬৮১ সালে যখন তিনি দক্ষিণে আসেন, তখন তাঁর বয়স ষাটের কাছাকাছি। যুদ্ধ চলতে চলতে তিনি আশির কোঠায় পৌঁছে যান। তবুও বৃদ্ধ সম্রাট এক সামরিক শিবির থেকে আরেক শিবিরে চলাচল করে অভিযান তদারক করতেন।
তাঁর শেষ বছরগুলোতে সাম্রাজ্যের মানচিত্র ছিল বিশাল, কিন্তু বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ছিল অসম। মুঘল সাম্রাজ্য ভূখণ্ড জয় করেছিল, কিন্তু সেই ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের খরচ তার লাভকে ক্রমে গ্রাস করছিল। বিজাপুর ও গোলকোন্ডার বিজয় যে সম্পদ এনে দেওয়ার কথা ছিল, দীর্ঘ মারাঠা যুদ্ধ তার বড় অংশ শুষে নিচ্ছিল।
১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেব আহমেদনগরের কাছে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি প্রায় অর্ধশতাব্দী মুঘল সাম্রাজ্য শাসন করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর সময় সাম্রাজ্য ভৌগোলিকভাবে ইতিহাসের বৃহত্তম পর্যায়ে ছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যের এই বিশালতা তার শক্তির পাশাপাশি দুর্বলতারও উৎস হয়ে উঠেছিল।
আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রদের মধ্যেও উত্তরাধিকার যুদ্ধ শুরু হয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই নতুন সংকটের সুযোগে মারাঠারা দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠিত করে। পরবর্তী কয়েক দশকে তারা শুধু দাক্ষিণাত্যে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করবে না, মালওয়া, গুজরাট এবং শেষ পর্যন্ত উত্তর ভারতেও শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি তৈরি করবে।
তাই আওরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য অভিযানকে শুধু ব্যর্থতা বললেও পুরো সত্য ধরা পড়ে না। তিনি বাস্তবেই বিজাপুর ও গোলকোন্ডা জয় করেছিলেন এবং মুঘল ভূখণ্ডকে সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে গিয়েছিলেন। সামরিকভাবে এগুলো বিশাল অর্জন ছিল। কিন্তু কৌশলগত প্রশ্ন ছিল—এই বিজয়গুলো সাম্রাজ্যকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করেছিল কি না।
উত্তরটি অনেক বেশি জটিল। বিজাপুর ও গোলকোন্ডার স্বাধীনতা বিলুপ্ত করার ফলে নতুন বিশাল ভূখণ্ড প্রশাসনের দায়িত্ব মুঘলদের ওপর পড়ে। মারাঠাদের বিরুদ্ধে স্থায়ী বিজয় না আসায় সেই ভূখণ্ড ক্রমাগত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। রাজস্ব কমে, সামরিক ব্যয় বাড়ে, জাগির ব্যবস্থা চাপে পড়ে এবং উত্তর ভারতের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের ওপর সম্রাটের প্রত্যক্ষ নজরও দুর্বল হয়।
আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে এমন একটি যুদ্ধ জিততে চেয়েছিলেন যেখানে প্রতিপক্ষের রাজধানী ও দুর্গ দখল করলেই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু মারাঠা প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে যে বিকেন্দ্রীভূত, দ্রুতগতির আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে শুধু বিশাল সাম্রাজ্যিক সেনাবাহিনী যথেষ্ট নয়।
১৬৮৬ সালে বিজাপুর পড়েছিল, ১৬৮৭ সালে গোলকোন্ডা পড়েছিল, ১৬৮৯ সালে সম্ভাজিও মুঘলদের হাতে নিহত হয়েছিলেন—তবু যুদ্ধ শেষ হয়নি। বরং ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর সময় মারাঠারা তখনো লড়ছিল এবং মুঘল রাষ্ট্র দীর্ঘ যুদ্ধের ভারে ক্লান্ত। এই বৈপরীত্যই দাক্ষিণাত্য অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক শিক্ষা: আওরঙ্গজেব ভূখণ্ডের বিচারে মুঘল সাম্রাজ্যকে তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে গিয়েই সাম্রাজ্য এমন এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে আটকে যায়, যা পরবর্তী মুঘল পতনের অন্যতম প্রধান কাঠামোগত সংকট তৈরি করে।
রোমান পুরাণের উত্তরাধিকার: শিল্প, সাহিত্য ও আধুনিক সংস্কৃতি
লারেস, পেনেটেস ও গৃহদেবতা: রোমান পরিবারের উপাসনার জগৎ
কিউপিড ও সাইকির প্রেমকাহিনি: অভিশাপ, চার পরীক্ষা ও অমর মিলন
হারকিউলিসের রোমান কিংবদন্তি: বারোটি শ্রম ও ইতালির দানববধ
কন্টিনেন্টাল সিস্টেম: ব্রিটেনকে দুর্বল করার পরিকল্পনায় নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য কেন বিপদে পড়েছিল?
ইয়েনা-আউয়ারস্টেড থেকে টিলসিট: ইউরোপে নেপোলিয়নের শক্তির উত্থান