বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কিউপিড ও সাইকির প্রেমকাহিনি: অভিশাপ, চার পরীক্ষা ও অমর মিলন

সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি

কিউপিড ও সাইকির প্রেমকাহিনি: অভিশাপ, চার পরীক্ষা ও অমর মিলন
বিশ্বাসভঙ্গ ও কঠিন পরীক্ষার পথ পেরিয়ে দেবলোকে মিলিত হন কিউপিড ও সাইকি।

হারকিউলিসের অসাধ্য শ্রম দেখিয়েছিল, মানুষের সীমা অতিক্রমের পথ কত যন্ত্রণাময় হতে পারে। কিন্তু রোমান কাহিনিতে আরেকজনও অসম্ভব পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন—শক্তির স্বীকৃতি পেতে নয়, হারানো প্রেম ফিরে পেতে। তিনি সাইকি, এক মানবী রাজকন্যা; তাঁর প্রেমিক কিউপিড, প্রেমের দেবতা এবং ভেনাসের পুত্র। তাঁদের গল্পের সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রাচীন রূপ সংরক্ষিত আছে দ্বিতীয় শতাব্দীর লেখক আপুলেইয়াসের উপন্যাসে, যা সোনার গাধা নামে পরিচিত। এটি উপন্যাসের ভেতরে বলা একটি কাহিনি, সমগ্র রোমান ধর্মের সর্বজনস্বীকৃত বিশ্বাস নয়।

এক রাজা ও রানির তিন কন্যার মধ্যে ছোট সাইকি ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী। তাঁর সৌন্দর্যের খ্যাতি এত দূর ছড়াল যে মানুষ তাঁকে দেখতে এসে দেবীর মতো সম্মান জানাতে শুরু করল। ভেনাসের উপাসনার বদলে মানবীকে ঘিরে এই ভক্তি দেবীর ক্রোধ জাগায়। তিনি কিউপিডকে নির্দেশ দেন, সাইকি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্ভাগা ও অপমানিত কোনো মানুষের প্রেমে পড়েন। কিন্তু পরিকল্পনা অনুসরণ করতে গিয়ে কিউপিড নিজেই সাইকির প্রেমে পড়েন। অন্যের হৃদয় নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা নিজের হৃদয়ের ওপর কর্তৃত্ব হারান—গল্পের প্রথম বড় পরিবর্তন এখানেই।

সাইকির সৌন্দর্য তাঁকে সুখী করেনি। দুই বোনের বিয়ে হলেও তাঁকে কেউ সাধারণ মানবী হিসেবে বিবাহের প্রস্তাব দিতে সাহস পায় না। উদ্বিগ্ন রাজা দৈববাণীর শরণাপন্ন হন। নির্দেশ আসে, কন্যাকে শোকের পোশাকে পাহাড়চূড়ায় রেখে আসতে হবে; তাঁর বর হবে এমন এক ভয়ংকর সত্তা, যার কাছে দেবতারাও নতি স্বীকার করে। বিবাহযাত্রা তাই অন্ত্যেষ্টির মতো বিষণ্ন হয়ে ওঠে। পরিবার তাঁকে রেখে চলে গেলে সাইকি একা অপেক্ষা করেন। সবার প্রশংসা পাওয়া এবং ভালোবাসার সম্পর্ক পাওয়া যে এক বিষয় নয়, তাঁর প্রথম জীবনে সেই ব্যবধান স্পষ্ট।

এরপর পশ্চিমা বাতাস জেফির তাঁকে কোমলভাবে তুলে একটি উপত্যকায় নামিয়ে দেয়। সেখানে সাইকি আবিষ্কার করেন অপূর্ব এক প্রাসাদ, যেখানে অদৃশ্য পরিচারকেরা তাঁর সেবা করে। রাতে অচেনা স্বামী আসেন; তাঁর আচরণ স্নেহময়, কিন্তু মুখ দেখা নিষিদ্ধ। সাইকিকে সতর্ক করা হয়, পরিচয় জানার চেষ্টা তাঁদের সম্পর্ক বিপন্ন করবে। তিনি প্রথমে এই জীবন মেনে নেন এবং ভালোবাসা অনুভব করেন। তবু স্নেহের সঙ্গে জ্ঞানের অসমতা রয়ে যায়: স্বামী তাঁর পরিচয় জানেন, কিন্তু স্ত্রী জানেন না কাকে তিনি বিশ্বাস করছেন।

পরিবারের কথা মনে পড়লে সাইকি বোনদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চান। কিউপিড বিপদের আশঙ্কা জানিয়েও শেষ পর্যন্ত সম্মত হন। জেফির বোনদের প্রাসাদে নিয়ে আসে। ছোট বোনের অঢেল সম্পদ ও সুখ দেখে তাঁদের ঈর্ষা জন্মায়। সাইকির স্বামী সম্পর্কে অসংগত উত্তর সন্দেহের সুযোগ তৈরি করে। বোনেরা তাঁকে বোঝায়, অদেখা স্বামী আসলে এক ভয়ংকর সাপ, যে একদিন তাঁকে গ্রাস করবে। তখন সাইকি সন্তানসম্ভবা। তাঁর ভবিষ্যৎ সন্তানকে ঘিরে ভয়ও এই প্ররোচনাকে শক্তিশালী করে; ভালোবাসার মধ্যে সন্দেহ ঢুকে পড়ে।

বোনদের পরামর্শে এক রাতে সাইকি প্রদীপ ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঘুমন্ত স্বামীর কাছে যান। আলো জ্বালিয়ে দেখেন, কোনো দানব নয়—অসাধারণ সুন্দর কিউপিড শুয়ে আছেন। পাশে তাঁর ধনুক ও তীর। একটি তীর পরীক্ষা করতে গিয়ে সাইকির আঙুলে আঘাত লাগে, এবং প্রেমের দেবতার প্রতি তাঁর আকর্ষণ আরও তীব্র হয়। কিন্তু প্রদীপের গরম তেল কিউপিডের শরীরে পড়ে তাঁকে জাগিয়ে দেয়। পরিচয় প্রকাশ পেয়ে তিনি চলে যান। সাইকি সত্য জানতে পারেন, অথচ সেই মুহূর্তেই সম্পর্ক হারান।

কিউপিডের অভিযোগ ছিল বিশ্বাসভঙ্গের। তবে গল্পটি পড়তে গিয়ে সাইকির ভয়ের কারণও মনে রাখতে হয়: দৈববাণী, অদেখা স্বামী এবং তাঁর পরিচয় গোপন রাখার শর্ত। বিচ্ছেদের পর রাজকন্যা তাঁকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন। যে দুই বোন বিপর্যয় ঘটিয়েছিল, তাদের ঈর্ষাও শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে। সাইকির কথায় প্রত্যেকে বিশ্বাস করে, কিউপিড তাকে নতুন স্ত্রী হিসেবে চান; জেফিরের সাহায্য পাওয়ার প্রত্যাশায় পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে তারা মারা যায়। এই পর্ব মনে করিয়ে দেয়, কাহিনির জগৎ কোমল প্রেমের পাশাপাশি প্রতিশোধেও পূর্ণ।

সাইকি বিভিন্ন স্থানে ঘুরে সাহায্য চান। সেরেস ও জুনোর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়, কিন্তু তাঁরা ভেনাসের বিরোধিতা করতে রাজি হন না। দেবতাদের আত্মীয়তা ও ক্ষমতার সম্পর্ক মানবীর আশ্রয় পাওয়ার সুযোগ সীমিত করে। শেষ পর্যন্ত সাইকি ভেনাসের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। দেবী তাঁকে পুত্রের উপযুক্ত সঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করার বদলে অপমান ও কঠিন কাজে বাধ্য করেন। এখানে প্রেমের বাধা শুধু দুই ব্যক্তির ভুল বোঝাবুঝি নয়। এক দেবীর কাছে মানবী পুত্রবধূর মর্যাদা পাওয়ার সংগ্রামও গল্পের কেন্দ্রে এসে দাঁড়ায়।

প্রথম পরীক্ষায় ভেনাস গম, যব, ডাল এবং নানা বীজ একসঙ্গে মিশিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে আলাদা করতে বলেন। বিপুল স্তূপ দেখে সাইকি হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকেন। তখন একটি পিঁপড়ে তাঁর দুর্দশায় করুণা করে অন্য পিঁপড়েদের ডেকে আনে; তারা সব শস্য পৃথক করে দেয়। কাজ শেষ হলেও ভেনাস সন্তুষ্ট হন না। এই পরীক্ষায় সাইকির জয় ব্যক্তিগত দক্ষতার ফল নয়। ক্ষুদ্র প্রাণীর সহমর্মিতা দেবীর আরোপিত অসম্ভব বাধা অতিক্রম করে—হারকিউলিসের শ্রমে সহযোগিতার মতো এখানেও সাহায্য গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয় পরীক্ষায় সোনালি পশমওয়ালা হিংস্র ভেড়াদের কাছ থেকে পশম আনতে হয়। বিপন্ন সাইকিকে নদীতীরের একটি নলখাগড়া পরামর্শ দেয়: দিনের প্রচণ্ড উত্তাপে পশুদের কাছে না গিয়ে শান্ত হওয়ার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। পরে ঝোপে আটকে থাকা পশম সংগ্রহ করলেই কাজ হবে। তৃতীয় পরীক্ষায় দুর্গম উৎস থেকে পাতালনদীর সঙ্গে যুক্ত জল আনতে বলা হয়। খাড়া শিলা ও ভয়ংকর প্রহরীর কারণে সেখানে পৌঁছানো অসম্ভব মনে হয়। এবার জুপিটারের ঈগল সাহায্য করে। সঠিক সময়, পরামর্শ ও সহযোগিতা শক্তির বিকল্প হয়ে ওঠে।

চতুর্থ পরীক্ষায় সাইকিকে পাতালজগতে গিয়ে প্রোসারপিনার সৌন্দর্যের কিছু অংশ একটি বাক্সে নিয়ে আসতে হয়। ভেনাস দাবি করেন, অসুস্থ পুত্রের পরিচর্যায় তাঁর নিজের সৌন্দর্য ক্ষয় হয়েছে। হতাশ সাইকিকে একটি কথা বলা মিনার নিরাপদ যাত্রার নির্দেশ দেয়: সঙ্গে মুদ্রা ও খাবার নিতে হবে, মাঝির ভাড়া দিতে হবে এবং সেরবেরাসকে খাবার দিয়ে পার হতে হবে। পথে সাহায্য চাওয়ার ফাঁদেও থামা চলবে না। প্রোসারপিনার কাছ থেকে বাক্স নিয়ে ফিরে আসার সময় সেটি না খোলার নির্দেশই ছিল সবচেয়ে জরুরি।

সাইকি পাতালযাত্রা সম্পন্ন করেন, কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে নিজের ক্লান্ত ও মলিন চেহারা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিউপিডের সঙ্গে দেখা হলে সুন্দর দেখানোর আশায় বাক্স খুলে ফেলেন। ভেতরে সৌন্দর্য ছিল না; ছিল মৃত্যুর মতো গভীর ঘুম, যা তাঁকে অচেতন করে দেয়। নিষেধ ভাঙার ঘটনাটি আগের প্রদীপের দৃশ্যের প্রতিধ্বনি। তবে এবার সুস্থ হয়ে ওঠা কিউপিড তাঁকে খুঁজে পান, ঘুম সরিয়ে বাক্সে ফিরিয়ে রাখেন এবং তাঁকে জাগান। সম্পর্ক পুনর্গঠনে এখন প্রেমিকও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব নেন।

কিউপিড জুপিটারের কাছে সমাধান চান। দেবরাজ দেবতাদের সভায় তাঁদের মিলন অনুমোদন করেন এবং সাইকিকে অমৃত পান করিয়ে অমর করে তোলেন। মানবী ও দেবতার মর্যাদার ব্যবধান দূর হয়; ভেনাসও শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থার মধ্যে স্থান পান। দেবলোকে বিবাহভোজ হয়, আর তাঁদের কন্যার নাম হয় ভলুপতাস—আনন্দ। ‘সাইকি’ শব্দের অর্থ আত্মা, তাই গল্পটি প্রেম ও আত্মার মিলনের প্রতীক হিসেবেও পড়া হয়েছে। কিন্তু তার মানবিক শক্তি রয়ে যায় সংশয়ে, ভুলে ও সাহায্যে: অমর মিলন আসে নিখুঁত প্রেম থেকে নয়, বিপর্যয়ের পরে সম্পর্ককে নতুনভাবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে।