বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চীনে আফিম বাণিজ্যের বিস্তার: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও সংঘাতের পটভূমি

সিরিজ: আফিম যুদ্ধ: চীন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংঘাত

চীনে আফিম বাণিজ্যের বিস্তার: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও সংঘাতের পটভূমি
চা, রুপা ও আফিমের বাণিজ্য থেকে সাম্রাজ্যিক সংঘাতের সূচনা।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটেনের ঘরে ঘরে চায়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছিল, আর সেই চায়ের প্রধান উৎস ছিল চীন। চিং সাম্রাজ্যের ব্যবসায়ীরা ইউরোপীয় বাজারে চা, রেশম ও চীনামাটির সামগ্রী বিক্রি করতেন। কিন্তু ব্রিটিশরা বিনিময়ে যে পণ্য দিতে চাইতেন, চীনে সেগুলোর চাহিদা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। ফলে চীনা পণ্য কিনতে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের বিপুল রুপা ব্যয় করতে হতো। এই বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের আফিম উৎপাদন যুক্ত হওয়াতেই ভবিষ্যৎ সংঘাতের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়।

চীন অবশ্য বিদেশি বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ রাখেনি। ১৭৫৭ সাল থেকে পশ্চিমা সমুদ্রবাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে দক্ষিণের গুয়াংঝৌকে নির্ধারণ করা হয়, যা ইউরোপীয়দের কাছে ক্যান্টন নামে পরিচিত ছিল। সেখানে অনুমোদিত চীনা বণিকদের মাধ্যমে বিদেশিদের লেনদেন করতে হতো। এই বণিকগোষ্ঠীকে সাধারণভাবে কোহং বলা হতো। বিদেশিদের অবস্থান, চলাচল ও যোগাযোগের ওপরও বিধিনিষেধ ছিল। চিং সরকারের উদ্দেশ্য ছিল শুল্ক আদায় ও বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণ; ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের কাছে একই ব্যবস্থা ছিল বাজার সম্প্রসারণের বাধা।

এই নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যব্যবস্থার ভেতরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিশেষ অবস্থান দখল করেছিল। প্রতিষ্ঠানটি শুধু ব্যবসায়িক সংস্থা ছিল না; ভারতে তার সেনাবাহিনী, রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা এবং বিস্তৃত প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ছিল। ১৭৬৫ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানির অর্থনৈতিক শক্তি আরও বাড়ে। ভারতীয় রাজস্ব এবং বাণিজ্যিক মুনাফা ব্যবহার করে চীনের পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি হয়। তবে চায়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে এমন একটি পণ্যের প্রয়োজন ছিল, যা চীনে বিক্রি করে পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করা যাবে।

আফিম চীনে ব্রিটিশদের আগমনের আগে থেকেই পরিচিত ছিল। চিকিৎসায় এর ব্যবহার ছিল, আর ধূমপানের অভ্যাসও আগেই প্রবেশ করেছিল। কিন্তু কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা এর বিস্তারকে নতুন মাত্রা দেয়। চিং সরকার ১৭২৯ সালে আফিম ধূমপান ও সংশ্লিষ্ট বিক্রির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল; পরবর্তী সময়ে আমদানির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাই ব্রিটিশ বাণিজ্যের মাধ্যমে চীনে আফিমের প্রথম পরিচয় ঘটেনি; বরং একটি পরিচিত মাদকের সরবরাহ ব্যাপকভাবে বেড়ে গিয়েছিল।

ভারতে কোম্পানির আফিমব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বিহার ও বেনারস অঞ্চলে। চাষিদের অগ্রিম অর্থ দিয়ে পপি চাষের চুক্তিতে আনা হতো। উৎপাদিত কাঁচা আফিম নির্ধারিত ব্যবস্থায় কোম্পানির কাছে জমা দিতে হতো। পাটনা ও গাজিপুরের কারখানায় তা প্রক্রিয়াকরণ, মান যাচাই এবং প্যাকেটজাত করা হতো। এই ব্যবস্থায় কোম্পানি উৎপাদন ও ক্রয়ের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখত। চাষিদের স্বাধীনভাবে দাম নির্ধারণ বা অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রির সুযোগ সীমিত ছিল; ফলে লাভজনক আন্তর্জাতিক ব্যবসার নিচে ছিল অসম ক্ষমতাসম্পন্ন কৃষি অর্থনীতি।

প্রস্তুত আফিম কলকাতায় নিলামে বিক্রি করা হতো। বেসরকারি ব্যবসায়ীরা সেই আফিম কিনে জাহাজে চীনের উপকূলে নিয়ে যেতেন। এই ব্যবস্থার রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল গভীর। কোম্পানি নিজের বৈধ চা-বাণিজ্যকে বিপন্ন করতে চাইত না, তাই সরাসরি চীনে নিষিদ্ধ মাদক প্রবেশ করানোর কাজ সাধারণত বেসরকারি ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিত। উৎপাদন ও নিলামের লাভ কোম্পানি পেত, আর চোরাচালানের প্রত্যক্ষ দায় বহন করতেন অন্য ব্যবসায়ীরা। এতে কোম্পানির অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা আড়াল করা সহজ হতো।

তবে চীনে যাওয়া সব ভারতীয় আফিম কোম্পানির সরাসরি উৎপাদনব্যবস্থা থেকে আসেনি। মধ্য ও পশ্চিম ভারতের মালওয়া অঞ্চলেও আফিম উৎপাদিত হতো। দেশীয় শাসকদের অঞ্চল থেকে আসা এই আফিম পশ্চিম উপকূল, বিশেষত বোম্বাইয়ের মাধ্যমে রপ্তানি করা হতো। কোম্পানি প্রথমে প্রতিযোগী সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও পরে পারমিট ও শুল্কের মাধ্যমে সেখান থেকেও রাজস্ব সংগ্রহ করে। ফলে পূর্ব ভারতের নিয়ন্ত্রিত উৎপাদন এবং পশ্চিম ভারতের রপ্তানিপথ মিলিয়ে চীনের বাজারে আফিমের সরবরাহ ক্রমেই বৃদ্ধি পায়।

চীনের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবসায়ীরা উপকূলীয় জলপথকে ব্যবহার করতেন। পার্ল নদীর মোহনার কাছে লিন্টিনের মতো নোঙরস্থলে জাহাজে আফিম রাখা হতো। চীনা মধ্যস্থতাকারীরা ছোট নৌকায় মাদক নিয়ে উপকূলে পৌঁছাতেন, তারপর তা অভ্যন্তরীণ বাজারে ছড়িয়ে পড়ত। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহনকারী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া এত বড় সরবরাহব্যবস্থা চালানো সম্ভব ছিল না। কেন্দ্রীয় সরকারের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার দায় যাঁদের ছিল, তাঁদের কেউ কেউ ঘুষের বিনিময়ে সেই নিষেধাজ্ঞা অকার্যকর করে তুলছিলেন।

এই ব্যবসার সঙ্গে ব্রিটেনের চা কেনার অর্থায়ন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে যায়। চীনে আফিম বিক্রি করে বেসরকারি ব্যবসায়ীরা রুপা সংগ্রহ করতেন। কোম্পানির আর্থিক লেনদেন ও বিনিময়পত্রের ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই অর্থ চা কেনা এবং ভারত বা ব্রিটেনে পাওনা নিষ্পত্তিতে ব্যবহার করা যেত। সব লেনদেনে রুপা সরাসরি তিন দেশ ঘুরে আসত না; কাগুজে অর্থপ্রদানের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবু মূল সম্পর্ক স্পষ্ট: ভারতের আফিম চীনের বাজারে বিক্রি হতো, আর তার অর্থ ব্রিটিশ বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করত।

উনিশ শতাব্দীর প্রথম কয়েক দশকে আফিম আমদানি কয়েক হাজার সিন্দুকের স্তর থেকে কয়েক দশকের মধ্যে কয়েক দশ হাজার সিন্দুকে পৌঁছায়। সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে উপকূলের বাইরেও বাজার সম্প্রসারিত হয়। ধনী ভোক্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে ব্যবহার ছড়াতে থাকে। সমসাময়িক প্রতিবেদনে আসক্ত মানুষের সংখ্যা নিয়ে ব্যাপক পার্থক্য আছে, তাই নির্দিষ্ট হিসাবকে নিশ্চিত বলা কঠিন। তবে পরিবারে অর্থব্যয়, কর্মক্ষমতার ক্ষতি এবং কর্মকর্তা ও সৈন্যদের আসক্তি নিয়ে চিং প্রশাসনের উদ্বেগ যে বাড়ছিল, তা পরিষ্কার।

রুপার বিষয়টি এই উদ্বেগকে রাষ্ট্রের আর্থিক সমস্যায় পরিণত করে। আগে চা ও অন্যান্য পণ্যের বিনিময়ে চীনে রুপা প্রবেশ করত; আফিমের মূল্য পরিশোধ সেই প্রবাহের ওপর বিপরীত চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে ১৮২০ ও ১৮৩০-এর দশকে রুপার বহির্গমন নিয়ে সরকারি অভিযোগ তীব্র হয়। তবে রুপার সংকটের একমাত্র কারণ আফিম ছিল—এমন সরল ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক রুপা সরবরাহ, মুদ্রার প্রাপ্যতা এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক পরিবর্তনও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছিল।

চীনের করব্যবস্থার কারণে রুপার সংকট সাধারণ মানুষের জীবনেও আঘাত করে। অনেক করের হিসাব রুপায় নির্ধারিত থাকলেও দৈনন্দিন কেনাবেচায় তামার মুদ্রা ব্যবহৃত হতো। তামার তুলনায় রুপা দামি হয়ে উঠলে একই কর দিতে কৃষককে বেশি তামার মুদ্রা জোগাড় করতে হতো। অর্থাৎ করের নির্ধারিত অঙ্ক অপরিবর্তিত থেকেও বাস্তব বোঝা বাড়তে পারত। এর সঙ্গে ফসলের অনিশ্চয়তা ও স্থানীয় আদায়ব্যবস্থার অনিয়ম যুক্ত হলে দুর্দশা আরও গভীর হতো। আফিম তখন রাজকোষ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা অন্যদিকে চীনের নিয়ন্ত্রিত বাজারকে বদলাতে চাইছিলেন। ১৭৯৩ সালের ম্যাকার্টনি দূতাবাস অতিরিক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের দাবি তুললেও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। ১৮১৬ সালের আমহার্স্ট দূতাবাসও ব্যর্থ হয়। পরে ১৮৩৪ সালে চীনের সঙ্গে ব্রিটিশ বাণিজ্যে কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার শেষ হলে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের ভূমিকা বাড়ে। কোম্পানি বিলুপ্ত হয়নি, ভারতেও তার কর্তৃত্ব ছিল। কিন্তু চীনে ব্রিটিশ বাণিজ্য পরিচালনার নতুন সরকারি ব্যবস্থা পুরোনো ক্যান্টন ব্যবস্থার সঙ্গে আরও প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়ে।

চিং দরবারে তখন সমাধান নিয়ে মতবিরোধ চলছিল। ১৮৩৬ সালে কর্মকর্তা সু নাইজি নিয়ন্ত্রিত বৈধতা ও কর আরোপের প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, নিষেধাজ্ঞা চোরাচালান থামাতে পারছে না। বিরোধীরা মনে করতেন, বৈধতা দিলে ব্যবহার আরও বাড়বে এবং রাষ্ট্র ক্ষতিকর অভ্যাসকে অনুমোদন দেবে। কঠোর দমনের সমর্থকদের কাছে সমস্যাটি ছিল আইন, জনস্বাস্থ্য ও রাজস্বের সম্মিলিত সংকট। সম্রাট দাওগুয়াং শেষ পর্যন্ত দমনের পথ বেছে নেন এবং লিন জেশুকে বিশেষ কমিশনার নিযুক্ত করেন।

১৮৩৯ সালে লিন জেশুর গুয়াংঝৌ আগমনের সময় তাই সংঘাতের উপাদানগুলো প্রস্তুত ছিল। ভারতীয় উৎপাদন থেকে চীনা চোরাচালান পর্যন্ত একটি লাভজনক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল; তার বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চিং সরকার। চীনের ভূখণ্ডে চীনের আইন মানতে বিদেশি ব্যবসায়ীদের বাধ্য করা যাবে কি না—এই প্রশ্ন সামনে চলে আসে। লিন এবার সেই প্রশ্নের উত্তর বাস্তবে দিতে উদ্যোগী হলেন। বাণিজ্যিক উত্তেজনা তাঁর অভিযানে এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখান থেকে দুই সাম্রাজ্যের সম্পর্ককে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সহজ হবে না।