প্রথম আফিম যুদ্ধ: ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কাছে চিং সাম্রাজ্য কেন পরাজিত হয়েছিল?
সিরিজ: আফিম যুদ্ধ: চীন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংঘাত
নৌশক্তি ও নদীপথের নিয়ন্ত্রণে চিং সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে।
হুমেনে আফিম ধ্বংসের পরে যে প্রশ্ন সামনে এসেছিল, তার উত্তর এবার কামানের মুখে নির্ধারিত হতে চলেছে: চীনের উপকূলীয় দুর্গ, যুদ্ধনৌকা ও প্রশাসন ব্রিটিশ অভিযাত্রী বহরকে কীভাবে ঠেকাবে? ১৮৩৯ সালে বিচ্ছিন্ন নৌসংঘর্ষ শুরু হলেও বড় ব্রিটিশ সামরিক অভিযান আসে ১৮৪০ সালে। চিং সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার তুলনায় আক্রমণকারী বাহিনী ছিল ছোট। তবু পুরো চীন দখল না করেও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, নদীপথ ও রাজস্বের ওপর আঘাত করে ব্রিটিশরা সম্রাটকে চুক্তিতে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছিল।
এই যুদ্ধকে শুধু দুই দেশের নৌবাহিনীর সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা বাদ পড়ে। ব্রিটিশ অভিযানে রাজকীয় নৌবাহিনীর পাশাপাশি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ, ব্রিটিশ স্থলসেনা এবং ভারতীয় সৈন্য অংশ নিয়েছিলেন। ভারত ছিল সৈন্য, সরবরাহ ও পরিবহন সংগ্রহের প্রধান ঘাঁটি। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পাওয়া সম্পদ ব্রিটেনকে নিজের দেশ থেকে বহুদূরে যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধা দেয়। তাই চীনের সামনে ছিল সমুদ্রপথে সংগঠিত একটি সাম্রাজ্যিক সামরিক ব্যবস্থা, যার পেছনে ভারতীয় সম্পদেরও বড় ভূমিকা ছিল।
১৮৪০ সালের জুনে বহর দক্ষিণ চীনের উপকূলে পৌঁছে অবরোধ শুরু করে। কিন্তু ব্রিটিশরা নিজেদের অভিযান গুয়াংঝৌর আশপাশে সীমাবদ্ধ রাখেনি। তারা উত্তরে এগিয়ে জুলাইয়ে ঝৌশান দ্বীপপুঞ্জের ডিংহাই দখল করে। এই দ্বীপপুঞ্জ পূর্ব চীনের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের কাছে অবস্থিত ছিল। দখলটি দেখায়, চিং প্রশাসন গুয়াংডংয়ে প্রতিরক্ষা জোরদার করলেও আক্রমণকারী অন্য প্রদেশে চলে যেতে পারে। আক্রমণের স্থান বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল ব্রিটিশ নৌশক্তির অন্যতম বড় সুবিধা।
ব্রিটিশ বহর এরপর উত্তরে পেইহো নদীর মোহনার দিকে যায় এবং রাজধানীর কাছাকাছি সামরিক চাপের আশঙ্কা তৈরি করে। সম্রাট দাওগুয়াং তখন আলোচনার পথ খোঁজেন। লিন জেশুকে সরিয়ে চিশানকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আলোচনা ও যুদ্ধের মধ্যে চিং নীতি বারবার পরিবর্তিত হতে থাকে। ব্রিটিশ দাবির পরিমাণ, নিজেদের প্রতিরক্ষার সক্ষমতা এবং আক্রমণকারীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে দরবারের মূল্যায়নও স্থির ছিল না। এতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পক্ষে ধারাবাহিক পরিকল্পনা অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্রিটিশ সুবিধার সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ ছিল যুদ্ধজাহাজ ও কামান। বড় পালতোলা জাহাজগুলো শক্তিশালী গোলাবর্ষণ করতে পারত, আর প্রশিক্ষিত নাবিকেরা জাহাজ পরিচালনা ও কামান ব্যবহারে অভিজ্ঞ ছিলেন। চীনা দুর্গে কামান ছিল এবং কোনো কোনো অবস্থানে যথেষ্ট প্রতিরোধও গড়ে ওঠে। কিন্তু কামানের মান, গোলাবারুদের কার্যকারিতা ও লক্ষ্যভেদের দক্ষতা সর্বত্র সমান ছিল না। স্থির দুর্গের বিপরীতে ব্রিটিশ জাহাজ চলাচল করে সুবিধাজনক দূরত্ব ও অবস্থান নিতে পারত।
বাষ্পচালিত নেমেসিস এই সুবিধাকে নতুন মাত্রা দেয়। লোহার কাঠামো ও অগভীর পানিতে চলার উপযোগী নকশার কারণে জাহাজটি নদী ও মোহনায় কার্যকর ছিল। বাতাসের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে চলতে পারা তাকে পালতোলা নৌকার তুলনায় বিশেষ সুবিধা দেয়। তবে নেমেসিস একাই চীনকে পরাজিত করেনি, আর ব্রিটিশ বহরের সব জাহাজও বাষ্পচালিত ছিল না। পালতোলা যুদ্ধজাহাজ, ছোট নৌযান, পরিবহন ও স্থলসেনার সম্মিলিত ব্যবস্থায় তার গুরুত্ব বুঝতে হবে।
১৮৪১ সালের ৭ জানুয়ারি চুয়ানবির যুদ্ধে এই সমন্বয়ের কার্যকারিতা দেখা যায়। ব্রিটিশ জাহাজ দুর্গে গোলাবর্ষণ করে, সৈন্যরা তীরে নামে এবং চীনা যুদ্ধনৌকা আক্রমণের মুখে পড়ে। নেমেসিসও অভিযানে অংশ নেয়। পরে চুয়ানবির সমঝোতার মাধ্যমে সাময়িক নিষ্পত্তির চেষ্টা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। চার্লস এলিয়ট ও চিশানের আলোচনার ফল দুই সরকারের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। ফলে যুদ্ধ আবার শুরু হয় এবং ফেব্রুয়ারিতে হুমেনের প্রধান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর আঘাত আসে।
হুমেনের যুদ্ধে প্রবীণ চীনা নৌসেনাপতি গুয়ান তিয়ানপেই প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিহত হন। তাঁর মৃত্যু মনে করিয়ে দেয়, চীনের পরাজয়কে সৈন্যদের সাহসের অভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা ভুল। অনেক প্রতিরক্ষক অবস্থান ছাড়েননি এবং প্রাণ দিয়েছেন। সমস্যা ছিল তাঁদের প্রতিরোধকে কার্যকর করার সামরিক ব্যবস্থায়। দুর্গগুলোর পারস্পরিক সহায়তা, শত্রুর চলাচল ঠেকানো এবং গোলাবর্ষণের পরে স্থল আক্রমণ মোকাবিলার প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত ছিল। ব্যক্তিগত বীরত্ব সংগঠিত সামরিক অসাম্য দূর করতে পারেনি।
চিং বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বিদ্রোহ দমন এবং স্থলসীমান্তের যুদ্ধের প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে উঠেছিল। ব্যানার বাহিনী ও গ্রিন স্ট্যান্ডার্ড বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং যুদ্ধপ্রস্তুতির মান অঞ্চলভেদে ভিন্ন ছিল। একটি দ্রুতগামী বিদেশি বহরকে দীর্ঘ উপকূলজুড়ে মোকাবিলা করার জন্য কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। এক প্রদেশ আক্রান্ত হলে অন্য প্রদেশ থেকে সৈন্য আনা সময়সাপেক্ষ হতো। এর মধ্যে ব্রিটিশরা জাহাজে সৈন্য সরিয়ে পরবর্তী লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে যেত।
প্রশাসনিক সমস্যাও প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করে। কিছু কর্মকর্তা পরাজয়ের খবর ছোট করে দেখাতেন বা সাফল্যের দাবি বাড়িয়ে পাঠাতেন। শাস্তির ভয় এবং দরবারকে সন্তুষ্ট রাখার প্রবণতা সঠিক মূল্যায়নে বাধা সৃষ্টি করত। অবশ্য সব কর্মকর্তা বাস্তবতা আড়াল করেননি; কেউ কেউ শত্রুর শক্তি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবু দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রাজধানীতে খবর পৌঁছাতে সময় লাগত। ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়ানো নির্দেশ কার্যকর প্রতিরক্ষা গড়ার সুযোগ আরও কমিয়ে দেয়।
১৮৪১ সালের মে মাসে গুয়াংঝৌর আশপাশে ব্রিটিশ আক্রমণ এবং পরে অর্থপ্রদানের বিনিময়ে সাময়িক নিষ্পত্তি ঘটে। একই সময়ে সানইউয়ানলির কাছে স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধ দেখায়, বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে জনসাধারণও সক্রিয় হতে পারে। কিন্তু এমন প্রতিরোধ উপকূলজুড়ে সমন্বিত সামরিক ব্যবস্থায় রূপ নেয়নি। ব্রিটিশদের লক্ষ্যও প্রতিটি গ্রাম দখল করা ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রকে হুমকির মুখে রেখে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ছাড় আদায় করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।
ব্রিটিশ অভিযান বাধাহীন ছিল না। ডিংহাইয়ে অবস্থানরত সৈন্যদের মধ্যে রোগ ছড়ায় এবং বহু মানুষ মারা যান বা যুদ্ধের অনুপযোগী হয়ে পড়েন। অপরিচিত জলপথ, আবহাওয়া ও সরবরাহের সমস্যাও ছিল। তবে এসব দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চিং বাহিনী ধারাবাহিকভাবে ব্রিটিশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। ১৮৪১ সালের দ্বিতীয়ার্ধে হেনরি পটিঞ্জারের অধীনে অভিযান আরও বিস্তৃত হয়। শিয়ামেন, পুনরায় ডিংহাই, ঝেনহাই এবং নিংবো ব্রিটিশদের হাতে যায়।
১৮৪২ সালের মার্চে নিংবো পুনর্দখলের চীনা চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর ব্রিটিশরা আরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বেছে নেয়: ইয়াংজি নদী। জুনে উসুংয়ের প্রতিরক্ষা ভেঙে সাংহাই দখল করা হয়। নদীর ভেতরে যুদ্ধজাহাজ এগিয়ে যাওয়ার অর্থ ছিল সমুদ্রের সুবিধা চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া। এখন উপকূলীয় শহরের ক্ষতি ছাড়াও পরিবহন, বাণিজ্য এবং রাজধানীতে শস্য সরবরাহের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
২১ জুলাই ঝেনজিয়াংয়ের যুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধের পরে শহরটি দখল হয়। এখানে ইয়াংজি নদীর সঙ্গে গ্র্যান্ড ক্যানালের যোগাযোগ ছিল, যা দক্ষিণের সম্পদ ও শস্য উত্তরে পাঠানোর ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। ঝেনজিয়াং হারানো চিং দরবারকে বুঝিয়ে দেয়, যুদ্ধ চললে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক যোগাযোগ আরও বিপন্ন হবে। ব্রিটিশ বহর নানজিংয়ের দিকে এগিয়ে গেলে শান্তি প্রতিষ্ঠার চাপ তীব্র হয়। সম্রাটের বিশাল ভূখণ্ড তখনও অক্ষত ছিল, কিন্তু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মূল্য দ্রুত বাড়ছিল।
চিং সাম্রাজ্য তাই জনসংখ্যার অভাবে পরাজিত হয়নি। ব্রিটিশ নৌচলাচল, কার্যকর কামান, সৈন্য নামানোর দক্ষতা ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে চীনের বিচ্ছিন্ন প্রতিরক্ষা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সংঘর্ষ ঘটেছিল। ব্রিটিশরা প্রতিটি স্থানে জয় পাওয়ার বদলে এমন কেন্দ্র দখল করেছিল, যার ক্ষতি দরবারকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে। ১৮৪২ সালের আগস্টে নানজিংয়ের সামনে যুদ্ধজাহাজ দাঁড়িয়ে থাকার সময় আলোচনা আর সমান শক্তির মধ্যে হচ্ছিল না। এখন কামানের চাপকে লিখিত শর্তে রূপ দেওয়ার পালা—যে শর্ত চীনের বন্দর, ভূখণ্ড ও বিদেশি সম্পর্ক বদলে দেবে।
লারেস, পেনেটেস ও গৃহদেবতা: রোমান পরিবারের উপাসনার জগৎ
কিউপিড ও সাইকির প্রেমকাহিনি: অভিশাপ, চার পরীক্ষা ও অমর মিলন
হারকিউলিসের রোমান কিংবদন্তি: বারোটি শ্রম ও ইতালির দানববধ
কন্টিনেন্টাল সিস্টেম: ব্রিটেনকে দুর্বল করার পরিকল্পনায় নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য কেন বিপদে পড়েছিল?
ইয়েনা-আউয়ারস্টেড থেকে টিলসিট: ইউরোপে নেপোলিয়নের শক্তির উত্থান
ট্রাফালগার ও অস্টারলিৎস: সমুদ্রে পরাজয়, স্থলে নেপোলিয়নের আধিপত্য