বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আওরঙ্গজেবের ক্ষমতা দখল: শাহজাহানকে বন্দি করে কীভাবে মুঘল সিংহাসন জয় করেছিলেন?

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 23, 2026
আওরঙ্গজেবের ক্ষমতা দখল: শাহজাহানকে বন্দি করে কীভাবে মুঘল সিংহাসন জয় করেছিলেন?
আওরঙ্গজেবের ক্ষমতা দখল

১৬৫৮ সালে মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষমতা বদলের ঘটনা ছিল শুধু এক সম্রাটের পরিবর্তন নয়; এটি ছিল পিতা, পুত্র ও ভাইদের মধ্যে নির্মম রাজনৈতিক সংঘর্ষের ফল। সম্রাট শাহজাহান তখনো জীবিত, তাঁর সাম্রাজ্য প্রশাসনিকভাবে কার্যকর, রাজকোষ সমৃদ্ধ এবং দিল্লি-আগ্রা এখনো মুঘল ক্ষমতার কেন্দ্র। তবু তাঁর অসুস্থতা এমন একটি সংকট সৃষ্টি করেছিল, যার সুযোগ নিয়ে তাঁর তৃতীয় পুত্র আওরঙ্গজেব একদিকে ভাইদের সামরিকভাবে পরাজিত করেন, অন্যদিকে আগ্রা দুর্গের ভেতরে নিজের পিতাকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেন। এই ঘটনাই মুঘল ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ক্ষমতা দখলের অধ্যায়।

সংকটের সূত্রপাত ১৬৫৭ সালে, যখন শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর মৃত্যুর গুজব দ্রুত সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। মুঘলদের মধ্যে এমন কোনো নির্ধারিত উত্তরাধিকার আইন ছিল না, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে জ্যেষ্ঠ পুত্রকে সিংহাসন দিত। ফলে চার পুত্র—দারা শিকোহ, শাহ সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ বখশ—প্রত্যেকেই সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেন।

শাহজাহানের সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ছিলেন দারা শিকোহ। তিনি সম্রাটের খুব কাছাকাছি থাকতেন এবং কার্যত সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হতেন। কিন্তু এই সুবিধাই তাঁকে অন্য ভাইদের চোখে বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করে। অন্যদিকে আওরঙ্গজেব বহু বছরের সামরিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে দাক্ষিণাত্যে অবস্থান করছিলেন। তিনি পরিস্থিতি খুব দ্রুত বুঝে নেন এবং সরাসরি দারার বিরুদ্ধে যাওয়ার আগে কৌশলগতভাবে মুরাদ বখশের সঙ্গে জোট করেন।

এই জোট ছিল মূলত সুবিধাবাদী। আওরঙ্গজেব জানতেন, মুরাদের সেনাবাহিনী ও গুজরাটের সম্পদ ব্যবহার করলে তাঁর সামরিক শক্তি বাড়বে। তাই তিনি এমন ধারণা দেন যে দারাকে পরাজিত করার পর সাম্রাজ্যের ক্ষমতা ভাগাভাগি হতে পারে। বাস্তবে আওরঙ্গজেবের লক্ষ্য ছিল এককভাবে সিংহাসন দখল করা।

দারা শিকোহ তাঁদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে রাজা যশবন্ত সিংহের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠান। ১৬৫৮ সালের ১৫ এপ্রিল ধর্মতের যুদ্ধে আওরঙ্গজেব ও মুরাদের যৌথ বাহিনী বিজয়ী হয়। এই যুদ্ধের পর দিল্লি-আগ্রার দিকে তাদের অগ্রসর হওয়ার পথ খুলে যায়।

চূড়ান্ত সংঘর্ষ ঘটে ১৬৫৮ সালের ২৯ মে সামুগড়ের যুদ্ধে, আগ্রার কাছে। দারা বিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হন এবং হাতির পিঠ থেকে নেতৃত্ব দেন। তাঁর বাহিনীতে সংখ্যাগত শক্তি ছিল, কিন্তু কমান্ড কাঠামো ও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেবের সেনাবাহিনী বেশি সংগঠিত ছিল।

সামুগড়ের যুদ্ধ দীর্ঘ ও অনিশ্চিত ছিল। দারার বাহিনী একাধিকবার শক্তিশালী আক্রমণ চালায়, কিন্তু আওরঙ্গজেব নিজের কেন্দ্রকে স্থিতিশীল রাখেন এবং কামান ও অশ্বারোহী বাহিনীকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন। এক পর্যায়ে দারা নিজের হাতি থেকে নামেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সম্রাট বা যুবরাজের হাতি ছিল সৈন্যদের কাছে দৃশ্যমান কমান্ড কেন্দ্র; দারাকে হাতির ওপর না দেখে তাঁর কিছু সৈন্য মনে করে তিনি হয়তো নিহত বা পালিয়ে গেছেন। এই বিভ্রান্তি দ্রুত মনোবল ভেঙে দেয়।

দারা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পিছু হটেন। সামুগড়ের বিজয় আওরঙ্গজেবকে শুধু একটি সামরিক সাফল্য দেয়নি; এটি তাঁকে আগ্রা এবং সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় রাজকোষের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ দেয়। এখান থেকেই তাঁর ক্ষমতা দখলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়।

শাহজাহান তখন অসুস্থতা থেকে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন এবং সামুগড়ের পরও নিজেকে বৈধ সম্রাট হিসেবে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি দারার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আওরঙ্গজেবের বাহিনী আগ্রা দুর্গের দিকে অগ্রসর হয়, যেখানে সম্রাট, রাজপরিবারের সদস্য এবং বিশাল মুঘল রাজকোষ ছিল।

আগ্রা দুর্গ সরাসরি ঝড়ের বেগে দখল করা সহজ ছিল না। এটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসম্পন্ন সাম্রাজ্যিক দুর্গ। তাই আওরঙ্গজেব সামরিক চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করেন। দুর্গের বাইরে তাঁর বাহিনী অবস্থান নেয় এবং সম্রাটের ওপর চাপ বাড়ে।

আগ্রা দুর্গের জল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল বলে সমসাময়িক ও পরবর্তী বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়, যা দুর্গের প্রতিরোধ দুর্বল করার একটি কার্যকর উপায় ছিল। শাহজাহান শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন যে দীর্ঘ প্রতিরোধ তাঁর অবস্থান আরও দুর্বল করবে। আলোচনার মাধ্যমে দুর্গের নিয়ন্ত্রণ আওরঙ্গজেবের হাতে চলে আসে।

এর সঙ্গে আওরঙ্গজেবের হাতে আসে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—রাজকোষ ও সাম্রাজ্যিক ধনসম্পদ। সিংহাসনের লড়াইয়ে অর্থ ছিল সেনাবাহিনী, মনসবদার ও রাজনৈতিক আনুগত্য বজায় রাখার প্রধান উপায়গুলোর একটি। ফলে আগ্রার নিয়ন্ত্রণ তাঁকে সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই বিপুল সুবিধা দেয়।

শাহজাহানের জন্য এরপর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সঙ্গে সঙ্গে নিহত বা অপসারিত হননি; বরং আগ্রা দুর্গের ভেতরে কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়। রাজকীয় মর্যাদার কিছু বাহ্যিক উপাদান বজায় থাকলেও বাস্তবে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা তাঁর হাত থেকে চলে যায়।

শাহজাহানের সঙ্গে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা জাহানারা বেগম থাকেন। তিনি পিতার যত্ন নেন এবং তাঁর বন্দিজীবনের দীর্ঘ সময় পাশে ছিলেন। আগ্রা দুর্গ থেকে যমুনার ওপারে তাজমহল দেখা যেত—এই দৃশ্য পরবর্তী ঐতিহ্যে শাহজাহানের বন্দিজীবনের সবচেয়ে প্রতীকী চিত্রে পরিণত হয়েছে। যদিও জনপ্রিয় বর্ণনা প্রায়ই আবেগময় করে তোলা হয়, বাস্তব সত্য হলো যে সম্রাট তাজমহল ও শাহজাহানাবাদের মতো স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন, জীবনের শেষ বছরগুলো তাঁকে নিজের দুর্গের ভেতর রাজনৈতিকভাবে বন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়।

কিন্তু শুধু শাহজাহানকে বন্দি করলেই আওরঙ্গজেবের সিংহাসন নিরাপদ ছিল না। তাঁর পাশে তখনো মুরাদ বখশ ছিলেন, যিনি নিজেও সম্রাট হওয়ার দাবি রেখেছিলেন। সামুগড়ের বিজয়ের পর মুরাদ দ্রুতই সহযোগী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন।

আওরঙ্গজেব সরাসরি যুদ্ধের বদলে কৌশল গ্রহণ করেন। ১৬৫৮ সালের জুন মাসে মুরাদ বখশকে এক ভোজের পর বন্দি করা হয়। এরপর তাঁকে উত্তর ভারতে নিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত গোয়ালিয়র দুর্গে আটক রাখা হয়। এতে আওরঙ্গজেব সামরিক জোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীকেও রাজনৈতিকভাবে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন।

এই পদক্ষেপ তাঁর ক্ষমতা দখলের পদ্ধতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। তিনি প্রতিপক্ষদের একসঙ্গে মোকাবিলা করেননি। বরং একজনকে অন্যজনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে পরে একে একে সকলকে বিচ্ছিন্ন করেন। মুরাদের শক্তি দিয়ে দারাকে পরাজিত করেন, তারপর মুরাদকেই সরিয়ে দেন; এরপর সুজা ও দারার অবশিষ্ট প্রতিরোধ আলাদাভাবে মোকাবিলা করেন।

আগ্রার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর আওরঙ্গজেব নিজেকে সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যান। ১৬৫৮ সালের জুলাই মাসে তাঁর প্রথম রাজ্যাভিষেক হয়। তিনি ‘আলমগীর’ উপাধি গ্রহণ করেন, যার অর্থ বিশ্বজয়ী বা বিশ্বকে অধীনকারী। তবে তখনো তাঁর সব প্রতিদ্বন্দ্বী পরাজিত হননি, তাই রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল ছিল না।

পূর্বদিকে শাহ সুজা বাংলা ও বিহারের সম্পদ ব্যবহার করে আবারও সিংহাসনের জন্য অগ্রসর হন। তাঁর সঙ্গে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর বড় সংঘর্ষ হয় ১৬৫৯ সালের ৫ জানুয়ারি খাজওয়ার যুদ্ধে। সুজার বাহিনী পরাজিত হয় এবং তিনি বাংলার দিকে ফিরে যান।

অন্যদিকে দারা শিকোহ সামুগড়ের পরাজয়ের পরও আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি পাঞ্জাব, সিন্ধু এবং গুজরাটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন সমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ক্রমে দুর্বল হতে থাকে। বহু অভিজাত বিজয়ী আওরঙ্গজেবের দিকে চলে যান।

১৬৫৯ সালের দেওরাইয়ের যুদ্ধে দারা আবার পরাজিত হন। এর পর তাঁর পক্ষে সংগঠিত সামরিক প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি পশ্চিমে পালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত মালিক জিওয়ানের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে বন্দি হন।

দারাকে দিল্লিতে এনে অপমানজনকভাবে প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—তাঁকে শুধু সামরিকভাবে নয়, রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবেও ধ্বংস করা। এরপর ধর্মীয় বিচ্যুতি ও বিদ্রোহের অভিযোগ সামনে এনে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৬৫৯ সালের আগস্টে দারা শিকোহ নিহত হন।

আওরঙ্গজেবের জন্য এটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বীর অবসান। দারা শুধু জ্যেষ্ঠ ভাই ছিলেন না; তিনি শাহজাহানের নির্বাচিত উত্তরাধিকারী এবং সাম্রাজ্যের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বিকল্পের প্রতীক ছিলেন। তাঁর মৃত্যু আওরঙ্গজেবের বৈধতাবিরোধী সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিকে সরিয়ে দেয়।

মুরাদ বখশও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি। তাঁর বিরুদ্ধে গুজরাটে পূর্বে সংঘটিত একটি হত্যার অভিযোগ বিচারিকভাবে সামনে আনা হয়। ১৬৬১ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে শাহ সুজা আরাকানে পালিয়ে গিয়ে রহস্যজনক পরিস্থিতিতে বিলুপ্ত হন।

এইভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই শাহজাহানের চার পুত্রের মধ্যে আওরঙ্গজেব একমাত্র কার্যকর সিংহাসন দাবিদার হিসেবে টিকে থাকেন। এটি ছিল যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ের পাশাপাশি ধৈর্যশীল রাজনৈতিক নির্মূলের ফল।

কিন্তু পিতাকে বন্দি করার প্রশ্নটি আওরঙ্গজেবের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত থেকে গেছে। তাঁর সমর্থকেরা যুক্তি দিতে পারেন যে উত্তরাধিকার যুদ্ধের পরিস্থিতিতে শাহজাহান দারার পক্ষে সক্রিয় থাকলে সাম্রাজ্য আবার গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত। তাই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করা ক্ষমতা স্থিতিশীল করার জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। অন্যদিকে জীবিত ও পুনরায় সুস্থ হয়ে ওঠা বৈধ সম্রাটকে তাঁর নিজের পুত্রের হাতে বন্দি করা নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ ক্ষমতা দখল

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—শাহজাহানকে সাধারণ কারাগারে রাখা হয়নি। তিনি আগ্রা দুর্গের রাজকীয় অংশে অবস্থান করতেন, তাঁর সঙ্গে পরিচারক ছিল এবং জাহানারা তাঁর পাশে ছিলেন। কিন্তু এই তুলনামূলক আরামদায়ক অবস্থাকে স্বাধীনতা বলা যায় না। তিনি আর ফরমান জারি করতে, সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে বা সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না।

আওরঙ্গজেব নিজের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল শক্তির ওপর নির্ভর করেননি। রাজ্যাভিষেক, খুতবা, মুদ্রা এবং সাম্রাজ্যিক আচার ব্যবহার করে তিনি নিজেকে বৈধ মুঘল সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৬৫৯ সালে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বড় অংশ সরিয়ে দেওয়ার পর তাঁর আরও আনুষ্ঠানিক রাজ্যাভিষেক হয়।

অর্থাৎ ক্ষমতা দখলের সামরিক পর্যায় এবং বৈধ সম্রাট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক পর্যায় আলাদা ছিল। সামুগড় তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রের সুবিধা দেয়, আগ্রা তাঁকে রাজকোষ ও পিতার ওপর নিয়ন্ত্রণ দেয়, আর দারা-মুরাদ-সুজার পরাজয় তাঁকে কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলে।

শাহজাহানের বন্দিজীবন দীর্ঘ হয়। তিনি ১৬৬৬ সালের ২২ জানুয়ারি আগ্রা দুর্গে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁকে তাজমহলে মুমতাজ মহলের পাশে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় আট বছর আওরঙ্গজেব সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন, অথচ তাঁর পিতা একই সাম্রাজ্যের জীবিত সাবেক সম্রাট হিসেবে বন্দি ছিলেন।

এই ঘটনাকে শুধু ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলেও মুঘল রাজনীতির কাঠামো বোঝা যাবে না। মুঘল উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় স্পষ্ট আইন না থাকার ফলে রাজপুত্রদের কাছে পরাজয়ের অর্থ প্রায়ই শুধু সিংহাসন হারানো নয়, মৃত্যু বা দীর্ঘ বন্দিত্বও ছিল। যে প্রতিদ্বন্দ্বী জীবিত থাকত, তাকে ঘিরে নতুন বিদ্রোহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। ফলে বিজয়ী রাজপুত্রের কাছে প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিষ্ক্রিয় করা রাজনৈতিক প্রয়োজন হিসেবেও দেখা হতো।

তবে আওরঙ্গজেবের পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর ছিল। তিনি সরাসরি এক মুহূর্তে অভ্যুত্থান করেননি। প্রথমে শাহজাহানের অসুস্থতার সংকটকে কাজে লাগান, মুরাদের সঙ্গে জোট গড়েন, দারাকে পরাজিত করেন, আগ্রার রাজকোষ দখল করেন, পিতাকে বন্দি করেন, তারপর মুরাদকে সরান এবং শেষে সুজা ও দারাকে পরাজিত করেন। এটি ছিল ধাপে ধাপে ক্ষমতার প্রতিটি বিকল্প কেন্দ্র ধ্বংস করার প্রক্রিয়া।

১৬৫৮ সালের এই ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রভাব মুঘল ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী হয়। শাহজাহানের রাজত্বের রাজকীয় স্থাপত্য ও তুলনামূলক দরবারকেন্দ্রিক যুগের পর আওরঙ্গজেব সাম্রাজ্যকে আরও দীর্ঘ ও ব্যাপক সামরিক অভিযানের দিকে নিয়ে যান। তাঁর প্রায় অর্ধশতাব্দীর শাসনে মুঘল ভূখণ্ড সর্বোচ্চ বিস্তার লাভ করবে, বিশেষ করে দাক্ষিণাত্যে।

কিন্তু আওরঙ্গজেবের ক্ষমতা দখলের ঘটনাই একই সঙ্গে একটি গভীর মুঘল সমস্যাকে প্রকাশ করে। এত শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ একটি সাম্রাজ্যেও শান্তিপূর্ণ উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। শাহজাহানের অসুস্থতার একটি সংবাদই চার রাজপুত্রকে পরস্পরের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছিল।

আওরঙ্গজেব তাই মুঘল সিংহাসন উত্তরাধিকারসূত্রে সহজে পাননি; তিনি সেটি যুদ্ধ, জোট, কৌশল, বন্দিত্ব এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূলের মাধ্যমে জয় করেছিলেন। সামুগড়ে দারার পরাজয় তাঁকে আগ্রার দরজায় নিয়ে আসে, আগ্রা দুর্গের নিয়ন্ত্রণ তাঁকে শাহজাহান ও রাজকোষের ওপর কর্তৃত্ব দেয়, আর ভাইদের একে একে সরিয়ে দেওয়া তাঁকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাটে পরিণত করে। এই কারণেই ১৬৫৮ সালের ক্ষমতা দখল মুঘল ইতিহাসের শুধু একটি উত্তরাধিকার পরিবর্তন নয়—এটি ছিল শাহজাহানের স্বর্ণযুগের সমাপ্তি এবং আওরঙ্গজেবের দীর্ঘ, বিতর্কিত ও সামরিকভাবে বিস্তৃত যুগের প্রকৃত সূচনা।