বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নানকিং চুক্তি ও হংকং: চীনে ব্রিটিশ প্রভাব ও অসম চুক্তির সূচনা

সিরিজ: আফিম যুদ্ধ: চীন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংঘাত

নানকিং চুক্তি ও হংকং: চীনে ব্রিটিশ প্রভাব ও অসম চুক্তির সূচনা
যুদ্ধজাহাজের চাপে স্বাক্ষরিত চুক্তি বদলে দেয় চীনের বন্দর ও সার্বভৌমত্ব।

নানজিংয়ের সামনে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ দাঁড়িয়ে থাকার সময় চিং দরবারের সামনে প্রশ্ন ছিল, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মূল্য আর কত দূর পর্যন্ত বহন করা সম্ভব। ঝেনজিয়াংয়ের পতন এবং ইয়াংজি নদীতে ব্রিটিশ অগ্রযাত্রা সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও শস্য পরিবহনকে বিপন্ন করেছিল। এই চাপের মধ্যেই ১৮৪২ সালের ২৯ আগস্ট ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ কর্নওয়ালিসে নানকিং চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রথম আফিম যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও চীনের ওপর বিদেশি প্রভাব বিস্তারের একটি নতুন ব্যবস্থা এখান থেকেই শুরু হয়।

চুক্তির নামের নানকিং হলো নানজিংয়ের পুরোনো ইংরেজি নাম। ব্রিটিশ পক্ষে প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন হেনরি পটিঞ্জার; চীনা পক্ষে চিয়িং, ইলিবু ও নিউ জিয়ানের মতো কর্মকর্তারা অংশ নেন। দলিলটি শান্তি ও বন্ধুত্বের ভাষায় লেখা হলেও আলোচনার পেছনে ছিল সামরিক পরাজয়ের বাস্তবতা। ব্রিটিশ বাহিনী তখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে রেখেছিল। তাই চুক্তিকে বোঝার জন্য শুধু তার আনুষ্ঠানিক ভাষা পড়লে হবে না; কোন পরিস্থিতিতে শর্তগুলো গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটিও দেখতে হবে।

সবচেয়ে দৃশ্যমান শর্ত ছিল হংকং দ্বীপ ব্রিটেনের কাছে স্থায়ীভাবে হস্তান্তর। চুক্তির তৃতীয় অনুচ্ছেদে জাহাজ মেরামত ও সরঞ্জাম রাখার জন্য একটি বন্দর থাকার প্রয়োজনের কথা বলা হয়। কিন্তু এর ফল ছিল আরও ব্যাপক: দ্বীপটি ব্রিটিশ আইন ও প্রশাসনের অধীনে চলে যায়। এটি বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের অনুমতি বা নির্দিষ্ট সময়ের ইজারা ছিল না। চীনের ভূখণ্ডের একটি অংশের ওপর সরাসরি ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতি ছিল।

হংকংয়ের গুরুত্ব বোঝার জন্য তখনকার ভূগোল দেখতে হয়। পার্ল নদীর মোহনার কাছে দ্বীপটির প্রাকৃতিক বন্দর জাহাজ আশ্রয়, পণ্য সংরক্ষণ এবং দক্ষিণ চীনের বাণিজ্যে প্রবেশের সুবিধা দিত। ব্রিটিশরা ১৮৪১ সালেই সেখানে দখল প্রতিষ্ঠা করেছিল; নানকিং চুক্তি সেই দখলকে আনুষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়। দ্বীপে আগে থেকেই গ্রাম ও জনবসতি ছিল। ফলে একে সম্পূর্ণ জনশূন্য পাথুরে স্থান হিসেবে দেখানো যেমন ভুল, তেমনি আজকের মহানগরের চেহারাও তখনকার হংকংয়ে আরোপ করা যায় না।

এখানে একটি জরুরি পার্থক্য আছে। ১৮৪২ সালে পুরো বর্তমান হংকং অঞ্চল হস্তান্তর করা হয়নি; শুধু হংকং দ্বীপ দেওয়া হয়েছিল। কাউলুন উপদ্বীপের দক্ষিণাংশ ও স্টোনকাটার্স দ্বীপ ব্রিটিশদের হাতে আসে ১৮৬০ সালের ব্যবস্থায়। নিউ টেরিটরিজের নিরানব্বই বছরের ইজারা হয় ১৮৯৮ সালে। এই আলাদা ঘটনাগুলোকে একসঙ্গে নানকিং চুক্তির ফল বললে ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতা হারিয়ে যায়। প্রথম চুক্তি ছিল সেই দীর্ঘ পরিবর্তনের সূচনা।

দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন ছিল পাঁচটি বন্দর ব্রিটিশ বাণিজ্য ও বসবাসের জন্য উন্মুক্ত করা। এগুলো ছিল গুয়াংঝৌ, শিয়ামেন, ফুঝৌ, নিংবো ও সাংহাই। ব্রিটিশ বণিকেরা পরিবারসহ সেখানে থাকতে পারবেন এবং তাঁদের স্বার্থ দেখার জন্য কনসাল নিযুক্ত হতে পারবেন। এর ফলে বিদেশি বাণিজ্যকে প্রধানত গুয়াংঝৌতে সীমাবদ্ধ রাখার পুরোনো ব্যবস্থা ভেঙে যায়। দক্ষিণ থেকে পূর্ব চীনের উপকূল পর্যন্ত ব্রিটিশ বাণিজ্যের একাধিক প্রবেশদ্বার তৈরি হয়।

তবে বন্দর উন্মুক্ত করা মানেই বন্দরগুলো ব্রিটিশ ভূখণ্ড হয়ে যাওয়া ছিল না। হংকংয়ে ভূখণ্ড হস্তান্তর এবং চুক্তিবন্দরে বিদেশিদের বসবাস ও ব্যবসার অধিকার ছিল ভিন্ন ব্যবস্থা। সময়ের সঙ্গে কিছু বন্দরে বিদেশি বসতি ও বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল গড়ে ওঠে, কিন্তু সব পরিবর্তন চুক্তি স্বাক্ষরের দিনেই ঘটেনি। সাংহাইয়ের পরবর্তী বিকাশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ ইয়াংজি অববাহিকার সঙ্গে তার যোগাযোগ বিদেশি ব্যবসায়ীদের একটি বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাছে পৌঁছে দেয়।

কোহং বণিকদের একচেটিয়া মধ্যস্থতার অবসানও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল। আগে বিদেশিদের অনুমোদিত চীনা বণিকদের মাধ্যমেই ব্যবসা করতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় ব্রিটিশরা নিজেদের পছন্দের ব্যবসায়ীর সঙ্গে লেনদেনের অধিকার পায়। এর ফলে চিং সরকারের নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যিক কাঠামোর একটি স্তম্ভ দুর্বল হয়। একই সঙ্গে দেউলিয়া কোহং বণিকদের কাছে ব্রিটিশদের পাওনা ঋণ পরিশোধের দায় চীনা সরকারকে নিতে হয়। ব্যক্তিগত ব্যবসার দেনা এভাবে আন্তরাষ্ট্রীয় দাবিতে পরিণত হয়।

ক্ষতিপূরণের মোট পরিমাণ নির্ধারিত হয় দুই কোটি দশ লাখ রুপার ডলার। এর মধ্যে ষাট লাখ ছিল জব্দ ও ধ্বংস করা আফিমের জন্য, ত্রিশ লাখ কোহং বণিকদের ঋণের জন্য এবং এক কোটি বিশ লাখ যুদ্ধব্যয়ের জন্য। এখানে ডলার বলতে আধুনিক মার্কিন কাগুজে মুদ্রা বোঝায় না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচলিত রুপার মুদ্রার হিসাব বোঝায়। কিস্তিতে অর্থ দেওয়ার সময়সূচি এবং বিলম্ব হলে সুদের ব্যবস্থাও ছিল, যা যুদ্ধের পরে চিং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

সবচেয়ে তীব্র বৈপরীত্য ছিল আফিমের ক্ষতিপূরণে। চীনা প্রশাসন যে পণ্যকে বেআইনি হিসেবে জব্দ করেছিল, পরাজয়ের পরে সেই পণ্যের জন্যই অর্থ দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু নানকিং চুক্তি আফিম আমদানিকে বৈধ করেনি। মাদকটির আইনগত অবস্থান নিষ্পত্তি না করেই তার ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। ফলে যুদ্ধের কেন্দ্রীয় বিরোধ পুরোপুরি মেটেনি। চোরাচালান ও আইন প্রয়োগের প্রশ্ন পরবর্তী বছরগুলোতেও ব্রিটিশ-চীনা সম্পর্কের উত্তেজনা বজায় রাখে।

শুল্কব্যবস্থায়ও পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়। চুক্তিতে উন্মুক্ত বন্দরগুলোর জন্য প্রকাশ্য ও নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি শুল্ক নির্ধারণের কথা ছিল। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা অনিশ্চিত আদায় ও অতিরিক্ত দাবির বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা চাইতেন। পরবর্তী আলোচনায় বিস্তারিত শুল্কতালিকা স্থির হয়, যেখানে অনেক পণ্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশের স্তরে ছিল। তবে মূল চুক্তিতেই সব পণ্যের জন্য এক অভিন্ন হার লেখা ছিল—এমন বক্তব্য সঠিক নয়। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল বিদেশি বাণিজ্যের শর্ত নির্ধারণে চীনের একক সিদ্ধান্তের সুযোগ সংকুচিত হওয়া।

কূটনৈতিক যোগাযোগেও নতুন রীতি আসে। চুক্তি অনুযায়ী দুই পক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে পত্রালাপে সমমর্যাদার যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকবে। ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদনকারী বিদেশি ব্যবসায়ীদের পর্যায়ে রাখা আর সহজ ছিল না। একই সঙ্গে বন্দিদের মুক্তি এবং ব্রিটিশদের সহায়তা করা চীনা ব্যক্তিদের ক্ষমার শর্ত রাখা হয়। এসব বিধান দেখায়, দলিলটি শুধু পণ্যের দাম ও বন্দর নিয়ে নয়; চীনের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেটিও প্রভাবিত করেছিল।

নানকিং চুক্তির সঙ্গে প্রায়ই যে বিচারিক সুবিধার কথা বলা হয়, তা মূলত পরবর্তী ব্যবস্থায় স্পষ্ট হয়। ১৮৪৩ সালের বাণিজ্যবিধি ও বোগের পরিপূরক চুক্তির ব্যবস্থায় ব্রিটিশ নাগরিকদের ওপর ব্রিটিশ বিচারিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনো ব্রিটিশ অপরাধ করলে তাকে সাধারণভাবে চীনা আদালতের পরিবর্তে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ আইন অনুসারে বিচার করবে। বিদেশিদের নিজস্ব বিচারব্যবস্থার অধীন রাখার এই অধিকার চীনের ভূখণ্ডে তার আইন প্রয়োগের ক্ষমতাকে সীমিত করে।

১৮৪৩ সালের ব্যবস্থায় ব্রিটেন সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের অধিকারও পায়। এর অর্থ, চীন ভবিষ্যতে অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রকে নতুন সুবিধা দিলে ব্রিটেনও অনুরূপ সুবিধা দাবি করতে পারবে। ফলে একটি দেশের সঙ্গে করা ছাড় অন্য দেশের অধিকারে বিস্তৃত হওয়ার পথ তৈরি হয়। ১৮৪৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াংসিয়া এবং ফ্রান্সের হুয়াংপু চুক্তি এই বৃহত্তর ধারাকে এগিয়ে নেয়। ব্রিটিশ বিজয়ের ফল তাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

এই চুক্তিগুলোকে অসম বলা হয় কারণ সামরিক চাপের মধ্যে চীনকে ভূখণ্ড, অর্থ এবং বিশেষ অধিকার দিতে হয়েছিল, অথচ বিনিময়ে সমপরিমাণ অধিকার পায়নি। তবে চীন পুরোপুরি উপনিবেশ হয়ে যায়নি; চিং সরকার বিশাল ভূখণ্ডে প্রশাসন চালিয়ে যায়। একই সময়ে নতুন বন্দরে ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও নগরবিকাশের সুযোগও তৈরি হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সুফল থাকলেও সেগুলো চাপিয়ে দেওয়া শর্ত ও সার্বভৌমত্বের ক্ষয়কে মুছে দেয় না।

১৮৪৩ সালে অনুমোদনপত্র বিনিময় এবং পরিপূরক বিধান কার্যকর হওয়ার সঙ্গে যুদ্ধের ফল দৈনন্দিন ব্যবস্থায় রূপ নিতে থাকে। হংকং হয় ব্রিটিশ ঘাঁটি, পাঁচ বন্দরে বিদেশি উপস্থিতি বাড়ে এবং চীনের আইন ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নতুন সীমারেখা তৈরি হয়। তবু গুয়াংঝৌতে প্রবেশাধিকার, চুক্তির ব্যাখ্যা এবং আফিম নিয়ে বিরোধ রয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হয়েছিল, কিন্তু উভয় পক্ষের প্রত্যাশা মেলেনি—এই অমীমাংসিত ব্যবধানই পরবর্তী সংঘাতের পটভূমি তৈরি করতে থাকে।