বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হেডি লামার: হলিউড তারকা থেকে বেতার প্রযুক্তির পথিকৃৎ

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

হেডি লামার: হলিউড তারকা থেকে বেতার প্রযুক্তির পথিকৃৎ
রুপালি পর্দার আড়ালে বেতার যোগাযোগের এক পথিকৃৎ

ভার্জিনিয়া উলফের নিজের ঘরের দাবি আমাদের যে প্রশ্নের সামনে রেখে গিয়েছিল—স্বাধীনভাবে চিন্তার সুযোগ পেলে একজন নারী কত দূর যেতে পারেন—হেডি লামারের জীবন তার এক অপ্রত্যাশিত উত্তর। সেই উত্তর জন্মেছিল হলিউডের ঝলমলে পর্দার আড়ালে, যুদ্ধকালীন বেতার যোগাযোগের একটি সমস্যা নিয়ে ভাবতে গিয়ে। দর্শক তাঁকে চিনতেন অভিনেত্রী হিসেবে; প্রচারণায় গুরুত্ব পেত তাঁর সৌন্দর্য। অথচ তিনি খুঁজছিলেন এমন ব্যবস্থা, যাতে শত্রুপক্ষ সহজে রেডিও সংকেত ব্যাহত করতে না পারে। তাঁর গল্প একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত কৌতূহল, সহযোগিতা এবং নারীর মেধাকে সংকীর্ণ পরিচয়ে আটকে রাখার ইতিহাস।

১৯১৪ সালের ৯ নভেম্বর ভিয়েনায় জন্ম নেওয়া হেডির আসল নাম হেডভিগ ইভা মারিয়া কিসলার। তখন শহরটি অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। ইহুদি পরিবারে বেড়ে ওঠা হেডির বাবা ছিলেন ব্যাংক কর্মকর্তা, মা পিয়ানোবাদক। ছোটবেলা থেকেই যন্ত্র কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল। বাবার সঙ্গে কথোপকথনে বিভিন্ন প্রযুক্তির কার্যপ্রণালি জানার সুযোগ পেতেন। প্রকৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল না তাঁর; কিন্তু পর্যবেক্ষণ, নিজে শেখা এবং সমস্যা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চিন্তা করার অভ্যাস ছিল। পরে অভিনয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও সেই অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।

কৈশোরেই অভিনয়ে প্রবেশ করেন হেডি। ১৯৩৩ সালের ‘একস্ট্যাসি’ চলচ্চিত্র তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়, পাশাপাশি সৃষ্টি করে বিতর্ক। একই বছর অস্ট্রিয়ার অস্ত্রশিল্পপতি ফ্রিৎস মান্ডলকে বিয়ে করেন তিনি। এই দাম্পত্য ছিল নিয়ন্ত্রণমূলক; স্বামীর ব্যবসায়িক পরিসরে অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা শোনার সুযোগও হয়েছিল তাঁর। তবে পরবর্তী আবিষ্কারের সব জ্ঞান সেখান থেকেই এসেছে বলা অতিরঞ্জন। ১৯৩৭ সালে মান্ডলকে ছেড়ে বেরিয়ে আসেন হেডি। ইউরোপে নাৎসিবাদের বিস্তারের মধ্যে নিজের জীবন নতুন করে গড়ার সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

লন্ডনে চলচ্চিত্র প্রযোজক লুই বি. মেয়ারের সঙ্গে যোগাযোগের পর আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ পান তিনি। এমজিএমের অধীনে তাঁর পর্দার নাম হয় হেডি লামার। ১৯৩৮ সালের ‘আলজিয়ার্স’ তাঁকে হলিউডে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তী সময়ে ‘জিগফেল্ড গার্ল’ এবং ‘স্যামসন অ্যান্ড ডিলাইলা’র মতো ছবিতে অভিনয় করেন। কিন্তু স্টুডিও ব্যবস্থায় তাঁর জন্য নির্ধারিত আকর্ষণীয় নারীর চরিত্রগুলো সব সময় তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রহের প্রকাশ ঘটাত না। অবসরে তিনি নকশা আঁকতেন, যন্ত্র নিয়ে ভাবতেন এবং দৈনন্দিন সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান খুঁজতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সেই কৌতূহলকে জরুরি উদ্দেশ্য দেয়। ইউরোপের সংঘাত থেকে দূরে নিরাপদ হলিউডে থাকলেও মিত্রশক্তির কাজে অবদান রাখতে চেয়েছিলেন লামার। তাঁর মনোযোগ যায় রেডিওর সাহায্যে টর্পেডো নিয়ন্ত্রণের সমস্যায়। ধারণাটি ছিল, দূর থেকে নির্দেশ পাঠিয়ে টর্পেডোর গতিপথ পরিবর্তন করা যাবে। কিন্তু যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট একটি ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করলে শত্রু সেটি শনাক্ত করে একই জায়গায় শক্তিশালী বিঘ্নকারী সংকেত পাঠাতে পারে। এই জ্যামিং নির্দেশ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। প্রশ্ন ছিল, বেতার সংযোগকে এমন আক্রমণের বিরুদ্ধে কীভাবে বেশি প্রতিরোধী করা যায়?

সহজ উদাহরণে বিষয়টি বোঝা যায়। দুজন মানুষ সব সময় একই রেডিও চ্যানেলে কথা বললে তৃতীয় ব্যক্তি সেই চ্যানেলে গোলমাল সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু প্রথম দুজন যদি আগে থেকে ঠিক করা ক্রম অনুযায়ী বারবার চ্যানেল বদলান, বিঘ্নকারীকে তাঁদের অনুসরণ করতে হবে। এখানেই আসে ফ্রিকোয়েন্সি হপিং—যোগাযোগ চলার সময় দ্রুত বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে স্থানান্তর। প্রেরক ও গ্রাহককে একই মুহূর্তে একই ফ্রিকোয়েন্সিতে যেতে হবে। সামঞ্জস্য হারালে নিজেদের যোগাযোগই ভেঙে পড়বে। লামার ও তাঁর সহযোগীর নকশার কেন্দ্রে ছিল এই সমন্বয়ের সমস্যা।

১৯৪০ সালে সুরকার জর্জ অ্যানথেইলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। অ্যানথেইল ছিলেন পরীক্ষামূলক সংগীতের মানুষ; যান্ত্রিকভাবে সংগীত বাজানো প্লেয়ার-পিয়ানো এবং একাধিক যন্ত্রের সময় মেলানো নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল। প্লেয়ার-পিয়ানোতে ছিদ্রযুক্ত কাগজের রোলের বিন্যাস অনুযায়ী সুর বাজে। লামার ও অ্যানথেইল ভাবলেন, অনুরূপ দুটি রোল দিয়ে প্রেরক ও গ্রাহকের ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। যুদ্ধের একটি সমস্যা সমাধানে সংগীতযন্ত্রের ধারণা ব্যবহারের এই প্রচেষ্টা ছিল তাঁদের সহযোগিতার বিশেষত্ব।

নকশায় পিয়ানোর ৮৮টি চাবির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণভাবে ৮৮টি ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের ব্যবস্থা ছিল। একই নির্দেশবিন্যাস অনুসরণকারী রোল দুটি যন্ত্রের পরিবর্তনের সময় মিলিয়ে দেবে। বাইরের কারও কাছে পরিবর্তনের ক্রম অজানা থাকলে নির্দিষ্ট সংকেত অনুসরণ ও ব্যাহত করা কঠিন হবে। তবে একে সম্পূর্ণ অভেদ্য ব্যবস্থা ভাবা ঠিক নয়। ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন করলেই সব ধরনের আক্রমণ ঠেকানো যায় না, আর এটি আধুনিক এনক্রিপশনের সমার্থকও নয়। তাঁদের লক্ষ্য ছিল যোগাযোগকে বিঘ্নিত করা কঠিন করা, সমস্ত নিরাপত্তা সমস্যার একক সমাধান দেওয়া নয়।

১৯৪১ সালের ১০ জুন তাঁরা পেটেন্টের আবেদন করেন। ১৯৪২ সালের ১১ আগস্ট ‘সিক্রেট কমিউনিকেশন সিস্টেম’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের পেটেন্ট নম্বর ২,২৯২,৩৮৭ মঞ্জুর হয়। নথিতে লামারের নাম ছিল হেডি কিসলার মার্কি—সেই সময়কার আইনগত নাম। তাঁর সঙ্গে সহ-আবিষ্কারক হিসেবে অ্যানথেইলের নামও রয়েছে। এই তথ্যটি জরুরি, কারণ জনপ্রিয় বর্ণনায় কখনো পুরো কৃতিত্ব একজনের হয়ে যায়। লামারের সমস্যাচিন্তা এবং অ্যানথেইলের সংগীতপ্রযুক্তির অভিজ্ঞতা মিলেই নির্দিষ্ট নকশাটি তৈরি হয়েছিল। পেটেন্টটি তাঁদের প্রযুক্তিগত উদ্যোগের প্রত্যক্ষ দলিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী যুদ্ধের সময় প্রস্তাবটি গ্রহণ করেনি। টর্পেডোর মধ্যে যান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যবহার, আকার, নির্ভরযোগ্যতা এবং বাস্তবায়ন নিয়ে আপত্তি ছিল। পেটেন্ট মঞ্জুর হওয়া ও যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। লামারকে বরং তারকাখ্যাতি ব্যবহার করে যুদ্ধঋণপত্র বিক্রিতে সহায়তা করতে উৎসাহিত করা হয়; সেই কাজেও অংশ নেন তিনি। ঘটনাটি তাঁর সময়ের সামাজিক প্রত্যাশাকে প্রকাশ করে: একজন অভিনেত্রী অর্থ সংগ্রহে কার্যকর হতে পারেন, কিন্তু সামরিক প্রযুক্তির আলোচনায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়া ছিল অনেক কঠিন।

পরবর্তী দশকগুলোতে ইলেকট্রনিকসের উন্নতি ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন ও সমন্বয়ের ব্যবস্থা ছোট, দ্রুত এবং বেশি ব্যবহারযোগ্য করে তোলে। বৃহত্তর স্প্রেড-স্পেকট্রাম যোগাযোগপরিবারে ফ্রিকোয়েন্সি হপিং একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। তবে এ ধরনের ধারণা নিয়ে লামার ও অ্যানথেইলের আগেও কাজ হয়েছিল এবং পরেও বহু গবেষক স্বতন্ত্র অবদান রেখেছেন। তাই তাঁদের পেটেন্ট থেকে আজকের প্রতিটি বেতার যন্ত্র পর্যন্ত সরল, একক উত্তরাধিকাররেখা আঁকা যায় না। তাঁদের গুরুত্ব নির্দিষ্ট যুদ্ধকালীন সমস্যার জন্য সমন্বিত ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তনের একটি উদ্ভাবনী নকশা দেওয়ায়।

ব্লুটুথে ফ্রিকোয়েন্সি হপিং ব্যবহৃত হয়; ওয়াই-ফাইয়ের প্রাথমিক মানেও এই পদ্ধতির বিকল্প ছিল। কিন্তু বর্তমান ওয়াই-ফাইয়ের প্রধান পদ্ধতিগুলো তাঁদের যান্ত্রিক নকশার অনুলিপি নয়। একইভাবে জিপিএসে স্প্রেড-স্পেকট্রাম কৌশল থাকলেও সেটিকে সরাসরি তাঁদের ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং ব্যবস্থা বলা ভুল। হেডি লামার একা ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ বা জিপিএস আবিষ্কার করেননি। তাঁর কাজ আধুনিক বেতার যোগাযোগের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি পূর্ববর্তী অবদান। যথাযথ ভাষায় সেই সম্পর্ক ব্যাখ্যা করলে তাঁর অর্জন ছোট হয় না; বরং তার প্রকৃত স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়।

আবিষ্কারটির জন্য লামার ও অ্যানথেইল রয়্যালটি থেকে লাভবান হননি। ১৯৫৯ সালে পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হয়। অনেক পরে, ১৯৯৭ সালে ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন দুজনকে পাইওনিয়ার অ্যাওয়ার্ড দিয়ে সম্মান জানায়। ২০১৪ সালে তাঁরা ন্যাশনাল ইনভেন্টরস হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন। লামার তত দিনে প্রয়াত; ২০০০ সালের ১৯ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। এই বিলম্বিত স্বীকৃতি তাঁর পরিচয়কে বিস্তৃত করেছে। পর্দায় দৃশ্যমান সৌন্দর্যের পাশাপাশি নকশার টেবিলে সক্রিয় বুদ্ধিমত্তাও ইতিহাসে নিজের স্থান পেয়েছে।

ভার্জিনিয়া উলফ নারীর চিন্তার জন্য নিজের ঘর ও আর্থিক স্বাধীনতার প্রয়োজন দেখিয়েছিলেন। হেডি লামারের জীবন সেই আলোচনায় আরও একটি শর্ত যোগ করে: চিন্তার সুযোগের সঙ্গে চিন্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবেশও দরকার। একজন মানুষের পেশা বা চেহারা দেখে তাঁর সক্ষমতার সীমানা নির্ধারণ করলে মূল্যবান সম্ভাবনা অদেখা থেকে যায়। লামারের সবচেয়ে শক্তিশালী উত্তরাধিকার তাই একটি পেটেন্টের বাইরেও বিস্তৃত। শিল্প ও প্রযুক্তির মধ্যে চলাচলকারী তাঁর কৌতূহল মনে করিয়ে দেয়, নতুন ধারণা পরিচিত দরজা দিয়েই আসবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।