বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফার্মি প্যারাডক্স: মহাবিশ্বে এত গ্রহ থাকলেও এলিয়েনরা কোথায়?

ফার্মি প্যারাডক্স: মহাবিশ্বে এত গ্রহ থাকলেও এলিয়েনরা কোথায়?
অসংখ্য গ্রহের মহাবিশ্ব এত নীরব কেন?

রাতের আকাশে খালি চোখে কয়েক হাজার নক্ষত্র দেখা গেলেও আমাদের আকাশগঙ্গায় নক্ষত্রের প্রকৃত সংখ্যা শত শত কোটি। পর্যবেক্ষণে এখন স্পষ্ট যে গ্রহ শুধু সৌরজগতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নয়; অসংখ্য নক্ষত্রের চারপাশেই গ্রহ ঘোরে। তাদের কিছু পাথুরে, কিছু পৃথিবীর কাছাকাছি আকারের এবং কিছু এমন দূরত্বে অবস্থান করে যেখানে উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল থাকলে পৃষ্ঠে তরল পানি টিকে থাকতে পারে। মহাবিশ্বের বিপুল বয়স ও অগণিত ছায়াপথ বিবেচনা করলে কোথাও না কোথাও প্রাণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা গড়ে ওঠার সম্ভাবনা স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরে কোনো জীব, বুদ্ধিমান সত্তা কিংবা প্রযুক্তিগত সভ্যতার অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি। সম্ভাবনার এই প্রাচুর্য ও প্রমাণের এই অনুপস্থিতির মধ্যকার আপাত বিরোধই ফার্মি প্যারাডক্স নামে পরিচিত।

ইতালীয় বংশোদ্ভূত পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মির নামের সঙ্গে এই প্রশ্নটি যুক্ত। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি মূলত জানতে চেয়েছিলেন—মহাজাগতিক সভ্যতার সম্ভাবনা যদি এত বেশি হয়, তাহলে তারা সবাই কোথায়? প্রশ্নটি শুনতে সহজ হলেও এর ভেতরে একটি গভীর যুক্তি রয়েছে। আকাশগঙ্গা প্রায় এক হাজার তিনশ কোটি বছরের পুরোনো, আর সূর্য ও পৃথিবীর বয়স প্রায় চারশ ষাট কোটি বছর। অর্থাৎ পৃথিবীর বহু আগে অসংখ্য নক্ষত্র ও গ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কোনো প্রযুক্তিগত সভ্যতা মানুষের চেয়ে মাত্র কয়েক লাখ বা কয়েক কোটি বছর এগিয়ে থাকলেও মহাজাগতিক সময়ের হিসাবে সেই ব্যবধান খুব বড় নয়, অথচ প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ক্ষেত্রে তা অকল্পনীয় হতে পারে।

মানবজাতির প্রযুক্তিগত অগ্রগতির গতি বিবেচনা করলে ফার্মির প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। মানুষ মাত্র কয়েক শতাব্দীতে বাষ্পীয় যন্ত্র থেকে মহাকাশযান, বেতার যোগাযোগ, কৃত্রিম উপগ্রহ ও সৌরজগতের প্রান্তে পৌঁছানো যন্ত্র তৈরি করেছে। এমন কোনো সভ্যতা যদি আমাদের চেয়ে দশ লাখ বছর আগে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে থাকে, তবে সেটি শুধু নিজের গ্রহে সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? আলোর চেয়ে ধীরগতির যান ব্যবহার করেও তারা নিকটবর্তী নক্ষত্রে পৌঁছাতে, সেখানে বসতি বা স্বয়ংক্রিয় অনুসন্ধানযন্ত্র স্থাপন করতে এবং সেখান থেকে আরও দূরের নক্ষত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রতিটি নতুন ঘাঁটি থেকে পরবর্তী অভিযান শুরু হলে কয়েক কোটি বছরের মধ্যে পুরো আকাশগঙ্গায় উপস্থিতির চিহ্ন ছড়িয়ে পড়া তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব নয়। আকাশগঙ্গার বয়সের তুলনায় কয়েক কোটি বছর খুবই অল্প।

তাহলে পৃথিবীর আকাশে বহির্জাগতিক যান দেখা যায় না কেন? চাঁদ, মঙ্গল, গ্রহাণু বা সৌরজগতের অন্য কোথাও তাদের নিশ্চিত যন্ত্র কিংবা স্থাপনার চিহ্ন নেই কেন? বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্রে কোনো কৃত্রিম উৎসের পুনরাবৃত্ত ও যাচাইযোগ্য বার্তা ধরা পড়ছে না কেন? কোনো নক্ষত্রের চারপাশে বিশাল শক্তি সংগ্রাহক স্থাপনা, অস্বাভাবিক তাপ নিঃসরণ অথবা উন্নত প্রকৌশলের অকাট্য নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে না কেন? এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো অজানা। ফার্মি প্যারাডক্স কোনো প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি আমাদের পর্যবেক্ষণ, অনুমান ও অজানা চলকগুলোর মধ্যকার অসামঞ্জস্য প্রকাশকারী একটি চিন্তার সমস্যা।

এ প্রশ্ন বিশ্লেষণের একটি পরিচিত উপায় হলো ড্রেক সমীকরণ। এর উদ্দেশ্য নির্দিষ্টভাবে এলিয়েন সভ্যতার সংখ্যা বলে দেওয়া নয়, বরং কোন কোন উপাদানের ওপর সেই সংখ্যা নির্ভর করতে পারে তা সাজিয়ে দেখানো। আকাশগঙ্গায় নতুন নক্ষত্র সৃষ্টির হার, গ্রহযুক্ত নক্ষত্রের অনুপাত, জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশবিশিষ্ট গ্রহের সংখ্যা, সেখানে প্রাণের উদ্ভবের সম্ভাবনা, বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন, যোগাযোগক্ষম প্রযুক্তির বিকাশ এবং সেই যোগাযোগযোগ্য পর্যায় কত দিন স্থায়ী হয়—এসব উপাদান বিবেচনা করা হয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে প্রথম কয়েকটি উপাদান সম্পর্কে ধারণা উন্নত হয়েছে, কিন্তু প্রাণের উদ্ভব ও প্রযুক্তিগত সভ্যতার স্থায়িত্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান প্রায় সম্পূর্ণভাবে পৃথিবীর একমাত্র উদাহরণের ওপর নির্ভরশীল।

পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব আছে বলে আমরা জানি যে প্রাণের উদ্ভব অন্তত একবার ঘটেছে। কিন্তু উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই প্রাণ সহজে জন্ম নেয়, নাকি এটি মহাবিশ্বের অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা—একটি উদাহরণ থেকে তা নির্ধারণ করা যায় না। পৃথিবী গঠনের তুলনামূলক অল্প সময়ের মধ্যে প্রাচীন জীবনের চিহ্ন দেখা যাওয়ার বিষয়টি প্রাণের উদ্ভব সহজ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেয়। তবে সেই প্রাচীন জীব থেকে জটিল বহুকোষী প্রাণ গড়ে উঠতে কয়েকশ কোটি বছর লেগেছে। প্রযুক্তি নির্মাণে সক্ষম বুদ্ধিমান প্রাণ পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র একবারই আবির্ভূত হয়েছে বলে আমরা জানি। তাই অণুজীব সাধারণ হলেও প্রযুক্তিনির্ভর সভ্যতা অত্যন্ত বিরল হতে পারে।

কোনো গ্রহ নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকলেই সেটি পৃথিবীর মতো হবে না। বাসযোগ্য অঞ্চল শুধু এমন সম্ভাব্য দূরত্ব বোঝায় যেখানে উপযুক্ত পরিবেশ থাকলে তরল পানি থাকতে পারে। গ্রহটির যথাযথ ভর, স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে সুরক্ষা এবং ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার মতো বহু বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। নক্ষত্রটি ঘন ঘন শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটালে বা গ্রহটি নক্ষত্রের সঙ্গে এমনভাবে আবদ্ধ থাকলে যে এক পাশ চিরকাল উত্তপ্ত ও অন্য পাশ অন্ধকার, সেখানে প্রাণের পথ পৃথিবীর চেয়ে ভিন্ন ও কঠিন হতে পারে। আবার পৃথিবীর মতো বড় উপগ্রহ, বহিঃস্থ বৃহৎ গ্রহ কিংবা পাতচলনের প্রকৃত গুরুত্ব নিয়েও নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।

ফার্মি প্যারাডক্সের একটি সম্ভাব্য উত্তর হলো মহাবিশ্বে আদিম প্রাণ প্রচুর থাকলেও জটিল প্রাণ বিরল। পৃথিবীতে দীর্ঘ সময় শুধু এককোষী জীব ছিল। বহুকোষী প্রাণ, স্নায়ুতন্ত্র, উন্নত মস্তিষ্ক, ভাষা, বিমূর্ত চিন্তা এবং সঞ্চিত প্রযুক্তিগত জ্ঞান—প্রতিটি পর্যায়ে এমন বিবর্তনীয় পরিবর্তন দরকার হয়েছে যা অবশ্যম্ভাবী ছিল না। ডাইনোসররা কোটি কোটি বছর পৃথিবীতে প্রভাবশালী থাকলেও বেতার দূরবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি করেনি। তাই দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণ টিকে থাকলেই একদিন অবশ্যই মহাকাশে সংকেত পাঠানো সভ্যতা সৃষ্টি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

আরেকটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো মহা ছাঁকনি। এর অর্থ, প্রাণহীন পদার্থ থেকে আকাশগঙ্গাজুড়ে বিস্তৃত উন্নত সভ্যতায় পৌঁছানোর পথে অন্তত একটি অত্যন্ত কঠিন বাধা থাকতে পারে। সেই বাধা প্রাণের প্রথম উদ্ভব, জটিল কোষের বিকাশ, বহুকোষী প্রাণ, বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি অথবা দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতা টিকিয়ে রাখার পর্যায়ে অবস্থান করতে পারে। যদি সবচেয়ে কঠিন বাধাগুলো মানবজাতি ইতিমধ্যে অতিক্রম করে এসে থাকে, তবে আমরা মহাবিশ্বে বিরল বলেই চারদিকে নীরবতা দেখছি। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর সম্ভাবনা হলো প্রধান বাধাটি এখনো আমাদের সামনে রয়েছে।

প্রযুক্তিগত সভ্যতা তৈরি হওয়ার পর আত্মবিনাশের ঝুঁকি সেই ভবিষ্যৎ ছাঁকনি হতে পারে। পারমাণবিক যুদ্ধ, পরিবেশগত বিপর্যয়, নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি, জীবাণুজনিত দুর্যোগ, সম্পদের অবক্ষয় কিংবা সামাজিক কাঠামোর পতন একটি সভ্যতার প্রযুক্তিনির্ভর সময়কাল সংক্ষিপ্ত করে দিতে পারে। মহাজাগতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও ভূমিকা রাখতে পারে—বৃহৎ গ্রহাণুর আঘাত, কাছাকাছি নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, তীব্র বিকিরণ অথবা নিজ নক্ষত্রের পরিবর্তন কোনো গ্রহের প্রাণ ধ্বংস করতে পারে। যদি অধিকাংশ সভ্যতা আন্তনাক্ষত্রিকভাবে বিস্তৃত হওয়ার আগেই বিলুপ্ত হয়, তবে একই সময়ে দুই সভ্যতার একে অন্যকে শনাক্ত করার সুযোগ অত্যন্ত কম হবে।

সভ্যতা বিলুপ্ত না হলেও তার যোগাযোগযোগ্য সময় খুব সংক্ষিপ্ত হতে পারে। মানুষ শক্তিশালী বেতার তরঙ্গ ব্যবহার শুরু করেছে মাত্র এক শতাব্দীর সামান্য বেশি সময় আগে। আমাদের বেতার নিঃসরণ আলোর গতিতে মহাকাশে ছড়ালেও তা এখনো আকাশগঙ্গার অত্যন্ত ক্ষুদ্র অঞ্চলে পৌঁছেছে। একইভাবে, হাজার বছর আগে পৃথিবীর পাশ দিয়ে কোনো দূরবর্তী সভ্যতার সংকেত অতিক্রম করে থাকলে তখন তা ধরার কোনো যন্ত্র আমাদের ছিল না। আবার দশ হাজার বছর পর কোনো সংকেত এলে সেই সময় মানবসভ্যতা কী অবস্থায় থাকবে, তা অজানা। দুটি সভ্যতা একই সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর হলেই যথেষ্ট নয়; তাদের যোগাযোগের সময় ও ব্যবহৃত পদ্ধতিও মিলে যেতে হবে।

মহাজাগতিক দূরত্ব এই সমস্যাকে আরও কঠিন করে। পৃথিবীর নিকটতম নক্ষত্র থেকেও আলো আসতে চার বছরের বেশি সময় লাগে। আকাশগঙ্গার দূরের কোনো অঞ্চলে পাঠানো বার্তার উত্তর পেতে কয়েক হাজার বা কয়েক দশ হাজার বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে। এমন কথোপকথন মানুষের পরিচিত সামাজিক যোগাযোগের মতো নয়। কোনো সভ্যতা সংকেত পাঠানোর পর উত্তর আসার আগেই বদলে যেতে বা বিলুপ্ত হতে পারে। আন্তনাক্ষত্রিক যান পাঠানো আরও কঠিন, কারণ বিপুল দূরত্ব অতিক্রম করতে প্রচুর শক্তি, দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্র এবং ধূলিকণার আঘাত ও বিকিরণ থেকে সুরক্ষা প্রয়োজন।

আমরা হয়তো সঠিক সংকেতও খুঁজছি না। মানবজাতি প্রধানত বেতার তরঙ্গ, সংক্ষিপ্ত আলোকঝলক, অস্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় রাসায়নিক এবং বৃহৎ কৃত্রিম স্থাপনার সম্ভাব্য তাপচিহ্ন খোঁজে। কিন্তু অতি উন্নত সভ্যতা এমন যোগাযোগপ্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে যা আমাদের কাছে অজানা অথবা শনাক্ত করার ক্ষমতার বাইরে। তারা শক্তিশালী বেতার সম্প্রচার ছেড়ে অধিক দক্ষ ও সংকীর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারে। পৃথিবী থেকে অনিচ্ছাকৃত বেতার নিঃসরণও দূরত্বের সঙ্গে দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। তাই একটি প্রযুক্তিগত সভ্যতা উপস্থিত থাকলেও তার যোগাযোগরশ্মি সরাসরি পৃথিবীর দিকে না এলে আমরা সেটি ধরতে নাও পারি।

অনুসন্ধানের পরিমাণও বাস্তবে খুব সীমিত। আকাশগঙ্গায় শত শত কোটি নক্ষত্র থাকলেও প্রতিটি নক্ষত্রকে সব সম্ভাব্য তরঙ্গদৈর্ঘ্য, সব সময়, সব সংকেতের দৈর্ঘ্য ও সব পুনরাবৃত্তির হারে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। মহাজাগতিক সংকেতের বিশাল সম্ভাব্য পরিসরের তুলনায় মানুষের অনুসন্ধানকে একটি মহাসাগর থেকে অল্প পানি তুলে সেখানে মাছ না পাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়। কয়েক দশকের সীমিত অনুসন্ধানে নিশ্চিত সংকেত না পাওয়া পুরো আকাশগঙ্গায় কেউ নেই—এমন প্রমাণ নয়। এটি শুধু বোঝায় যে এখন পর্যন্ত আমরা যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাইনি।

কিছু ব্যাখ্যা অনুযায়ী উন্নত সভ্যতাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব থাকতে পারে। তারা হয়তো অপরিচিত সভ্যতার কাছে নিজের অবস্থান প্রকাশ করাকে বিপজ্জনক মনে করে। মহাবিশ্বে বন্ধুত্বপূর্ণ ও শত্রুভাবাপন্ন সভ্যতার পার্থক্য আগে থেকে জানা সম্ভব না হলে নীরবতা আত্মরক্ষার কৌশল হতে পারে। আবার তথাকথিত চিড়িয়াখানা অনুমান অনুযায়ী উন্নত সভ্যতা পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করলেও আমাদের স্বাভাবিক বিকাশে হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এসব ধারণা কল্পনাকে আকর্ষণ করলেও বর্তমানে এগুলোর পক্ষে কোনো পরীক্ষিত প্রমাণ নেই। তাই এগুলোকে সম্ভাব্য চিন্তা হিসেবে দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।

আরেকটি সম্ভাবনা হলো উন্নত সভ্যতা নক্ষত্রজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে আগ্রহী নাও হতে পারে। মানুষের অনুসন্ধান ও সম্প্রসারণের ইচ্ছাকে সব বুদ্ধিমান প্রাণের সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কোনো সভ্যতা বস্তুগত সম্প্রসারণের বদলে নিজস্ব গ্রহে স্থিতিশীল জীবন, কৃত্রিম পরিবেশ অথবা গণনাভিত্তিক অস্তিত্বকে অগ্রাধিকার দিতে পারে। বিপুল ব্যয় ও ঝুঁকির আন্তনাক্ষত্রিক যাত্রা তাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। আবার তারা ক্ষুদ্র ও দক্ষ যন্ত্র ব্যবহার করলে বিশাল স্থাপনা বা সহজে দেখা যায় এমন চিহ্ন রেখে যাওয়ার প্রয়োজনও নাও হতে পারে।

মহাবিশ্বে বুদ্ধিমান সভ্যতা আছে, কিন্তু তারা খুব দূরে বা খুব বিচ্ছিন্ন—এটিও একটি সরল উত্তর। নক্ষত্র সৃষ্টি, ভারী মৌলের প্রাচুর্য ও গ্রহের পরিবেশ মহাবিশ্বের ইতিহাসে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রযুক্তিগত সভ্যতা গড়ে ওঠার উপযুক্ত পরিস্থিতি হয়তো তুলনামূলক সাম্প্রতিক। সে ক্ষেত্রে মানবজাতি মহাজাগতিক ইতিহাসের প্রথম দিককার প্রযুক্তিগত সভ্যতাগুলোর একটি হতে পারে। বিপরীতভাবে, বহু সভ্যতা হয়তো অনেক আগে এসেছিল এবং বিলুপ্ত হয়েছে; তাদের চিহ্ন সময়, বিকিরণ, সংঘর্ষ ও গ্রহীয় পরিবর্তনে মুছে গেছে। বিশাল সময়ের ব্যবধানেও একই আকাশগঙ্গা কার্যত নীরব মনে হতে পারে।

কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, পৃথিবীতে দেখা অজ্ঞাত আকাশীয় ঘটনা কি এলিয়েনদের প্রমাণ হতে পারে? কোনো ঘটনার পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা না গেলেই সেটি বহির্জাগতিক হয়ে যায় না। অসম্পূর্ণ তথ্য, দূরের বিমান, বেলুন, আবহাওয়াজনিত ঘটনা, দৃষ্টিভ্রম, যন্ত্রের ত্রুটি অথবা গোপন মানবনির্মিত প্রযুক্তি—অনেক ব্যাখ্যা থাকতে পারে। বহির্জাগতিক সভ্যতার দাবির জন্য এমন প্রমাণ দরকার যা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা যায়, বারবার পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং পরিচিত ব্যাখ্যাগুলোকে নির্ভরযোগ্যভাবে বাদ দেয়। আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্রকাশ্য ও বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পৃথিবীর বাইরে আদিম প্রাণ আবিষ্কার হলেও ফার্মি প্যারাডক্স পুরোপুরি সমাধান হবে না, তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলবে। মঙ্গল, বৃহস্পতির উপগ্রহ ইউরোপা বা শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসে স্বাধীনভাবে উদ্ভূত জীবনের সন্ধান পাওয়া গেলে বোঝা যেতে পারে যে উপযুক্ত পরিবেশে প্রাণের জন্ম তুলনামূলক সাধারণ। অন্যদিকে সৌরজগতের বহু সম্ভাবনাময় স্থানে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পরও প্রাণের চিহ্ন না পাওয়া প্রাণের উদ্ভব বিরল হওয়ার ধারণাকে কিছুটা শক্তিশালী করতে পারে। বহির্গ্রহের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন, মিথেন বা অন্য কোনো সম্ভাব্য প্রাণচিহ্ন পাওয়া গেলেও প্রাকৃতিক রাসায়নিক প্রক্রিয়া বাদ না দেওয়া পর্যন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

প্রযুক্তিগত সভ্যতার চিহ্ন অনুসন্ধানের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা শুধু বেতার বার্তা নয়, অস্বাভাবিক আলোকসংকেত, গ্রহের বায়ুমণ্ডলে শিল্পজাত রাসায়নিক, নক্ষত্রের শক্তি সংগ্রহকারী বিশাল কাঠামোর সম্ভাব্য ছায়া, অস্বাভাবিক তাপ নিঃসরণ এবং সৌরজগতের ভেতরে কৃত্রিম বস্তুর চিহ্ন খুঁজতে পারেন। তবে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখলেই এলিয়েন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নয়। প্রথমে যন্ত্রের ভুল, প্রাকৃতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া এবং মানুষের প্রযুক্তিগত কার্যক্রম পরীক্ষা করতে হয়। একটি সত্যিকারের আবিষ্কারকে একাধিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ও স্বাধীন গবেষণায় যাচাইযোগ্য হতে হবে।

ফার্মি প্যারাডক্সের শক্তি হলো এটি কোনো একটি উত্তরের দিকে আমাদের ঠেলে দেয় না। এটি জীববিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান এবং সভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎকে একই প্রশ্নের মধ্যে যুক্ত করে। হয়তো প্রাণের জন্মই অত্যন্ত বিরল, হয়তো বুদ্ধিমত্তা বিরল, হয়তো সভ্যতাগুলো বেশিদিন টিকে না, হয়তো দূরত্ব যোগাযোগকে প্রায় অসম্ভব করে, অথবা আমরা এখনো যথেষ্ট ভালোভাবে অনুসন্ধান করিনি। একাধিক কারণ একসঙ্গেও কাজ করতে পারে।

মহাবিশ্বের বর্তমান নীরবতা তাই এলিয়েন নেই—এমন নিশ্চিত ঘোষণা নয়। আবার অসংখ্য গ্রহ আছে বলেই এলিয়েন অবশ্যই আছে—এমন প্রমাণও নয়। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত পৃথিবীই প্রাণের একমাত্র নিশ্চিত আশ্রয় এবং মানবজাতিই যোগাযোগক্ষম প্রযুক্তিগত সভ্যতার একমাত্র জানা উদাহরণ। এই একটিমাত্র নমুনা দিয়ে মহাবিশ্বের সামগ্রিক বাস্তবতা নির্ধারণ করা যায় না। ফার্মির প্রশ্ন এখনো খোলা রয়েছে—সবাই কোথায়? হয়তো উত্তরটি কোনো দূরের সংকেতে অপেক্ষা করছে, হয়তো কোনো বরফঢাকা উপগ্রহের সমুদ্রে লুকিয়ে আছে, হয়তো সভ্যতার টিকে থাকার নিয়মের মধ্যে রয়েছে, অথবা মহাবিশ্ব সত্যিই আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি নিঃসঙ্গ। এই অনিশ্চয়তাই ফার্মি প্যারাডক্সকে আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর ও আকর্ষণীয় প্রশ্নগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।


আপনার পছন্দ হতে পারে