নাসার প্রতিষ্ঠা ও মার্কিন মহাকাশ অভিযান: এক্সপ্লোরার-১ থেকে শেপার্ড ও জন গ্লেন
সিরিজ: মহাকাশ প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন
প্রথম উপগ্রহ থেকে মানব মহাকাশযাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রগতি।
গ্যাগারিনের পৃথিবী প্রদক্ষিণের পর মহাকাশ প্রতিযোগিতার প্রশ্ন বদলে গিয়েছিল: পরবর্তী বড় লক্ষ্য কে আগে অর্জন করবে? তবে সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর আগেই যুক্তরাষ্ট্র নিজের মহাকাশ কর্মসূচির ভিত্তি পুনর্গঠন শুরু করেছিল। স্পুটনিকের ধাক্কা, প্রথম মার্কিন উপগ্রহের সাফল্য এবং নাসার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই প্রস্তুতি এগোয়। এরপর অ্যালান শেপার্ড প্রমাণ করেন, একজন মার্কিন মহাকাশচারী মহাকাশে গিয়ে ফিরতে পারেন; জন গ্লেন দেখান, তাঁকে পৃথিবীর কক্ষপথেও পাঠানো সম্ভব। এই অগ্রগতি তাৎক্ষণিকভাবে সোভিয়েত নেতৃত্বের অবসান ঘটায়নি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা চালানোর সক্ষমতা দিয়েছিল।
এই পরিবর্তনের শুরু বুঝতে ফিরতে হয় ১৯৫৭ সালের শেষ দিকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক-১ ও স্পুটনিক-২ পাঠিয়ে সাফল্য দেখালেও যুক্তরাষ্ট্রের উপগ্রহ কর্মসূচি তখনো উৎক্ষেপণের অপেক্ষায় ছিল। ৬ ডিসেম্বর ভ্যানগার্ড টিভি-৩ পরীক্ষায় রকেট উৎক্ষেপণমঞ্চ থেকে সামান্য উঠে ভেঙে পড়ে এবং বিস্ফোরিত হয়। টেলিভিশন ও সংবাদচিত্রে দৃশ্যটি ছড়িয়ে পড়ায় ব্যর্থতা জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে ওঠে। তবে একটি পরীক্ষার ব্যর্থতা পুরো মার্কিন রকেট গবেষণার চিত্র ছিল না। সেনাবাহিনীর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংস্থা এবং জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির কাজ বিকল্প পথ প্রস্তুত রেখেছিল।
সেই পথেই ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে জুনো-১ রকেটে এক্সপ্লোরার-১ উৎক্ষেপিত হয়। আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী তখন ১ ফেব্রুয়ারি। ভের্নার ফন ব্রাউনের দলের রকেট এবং জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির উপগ্রহ প্রস্তুতির সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবার কৃত্রিম উপগ্রহ কক্ষপথে পাঠায়। প্রায় ১৪ কিলোগ্রাম ওজনের সরু উপগ্রহটি স্পুটনিকগুলোর তুলনায় ছোট ছিল। কিন্তু এক্সপ্লোরার-১-এর গুরুত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম হওয়ায় নয়; তার বৈজ্ঞানিক যন্ত্র পৃথিবীর চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে বড় আবিষ্কারের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস ভ্যান অ্যালেনের দলের তৈরি মহাজাগতিক রশ্মি শনাক্তকারী যন্ত্র কখনো প্রত্যাশিত গণনা দেখাত, আবার কোনো অঞ্চলে প্রায় শূন্য পাঠ দিত। প্রথমে রহস্যজনক মনে হলেও বোঝা যায়, প্রবল বিকিরণে যন্ত্রের গণনাব্যবস্থা কার্যত সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছিল। পরবর্তী এক্সপ্লোরার অভিযানের তথ্য এই ব্যাখ্যা দৃঢ় করে। এভাবেই পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে আটকে থাকা উচ্চশক্তির আধানযুক্ত কণার বলয় শনাক্ত হয়, যা ভ্যান অ্যালেন বিকিরণ বলয় নামে পরিচিত। ভবিষ্যৎ মহাকাশযান ও মানুষের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এই পরিবেশ বোঝা জরুরি হয়ে ওঠে।
উপগ্রহের সাফল্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামো বদলানোও প্রয়োজন ছিল। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কাজ ছড়িয়ে থাকায় জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ ও সম্পদ ব্যবহারে জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার ১৯৫৮ সালের ২৯ জুলাই ন্যাশনাল অ্যারোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাক্টে স্বাক্ষর করেন। ১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে নাসা। এর ভিত্তি ছিল পুরোনো বিমান গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি ফর অ্যারোনটিকস বা নাকা। নাসা শূন্য থেকে তৈরি হয়নি; অভিজ্ঞ গবেষক, পরীক্ষাগার এবং বিদ্যমান প্রকল্পকে নতুন মহাকাশ লক্ষ্যে সংগঠিত করা হয়েছিল।
নাসাকে বেসামরিক সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। সামরিক বাহিনীর মহাকাশসংক্রান্ত কাজ চলতে থাকলেও প্রকাশ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও মানব মহাকাশযাত্রার কেন্দ্রীয় দায়িত্ব নাসা পায়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি গবেষণাকেন্দ্রকে একটি কর্মসূচিতে যুক্ত করার সুযোগ বাড়ে। প্রথম প্রশাসক টি. কিথ গ্লেনানের সময়ে সংস্থাটি দ্রুত নিজের দায়িত্ব বিস্তৃত করে। এই ব্যবস্থায় মহাকাশ অভিযান একটি রকেট তৈরির প্রকল্পের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে: মহাকাশযান, উৎক্ষেপণ, যোগাযোগ, চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ এবং উদ্ধারকে একসঙ্গে পরিচালনা করতে হয়।
মানুষ পাঠানোর প্রথম মার্কিন কর্মসূচির নাম ছিল প্রজেক্ট মার্কারি। লক্ষ্য ছিল একজন মানুষকে পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো, সেখানে তাঁর কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা এবং নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। ১৯৫৯ সালের এপ্রিলে সাতজন সামরিক পরীক্ষামূলক পাইলটকে প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়; তাঁরা পরিচিত হন ‘মার্কারি সেভেন’ নামে। ছোট ক্যাপসুলে একজন মহাকাশচারী থাকতেন। নিচে তাপঢাল, ফেরার জন্য বিপরীতমুখী ধাক্কা দেওয়ার রকেট এবং ওপরে জরুরি অবস্থায় ক্যাপসুল সরিয়ে নেওয়ার উদ্ধার টাওয়ার রাখা হয়। প্রতিটি ব্যবস্থাকে মানুষ বহনের উপযোগী করে পরীক্ষা করতে হয়েছিল।
প্রথম মানব অভিযানের আগে মনুষ্যবিহীন পরীক্ষা ও প্রাণী বহনকারী উড্ডয়ন চালানো হয়। ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে শিম্পাঞ্জি হ্যাম উপকক্ষপথীয় অভিযানে গিয়ে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে ফিরে আসে। তবু পরীক্ষা চলাকালে অতিরিক্ত ত্বরণ ও প্রত্যাশার চেয়ে দূরে অবতরণের মতো সমস্যা দেখা দেয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও রকেট পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যেই ১২ এপ্রিল গ্যাগারিন কক্ষপথে পৌঁছে যান। মার্কিন প্রস্তুতি চলছিল, কিন্তু মানুষকে আগে পাঠানোর প্রতিযোগিতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতিমধ্যে জিতে গিয়েছিল।
১৯৬১ সালের ৫ মে অ্যালান শেপার্ড ফ্রিডম-৭ ক্যাপসুলে মার্কারি-রেডস্টোন রকেটে যাত্রা করেন। প্রায় পনেরো মিনিটের অভিযানে তিনি প্রায় ১৮৭ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছান এবং আটলান্টিকে অবতরণ করেন। তিনি প্রথম মার্কিন মহাকাশচারী হলেও পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেননি। রেডস্টোন তাঁকে কক্ষপথে থাকার প্রয়োজনীয় অনুভূমিক বেগ দিতে পারেনি; উড্ডয়ন ছিল উপকক্ষপথীয়। তবে অভিযানে শেপার্ড হাতে ক্যাপসুলের অভিমুখ নিয়ন্ত্রণ করেন। এতে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণক্ষমতা এবং ক্যাপসুলের জীবনরক্ষা ও প্রত্যাবর্তনব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়।
শেপার্ডের অভিযান সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে বিপুল মানুষের কাছে পৌঁছায়। প্রকাশ্য উৎক্ষেপণ সফল হলে জাতীয় আত্মবিশ্বাস বাড়ত, ব্যর্থ হলে সেটিও সবার সামনে ঘটত। এই উন্মুক্ততার মধ্যে সাফল্য মার্কিন কর্মসূচিকে রাজনৈতিক সমর্থন দেয়। ২৫ মে প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি দশক শেষ হওয়ার আগে মানুষকে চাঁদে নামিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করেন। সিদ্ধান্তের পেছনে গ্যাগারিনের সাফল্যসহ বৃহত্তর স্নায়ুযুদ্ধের হিসাব ছিল। শেপার্ডের উড্ডয়ন দেখিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রও মানব মহাকাশযাত্রার প্রাথমিক ধাপ বাস্তবে সম্পন্ন করতে পারে।
কক্ষপথে পৌঁছাতে আরও শক্তিশালী অ্যাটলাস রকেট দরকার হয়। মূলত আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে তৈরি এই রকেটকে মানুষ বহনের জন্য পরিবর্তন ও পরীক্ষা করা হয়। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে শিম্পাঞ্জি ইনোসকে কক্ষপথে পাঠিয়ে ব্যবস্থা যাচাই করা হয়। এরপর ১৯৬২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জন গ্লেন ফ্রেন্ডশিপ-৭ ক্যাপসুলে যাত্রা করেন। তিনি প্রায় চার ঘণ্টা পঞ্চান্ন মিনিটে পৃথিবী তিনবার প্রদক্ষিণ করে প্রথম মার্কিন কক্ষপথযাত্রী হন। শেপার্ডের সংক্ষিপ্ত উড্ডয়নের পর গ্লেনের অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘতর কক্ষপথভিত্তিক মানব অভিযানের সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে।
গ্লেনের যাত্রায় সমস্যাও দেখা দেয়। স্বয়ংক্রিয় অভিমুখ নিয়ন্ত্রণে ত্রুটির কারণে তাঁকে হাতে নিয়ন্ত্রণ নিতে হয়। আরও উদ্বেগ তৈরি করে একটি সংকেত, যা তাপঢাল ধরে রাখার ব্যবস্থা খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা নির্দেশ করছিল। সতর্কতা হিসেবে নিয়ন্ত্রণকক্ষ প্রত্যাবর্তনের সময় রেট্রোরকেট প্যাকটি যথাসময়ের আগে বিচ্ছিন্ন না করার নির্দেশ দেয়, যাতে তার বন্ধনী তাপঢাল ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। পরে বোঝা যায়, সতর্কসংকেতটি ভুল ছিল। গ্লেন নিরাপদে আটলান্টিকে নামেন। অভিযানটি প্রযুক্তির পাশাপাশি মহাকাশচারী ও ভূমির নিয়ন্ত্রণদলের সমন্বয়ের গুরুত্বও দেখায়।
এক্সপ্লোরার-১, নাসা, শেপার্ড এবং গ্লেনের অর্জন তাই একই অগ্রগতির ভিন্ন অংশ। প্রথমটি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে সাফল্য আনে, নাসা কাজকে সংগঠিত করে, শেপার্ড মানব উড্ডয়ন পরীক্ষা করেন এবং গ্লেন কক্ষপথযাত্রার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। এরপরও চাঁদে যাওয়ার জন্য বহু দিনের অভিযান, মহাকাশে বাইরে কাজ করা এবং দুটি যানকে কাছে এনে যুক্ত করার কৌশল শেখা বাকি ছিল। মার্কারি মানুষকে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছিল; সেই মানুষকে চাঁদে পৌঁছানোর উপযোগী দক্ষতা শেখানোই হয়ে ওঠে পরবর্তী অধ্যায়ের প্রধান কাজ।
ধূমকেতুর লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে কেন? ধুলো ও গ্যাসের লেজের বিজ্ঞান
গ্রহগুলো কেন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে? মহাকর্ষ ও কক্ষপথের সহজ বিজ্ঞান
মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন? নীল গ্রহের রং, আলো ও বিস্ময়
মঙ্গল গ্রহকে লাল গ্রহ বলা হয় কেন? লাল ধুলো ও লোহার খনিজের রহস্য
অ্যাপোলো ১১-এর প্রত্যাবর্তন: চাঁদ থেকে পৃথিবীতে ফেরার ইতিহাস
চাঁদের বুকে প্রথম অভিযান: পতাকা, পাথর ও অ্যাপোলো ১১-এর বিজ্ঞান