চাঁদ জয়ের প্রতিযোগিতা: কেনেডির ঘোষণা, অ্যাপোলো ও সোভিয়েত চন্দ্রাভিযানের ইতিহাস
সিরিজ: মহাকাশ প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন
চাঁদের পথে দুই পরাশক্তির প্রযুক্তি, সংকল্প ও মর্যাদার লড়াই।
মার্কারি মানুষকে মহাকাশে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি তৈরি করেছিল; এবার সেই মানুষকে চাঁদে পৌঁছানোর উপযোগী দক্ষতা শেখানো দরকার ছিল। কিন্তু এই প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির আগেই যুক্তরাষ্ট্র একটি অসাধারণ রাজনৈতিক অঙ্গীকার করে বসে। পৃথিবীর কক্ষপথে সোভিয়েত সাফল্যের জবাব দিতে প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি এমন একটি লক্ষ্য বেছে নেন, যার জন্য কোনো দেশই তখন প্রস্তুত ছিল না। চাঁদে মানুষ নামিয়ে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার প্রতিযোগিতা মহাকাশযাত্রাকে বিচ্ছিন্ন রেকর্ডের লড়াই থেকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সক্ষমতার পরীক্ষায় পরিণত করেছিল।
১৯৬১ সালের বসন্তে কেনেডির প্রশাসন একাধিক ধাক্কার মুখে ছিল। এপ্রিল মাসে ইউরি গ্যাগারিনের প্রথম মানব মহাকাশযাত্রা সোভিয়েত প্রযুক্তিগত মর্যাদা বাড়ায়। একই মাসে কিউবার বে অব পিগস অভিযানের ব্যর্থতা মার্কিন নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কেনেডি এমন একটি মহাকাশ লক্ষ্য খুঁজছিলেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সম্পদ বিনিয়োগ করে প্রতিদ্বন্দ্বীকে অতিক্রম করতে পারে। ছোট ব্যবধানের পরবর্তী রেকর্ডে সোভিয়েতদের সুবিধা ছিল; চন্দ্রাভিযানে উভয় পক্ষকেই বিপুল নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে হতো। ফলে চাঁদ হয়ে ওঠে রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় এবং প্রযুক্তিগতভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য।
১৯৬১ সালের ২৫ মে কংগ্রেসে কেনেডি ঘোষণা করেন, দশক শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত একজন মানুষকে চাঁদে নামিয়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা। ঘোষণার প্রতিটি অংশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুধু চাঁদের কাছে পৌঁছানো বা পতাকা পাঠানো নয়, মানুষকে অবতরণ করিয়ে ফেরত আনতে হবে। আবার সময়সীমা ছিল নির্দিষ্ট। ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতায় তিনি এই লক্ষ্যকে জনসমর্থনের ভাষা দেন। চাঁদে যাওয়ার অঙ্গীকার ছিল প্রকৌশলীদের জন্য কাজের নির্দেশ, কংগ্রেসের কাছে অর্থায়নের দাবি এবং বিশ্বের সামনে মার্কিন সক্ষমতার ঘোষণা।
অ্যাপোলো কর্মসূচির ধারণা কেনেডির ঘোষণার আগেই নাসায় আলোচিত হচ্ছিল। কিন্তু ঘোষণার পর তার পরিসর ও জরুরিতা আমূল বদলে যায়। মহাকাশযান, বিশাল রকেট, উৎক্ষেপণকেন্দ্র, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণ অবকাঠামো একসঙ্গে গড়ে তুলতে হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় চার লাখ মানুষ একসময় এই প্রচেষ্টায় যুক্ত ছিলেন। নাসার প্রশাসক জেমস ওয়েবের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল এই বিপুল কর্মযজ্ঞের রাজনৈতিক সমর্থন ও সাংগঠনিক সমন্বয় ধরে রাখা। চন্দ্রাভিযান শুধু মহাকাশচারী বা রকেট নকশাকারের ব্যক্তিগত কৃতিত্বে সম্পন্ন হওয়ার প্রকল্প ছিল না।
প্রথম বড় সিদ্ধান্ত ছিল চাঁদে যাওয়ার পদ্ধতি নির্বাচন। একটি বিশাল যান সরাসরি চাঁদে নামিয়ে আবার পৃথিবীতে ফেরানো অত্যন্ত শক্তিশালী রকেট দাবি করত। পৃথিবীর কক্ষপথে একাধিক উৎক্ষেপণের অংশ জুড়ে অভিযান তৈরির বিকল্পও বিবেচিত হয়। শেষ পর্যন্ত নাসা চন্দ্রকক্ষপথে মিলনের পদ্ধতি গ্রহণ করে। এতে মূল মহাকাশযান চাঁদের চারপাশে থাকবে, ছোট একটি অবতরণযান দুজনকে পৃষ্ঠে নামাবে এবং পরে ফিরে মূল যানের সঙ্গে যুক্ত হবে। জন হুবোল্ট এই পদ্ধতির পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়েছিলেন। অপ্রয়োজনীয় ভর চাঁদের পৃষ্ঠে না নামানোই পরিকল্পনাটিকে বাস্তবসম্মত করে তোলে।
এই পরিকল্পনায় অ্যাপোলো মহাকাশযান বিশেষায়িত অংশে বিভক্ত হয়। কমান্ড মডিউলে তিনজন মহাকাশচারী উৎক্ষেপণ ও প্রত্যাবর্তনের সময় থাকতেন; সার্ভিস মডিউল বিদ্যুৎ, অক্সিজেন ও প্রধান ইঞ্জিনের সহায়তা দিত। লুনার মডিউল শুধু মহাশূন্য ও চাঁদের পরিবেশের জন্য তৈরি হওয়ায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে উড্ডয়নের উপযোগী আকৃতির প্রয়োজন ছিল না। চাঁদ থেকে ওঠার জন্য তার ওপরের অংশ নিচের অবতরণ অংশ ছেড়ে যাত্রা করত। এই বিভাজন ভর কমালেও মিলন, সংযোগ এবং মহাকাশচারীদের স্থানান্তরকে অভিযানের অপরিহার্য ধাপে পরিণত করে।
সবকিছু উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি হয় স্যাটার্ন-৫। প্রায় ১১১ মিটার উঁচু তিন ধাপের রকেটটির প্রথম ধাপে পাঁচটি এফ-১ ইঞ্জিন কাজ করত। ওপরের ধাপগুলোতে তরল হাইড্রোজেন ও তরল অক্সিজেনচালিত ইঞ্জিন ব্যবহৃত হয়। ভের্নার ফন ব্রাউনের নেতৃত্বাধীন মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এর উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। তবে শক্তি বাড়ানোই যথেষ্ট ছিল না; জ্বালানির প্রবাহ, দহনস্থিতিশীলতা, কম্পন এবং ধাপ বিচ্ছিন্ন করার নির্ভরযোগ্যতাও নিশ্চিত করতে হয়। একটি অংশের ত্রুটি পুরো অভিযানের ব্যর্থতা ঘটাতে পারত।
এই প্রস্তুতির মাঝখানে জেমিনি কর্মসূচি কার্যত প্রশিক্ষণসেতুর কাজ করে। ১৯৬৫–১৯৬৬ সালের অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকা, মহাকাশযানের বাইরে কাজ করা এবং পৃথক যানকে কাছে এনে যুক্ত করার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। কক্ষপথে দুটি যানকে মিলিয়ে দেওয়া সাধারণভাবে একটির পেছনে অন্যটি চালানোর মতো নয়; গতি বদলালে কক্ষপথ ও প্রদক্ষিণকালও বদলে যায়। মহাকাশচারী ও নিয়ন্ত্রণদলকে সেই সম্পর্ক আয়ত্ত করতে হয়। চাঁদের কাছে লুনার মডিউলকে মূল যানে ফিরিয়ে আনার জন্য এই দক্ষতা অপরিহার্য ছিল।
অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নও চাঁদের পথে এগোচ্ছিল, তবে সব অভিযান একই ধরনের ছিল না। রোবোটিক লুনা কর্মসূচি আগেই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছিল। ১৯৫৯ সালে লুনা-২ প্রথম মানবনির্মিত বস্তু হিসেবে চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছায় এবং লুনা-৩ চাঁদের অদৃশ্য পিঠের ছবি পাঠায়। ১৯৬৬ সালে লুনা-৯ প্রথম সফল কোমল অবতরণ করে; লুনা-১০ চাঁদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ হয়। এসব সাফল্য প্রমাণ করে, মানব চন্দ্রাভিযানের প্রতিযোগিতা চললেও রোবোটিক অনুসন্ধানে সোভিয়েতদের শক্তিশালী সক্ষমতা ছিল।
সোভিয়েত মানব চন্দ্রকর্মসূচিতে চাঁদ ঘুরে আসা এবং চাঁদে অবতরণের জন্য পৃথক পরিকল্পনা ছিল। প্রোটন রকেট ও এল-১ মহাকাশযানভিত্তিক কর্মসূচি মানুষকে চাঁদের চারপাশ ঘুরিয়ে ফেরানোর উদ্দেশ্যে তৈরি হয়; এর পরীক্ষাগুলো জোন্ড নামে পরিচিত। অবতরণের জন্য এন-১ রকেট ও এল-৩ ব্যবস্থায় চন্দ্রকক্ষপথযান এবং ছোট এলকে অবতরণযান পরিকল্পিত হয়। এতে একজন মহাকাশচারীর চাঁদে নামার কথা ছিল। কিন্তু নকশা সংস্থাগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পরিবর্তনশীল অনুমোদন ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা কর্মসূচির সমন্বয় কঠিন করে তোলে।
১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে সের্গেই কোরোলিয়ভের মৃত্যু সোভিয়েত প্রচেষ্টার জন্য বড় ক্ষতি ছিল। তাঁর উত্তরসূরি ভাসিলি মিশিনকে অসমাপ্ত প্রযুক্তি ও কঠোর সময়চাপ সামলাতে হয়। এন-১-এর প্রথম ধাপে ত্রিশটি ইঞ্জিনের সমন্বিত পরিচালনা অত্যন্ত জটিল ছিল; পূর্ণ প্রথম ধাপকে একসঙ্গে মাটিতে চালিয়ে পরীক্ষার ব্যবস্থাও ছিল না। ১৯৬৯ সালে এর প্রথম দুটি উৎক্ষেপণই ব্যর্থ হয়, দ্বিতীয়টি উৎক্ষেপণস্থলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটায়। তবে সমস্যার কারণ শুধু ইঞ্জিনের সংখ্যা ছিল না; পরীক্ষার ঘাটতি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও সামগ্রিক প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা একসঙ্গে কাজ করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রও বিপর্যয় এড়িয়ে এগোয়নি। ১৯৬৭ সালের ২৭ জানুয়ারি ভূমিতে পরীক্ষার সময় অ্যাপোলো-১ ক্যাপসুলে আগুন লেগে গাস গ্রিসম, এড হোয়াইট ও রজার চ্যাফি মারা যান। উচ্চচাপের বিশুদ্ধ অক্সিজেন পরিবেশ, দাহ্য উপকরণ এবং দ্রুত বের হতে না পারার সমস্যা দুর্ঘটনাকে প্রাণঘাতী করে। এরপর নকশা ও পরীক্ষাপদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৬৮ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো-৮ মানুষ নিয়ে প্রথম চাঁদ প্রদক্ষিণ করে। এই সাফল্য দেখায়, চন্দ্রযাত্রার নেভিগেশন, যোগাযোগ এবং উচ্চগতির প্রত্যাবর্তন বাস্তবে সম্ভব।
দশকের শেষ প্রান্তে এসে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বদলে যায়। সোভিয়েতদের রোবোটিক অর্জন অব্যাহত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র বিশাল রকেট, মানব মহাকাশযান এবং অভিযানের ধাপগুলো কার্যকরভাবে একত্র করেছিল। কেনেডির ঘোষণা একটি রাজনৈতিক লক্ষ্যকে নির্দিষ্ট প্রকৌশল সমস্যায় ভাগ করার শক্তি দিয়েছিল, যদিও তিনি নিজে ফল দেখে যেতে পারেননি। এখন বাকি ছিল সবচেয়ে নাটকীয় পরীক্ষা: চন্দ্রকক্ষপথ ছেড়ে ছোট একটি যান নামবে অজানা পৃষ্ঠে, তারপর সেখান থেকে আবার উঠে আসবে। অ্যাপোলো-১১-এ সেই পরিকল্পনাই বাস্তবের মুখোমুখি হতে যাচ্ছিল।
লাইকা থেকে ইউরি গ্যাগারিন: পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথম প্রাণী ও প্রথম মানুষের সোভিয়েত অভিযান
স্পুটনিক-১: ১৯৫৭ সালে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে যেভাবে বিশ্বকে চমকে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন
মহাকাশ প্রতিযোগিতার সূচনা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের লড়াই
মহাবিশ্ব কোথায় প্রসারিত হচ্ছে? স্থান, সীমানা ও মহাবিস্ফোরণের সহজ ব্যাখ্যা
ধূমকেতুর লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে কেন? ধুলো ও গ্যাসের লেজের বিজ্ঞান