লাইকা থেকে ইউরি গ্যাগারিন: পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথম প্রাণী ও প্রথম মানুষের সোভিয়েত অভিযান
সিরিজ: মহাকাশ প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন
লাইকার একমুখী যাত্রা থেকে গ্যাগারিনের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন।
স্পুটনিক-১ পৃথিবীর বাইরে যন্ত্র পাঠানোর পথ খুলেছিল; এবার প্রশ্ন ছিল, সেই পথে জীবন্ত শরীর টিকে থাকতে পারবে কি না। উৎক্ষেপণের প্রচণ্ড কম্পন, ত্বরণ, ওজনহীনতা এবং বদ্ধ কেবিনের পরিবেশে প্রাণীর শ্বাসপ্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন কীভাবে কাজ করবে, তা নিশ্চিতভাবে জানা ছিল না। মানুষের মহাকাশযাত্রার আগে তাই জীবন্ত প্রাণীর ওপর পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দ্রুত আরেকটি সাফল্য দেখানোর রাজনৈতিক চাপ। লাইকা থেকে ইউরি গ্যাগারিনের যাত্রাপথ ছিল জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তির অগ্রগতি, পরীক্ষামূলক ব্যর্থতা এবং প্রাণী ব্যবহারের কঠিন নৈতিক প্রশ্নে পরিপূর্ণ।
এখানে একটি পার্থক্য পরিষ্কার করা জরুরি। লাইকা মহাকাশে যাওয়া প্রথম প্রাণী ছিল না। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্র ফলের মাছি ও বানর এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন কুকুরকে উপকক্ষপথীয় অভিযানে পাঠিয়েছিল। এসব রকেট মহাকাশের উচ্চতায় পৌঁছে আবার নেমে আসত, পৃথিবী প্রদক্ষিণ করত না। লাইকার স্বতন্ত্র পরিচয় হলো, সে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছানো প্রথম প্রাণী। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কয়েক মিনিটের উড্ডয়নের তুলনায় কক্ষপথে অবস্থানে দীর্ঘ সময়ের জীবনরক্ষা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সমস্যা অনেক বড় হয়ে দাঁড়ায়।
স্পুটনিক-১-এর সাফল্যের পর সোভিয়েত নেতৃত্ব নভেম্বর বিপ্লবের চল্লিশতম বার্ষিকীর সময় আরেকটি অর্জন প্রদর্শন করতে চেয়েছিল। অতি অল্প সময়ে প্রস্তুত করা হয় স্পুটনিক-২। ১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর উৎক্ষেপিত প্রায় ৫০৮ কিলোগ্রাম ওজনের এই মহাকাশযানে ছিল প্রাণী রাখার কেবিন, অক্সিজেন সরবরাহ, কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণের ব্যবস্থা এবং শারীরবৃত্তীয় তথ্য পাঠানোর সরঞ্জাম। এটি স্পুটনিক-১-এর চেয়ে অনেক ভারী ও জটিল ছিল। তবে একটি মৌলিক ব্যবস্থা অনুপস্থিত ছিল: লাইকাকে জীবিত পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার কোনো প্রযুক্তি এই অভিযানে রাখা হয়নি।
লাইকা ছিল মস্কোর রাস্তা থেকে সংগ্রহ করা একটি ছোট মাদি কুকুর। সোভিয়েত গবেষকেরা ধারণা করতেন, পথের কুকুর প্রতিকূল পরিবেশে অভ্যস্ত হওয়ায় পরীক্ষার চাপ তুলনামূলক ভালোভাবে সহ্য করতে পারবে। সংকীর্ণ কেবিনে থাকার প্রশিক্ষণ, রকেটের শব্দ ও কম্পনের অনুকরণ এবং ঘূর্ণনযন্ত্রে ত্বরণের পরীক্ষা চালানো হয়। মাদি কুকুর নির্বাচনের একটি ব্যবহারিক কারণ ছিল বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা তুলনামূলক সহজ করা। লাইকার শরীরে হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস পর্যবেক্ষণের সেন্সর লাগানো হয়। খাবার দেওয়া হয় বিশেষ ধরনের জেল আকারে।
উৎক্ষেপণের সময় লাইকার হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত বেড়ে যায়। কক্ষপথে পৌঁছানোর পর কিছু শারীরবৃত্তীয় সূচক স্থিতিশীল হতে শুরু করেছিল, যা দেখায় জীবন্ত প্রাণী ওজনহীন অবস্থায় অন্তত প্রাথমিকভাবে টিকে থাকতে পারে। কিন্তু কেবিনের তাপ নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশামতো কাজ করেনি। তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়তে থাকে এবং লাইকা উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অতিরিক্ত তাপ ও শারীরিক চাপের কারণে মারা যায়। দীর্ঘ সময় সোভিয়েত বিবরণে তার মৃত্যুর প্রকৃত সময় ও কারণ স্পষ্ট করা হয়নি; পরবর্তী প্রকাশিত তথ্য এই দুঃখজনক বাস্তবতা সামনে আনে।
লাইকার অভিযান জীববৈজ্ঞানিক তথ্য দিলেও মানুষের মহাকাশযাত্রার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করেনি। একজন মানুষকে পাঠাতে হলে শুধু কক্ষপথে বাঁচিয়ে রাখা যথেষ্ট ছিল না; নির্ধারিত সময়ে গতি কমিয়ে বায়ুমণ্ডলে ফেরানো এবং অবতরণের সময় রক্ষা করতে হতো। ফেরার পথে মহাকাশযানের বিপুল গতিশক্তি তাপে রূপান্তরিত হয়। তাই প্রয়োজন তাপঢাল, সঠিক অভিমুখ, নির্ভরযোগ্য ব্রেকিং রকেট এবং প্যারাশুট। মহাকাশে পৌঁছানোর প্রযুক্তির পাশাপাশি মহাকাশ থেকে ফিরে আসার প্রযুক্তি তৈরি করাই হয়ে ওঠে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
এই প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য আসে ১৯৬০ সালের ১৯ আগস্ট। বেলকা ও স্ত্রেলকা নামের দুটি কুকুরকে অন্য জীববৈজ্ঞানিক নমুনাসহ একটি পরীক্ষামূলক মহাকাশযানে পাঠানো হয়। প্রায় এক দিন কক্ষপথে কাটিয়ে তারা নিরাপদে ফিরে আসে। ভস্তক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত এই অভিযান দেখায়, উপযুক্ত কেবিনে প্রাণীকে বাঁচিয়ে রেখে অবতরণ ক্যাপসুল পৃথিবীতে ফেরানো সম্ভব। তবে সব পরীক্ষা সফল হয়নি। প্রাণী বহনকারী অন্য অভিযানে রকেট বিস্ফোরণ, নিয়ন্ত্রণের ত্রুটি ও প্রত্যাবর্তনের ব্যর্থতাও ঘটেছে। ফলে সাফল্যের প্রতিটি ধাপের পেছনে ছিল সংশোধন এবং প্রাণহানির অভিজ্ঞতা।
মানুষ বহনের জন্য তৈরি ভস্তক মহাকাশযানে দুটি প্রধান অংশ ছিল: গোলাকার অবতরণ ক্যাপসুল এবং যন্ত্রপাতি ও রকেটব্যবস্থা বহনকারী মডিউল। ক্যাপসুলে চাপযুক্ত পরিবেশ, অক্সিজেন, যোগাযোগ এবং স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়। ওজনহীনতায় মানুষের বিচারবুদ্ধি ও কাজ করার ক্ষমতা কেমন থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় প্রথম অভিযান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনার ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রয়োজনে হাতে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ব্যবস্থাও ছিল। ভস্তকের লক্ষ্য ছিল একজন মানুষকে কক্ষপথে নিয়ে যাওয়া, তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং তাঁকে জীবিত ফিরিয়ে আনা।
এই অভিযানের জন্য ১৯৬০ সালে সোভিয়েত বিমানবাহিনীর তরুণ পাইলটদের মধ্য থেকে প্রথম মহাকাশচারী দল নির্বাচন করা হয়। চিকিৎসা পরীক্ষা, বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকার অনুশীলন, ত্বরণ সহ্য করার প্রশিক্ষণ এবং প্যারাশুট ব্যবহারের প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত কঠোর। ইউরি আলেক্সেইয়েভিচ গ্যাগারিনের শারীরিক গঠন ছোট কেবিনের উপযোগী ছিল; পাশাপাশি তাঁর মানসিক স্থিরতা, শেখার ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্বও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়। গেরমান তিতভ ছিলেন বিকল্প মহাকাশচারী। গ্যাগারিন তখন সাতাশ বছরের সামরিক পাইলট, যাঁর ওপর এক অভূতপূর্ব পরীক্ষার দায়িত্ব পড়তে চলেছিল।
১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল বাইকোনুর থেকে ভস্তক-১ উৎক্ষেপিত হয়। মস্কোর সময় সকাল ৯টা ৭ মিনিটে রকেট যাত্রা শুরু করলে গ্যাগারিনের উচ্চারিত ‘পোয়েখালি’—অর্থাৎ ‘চলো যাই’—পরবর্তী সময়ে ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে। উৎক্ষেপণ সফল হওয়ার পর তিনি পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছান। কেবিন থেকে নিজের অবস্থা ও পর্যবেক্ষণ জানান এবং ওজনহীন অবস্থায় সচেতনভাবে কাজ করতে পারেন। ইউরি গ্যাগারিন একই সঙ্গে মহাকাশে যাওয়া প্রথম মানুষ এবং পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছানো প্রথম মানুষ হন। মানুষের মহাকাশযাত্রা সেদিন পরীক্ষাগারের সম্ভাবনা থেকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।
তবে যাত্রাটি সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ছিল না। মহাকাশযান পরিকল্পনার চেয়ে উঁচু কক্ষপথে পৌঁছায়, যা ব্রেকিং ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে দীর্ঘ সময় আটকে পড়ার ঝুঁকি বাড়াত। প্রত্যাবর্তনের সময় ব্রেকিং রকেট কাজ করলেও অবতরণ ক্যাপসুল ও যন্ত্রপাতির মডিউল প্রথমে পুরোপুরি আলাদা হয়নি। সংযোগ রয়ে যাওয়ায় মহাকাশযান অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঘুরতে থাকে। পরে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের প্রক্রিয়ায় অবশিষ্ট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় এবং ক্যাপসুল যথাযথভাবে নামতে পারে। এসব ঘটনা দেখায়, ঐতিহাসিক সাফল্যের মধ্যেও প্রকৌশলগত বিপদের পরিমাণ কতটা ছিল।
ভস্তকের অবতরণব্যবস্থায় মহাকাশচারীর ক্যাপসুলের ভেতর বসে মাটিতে নামার পরিকল্পনা ছিল না। প্রায় সাত কিলোমিটার উচ্চতায় গ্যাগারিন ইজেকশন আসনের সাহায্যে বেরিয়ে আসেন এবং নিজের প্যারাশুটে অবতরণ করেন; ক্যাপসুলও আলাদাভাবে নামে। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সারাতভ অঞ্চলে পৃথিবীতে ফেরেন। অভিযানের প্রচলিত মোট সময় প্রায় ১০৮ মিনিট। প্রথম দিকে তাঁর আলাদাভাবে প্যারাশুটে নামার তথ্য জনসমক্ষে স্পষ্ট করা হয়নি। গ্যাগারিনকে নিরাপদে ফেরানো সম্ভব হয়েছিল মহাকাশযানের তাপঢাল, ব্রেকিং ব্যবস্থা এবং প্যারাশুটের সম্মিলিত কার্যকারিতায়।
এই সাফল্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিপুল আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ায়। কিন্তু লাইকা ও গ্যাগারিনের ইতিহাস পাশাপাশি রাখলে অগ্রগতির মূল্যও স্পষ্ট হয়। লাইকার জন্য ফেরার পথ রাখা হয়নি; চার বছরেরও কম সময় পরে একজন মানুষের প্রত্যাবর্তন অভিযানের অপরিহার্য শর্ত হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন, মানুষ কক্ষপথে সচেতন থাকতে এবং পৃথিবীতে ফিরতে পারে। এখন যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের সক্ষমতা দেখাতে হতো। গ্যাগারিনের একবারের পৃথিবী প্রদক্ষিণের পর প্রতিযোগিতার প্রশ্ন বদলে যায়: মহাকাশে কে আগে যাবে থেকে, পরবর্তী বড় লক্ষ্য কে আগে অর্জন করবে।
ধূমকেতুর লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে কেন? ধুলো ও গ্যাসের লেজের বিজ্ঞান
গ্রহগুলো কেন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে? মহাকর্ষ ও কক্ষপথের সহজ বিজ্ঞান
মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন? নীল গ্রহের রং, আলো ও বিস্ময়
মঙ্গল গ্রহকে লাল গ্রহ বলা হয় কেন? লাল ধুলো ও লোহার খনিজের রহস্য
অ্যাপোলো ১১-এর প্রত্যাবর্তন: চাঁদ থেকে পৃথিবীতে ফেরার ইতিহাস
চাঁদের বুকে প্রথম অভিযান: পতাকা, পাথর ও অ্যাপোলো ১১-এর বিজ্ঞান