মহাকাশ প্রতিযোগিতার সূচনা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের লড়াই
সিরিজ: মহাকাশ প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন
যুদ্ধের রকেট থেকেই মহাকাশ প্রতিযোগিতার যাত্রা।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা থামেনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের ওপর দিয়ে তখন নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছিল, যার কেন্দ্রে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করার সময় তারা মিত্র ছিল; কিন্তু যুদ্ধোত্তর নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তাদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। এই বিরোধ ক্রমে এমন এক প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়, যেখানে পরীক্ষাগার, ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি এবং পৃথিবীর বাইরের আকাশও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মহাকাশ প্রতিযোগিতার জন্ম শুধু অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে হয়নি; এর পেছনে ছিল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা এবং নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের তাগিদ।
এই ইতিহাসের প্রযুক্তিগত শিকড় ছিল জার্মানির ভি-২ রকেটে। ভের্নার ফন ব্রাউনের নেতৃত্বাধীন দলের তৈরি এই তরল জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ১৯৪৪ সাল থেকে লন্ডন ও অ্যান্টওয়ার্পসহ বিভিন্ন শহরে হামলায় ব্যবহৃত হয়। উৎক্ষেপণের পর এটি বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরে উঠে আবার লক্ষ্যবস্তুর দিকে নেমে আসত। তৎকালীন প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় একে ঠেকানো অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নাৎসি শাসনের ভয়াবহ অপরাধ: ভূগর্ভস্থ কারখানায় বন্দি শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে কাজ করানো হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ মারা যান। মহাকাশযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ধ্বংস ও নিপীড়নের এই ব্যবস্থার মধ্যে।
জার্মানির পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী শক্তিগুলো রকেট, যন্ত্রাংশ, গবেষণাপত্র ও বিশেষজ্ঞ সংগ্রহে নেমে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশন পেপারক্লিপের মাধ্যমে ফন ব্রাউনসহ বহু জার্মান বিশেষজ্ঞকে আমেরিকায় নেওয়া হয়। সোভিয়েতরাও নিজেদের দখলকৃত অঞ্চলের স্থাপনা ও নথি পরীক্ষা করে এবং জার্মান প্রকৌশলীদের কাজে লাগায়; ১৯৪৬ সালে বহু বিশেষজ্ঞ ও তাঁদের পরিবারকে সোভিয়েত ইউনিয়নে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সাফল্য কেবল জার্মান প্রযুক্তি দখলের ফল ছিল না। উভয় দেশের নিজস্ব গবেষণা, শিল্পক্ষমতা এবং প্রকৌশলীদের নতুন সমাধান উদ্ভাবনের সামর্থ্যই শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হয়ে ওঠে।
এরপর পারমাণবিক অস্ত্র রকেট গবেষণাকে নতুন গুরুত্ব দেয়। ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে; ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নও পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। প্রথমদিকে এসব অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল বোমারু বিমান। কিন্তু বিমানকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো এবং শত্রুর প্রতিরক্ষার মুখোমুখি হতে হতো। সামরিক পরিকল্পনাবিদদের কাছে তাই দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। যে রকেট এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পারমাণবিক অস্ত্র বহন করতে পারে, তার প্রযুক্তি পরিবর্তন করে উপগ্রহও উৎক্ষেপণ করা সম্ভব—এই সংযোগ মহাকাশ প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে ছিল।
তবে উপগ্রহ পাঠানো আর ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া এক কাজ নয়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একটি বাঁকানো পথে উঠে নির্দিষ্ট অঞ্চলে ফিরে আসে; উপগ্রহকে এমন উচ্চতা ও অনুভূমিক বেগ দিতে হয়, যাতে সেটি পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে থাকে। নিম্ন কক্ষপথে এই বেগ প্রায় সেকেন্ডে ৭.৮ কিলোমিটার। এর জন্য নির্ভরযোগ্য ইঞ্জিন, ধাপে ধাপে রকেটের অংশ বিচ্ছিন্ন করা, নির্ভুল দিকনিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক সময়ে ইঞ্জিন বন্ধ করার ব্যবস্থা দরকার। সামরিক অর্থায়নে গড়ে ওঠা গবেষণা এসব সমস্যার সমাধানকে ত্বরান্বিত করে। ফলে মহাকাশে যাওয়ার স্বপ্ন প্রথমবারের মতো বাস্তব রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়।
দুই পরাশক্তির সামরিক অবস্থানের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী দূরপাল্লার বোমারু বিমান এবং সোভিয়েত ভূখণ্ডের তুলনামূলক কাছাকাছি মিত্রদেশে ঘাঁটি ছিল। সোভিয়েত নেতৃত্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত করার জন্য আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষ মূল্য বহন করত। তাদের প্রাথমিক তাপপারমাণবিক অস্ত্রের ওজনও শক্তিশালী রকেটের প্রয়োজন বাড়ায়। এই প্রেক্ষাপটে তৈরি হয় আর-৭ ক্ষেপণাস্ত্র। সামরিক অস্ত্র হিসেবে এর প্রস্তুতি ও পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা থাকলেও ভারী বস্তু ওপরে তোলার ক্ষমতা মহাকাশ অভিযানে অসাধারণ সুবিধা এনে দেয়।
সোভিয়েত কর্মসূচির প্রধান সংগঠক ছিলেন সের্গেই কোরোলিয়ভ। রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার কারণে তখন জনসাধারণ তাঁর পরিচয় জানত না; তিনি পরিচিত ছিলেন প্রধান নকশাকার হিসেবে। স্তালিনের দমননীতিতে কারাবরণ করা এই প্রকৌশলী পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত রকেট কর্মসূচির কেন্দ্রে উঠে আসেন। তাঁর কাছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ এবং মহাকাশযাত্রার আকাঙ্ক্ষা পাশাপাশি চলেছিল। সামরিক প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত অবকাঠামো ব্যবহার করে তিনি উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সুযোগ তৈরি করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেখানে কৌশলগত শক্তি দেখছিল, কোরোলিয়ভ সেখানে পৃথিবীর বাইরে পৌঁছানোর বাস্তব পথও দেখছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা এগোচ্ছিল একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর নিজস্ব অগ্রাধিকার ও প্রকল্প ছিল। ফন ব্রাউনের দল সেনাবাহিনীর অধীনে রকেট তৈরি করছিল, অন্যদিকে নৌবাহিনীর গবেষণাগার উপগ্রহ প্রকল্পে কাজ করছিল। এই বৈচিত্র্য গবেষণার সুযোগ বাড়ালেও সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করে। তখনো নাসা প্রতিষ্ঠিত হয়নি; সেটি গঠিত হয় ১৯৫৮ সালে। ফলে মহাকাশ প্রতিযোগিতার প্রাথমিক পর্যায়কে পরবর্তী নাসাকেন্দ্রিক মার্কিন অভিযানের সঙ্গে এক করে দেখলে সেই সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা আড়াল হয়ে যায়।
সামরিক প্রয়োজনের পাশাপাশি বিজ্ঞানও একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা খুলে দেয়। ১৯৫৭–১৯৫৮ সালের আন্তর্জাতিক ভূ-পদার্থবিজ্ঞান বর্ষে বিভিন্ন দেশ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, মেরু অঞ্চল, সৌরক্রিয়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনা নিয়ে সমন্বিত গবেষণার প্রস্তুতি নেয়। কৃত্রিম উপগ্রহকে এই উদ্যোগের অংশ করার সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৫৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এতে মহাকাশ প্রকল্প জনসমক্ষে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ভাষা পায়। কিন্তু একই উপগ্রহ একটি দেশের রকেটের সক্ষমতার দৃশ্যমান প্রমাণও হতে পারত। বিজ্ঞান ও শক্তিপ্রদর্শন তাই একই উৎক্ষেপণে একত্র হয়।
মার্কিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক ভূ-পদার্থবিজ্ঞান বর্ষের উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য ভ্যানগার্ড প্রকল্প বেছে নেয়। নৌবাহিনীর গবেষণাগারের নেতৃত্বে পরিচালিত এই প্রকল্পকে বৈজ্ঞানিক চরিত্র দেওয়া সম্ভব ছিল। পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রশ্নও ছিল: পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী উপগ্রহ অন্য দেশের ওপর দিয়ে গেলে সেটিকে কীভাবে দেখা হবে? ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণ উপগ্রহের জন্য মহাকাশে অবাধ চলাচলের গ্রহণযোগ্যতা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ছিল। তবে এই ভাবনা থেকে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ভুল যে ওয়াশিংটন সোভিয়েতদের সব সাফল্যকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল। মর্যাদা ও নিরাপত্তার রাজনৈতিক হিসাব ছিল অনেক বেশি জটিল।
এই মর্যাদার প্রশ্ন স্নায়ুযুদ্ধে বিশেষ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরত; সোভিয়েত নেতৃত্ব সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা, গণশিক্ষা ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাইত। মহাকাশে প্রথম সাফল্য এমন একটি অর্জন, যা ভাষা বা সীমান্ত ছাড়িয়ে মানুষ বুঝতে পারে। সদ্য স্বাধীন এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর কাছেও প্রযুক্তিগত সাফল্য উন্নয়নের একটি শক্তিশালী বিজ্ঞাপন ছিল। একটি উপগ্রহ তাই শুধু বৈজ্ঞানিক যন্ত্র ছিল না; সেটি কোন রাষ্ট্র ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম, সেই দাবিরও বাহক হয়ে উঠেছিল।
সোভিয়েত কর্মসূচিতে প্রথমে তুলনামূলক ভারী বৈজ্ঞানিক উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু যন্ত্রপাতি তৈরিতে বিলম্ব হওয়ায় কোরোলিয়ভ একটি সহজতর উপগ্রহ আগে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। এর মূল কাজ হবে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা এবং বেতারসংকেত পাঠানো। এই সিদ্ধান্তে বোঝা যায়, প্রতিযোগিতায় বৈজ্ঞানিক জটিলতার পাশাপাশি সময়ও কত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ১৯৫৭ সালের আগস্টে আর-৭-এর সফল দূরপাল্লার পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পথ খুলে দেয়। এখন প্রশ্ন শুধু রকেট কাজ করবে কি না ছিল না; প্রশ্ন ছিল, কে আগে মহাকাশে পৌঁছে পৃথিবীকে তা জানাবে।
অবশেষে ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণ করে। প্রায় ৮৩.৬ কিলোগ্রাম ওজনের ছোট ধাতব গোলকটি পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ হয়। এর বেতারসংকেত একটি নতুন বাস্তবতার ঘোষণা দেয়: মানুষের তৈরি যন্ত্র এখন পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। যে প্রতিযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল যুদ্ধের রকেট, পারমাণবিক নিরাপত্তা ও মতাদর্শিক বিরোধে, তা সেদিন প্রকাশ্য মহাকাশ প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। কিন্তু স্পুটনিকের তাৎপর্য তার আকারের চেয়ে বহুগুণ বড় ছিল। সোভিয়েত সাফল্যের সেই বিপ-বিপ শব্দ যুক্তরাষ্ট্রে কেন এত গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল—মহাকাশ প্রতিযোগিতার পরবর্তী অধ্যায় শুরু হয় সেই প্রশ্ন থেকেই।
ধূমকেতুর লেজ সূর্যের বিপরীত দিকে থাকে কেন? ধুলো ও গ্যাসের লেজের বিজ্ঞান
গ্রহগুলো কেন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে? মহাকর্ষ ও কক্ষপথের সহজ বিজ্ঞান
মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন? নীল গ্রহের রং, আলো ও বিস্ময়
মঙ্গল গ্রহকে লাল গ্রহ বলা হয় কেন? লাল ধুলো ও লোহার খনিজের রহস্য
অ্যাপোলো ১১-এর প্রত্যাবর্তন: চাঁদ থেকে পৃথিবীতে ফেরার ইতিহাস
চাঁদের বুকে প্রথম অভিযান: পতাকা, পাথর ও অ্যাপোলো ১১-এর বিজ্ঞান