চাঁদ জয়ের পর মহাকাশ প্রতিযোগিতা: স্যালিউট… | এসো-জানি

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চাঁদ জয়ের পর মহাকাশ প্রতিযোগিতা: স্যালিউট, স্কাইল্যাব ও অ্যাপোলো-সয়ুজের নতুন যুগ

সিরিজ: মহাকাশ প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন

চাঁদ জয়ের পর মহাকাশ প্রতিযোগিতা: স্যালিউট, স্কাইল্যাব ও অ্যাপোলো-সয়ুজের নতুন যুগ
চাঁদ জয়ের প্রতিযোগিতা থেকে কক্ষপথে বসবাস ও সহযোগিতার যাত্রা।

চাঁদের প্রথম পদচিহ্ন মহাকাশ প্রতিযোগিতার সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় সম্পূর্ণ করেছিল, কিন্তু অনুসন্ধান ও দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের ইতিহাস তখনো সামনে পড়ে ছিল। অ্যাপোলো ১১-এর পর প্রশ্ন উঠল, পরবর্তী বড় লক্ষ্য কী হবে? প্রতিবার কয়েক দিনের জন্য মানুষ পাঠানোর পরিবর্তে মহাকাশে দীর্ঘ সময় কাজ করা সম্ভব কি না, তা ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে চন্দ্রাভিযানের বিপুল ব্যয় রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা কঠিন করছিল। মহাকাশে কে আগে পৌঁছাবে—এই প্রশ্নের পাশে এবার দাঁড়াল, সেখানে মানুষ কত দিন থাকবে এবং কী কাজে সেই উপস্থিতি ব্যবহার করবে।

চন্দ্রাভিযান অবশ্য ১৯৬৯ সালেই শেষ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র আরও কয়েকটি অ্যাপোলো অভিযান চালায়; ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে অ্যাপোলো ১৭ ছিল শেষ মানব চন্দ্রাভিযান। কিন্তু বাজেটের চাপ এবং অগ্রাধিকারের পরিবর্তনে পরিকল্পিত কিছু অভিযান বাতিল হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষ নামানোর কর্মসূচিও সফল হয়নি। এন-১ রকেটের ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্যে সোভিয়েত নেতৃত্ব কক্ষপথে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। মহাকাশ স্টেশন এমন একটি লক্ষ্য ছিল, যেখানে চাঁদে আগে নামার মার্কিন সাফল্যের বাইরেও স্বতন্ত্র অর্জন সম্ভব।

মহাকাশ স্টেশন সাধারণ যাত্রীবাহী মহাকাশযানের চেয়ে আলাদা। এতে দীর্ঘদিন থাকার জায়গা, বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ এবং জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা রাখা যায়। মানুষ বহনকারী ছোট যান সেখানে পৌঁছে যুক্ত হতে পারে এবং পরে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারে। ফলে প্রতিবার পুরো গবেষণাগার উৎক্ষেপণের প্রয়োজন হয় না। তবে দীর্ঘ বসবাস নতুন সমস্যা আনে: পেশি দুর্বল হওয়া, হাড়ের খনিজ ক্ষয়, যন্ত্রের নির্ভরযোগ্যতা এবং বদ্ধ পরিবেশে মানসিক চাপ। মহাকাশ স্টেশন মানুষের সহনশীলতার পাশাপাশি মহাকাশে নিয়মিত কাজ করার ব্যবস্থাকেও পরীক্ষা করত।

১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল সোভিয়েত ইউনিয়ন উৎক্ষেপণ করে স্যালিউট-১, পৃথিবীর প্রথম মহাকাশ স্টেশন। প্রোটন রকেটে পাঠানো এই গবেষণাগারে পৌঁছাতে সয়ুজ মহাকাশযান ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। প্রথম প্রচেষ্টায় সয়ুজ-১০ স্টেশনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করলেও এমন নিরাপদ সংযোগ তৈরি করতে পারেনি, যার মধ্য দিয়ে মহাকাশচারীরা ভেতরে ঢুকবেন। ফলে দলটিকে ফিরে আসতে হয়। এই ব্যর্থতা দেখায়, দুটি যানকে কাছে আনা এবং মানুষের যাতায়াতযোগ্য নির্ভরযোগ্য সংযোগ তৈরি করা এক বিষয় নয়।

জুন মাসে সয়ুজ-১১-এর গেওর্গি দোব্রোভোলস্কি, ভ্লাদিস্লাভ ভলকভ ও ভিক্টর পাতসায়েভ স্যালিউট-১-এ প্রবেশ করেন। প্রায় তেইশ দিন স্টেশনে থেকে তাঁরা বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও মানুষের ওপর দীর্ঘ মহাকাশবাসের প্রভাব পরীক্ষা করেন। কিন্তু ফেরার সময় বিপর্যয় ঘটে। মহাকাশযানের অংশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর্যায়ে একটি বায়ু চলাচলের ভালভ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে খুলে গেলে কেবিনের চাপ দ্রুত কমে যায়। তিনজন তখন চাপরোধী পোশাক পরা ছিলেন না। ক্যাপসুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবতরণ করলেও উদ্ধারকারীরা তাঁদের মৃত অবস্থায় পান। প্রথম মহাকাশ স্টেশনে সফল বসবাস শেষ হয়েছিল ভয়াবহ প্রাণহানিতে।

এই দুর্ঘটনার পর সয়ুজের নিরাপত্তাব্যবস্থা সংশোধন করা হয় এবং উৎক্ষেপণ ও প্রত্যাবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে চাপরোধী পোশাক ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়। পরবর্তী স্যালিউট কর্মসূচিও ছিল সাফল্য ও ব্যর্থতার মিশ্র ইতিহাস। সব স্টেশনের উদ্দেশ্য একই ছিল না; কিছু ছিল বেসামরিক গবেষণার জন্য, আবার স্যালিউট নামের আড়ালে সামরিক আলমাজ স্টেশনও পরিচালিত হয়। পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তি পরীক্ষা এবং সামরিক নজরদারি পাশাপাশি চলছিল। তাই মহাকাশ স্টেশনের যুগকে কেবল শান্তিপূর্ণ বিজ্ঞানের যুগ হিসেবে দেখলে স্নায়ুযুদ্ধের বাস্তবতা আড়াল হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ছিল স্কাইল্যাব। অ্যাপোলোর প্রযুক্তি ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে তৈরি এই বড় গবেষণাগার ১৯৭৩ সালের ১৪ মে স্যাটার্ন-৫ রকেটে উৎক্ষেপিত হয়। কিন্তু উড্ডয়নের সময় তাপ ও ক্ষুদ্র উল্কাখণ্ড থেকে সুরক্ষার আবরণ ছিঁড়ে যায়। একটি প্রধান সৌরপ্যানেল হারিয়ে যায় এবং অন্যটি আটকে থাকে। এতে বিদ্যুৎ কমে যায়, আর স্টেশনের ভেতর তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়ে। মানুষ পৌঁছানোর আগেই গবেষণাগারটি ব্যবহারযোগ্য থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

প্রথম স্কাইল্যাব দল—পিট কনরাড, জোসেফ কেরউইন ও পল ওয়েইটজ—এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁরা একটি ছাতার মতো তাপরোধী পর্দা স্থাপন করেন এবং পরে আটকে থাকা সৌরপ্যানেল খুলতে সক্ষম হন। এতে তাপমাত্রা ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উন্নত হয়। মহাকাশচারীরা শুধু গবেষণাগারের যাত্রী নন; প্রয়োজনে তাঁরা মেরামতকারী ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমাধান উদ্ভাবনকারীও হতে পারেন—স্কাইল্যাব তা দেখিয়ে দেয়। ভূমির প্রকৌশলী ও মহাকাশের কর্মীদের সমন্বয় একটি বিপন্ন কর্মসূচিকে উদ্ধার করে।

স্কাইল্যাবে তিনটি দল পর্যায়ক্রমে প্রায় ২৮, ৫৯ এবং ৮৪ দিন অবস্থান করে। তাঁরা সূর্যের সক্রিয় অঞ্চল ও সৌরবিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণ, পৃথিবীর ছবি সংগ্রহ এবং ওজনহীনতায় মানুষের শরীরের পরিবর্তন পরীক্ষা করেন। ব্যায়াম, কাজের সময়সূচি এবং দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার অভিজ্ঞতাও ভবিষ্যৎ অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়। চাঁদে পৌঁছানোর সক্ষমতার পর স্কাইল্যাব দেখায়, মানুষ কক্ষপথে দীর্ঘদিন থেকে একটি গবেষণাগার চালাতে পারে। তবে এটি পুনরায় জনবসতিপূর্ণ হয়নি; ১৯৭৯ সালে বায়ুমণ্ডলে ফিরে ভেঙে পড়ে।

এই সময় মহাকাশের রাজনৈতিক পরিবেশেও পরিবর্তন আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কূটনীতি বা দেতাঁত সহযোগিতার কিছু সুযোগ তৈরি করে। জরুরি অবস্থায় এক দেশের মহাকাশযান অন্য দেশের মহাকাশচারীকে সাহায্য করতে পারবে কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্ব পায়। ১৯৭২ সালে যৌথ মহাকাশ অভিযানের চুক্তি হয়। এর ফল অ্যাপোলো-সয়ুজ পরীক্ষা প্রকল্প। উদ্দেশ্য শুধু প্রতীকী সাক্ষাৎ ছিল না; ভিন্ন দেশের যান, যোগাযোগপদ্ধতি ও পরিচালনাব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজ করার উপযোগী করতে হতো।

প্রযুক্তিগত পার্থক্য ছিল উল্লেখযোগ্য। অ্যাপোলোর কেবিনে কম চাপে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ব্যবহৃত হতো, আর সয়ুজে ভিন্ন চাপ ও বায়ুর মিশ্রণ ছিল। তাই মাঝখানে বিশেষ সংযোগ মডিউল রাখা হয়, যা যাতায়াতের সময় চাপ ও পরিবেশের পার্থক্য সামলাতে সহায়তা করে। নতুন সামঞ্জস্যপূর্ণ সংযোগব্যবস্থাও তৈরি করা হয়। দুই দেশের কর্মীরা পরস্পরের ভাষা শেখেন, প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং যৌথ মহড়া চালান। সহযোগিতা কার্যকর করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে নির্দিষ্ট প্রকৌশলবিধি ও দৈনন্দিন কাজের পদ্ধতিতে রূপ দিতে হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ জুলাই পৃথক উৎক্ষেপণে দুই দল মহাকাশে যায়। অ্যাপোলোতে ছিলেন টমাস স্ট্যাফোর্ড, ভ্যান্স ব্র্যান্ড ও ডোনাল্ড স্লেটন; সয়ুজ-১৯-এ আলেক্সেই লিওনভ ও ভালেরি কুবাসভ। ১৭ জুলাই যান দুটি যুক্ত হয়। সংযোগপথ খুলে স্ট্যাফোর্ড ও লিওনভ করমর্দন করেন। যৌথ পরীক্ষা, খাবার ভাগাভাগি ও পরস্পরের যানে যাওয়ার দৃশ্য বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত হয়। যে মহাকাশ একসময় প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের মঞ্চ ছিল, সেখানেই এবার একসঙ্গে কাজ করার দৃশ্য দেখা গেল।

অ্যাপোলো-সয়ুজকে প্রায়ই প্রাথমিক মহাকাশ প্রতিযোগিতার প্রতীকী সমাপ্তি বলা হয়। তবে এতে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয়নি, সামরিক মহাকাশ কার্যক্রমও বন্ধ হয়নি। বরং স্যালিউট, স্কাইল্যাব ও যৌথ অভিযান মিলে দেখিয়েছিল, মহাকাশে অর্জনের অর্থ বদলাচ্ছে। দ্রুততম রেকর্ডের পাশাপাশি দীর্ঘ বসবাস, বৈজ্ঞানিক ফল, মেরামত এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। পরবর্তী স্যালিউট, মির এবং বহু পরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের যুগে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগে। মহাকাশে মানুষের ভবিষ্যৎ তখন শুধু কে আগে পৌঁছাবে, তার ওপর নির্ভর করছিল না; সেখানে টিকে থাকতে মানুষ কীভাবে কাজ করবে এবং কাদের সঙ্গে কাজ করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে