অ্যাপোলো ১১: নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনের চাঁদে……

বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

অ্যাপোলো ১১: নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনের চাঁদে প্রথম পদার্পণের ইতিহাস

সিরিজ: মহাকাশ প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন

অ্যাপোলো ১১: নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনের চাঁদে প্রথম পদার্পণের ইতিহাস
চাঁদের ধুলোয় মানুষের প্রথম পদচিহ্ন, পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন অধ্যায়।

চন্দ্রকক্ষপথ ছেড়ে ছোট একটি যান অজানা পৃষ্ঠে নামবে, তারপর সেখান থেকে আবার উঠে মূল মহাকাশযানে ফিরবে—অ্যাপোলো কর্মসূচির সবচেয়ে কঠিন পরিকল্পনাটি এবার বাস্তবে পরীক্ষিত হতে যাচ্ছিল। পূর্ববর্তী অভিযানে রকেট, মহাকাশযান এবং চাঁদের কাছে মিলিত হওয়ার কৌশল যাচাই করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো মানুষ তখনো অন্য একটি জগতের মাটিতে দাঁড়াননি। অ্যাপোলো ১১-এর লক্ষ্য শুধু চাঁদে পৌঁছানো ছিল না; সেখানে মানুষ নামিয়ে জীবিত পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনে কেনেডির ঘোষিত অঙ্গীকার সম্পূর্ণ করতে হতো।

অভিযানের তিন মহাকাশচারীর দায়িত্ব ছিল আলাদা। কমান্ডার নিল আর্মস্ট্রং ছিলেন অভিজ্ঞ পরীক্ষামূলক পাইলট; জেমিনি ৮ অভিযানে বিপজ্জনক ঘূর্ণনের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল। লুনার মডিউল পাইলট এডউইন ‘বাজ’ অলড্রিন মহাকাশযানের মিলনসংক্রান্ত কৌশলে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। কমান্ড মডিউল পাইলট মাইকেল কলিন্সের কাজ ছিল চন্দ্রকক্ষপথে মূল যান পরিচালনা এবং সহযাত্রীদের ফিরে আসার প্রস্তুতি রাখা। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন চাঁদে নামলেও কলিন্সের নির্ভুল কাজ ছাড়া তাঁদের পৃথিবীতে ফেরার পথ সম্পূর্ণ হতো না।

১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্যাটার্ন-৫ রকেট উৎক্ষেপিত হয়। প্রথমে মহাকাশযান পৃথিবীর একটি অপেক্ষাকৃত নিচু কক্ষপথে পৌঁছায়। ব্যবস্থা পরীক্ষা করার পর রকেটের তৃতীয় ধাপ আবার চালু করে চাঁদের পথে প্রয়োজনীয় বেগ দেওয়া হয়। এরপর কলাম্বিয়া নামের কমান্ড ও সার্ভিস মডিউল ঘুরে ঈগল নামের লুনার মডিউলের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং সেটিকে রকেটের সংরক্ষণস্থান থেকে বের করে আনে। এই সংযোগের মধ্য দিয়েই দুই বিশেষায়িত যান চাঁদের দিকে একত্রে যাত্রা করে।

প্রায় তিন দিনের যাত্রার পর ১৯ জুলাই অ্যাপোলো ১১ চাঁদের কাছে পৌঁছায়। চাঁদের আড়ালে প্রধান ইঞ্জিন চালিয়ে গতি কমানো হয়, যাতে মহাকাশযান চন্দ্রকক্ষপথে প্রবেশ করে। পৃথিবীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় নিয়ন্ত্রণকক্ষ তাৎক্ষণিক নিশ্চয়তা পায়নি। পরদিন আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন ঈগলে প্রবেশ করে কলাম্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হন। কলিন্স কক্ষপথে থেকে যান। এখন দুই মহাকাশচারীর সামনে ছিল অবতরণ, আর তাঁদের সহযাত্রীর সামনে ছিল পরে তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব।

অবতরণের সময় ঈগলের নির্দেশনা কম্পিউটারে ১২০১ ও ১২০২ সতর্কসংকেত দেখা দেয়। অতিরিক্ত কাজের চাপে কম্পিউটার নির্ধারিত সময়ে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারছিল না। কিন্তু তার সফটওয়্যার গুরুত্বপূর্ণ কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম জরুরি কাজ বাদ দেওয়ার উপযোগী ছিল। ভূমির বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে অবতরণ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন। এই মুহূর্তে সাফল্য আসে কম্পিউটারের নকশা, আগাম প্রশিক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষের দ্রুত সিদ্ধান্তের সমন্বয় থেকে। সতর্কসংকেত দেখা মানেই ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যাওয়া ছিল না।

আরেকটি সমস্যা দেখা দেয় নিচের ভূখণ্ডে। নির্ধারিত অবতরণপথের সামনে পাথর ও গর্ত দেখে আর্মস্ট্রং হাতে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গা খুঁজতে থাকেন। অলড্রিন উচ্চতা, নামার গতি এবং অন্যান্য তথ্য পড়ে তাঁকে সহায়তা করেন। জ্বালানির সীমা নিয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষে উদ্বেগ বাড়ছিল। অবশেষে ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক সময় রাত ৮টা ১৭ মিনিটের দিকে ঈগল চাঁদের প্রশান্তি সাগরে নামে। আর্মস্ট্রং জানান, ঈগল অবতরণ করেছে। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর মানুষ বহনকারী একটি যান প্রথমবার অন্য মহাজাগতিক বস্তুর পৃষ্ঠে স্থির হয়।

তবে অবতরণ আর পদার্পণ একই মুহূর্তে ঘটেনি। মহাকাশচারীদের পোশাক, জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থা এবং কেবিন প্রস্তুত করতে আরও কয়েক ঘণ্টা লাগে। ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক সময় রাত ২টা ৫৬ মিনিটের দিকে আর্মস্ট্রং সিঁড়ি বেয়ে নেমে চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখেন। যুক্তরাষ্ট্রের সময় অনুযায়ী তখনো ২০ জুলাই ছিল, তাই চন্দ্রপদার্পণের তারিখ সাধারণত ২০ জুলাই হিসেবেই পরিচিত। কিছুক্ষণ পরে অলড্রিনও নামেন। মানুষের ইতিহাসে প্রথমবার পৃথিবীর বাইরে কোনো প্রাকৃতিক জগতের পৃষ্ঠে মানুষের পদচিহ্ন তৈরি হয়।

টেলিভিশনের মাধ্যমে আনুমানিক প্রায় ৬৫ কোটি মানুষ এই ঘটনা দেখেছিলেন। ছবির মান সীমিত হলেও তার ঐতিহাসিক অর্থ বুঝতে অসুবিধা হয়নি। চাঁদের দুর্বল মহাকর্ষে হাঁটা, শরীরের ভারসাম্য রাখা এবং কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল নতুন। মহাকাশ পোশাকের চাপযুক্ত গঠন ও সীমিত নড়াচড়ার কারণে ঝুঁকে কিছু তোলাও সহজ ছিল না। আর্মস্ট্রং দ্রুত একটি জরুরি নমুনা সংগ্রহ করেন, যাতে কোনো কারণে অভিযান সংক্ষিপ্ত করতে হলেও পৃথিবীতে কিছু চন্দ্রপদার্থ ফেরানো যায়। প্রতিটি কাজেই সময় ও নিরাপত্তার হিসাব ছিল।

দুই মহাকাশচারী প্রায় আড়াই ঘণ্টার বহির্ভাগের কার্যক্রমে ছবি তোলেন, ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রায় ২১.৫ কিলোগ্রাম পাথর ও মাটির নমুনা সংগ্রহ করেন। তাঁরা ভূকম্পন শনাক্তকারী যন্ত্র এবং পৃথিবী থেকে পাঠানো লেজার প্রতিফলিত করার প্রতিফলক স্থাপন করেন। সৌরবায়ুর কণা সংগ্রহের পরীক্ষাও চালানো হয়। মার্কিন পতাকা স্থাপন প্রতিযোগিতার রাজনৈতিক অর্থ তুলে ধরলেও অভিযানের বৈজ্ঞানিক মূল্য ছিল বাস্তব: চাঁদের উপাদান সরাসরি পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। পতাকা স্থাপন চাঁদের ওপর আইনগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেনি।

এই সময় কলিন্স কলাম্বিয়ায় একা চাঁদ প্রদক্ষিণ করছিলেন। চাঁদের অদৃশ্য পিঠের দিকে গেলে পৃথিবীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতো। তাঁকে মহাকাশযানের ব্যবস্থা সচল রাখা, অবস্থান পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য মিলনপরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। ঈগল ফিরে আসতে ব্যর্থ হলে তিনি নেমে উদ্ধার করতে পারতেন না। চন্দ্রাভিযানের এই সীমাবদ্ধতা ছিল নির্মম: অবতরণযানের ঊর্ধ্বারোহণ ব্যবস্থা কাজ করতেই হবে। তাই চাঁদে প্রথম পা রাখার পরও অভিযানের সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপগুলোর একটি বাকি ছিল।

চাঁদের পৃষ্ঠে প্রায় সাড়ে একুশ ঘণ্টা কাটানোর পর ঈগলের ওপরের অংশ উড্ডয়ন করে; নিচের অবতরণ অংশটি সেখানেই থেকে যায়। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন চন্দ্রকক্ষপথে কলিন্সের সঙ্গে মিলিত হন এবং নমুনাসহ কলাম্বিয়ায় ফিরে আসেন। এরপর ঈগল বিচ্ছিন্ন করা হয়। সার্ভিস মডিউলের প্রধান ইঞ্জিন চালিয়ে মহাকাশযানকে পৃথিবীর পথে পাঠানো হয়। চাঁদ থেকে ওঠা এবং কক্ষপথে পুনরায় যুক্ত হওয়ার সফলতা দেখায়, অ্যাপোলোর জটিল অভিযানপদ্ধতি বাস্তবে সম্পূর্ণ কার্যকর ছিল।

২৪ জুলাই কলাম্বিয়ার কমান্ড মডিউল প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের আগে সার্ভিস মডিউল বিচ্ছিন্ন করা হয়; তাপঢাল ও প্যারাশুটের সাহায্যে তিনজন নিরাপদে নামেন। উদ্ধারকারী জাহাজ ইউএসএস হর্নেট তাঁদের গ্রহণ করে। চাঁদের নমুনায় অজানা জৈবিক ঝুঁকি থাকতে পারে—সেই সময়ের সতর্কতা অনুযায়ী মহাকাশচারীদের সাময়িক পৃথকীকরণে রাখা হয়। উৎক্ষেপণ থেকে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত প্রায় আট দিনের অভিযান শেষে কেনেডির ঘোষিত লক্ষ্য পূরণ হয়: মানুষ চাঁদে নেমেছে এবং নিরাপদে ফিরেছে।

এই সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রকে মানব চন্দ্রাভিযানের নির্দিষ্ট প্রতিযোগিতায় ঐতিহাসিক বিজয় দেয়। একই সময়ে সোভিয়েত লুনা-১৫ রোবোটিক অভিযান চাঁদ থেকে নমুনা ফেরানোর চেষ্টা করলেও অবতরণের সময় ধ্বংস হয়। তবে অ্যাপোলো ১১-এর বিজয় সোভিয়েতদের প্রথম উপগ্রহ, প্রথম মানব মহাকাশযাত্রা কিংবা রোবোটিক সাফল্য মুছে দেয়নি। এটি প্রমাণ করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র বিশাল শিল্প ও গবেষণাব্যবস্থাকে একটি অসাধারণ লক্ষ্যে সংগঠিত করতে পেরেছে। চাঁদের প্রথম পদচিহ্ন প্রতিযোগিতার সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় সম্পূর্ণ করলেও মহাকাশে অনুসন্ধান, দীর্ঘস্থায়ী বসবাস এবং শেষ পর্যন্ত সহযোগিতার ইতিহাস তখনো সামনে পড়ে ছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে