শেরম্যানের আটলান্টা অভিযান ও মার্চ টু দ্য সি: দক্ষিণের বিপর্যয়
সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
আটলান্টা থেকে সাভানা: দক্ষিণের যুদ্ধক্ষমতায় আঘাত
পিটার্সবার্গের পরিখায় গ্রান্ট যখন লির বাহিনীকে আটকে রেখে তার রসদপথ সংকুচিত করছিলেন, তখন পশ্চিমে যুদ্ধের আরেকটি সিদ্ধান্তমূলক অভিযান এগোচ্ছিল। উইলিয়াম টেকামসা শেরম্যানের লক্ষ্য ছিল জর্জিয়ার আটলান্টা, কনফেডারেসির গুরুত্বপূর্ণ রেলসংযোগ ও উৎপাদনকেন্দ্র। শহরটির পতন দক্ষিণের সামরিক সরবরাহে আঘাত হানবে; কিন্তু শেরম্যান পরে আরও দূরে যাবেন। তাঁর বাহিনী আটলান্টা থেকে আটলান্টিক উপকূল পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে দেখাবে, কনফেডারেট সরকার নিজের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলও রক্ষা করতে পারছে না।
১৮৬৪ সালের মে মাসে শেরম্যান প্রায় এক লাখ সৈন্য নিয়ে চাটানুগা অঞ্চল থেকে দক্ষিণে অভিযান শুরু করেন। তাঁর অধীনে জর্জ থমাস, জেমস ম্যাকফারসন ও জন স্কোফিল্ডের নেতৃত্বে তিনটি বাহিনী ছিল। প্রতিপক্ষে জোসেফ ই. জনস্টনের আর্মি অব টেনেসি সংখ্যায় ছোট হলেও পাহাড়ি ভূখণ্ডে শক্ত প্রতিরক্ষার সুবিধা পেত। উত্তর জর্জিয়ার পাহাড়, গিরিপথ ও নদী অতিক্রম করে এগোনোর সঙ্গে নিজের দীর্ঘ রেলসরবরাহপথ রক্ষা করাও শেরম্যানের বড় দায়িত্ব ছিল।
জনস্টন সাধারণত শক্ত অবস্থান গ্রহণ করতেন, আর শেরম্যান পাশ কাটিয়ে তাঁর যোগাযোগপথ বিপন্ন করার চেষ্টা করতেন। ডাল্টন ও রেসাকার মতো অবস্থানে এই কৌশল দেখা যায়। এতে জনস্টন বাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে পিছিয়ে যেতে পারছিলেন, কিন্তু ক্রমে ভূখণ্ড হারাচ্ছিলেন। সেনাবাহিনী সংরক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল রক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্ব কনফেডারেট নেতৃত্বের উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।
শেরম্যান সব সময় পাশ কাটানোর পথ নেননি। ২৭ জুন কেনেস মাউন্টেনে তিনি সরাসরি আক্রমণ চালিয়ে কঠিন প্রতিরোধের মুখে পড়েন। ইউনিয়নের আক্রমণ ব্যর্থ হয় এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। এরপর আবার ঘুরে অগ্রসর হয়ে তিনি জনস্টনকে অবস্থান ছাড়তে বাধ্য করেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, শেরম্যানের সাফল্য অব্যর্থ পরিকল্পনার ফল ছিল না; ব্যর্থতার পর পদ্ধতি বদলানোর ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
জুলাইয়ে ইউনিয়ন বাহিনী চাটাহুচি নদী পেরিয়ে আটলান্টার কাছে পৌঁছায়। কনফেডারেট প্রেসিডেন্ট জেফারসন ডেভিস জনস্টনের ধারাবাহিক পশ্চাদপসরণে অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে সরিয়ে জন বেল হুডকে কমান্ড দেন। হুড আক্রমণাত্মক লড়াইয়ের মাধ্যমে শেরম্যানকে ঠেকাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পিচট্রি ক্রিক, আটলান্টা এবং এজরা চার্চের লড়াইয়ে তাঁর বাহিনী বড় ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও ইউনিয়নের অগ্রগতি থামাতে পারেনি।
২২ জুলাই আটলান্টার যুদ্ধে ইউনিয়ন কমান্ডার ম্যাকফারসন নিহত হন। তবু তাঁর বাহিনী প্রতিরোধ ধরে রাখে। শেরম্যান শহরের প্রতিরক্ষায় সরাসরি বারবার আঘাত করার পরিবর্তে রেলপথ কাটার দিকে মনোযোগ দেন। আগস্টের শেষে জোনসবোরোর কাছে ইউনিয়নের সাফল্যে আটলান্টার শেষ গুরুত্বপূর্ণ রেলসংযোগ বিপন্ন হয়। সরবরাহ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ায় হুড শহর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১ সেপ্টেম্বর রাতে কনফেডারেটরা আটলান্টা ত্যাগ করে এবং নিজেদের কিছু সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস করে। ২ সেপ্টেম্বর ইউনিয়ন বাহিনী শহরে প্রবেশ করে। এটি শুধু ভৌগোলিক সাফল্য ছিল না। ১৮৬৪ সালের গ্রীষ্মে দীর্ঘ যুদ্ধ ও প্রচুর প্রাণহানিতে উত্তরের জনমত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আটলান্টার পতন দেখায়, বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হচ্ছে।
এই সংবাদ লিংকনের পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনা শক্তিশালী করে। নভেম্বরের নির্বাচনের আগে এটি ইউনিয়নের যুদ্ধনীতি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হয়ে ওঠে। তবে শেরম্যানের সমুদ্রাভিযানকে লিংকনের নির্বাচনী জয়ের কারণ বলা সময়ক্রমের দিক থেকে ভুল: নির্বাচন হয় ৮ নভেম্বর, আর সেই অভিযান শুরু হয় পরে। নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছিল আটলান্টা দখল এবং অন্যান্য সামরিক সাফল্য।
শহর দখলের পর শেরম্যান বেসামরিক বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। সামরিক ঘাঁটি হিসেবে আটলান্টাকে ব্যবহার এবং বেসামরিক জনসংখ্যার দায় কমানো ছিল তাঁর যুক্তি। কিন্তু পরিবারগুলোর জন্য এর অর্থ ছিল ঘরছাড়া হওয়া ও অনিশ্চয়তা। নভেম্বরে শহর ছাড়ার আগে ইউনিয়ন বাহিনী রেল ডিপো, কর্মশালা ও সামরিক কাজে লাগতে পারে এমন স্থাপনা ধ্বংস করে। আগুন অন্য ভবনেও ছড়ায়। আটলান্টার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল, তবে পুরো শহর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি।
এদিকে হুড উত্তরের দিকে গিয়ে শেরম্যানের যোগাযোগপথে চাপ সৃষ্টি করেন। শেরম্যান শেষ পর্যন্ত তাঁর পিছু নিয়ে পুরো বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার বদলে থমাসের নেতৃত্বে যথেষ্ট সৈন্য রেখে দেন। হুডের বাহিনী পরে ফ্র্যাঙ্কলিন ও ন্যাশভিলে বিপর্যস্ত হয়। এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শেরম্যানকে জর্জিয়ার ভেতর দিয়ে এগোনোর সুযোগ দেয়। ফলে সমুদ্রাভিযানের সাফল্যের সঙ্গে অন্য ইউনিয়ন বাহিনীর কাজও যুক্ত ছিল।
১৫ নভেম্বরের দিকে প্রায় ৬০ হাজার সৈন্য নিয়ে শেরম্যান সাভানার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। প্রায় ৩০০ মাইল পথ অতিক্রমের এই অভিযান পরিচিত হয় মার্চ টু দ্য সি নামে। বাহিনী দুটি প্রধান অংশে বিভক্ত হয়ে একাধিক পথে চলত। এতে খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্র বাড়ে এবং শত্রুর পক্ষে পরবর্তী লক্ষ্য অনুমান করা কঠিন হয়। দীর্ঘ রেলসরবরাহপথের বদলে স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার অভিযানের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
শেরম্যানের বিশেষ সামরিক আদেশ নম্বর ১২০ সংগঠিতভাবে খাদ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেয়। রেলপথ, মিল, গুদাম ও সামরিক পরিবহনের উপযোগী সম্পদ ধ্বংস করা হতো। সৈন্যরা রেল তুলে আগুনে গরম করে বাঁকিয়ে দিত, যাতে দ্রুত মেরামত করা না যায়। ভুট্টা, পশুখাদ্য, ঘোড়া, খচ্চর ও গবাদিপশু বাজেয়াপ্ত হওয়ায় ইউনিয়ন বাহিনী চলতে পারত, আর কনফেডারেসির সরবরাহক্ষমতা কমত।
আদেশে ব্যক্তিগত বাড়িতে নির্বিচারে প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ থাকলেও বাস্তবে সব সৈন্য তা মানেনি। অনুমোদিত সংগ্রহের পাশাপাশি লুটপাট ও অননুমোদিত ধ্বংস ঘটে। ধনী বাগানমালিকের সম্পদের সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের খাবার ও জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সামরিক সরবরাহ দুর্বল করার নীতি বেসামরিক মানুষের খাদ্যনিরাপত্তাকে সরাসরি আঘাত করেছিল। ধ্বংসের পরিমাণ সর্বত্র সমান ছিল না, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ক্ষুধা ও বাস্তুচ্যুতি ছিল তাৎক্ষণিক বাস্তবতা।
এই অভিযানকে প্রায়ই ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ বলা হয়। তবে আধুনিক যুগের নির্বিচার গণহত্যা বা সর্বব্যাপী বোমাবর্ষণের সঙ্গে এক করে দেখা যথাযথ নয়। শেরম্যানের উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণের যুদ্ধ চালানোর উপকরণ এবং প্রতিরোধের ইচ্ছা দুর্বল করা। তা সত্ত্বেও সম্পদ ধ্বংস ও সমষ্টিগত শাস্তির চর্চা যুদ্ধের ভার সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়। সামরিক কার্যকারিতা স্বীকার করলেও সেই মানবিক মূল্য উপেক্ষা করা যায় না।
দাসত্বে আবদ্ধ মানুষের কাছে ইউনিয়নের উপস্থিতি মুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করে। হাজারো মানুষ বাগান ছেড়ে সৈন্যদের সঙ্গে চলতে শুরু করেন; কেউ পথ দেখান, কেউ তথ্য দেন। কিন্তু সেনাবাহিনী তাঁদের সবার খাদ্য ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেনি। ৯ ডিসেম্বর এবেনেজার ক্রিকে জেফারসন সি. ডেভিসের ইউনিয়ন বাহিনী পার হওয়ার পর ভাসমান সেতু সরিয়ে নিলে বহু কৃষ্ণাঙ্গ শরণার্থী ওপারে আটকা পড়েন। আতঙ্কে পার হতে গিয়ে অনেকে ডুবে মারা যান; অন্যরা পুনরায় বন্দিত্বের ঝুঁকিতে পড়েন।
কনফেডারেট অশ্বারোহী ও স্থানীয় বাহিনী বাধা দিলেও শেরম্যানের সমপর্যায়ের সেনাবাহিনী জর্জিয়ায় ছিল না। নভেম্বরের গ্রিসওল্ডভিলের মতো সংঘর্ষে স্থানীয় প্রতিরোধ গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে। ইউনিয়নের অগ্রযাত্রা তাই কেবল সম্পদ ধ্বংস করেনি; দক্ষিণের সরকার নিজের জনগণকে রক্ষা করতে অক্ষম—এই বার্তাও ছড়িয়েছিল। সৈন্যদের পরিবার থেকে আসা দুর্দশার সংবাদ কনফেডারেট মনোবলেও চাপ বাড়ায়।
ডিসেম্বরে শেরম্যান সাভানার কাছে পৌঁছান। ১৩ ডিসেম্বর ফোর্ট ম্যাকঅ্যালিস্টার দখল উপকূলের ইউনিয়ন নৌবহরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সরবরাহের পথ খুলে দেয়। কনফেডারেট কমান্ডার উইলিয়াম হার্ডি বাহিনী সরিয়ে নিলে ২১ ডিসেম্বর সাভানা ইউনিয়নের হাতে আসে। শেরম্যান লিংকনকে শহরটি ক্রিসমাসের উপহার হিসেবে পাওয়ার সংবাদ পাঠান।
আটলান্টা থেকে সাভানা পর্যন্ত অভিযান দক্ষিণের পুরো অর্থনীতি ধ্বংস করেনি, কিন্তু রেল, উৎপাদন, কৃষিসরবরাহ ও সরকারি কর্তৃত্বে বড় আঘাত হানে। একই সময়ে পিটার্সবার্গে গ্রান্টের চাপ এবং টেনেসিতে হুডের পরাজয় কনফেডারেসির বিকল্প আরও কমিয়ে দেয়। ইউনিয়নের বিজয়ের পথ তৈরি হয় এই সম্মিলিত চাপেই। ১৮৬৫ সালে শেরম্যান এবার ক্যারোলাইনাসের দিকে এগোবেন, আর পূর্বে লির সংকুচিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শেষ পরীক্ষার মুখে পড়বে।
আক্কাদীয় রাজবংশ: সারগনের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও পতনের ইতিহাস
প্রাচীন মিশরের ফারাও রাজবংশ: নারমার থেকে ক্লিওপেট্রার উত্থান-পতন
রাজবংশ কীভাবে জন্ম নেয়? উত্তরাধিকার, যুদ্ধ, বিবাহ ও ক্ষমতার ইতিহাস
ব্ল্যাক ডেথের লক্ষণ ও মৃত্যুর কারণ: প্লেগের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ইতিহাস
ব্ল্যাক ডেথের বিস্তার: ১৩৪৭–১৩৫৩ সালে ইউরোপে কোটি মানুষের মৃত্যু
কাফা অবরোধ ও ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭ সালে জাহাজে ইউরোপে প্লেগের প্রবেশ