গ্রান্ট বনাম লি: ওভারল্যান্ড অভিযান ও পিটার্সবার্গের অবরোধ
সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
অবিরাম যুদ্ধ ও পরিখায় আটকে পড়া কনফেডারেট বাহিনী
কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য, নারী ও সাধারণ মানুষের সংগ্রাম যখন যুদ্ধের সামাজিক ভিত্তি বদলে দিচ্ছিল, তখন সামরিক নেতৃত্বও আরও কঠোর অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ভিকসবার্গ এবং পরে চাটানুগায় সাফল্য ইউলিসিস এস. গ্রান্টকে লিংকনের আস্থার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ১৮৬৪ সালের মার্চে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নীত হয়ে ইউনিয়নের সব সেনাবাহিনীর প্রধান হন। তাঁর সামনে প্রশ্ন ছিল: বিচ্ছিন্ন বিজয়গুলোকে কীভাবে কনফেডারেসির সামগ্রিক পরাজয়ে পরিণত করা যায়?
গ্রান্টের উত্তর ছিল একাধিক রণাঙ্গনে একই সময়ে চাপ সৃষ্টি করা। আগে একটি অঞ্চলে আক্রমণ থামলে কনফেডারেটরা অন্য অঞ্চলে সৈন্য পাঠানোর সুযোগ পেত। এবার শেরম্যান জর্জিয়ায় এগোবেন, অন্য বাহিনী ভার্জিনিয়ার যোগাযোগব্যবস্থায় আঘাত করবে, আর গ্রান্ট নিজে রবার্ট ই. লির প্রধান বাহিনীর বিরুদ্ধে থাকবেন। উদ্দেশ্য শুধু রিচমন্ড দখল নয়; রাজধানী রক্ষাকারী সেনাবাহিনীকে কার্যকর যুদ্ধক্ষমতা হারাতে বাধ্য করা।
পূর্বাঞ্চলে আর্মি অব দ্য পোটোম্যাকের কমান্ডার জর্জ গর্ডন মিড পদে বহাল ছিলেন। গ্রান্ট তাঁর সঙ্গে থেকে বৃহত্তর কৌশল পরিচালনা করেন। ফলে অভিযানকে শুধু দুই সেনাপতির ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে মিড ও অন্য কর্মকর্তাদের ভূমিকা আড়ালে পড়ে। ইউনিয়নের জনবল ও সরবরাহ বেশি থাকলেও সেই সুবিধা কাজে লাগাতে সমন্বয়, দ্রুত চলাচল এবং কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্তের প্রয়োজন ছিল।
৪ মে ১৮৬৪ ইউনিয়ন বাহিনী র্যাপিডান নদী অতিক্রম করে। পরদিন ভার্জিনিয়ার ঘন বনাঞ্চল ওয়াইল্ডারনেসে লড়াই শুরু হয়। লি এমন ভূখণ্ডে আঘাত করেন, যেখানে ইউনিয়নের বেশি সৈন্য ও কামানের সুবিধা সীমিত হয়ে পড়ে। ঝোপঝাড়ে দৃশ্যমানতা কম ছিল, ইউনিটগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছিল এবং কর্মকর্তাদের পক্ষে পুরো পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে উঠছিল।
৫–৬ মে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে উভয় বাহিনী বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ে। বনের শুকনো গাছপালায় আগুন ধরে আহতদের অনেকে আটকা পড়েন। কনফেডারেট জেনারেল জেমস লংস্ট্রিট নিজপক্ষের গুলিতে আহত হন; গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর নেতৃত্ব হারিয়ে দক্ষিণী আক্রমণের গতি কমে। কোনো পক্ষই প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ পরাজিত করতে পারেনি। ইউনিয়নের জন্য লড়াইটি বিশেষ ব্যয়বহুল হলেও লির বাহিনীও সহজে ক্ষতি পূরণ করার অবস্থায় ছিল না।
ওয়াইল্ডারনেসের পর গ্রান্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে। তিনি নদী পেরিয়ে আগের ঘাঁটিতে ফিরে যাননি; দক্ষিণে স্পটসিলভানিয়ার দিকে এগিয়েছেন। উদ্দেশ্য ছিল লির পাশ কাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখল এবং তাঁকে আবার অবস্থান বদলাতে বাধ্য করা। এই ধারাবাহিকতাই আগের বহু অভিযানের সঙ্গে পার্থক্য তৈরি করে। একটি যুদ্ধে বাধা পেলেও পুরো অভিযান থামছিল না।
কিন্তু লিও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁর সৈন্যরা আগে পৌঁছে স্পটসিলভানিয়া কোর্ট হাউসের কাছে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে। ৮ মে থেকে সংঘর্ষ শুরু হয়। মাটি, কাঠ ও পরিখার শক্তিশালী অবস্থান সরাসরি আক্রমণকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে। সৈন্যরা এখন প্রায় প্রতিটি বিরতিতেই খনন শুরু করতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য প্রতিরক্ষাব্যূহ নির্মাণ ক্রমে দৈনন্দিন অভ্যাস হয়ে উঠছিল।
কনফেডারেট রেখার একটি অংশ বাইরে বেরিয়ে ছিল, যা ‘মিউল শু’ নামে পরিচিত। এমন অবস্থানের একাধিক দিক থেকে আক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি ছিল। ১০ মে এমরি আপটনের ঘনবদ্ধ আক্রমণ সাময়িকভাবে রেখা ভেদ করলেও পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় সাফল্য ধরে রাখা যায়নি। এরপর ১২ মে ভোরে উইনফিল্ড স্কট হ্যানককের বাহিনী বড় আঘাত করে অনেক কনফেডারেট সৈন্য ও কামান দখল করে।
তবু প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েনি। কনফেডারেট পাল্টা আক্রমণের পর ‘ব্লাডি অ্যাঙ্গেল’ এলাকায় দীর্ঘ সময় কাছাকাছি দূরত্বে লড়াই চলে। বৃষ্টি, কাদা এবং কাঠের ব্যূহের দুই পাশে গুলি ও হাতাহাতি যুদ্ধ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে। লি পেছনে নতুন প্রতিরক্ষারেখা তৈরি করে বাহিনী সরিয়ে নেন। গ্রান্ট একটি দুর্বল অংশে আঘাত করতে পেরেছিলেন, কিন্তু লির সেনাবাহিনী ধ্বংস করতে পারেননি।
স্পটসিলভানিয়ার পরও গ্রান্ট দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চলতে থাকেন। নর্থ আনা নদীর কাছে লি এমন অবস্থান নেন, যা ইউনিয়ন বাহিনীকে বিভক্ত অবস্থায় আক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলতে পারত। গ্রান্ট সেই বিপদ এড়িয়ে আবার ঘুরে এগোন। অভিযানটি শুধু মুখোমুখি আক্রমণের ধারাবাহিকতা ছিল না; উভয় পক্ষই পথ, নদী ও অবস্থান ব্যবহার করে সুবিধা অর্জনের চেষ্টা করছিল। তবে লি বারবার রিচমন্ডের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ান।
এই অগ্রযাত্রা জুনের শুরুতে কোল্ড হারবারে পৌঁছায়। সেখানে কনফেডারেটরা শক্ত প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করেছিল। ৩ জুন ইউনিয়নের বড় আক্রমণ অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ও দুর্বল সমন্বয়ের মধ্যে শুরু হয় এবং গুরুতর ক্ষয়ক্ষতিতে ব্যর্থ হয়। পরিখার সামনে পড়ে থাকা আহতদের উদ্ধারও কঠিন হয়ে ওঠে। গ্রান্ট পরে এই আক্রমণের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন। তাঁর দৃঢ়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব সিদ্ধান্ত কার্যকর বা যুক্তিসংগত ছিল না।
মে থেকে জুনের অভিযানে ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ হিসাবে প্রায় ৫৫ হাজার, কনফেডারেটদের প্রায় ৩০–৩৫ হাজার ধরা হয়; হিসাবভেদে পার্থক্য রয়েছে। এগুলো নিহতের সংখ্যা নয়—আহত, বন্দি ও নিখোঁজও অন্তর্ভুক্ত। উত্তরের বেশি ক্ষয়ক্ষতি রাজনৈতিক সমালোচনা বাড়ায়। কিন্তু দক্ষিণের ছোট জনবলভিত্তির জন্য অভিজ্ঞ সৈন্য ও কর্মকর্তাদের হারানো তুলনামূলকভাবে আরও কঠিন সমস্যা সৃষ্টি করে।
কোল্ড হারবারের পর গ্রান্ট রিচমন্ডের শক্ত প্রতিরক্ষার সামনে একই আক্রমণ চালিয়ে যাননি। তিনি গোপনে বাহিনী সরিয়ে জেমস নদী পার হয়ে পিটার্সবার্গের দিকে যান। নৌযান ও দীর্ঘ ভাসমান সেতুর সাহায্যে বিপুল সৈন্য স্থানান্তর করা হয়। এই পদক্ষেপ লিকে কিছু সময়ের জন্য অনিশ্চয়তায় ফেলে। পিটার্সবার্গ দখল করতে পারলে রিচমন্ডে খাদ্য ও সরঞ্জাম পৌঁছানোর প্রধান রেলপথগুলো বিপন্ন হতো।
১৫–১৮ জুনের আক্রমণে ইউনিয়নের সামনে শহর দখলের সুযোগ তৈরি হলেও বিলম্ব ও অসংগঠিত আক্রমণে তা কাজে লাগেনি। পি. জি. টি. বোরেগার্ডের সীমিত বাহিনী প্রথমে প্রতিরোধ করে; পরে লির সৈন্যরা এসে অবস্থান শক্তিশালী করে। দ্রুত বিজয়ের সম্ভাবনা শেষ হয়। মে–জুনের ওভারল্যান্ড অভিযান এভাবে পৃথক ও দীর্ঘ রিচমন্ড–পিটার্সবার্গ অভিযানে রূপ নেয়।
পিটার্সবার্গে ‘অবরোধ’ বলতে শহরকে সম্পূর্ণ বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলা বোঝায় না। কনফেডারেটদের কিছু রেল ও সড়কযোগাযোগ খোলা ছিল। গ্রান্ট ক্রমে পশ্চিমদিকে নিজের রেখা বাড়িয়ে সেগুলো কাটার চেষ্টা করেন। প্রতিবার নতুন অংশ রক্ষা করতে লিকেও সৈন্য ছড়িয়ে দিতে হয়। একই বাহিনী দিয়ে আরও দীর্ঘ প্রতিরক্ষারেখা ধরে রাখার চাপ তাঁর আক্রমণ করার স্বাধীনতা কমিয়ে দেয়।
সরাসরি ব্যূহ ভাঙার আরেক চেষ্টা হয় ৩০ জুলাই ক্রেটারের যুদ্ধে। ইউনিয়নের খনিশ্রমিক-অভিজ্ঞ সৈন্যরা শত্রুর অবস্থানের নিচে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বিস্ফোরক বসান। বিস্ফোরণে বিশাল গর্ত তৈরি হলেও আক্রমণ পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের ব্যর্থতায় সৈন্যরা সেখানে আটকে পড়েন। কনফেডারেট পাল্টা আক্রমণে অভিযান বিপর্যস্ত হয়; কৃষ্ণাঙ্গ ইউনিয়ন সৈন্যদের অনেকে আত্মসমর্পণের পরও হত্যার শিকার হন।
তবে একটি ব্যর্থ আক্রমণেও বৃহত্তর চাপ বন্ধ হয়নি। আগস্টে ইউনিয়ন ওয়েলডন রেলপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে। দক্ষিণ থেকে সরবরাহ এখন কিছু পথ গাড়িতে ঘুরিয়ে আনতে হচ্ছিল। অন্যদিকে সিটি পয়েন্টে ইউনিয়নের বিশাল সরবরাহঘাঁটি নৌপথ ও সামরিক রেলের সাহায্যে সৈন্যদের খাদ্য, গোলাবারুদ ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছিল। দীর্ঘ লড়াইয়ে দুই পক্ষের রসদসামর্থ্যের ব্যবধান ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবু ১৮৬৪ সালেই লির বাহিনী ভেঙে পড়েনি। তিনি পাল্টা আক্রমণ চালান এবং জুবাল আর্লিকে শেনানডোয়া উপত্যকা ও ওয়াশিংটনের দিকে পাঠিয়ে ইউনিয়নের মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মূল বাহিনী ক্রমে রিচমন্ড ও পিটার্সবার্গ রক্ষায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। গ্রান্টের সাফল্য ছিল প্রতিটি যুদ্ধ জেতায় নয়, প্রতিরোধের পরও উদ্যোগ ধরে রেখে শত্রুর বিকল্প সংকুচিত করায়। পূর্বে এই চাপ চলার সময় শেরম্যান জর্জিয়ার গভীরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন—যেখানে রেলপথ, শিল্প ও বেসামরিক সম্পদের ওপর আঘাত যুদ্ধকে নতুন মাত্রা দেবে।
আক্কাদীয় রাজবংশ: সারগনের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও পতনের ইতিহাস
প্রাচীন মিশরের ফারাও রাজবংশ: নারমার থেকে ক্লিওপেট্রার উত্থান-পতন
রাজবংশ কীভাবে জন্ম নেয়? উত্তরাধিকার, যুদ্ধ, বিবাহ ও ক্ষমতার ইতিহাস
ব্ল্যাক ডেথের লক্ষণ ও মৃত্যুর কারণ: প্লেগের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ইতিহাস
ব্ল্যাক ডেথের বিস্তার: ১৩৪৭–১৩৫৩ সালে ইউরোপে কোটি মানুষের মৃত্যু
কাফা অবরোধ ও ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭ সালে জাহাজে ইউরোপে প্লেগের প্রবেশ