টমাস দে তোরকেমাদা: ইনকুইজিশনের বিস্তার ও ধর্মীয় নিপীড়নের ইতিহাস
সিরিজ: স্প্যানিশ ইনকুইজিশন: ধর্মীয় নিপীড়ন ও বিচার
তোরকেমাদার নেতৃত্বে ধর্মীয় তদন্ত পরিণত হয় বিস্তৃত বিচার ও নিপীড়নের ব্যবস্থায়।
অভিযুক্ত মানুষ নিজের পক্ষে কতটুকু কথা বলতে পারবেন, সাক্ষ্য কীভাবে গ্রহণ করা হবে এবং স্থানীয় আদালত কার নির্দেশ মানবে—স্প্যানিশ ইনকুইজিশন প্রতিষ্ঠার পর এই প্রশ্নগুলো সামনে এসেছিল। সেভিলের প্রাথমিক কার্যক্রম দেখিয়েছিল, রাজকীয় সহযোগিতা পেলে ধর্মীয় তদন্ত কত দ্রুত মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন আদালতকে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দরকার ছিল সমন্বয়, নিয়ম ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এই পর্যায়েই টমাস দে তোরকেমাদা ইনকুইজিশনের ইতিহাসের কেন্দ্রে উঠে আসেন। তাঁর গুরুত্ব শুধু কঠোর শাস্তির সমর্থক হিসেবে নয়; তিনি নিপীড়নকে ধারাবাহিক প্রশাসনিক কার্যক্রমে রূপ দিতে সাহায্য করেছিলেন।
প্রায় ১৪২০ সালে জন্ম নেওয়া তোরকেমাদা ছিলেন ডোমিনিকান সন্ন্যাসী। তাঁর জন্মস্থান ও পারিবারিক পরিচয়ের কিছু বিবরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। আত্মীয় হুয়ান দে তোরকেমাদা ছিলেন প্রভাবশালী ধর্মতাত্ত্বিক ও কার্ডিনাল। টমাস দীর্ঘদিন সেগোভিয়ার সান্তা ক্রুস মঠের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ইসাবেলার আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতাদের একজন হিসেবে রাজপরিবারের আস্থা অর্জন করেন। এই সম্পর্ক তাঁকে দরবারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়। তবে তাঁর উত্থানকে কেবল ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ফল ভাবলে ভুল হবে; ধর্মীয় শৃঙ্খলা সম্পর্কে তাঁর কঠোর অবস্থান রাজদম্পতির অগ্রাধিকারের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।
এখানে ঘটনাক্রমটি পরিষ্কার রাখা জরুরি। তোরকেমাদা ১৪৭৮ সালে ইনকুইজিশন প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত থেকেই তার প্রধান ছিলেন না। প্রথম ইনকুইজিটররা তাঁর সর্বোচ্চ পদে আসার আগেই সেভিলে বিচার ও দণ্ড কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। তিনি ১৪৮২ সালে ইনকুইজিটর হিসেবে যুক্ত হন এবং ১৪৮৩ সালে পোপ চতুর্থ সিক্সটাসের অনুমোদনে কাস্তিলের ইনকুইজিটর জেনারেল হন। একই বছরে তাঁর এখতিয়ার আরাগনের রাজমুকুটের ভূখণ্ডেও প্রসারিত হয়। সাধারণভাবে তাঁকে স্পেনের প্রথম গ্র্যান্ড ইনকুইজিটর বলা হলেও তখন কাস্তিল ও আরাগনের স্বতন্ত্র আইন ও প্রতিষ্ঠান বহাল ছিল।
তাঁর নেতৃত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন আদালতের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয় বাড়ানো। সেভিলের বাইরে কর্দোবা, সিউদাদ রেয়াল ও তোলেদোসহ বিভিন্ন স্থানে আদালত গড়ে ওঠে বা পুনর্বিন্যস্ত হয়। ইনকুইজিটরদের পাশাপাশি অভিযোগ পরিচালনাকারী কর্মকর্তা, নথিলেখক, কারারক্ষী ও সম্পত্তির হিসাবরক্ষকদের কাজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানের সঙ্গে যুক্ত সুপ্রেমা পরিষদ এই সময়ে বিকশিত হয়। ধর্মীয় সন্দেহকে কার্যকর শাস্তিতে রূপান্তর করার জন্য একটি প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি হচ্ছিল। প্রতিটি রায় তোরকেমাদা নিজে দেননি, কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রায়গুলো দেওয়া হতো, তার পরিচালনায় তাঁর প্রভাব ছিল গভীর।
১৪৮৪ সালে সেভিলে ইনকুইজিটরদের সমাবেশের পর তোরকেমাদা বিচার পরিচালনার জন্য নির্দেশাবলি জারি করেন। পরবর্তী বছরগুলোতেও সেগুলো সংযোজিত ও সংশোধিত হয়। স্বীকারোক্তি, অনুতাপ, শাস্তি, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্বের মতো বিষয় এতে স্থান পায়। লিখিত নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল আদালতের কার্যক্রমে সামঞ্জস্য আনা। কিন্তু নিয়ম থাকার অর্থ অভিযুক্তের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত হওয়া নয়। বরং একই ধরনের কঠোর প্রক্রিয়া বিভিন্ন শহরে প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হয়। তোরকেমাদার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই: তিনি সাময়িক অভিযানের বদলে পুনরাবৃত্তিযোগ্য বিচারপদ্ধতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।
অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের সূচনায় মানুষকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজেদের ধর্মীয় বিচ্যুতি স্বীকার করার আহ্বান জানানো হতো। স্বেচ্ছায় হাজির হলে অপেক্ষাকৃত কম শাস্তির সম্ভাবনা থাকলেও ক্ষমা নিঃশর্ত ছিল না। স্বীকারোক্তিকারীকে অন্যদের নাম জানাতে বলা হতে পারত। ফলে নিজের নিরাপত্তার চেষ্টা প্রতিবেশী, আত্মীয় বা পরিচিতের বিরুদ্ধে নতুন তদন্তের কারণ হয়ে উঠত। একজনের স্বীকারোক্তি আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সূত্র তৈরি করত। এই প্রক্রিয়া কনভার্সো সমাজে পারস্পরিক আস্থা ক্ষয় করে এবং পরিবারের ভেতরের আচরণকেও বিচারযোগ্য তথ্য হিসেবে সামনে আনে।
সাক্ষীদের পরিচয় গোপন রাখার ব্যবস্থা অভিযুক্তের আত্মপক্ষসমর্থনকে বিশেষভাবে দুর্বল করত। অভিযোগের সারাংশ জানানো হলেও সব ক্ষেত্রে অভিযোগকারীর পরিচয় জানা যেত না। ব্যক্তিগত শত্রুতা দেখিয়ে সাক্ষ্য খণ্ডনের কিছু সুযোগ ছিল, কিন্তু কাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে তা বোঝাই কঠিন হতে পারত। আইনজীবীর সহায়তা থাকলেও তা আধুনিক স্বাধীন প্রতিরক্ষার সমতুল্য ছিল না। দীর্ঘ কারাবাস, বাইরের যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ পরিবারকে অসহায় করে তুলত। আদালতের কাছে সন্দেহ দূর করার জন্য যে তথ্য দরকার, তা সংগ্রহ করার বাস্তব সামর্থ্যও অনেক অভিযুক্তের থাকত না।
নির্যাতনও এই বিচারব্যবস্থার অংশ ছিল, যদিও প্রত্যেক অভিযুক্তকে নির্যাতন করা হতো না। নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ ও অনুমোদনের কাঠামোর মধ্যে তা ব্যবহার করা যেত; বাস্তবে এসব সীমা অভিযুক্তকে নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা দেয়নি। নির্যাতনের অধীনে পাওয়া বক্তব্য পরে পুনরায় স্বীকার করার বিধান থাকলেও পুনরায় নির্যাতনের আশঙ্কা থেকে মানুষ কতটা মুক্ত ছিলেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জবরদস্তিতে আদায় করা স্বীকারোক্তি সত্যের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়। তাই আদালতের নথিতে কারও অপরাধ স্বীকারের উল্লেখ থাকলেই তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ সত্য ছিল ধরে নেওয়া যায় না।
শাস্তির পরিসরও মৃত্যুদণ্ডের চেয়ে বিস্তৃত ছিল। প্রকাশ্য অনুতাপ, জরিমানা, বিশেষ পোশাক পরিধান, কারাবাস ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মতো দণ্ড মানুষের জীবন বদলে দিত। সানবেনিতো নামে পরিচিত দণ্ডসূচক পোশাক এবং গির্জায় শাস্তিপ্রাপ্তদের পরিচয় সংরক্ষণের প্রথা সামাজিক অপমানকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারত। মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধেও বিচার চালিয়ে সম্পত্তির উত্তরাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব ছিল। ফলে একজনের শাস্তি তাঁর সন্তান ও আত্মীয়দের ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করত। তোরকেমাদার প্রতিষ্ঠানের ভয় তাই শুধু মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল না; জীবিকা, সম্মান ও পারিবারিক নিরাপত্তা হারানোর আশঙ্কাও ছিল।
আরাগনের ভূখণ্ডে নতুন ব্যবস্থার বিস্তার সহজ হয়নি। স্থানীয় অধিকার, প্রচলিত আইন এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের প্রশ্নে বিরোধ দেখা দেয়। সব বিরোধী গোপন ধর্মাচার রক্ষা করতে চাইছিলেন—এমন ধারণা ভুল; অনেকে বিচারিক হস্তক্ষেপ ও রাজকীয় ক্ষমতা বৃদ্ধির বিরোধিতা করছিলেন। ১৪৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে সারাগোসায় ইনকুইজিটর পেদ্রো দে আরবুয়েসের ওপর হামলা হয় এবং তিনি মারা যান। হত্যাকাণ্ডের তদন্তে কয়েকজন কনভার্সোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি কর্তৃপক্ষকে বিরোধীদের দমনে সুবিধা দেয়, যদিও কয়েকজনের অপরাধ দিয়ে গোটা ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা ন্যায়সংগত ছিল না।
তোরকেমাদার ভূমিকা আদালতের সীমানা ছাড়িয়ে যায় ১৪৯২ সালের ইহুদি বহিষ্কারের প্রশ্নে। তাঁর মতো সমর্থকেরা যুক্তি দেন, প্রকাশ্যে ইহুদি ধর্ম পালনকারীদের উপস্থিতি ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদের পুরোনো বিশ্বাসে ফিরতে উৎসাহিত করে। এই যুক্তিতে কনভার্সোদের কথিত বিচ্যুতির দায় অবাপ্তাইজিত ইহুদিদের ওপর চাপানো হয়। ৩১ মার্চ ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা বহিষ্কারের আদেশ জারি করেন। সিদ্ধান্তটি ছিল রাজকীয়, কিন্তু তোরকেমাদা তার গুরুত্বপূর্ণ সমর্থক ও প্রভাবক ছিলেন। ধর্মান্তর অথবা দেশত্যাগের চাপ অসংখ্য পরিবারকে বিপর্যস্ত করে। ধর্মান্তরিতদের বিচার এবং ইহুদিদের বহিষ্কার পৃথক ব্যবস্থা হলেও এখানে তারা পরস্পরকে শক্তিশালী করেছিল।
তাঁর আমলে ঠিক কতজন নিহত হয়েছিলেন, তা নিয়ে সতর্কতা দরকার। পুরোনো লেখায় প্রচলিত অনেক বড় সংখ্যা অসম্পূর্ণ তথ্য ও অনুমাননির্ভর হিসাব থেকে এসেছে। সমসাময়িক নথির ঘাটতির কারণে নির্ভুল মোট সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন। আবার পরবর্তী শতকের তুলনামূলক কম মৃত্যুদণ্ডের হার দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের তীব্রতা আড়াল করাও ভুল। অতিরঞ্জিত সংখ্যা প্রত্যাখ্যান করা নিপীড়নকে ছোট করে দেখা নয়। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি কারাবাস, সম্পত্তি হারানো, নির্বাসন ও সামাজিক কলঙ্কের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলেই ব্যবস্থাটির ব্যাপক ক্ষতি বোঝা যায়।
১৪৯৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তোরকেমাদা মারা যান, কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে শক্তিশালী হওয়া প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। পরবর্তী সাহিত্য, চিত্রকলা ও রাজনৈতিক প্রচার তাঁকে অসহিষ্ণুতার প্রতীকে পরিণত করে; কিছু জনপ্রিয় কাহিনিতে তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকা অতিরঞ্জিতও হয়েছে। তবু তাঁর দায় কেবল পরবর্তী কল্পনার সৃষ্টি নয়। তিনি এমন বিচারব্যবস্থার বিস্তার ও নিয়মায়নে নেতৃত্ব দেন, যেখানে বিশ্বাস যাচাইয়ের নামে বংশপরিচয়, দৈনন্দিন অভ্যাস ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক তদন্তের বিষয় হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পরও থেকে যায় সেই মৌলিক সমস্যা: সন্দেহ যখন প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা পায়, অভিযুক্ত মানুষ কীভাবে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করবেন?
স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের পটভূমি: সহাবস্থান থেকে ধর্মীয় নিপীড়ন
মোয়াই মূর্তি কীভাবে সরানো হয়েছিল? বিশাল পাথরের দৈত্য পরিবহনের রহস্য
নাবাতীয় সভ্যতা: মরুভূমির বাণিজ্যপথে গড়ে ওঠা ধনী রাজ্যের ইতিহাস
অ্যাজটেক পতনের পর মেক্সিকো: স্প্যানিশ শাসন ও আদিবাসী উত্তরাধিকার