বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন: ১৯৯১ সালে পরাশক্তি ভেঙে ১৫টি রাষ্ট্র হওয়ার ইতিহাস

সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন: ১৯৯১ সালে পরাশক্তি ভেঙে ১৫টি রাষ্ট্র হওয়ার ইতিহাস
১৯৯১ সালে সোভিয়েত পরাশক্তির চূড়ান্ত পতন

১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মস্কোর ক্রেমলিনের ওপর থেকে লাল হাতুড়ি-কাস্তে চিহ্নিত সোভিয়েত পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়। কিছুক্ষণ আগে টেলিভিশন ভাষণে মিখাইল গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁর হাতে থাকা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ রুশ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরদিন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর পরিষদ রাষ্ট্রটির বিলুপ্তি স্বীকার করে। প্রায় সাত দশক ধরে টিকে থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা একটি পরাশক্তি কোনো বিদেশি আক্রমণে নয়, নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরকার সংকটে ভেঙে পড়েছিল।

১৯২২ সালে রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ ও ট্রান্সককেশীয় ফেডারেশনকে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী কয়েক দশকে এর সীমানা ও প্রশাসনিক কাঠামো বদলে শেষ পর্যন্ত ১৫টি ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়। সংবিধানে এসব প্রজাতন্ত্রকে স্বেচ্ছায় গঠিত ফেডারেশনের সদস্য এবং বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারসম্পন্ন বলে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল মস্কো ও কমিউনিস্ট পার্টির হাতে। স্থানীয় সরকার, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ করত।

সোভিয়েত রাষ্ট্র দ্রুত শিল্পায়ন, নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে বিজয়, মহাকাশ অভিযান এবং পারমাণবিক সামরিক শক্তি অর্জনের মাধ্যমে পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু এসব সাফল্যের পেছনে ছিল কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ, বিপুল সামরিক ব্যয় এবং জনগণের ভোগ্যপণ্যের চাহিদাকে গৌণ করে রাখার নীতি। ১৯৭০-এর দশকের শেষ থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। উৎপাদনব্যবস্থা আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে ধীর ছিল, কৃষিতে বিপুল বিনিয়োগের পরও খাদ্য আমদানি করতে হতো এবং কারখানাগুলো উৎপাদনের মানের বদলে নির্ধারিত সংখ্যা পূরণে বেশি গুরুত্ব দিত।

তেল ও গ্যাস রপ্তানি সোভিয়েত অর্থনীতিকে কিছু সময়ের জন্য টিকিয়ে রাখলেও তা কাঠামোগত দুর্বলতা আড়াল করেছিল। ১৯৮০-এর দশকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে আফগানিস্তানের যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, পূর্ব ইউরোপের মিত্ররাষ্ট্রগুলোকে সহায়তা এবং বিশাল সামরিক ব্যবস্থার ব্যয় অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ায়। দোকানে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি, দীর্ঘ সারি এবং নিম্নমানের সেবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

১৯৮৫ সালে ক্ষমতায় এসে মিখাইল গর্বাচেভ পেরেস্ত্রোইকা বা পুনর্গঠন এবং গ্লাসনস্ত বা উন্মুক্ততার নীতি গ্রহণ করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা নয়, বরং সংস্কারের মাধ্যমে বাঁচানো। কিন্তু অর্থনীতিতে আংশিক বাজারনীতি চালু করে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার পুরোনো কাঠামো পুরোপুরি বাতিল না করায় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় আরও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কারখানাগুলো সীমিত স্বাধীনতা পেলেও মূল্য, কাঁচামাল ও বণ্টনের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে যায়। ফলে ঘাটতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং কালোবাজার বৃদ্ধি পায়।

গ্লাসনস্ত মানুষের সামনে এমন সত্য তুলে ধরে, যা বহু দশক ধরে রাষ্ট্র গোপন রেখেছিল। স্তালিনের দমননীতি, বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির, দুর্ভিক্ষ, চেরনোবিল দুর্ঘটনা, সরকারি দুর্নীতি এবং আফগান যুদ্ধের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বাড়লে কমিউনিস্ট পার্টির নৈতিক কর্তৃত্ব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আনুগত্য শুধু অর্থনৈতিক ব্যর্থতার কারণে নষ্ট হয়নি; সরকারি ইতিহাস ও প্রচারণার প্রতি দীর্ঘদিনের বিশ্বাসও ভেঙে গিয়েছিল।

উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর জাতীয় পরিচয় ও পুরোনো ক্ষোভকে সামনে নিয়ে আসে। এস্তোনিয়া, লাতভিয়া ও লিথুয়ানিয়ায় স্বাধীনতা আন্দোলন সবচেয়ে সংগঠিত রূপ নেয়। বাল্টিক জনগণ মনে করত, ১৯৪০ সালে সোভিয়েত অন্তর্ভুক্তি ছিল অবৈধ দখল। ১৯৮৯ সালের আগস্টে প্রায় দুই মিলিয়ন মানুষ তিনটি প্রজাতন্ত্রজুড়ে হাত ধরে বাল্টিক ওয়ে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে। ১৯৯০ সালের ১১ মার্চ লিথুয়ানিয়া প্রথম সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।

মস্কো লিথুয়ানিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এবং ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে ভিলনিয়ুসে সোভিয়েত বাহিনীর অভিযানে বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। কিন্তু এ ধরনের শক্তি প্রয়োগ স্বাধীনতার আন্দোলন থামাতে পারেনি; বরং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ায়। লাতভিয়া ও এস্তোনিয়াও স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যায়। ককেশাস অঞ্চলে জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং ভূখণ্ডগত সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। নাগোরনো-কারাবাখ নিয়ে আর্মেনীয় ও আজারবাইজানিদের বিরোধ সহিংস রূপ নেয়।

একই সময়ে রাশিয়ার ভেতরেই বরিস ইয়েলৎসিন গর্বাচেভের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। একসময় কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপদস্থ নেতা ইয়েলৎসিন নিজেকে দ্রুত সংস্কার, গণতন্ত্র ও রুশ সার্বভৌমত্বের প্রবক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালের জুনে রুশ সোভিয়েত ফেডারেটিভ প্রজাতন্ত্র নিজস্ব আইনের সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী প্রজাতন্ত্র রাশিয়াই যখন কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে, তখন ইউনিয়নের ভিত্তি কার্যত ভেতর থেকে ভেঙে যেতে থাকে।

গর্বাচেভ একটি নতুন ইউনিয়ন চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। পরিকল্পনা ছিল, প্রজাতন্ত্রগুলোকে অধিক স্বায়ত্তশাসন দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি শিথিল ফেডারেশন বা কনফেডারেশনে রূপান্তর করা। ১৯৯১ সালের মার্চে নয়টি প্রজাতন্ত্রে অনুষ্ঠিত গণভোটে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি নবায়িত ইউনিয়ন বজায় রাখার পক্ষে ভোট দেয়। তবে বাল্টিক প্রজাতন্ত্র, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও মলদোভা এই গণভোটে অংশ নেয়নি। ফলে ফলাফল ঐক্যের ইচ্ছা দেখালেও রাষ্ট্রের গভীর বিভাজন দূর করতে পারেনি।

নতুন ইউনিয়ন চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক আগে রক্ষণশীল কমিউনিস্ট নেতা, সামরিক কর্মকর্তা ও কেজিবির শীর্ষ ব্যক্তিদের একটি দল ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করে। ১৯৯১ সালের ১৯ আগস্ট তারা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে জানায়, গর্বাচেভ অসুস্থ হওয়ায় দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। বাস্তবে ক্রিমিয়ায় অবকাশযাপনরত গর্বাচেভকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে গৃহবন্দী করা হয়েছিল। অভ্যুত্থানকারীদের উদ্দেশ্য ছিল নতুন চুক্তি ঠেকানো, কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনা এবং প্রজাতন্ত্রগুলোর স্বাধীনতার আন্দোলন দমন করা।

মস্কোর রাস্তায় ট্যাংক নামলেও অভ্যুত্থানকারীরা দৃঢ় নেতৃত্ব বা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেখাতে পারেনি। বরিস ইয়েলৎসিন রুশ পার্লামেন্ট ভবন বা হোয়াইট হাউসের সামনে একটি ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে জনগণ ও সেনাবাহিনীকে অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করার আহ্বান জানান। হাজার হাজার মানুষ ভবনটির চারপাশে ব্যারিকেড তৈরি করে। সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তিন দিনের মধ্যেই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় এবং গর্বাচেভ মস্কোতে ফিরে আসেন।

কিন্তু গর্বাচেভ ফিরে এলেও তাঁর রাজনৈতিক ক্ষমতা আর আগের অবস্থায় ছিল না। ব্যর্থ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে ইয়েলৎসিন দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম রাশিয়ায় স্থগিত করা হয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রুশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। প্রজাতন্ত্রগুলোর কাছে আগস্টের ঘটনা প্রমাণ করেছিল, রক্ষণশীল শক্তি আবারও স্বৈরশাসন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে। তাই একের পর এক প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা ঘোষণা করতে শুরু করে।

১৯৯১ সালের ২৪ আগস্ট ইউক্রেন স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত গণভোটে ইউক্রেনের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয়; এমনকি রুশভাষী অধ্যুষিত বহু এলাকাতেও সমর্থন ছিল শক্তিশালী। ইউক্রেন ছিল জনসংখ্যা, কৃষি, শিল্প, সামরিক সম্পদ এবং ভৌগোলিক গুরুত্বে ইউনিয়নের দ্বিতীয় প্রধান প্রজাতন্ত্র। ইউক্রেনের গণভোটের পর রাশিয়া ও ইউক্রেনকে নিয়ে কোনো কার্যকর সোভিয়েত ইউনিয়ন বজায় রাখা বাস্তবে অসম্ভব হয়ে পড়ে।

১৯৯১ সালের ৮ ডিসেম্বর রাশিয়ার বরিস ইয়েলৎসিন, ইউক্রেনের লিওনিদ ক্রাভচুক এবং বেলারুশের স্তানিস্লাভ শুশকেভিচ বেলারুশের বেলাভেজা অরণ্যে বৈঠক করেন। তাঁরা ঘোষণা করেন, ১৯২২ সালের চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক আইন ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে আর বিদ্যমান নেই। একই সঙ্গে তাঁরা স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের কমনওয়েলথ বা সিআইএস গঠনের চুক্তি করেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় গর্বাচেভকে কার্যত পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

২১ ডিসেম্বর কাজাখস্তানের আলমা-আতায় আরও আটটি প্রজাতন্ত্র সিআইএসে যোগ দেয়। বাল্টিকের তিন দেশ এবং জর্জিয়া তখন এতে অংশ নেয়নি। অংশগ্রহণকারী নেতারা সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসান এবং পারমাণবিক অস্ত্রের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে সমন্বয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সোভিয়েত কেন্দ্রীয় সরকার তখন নামমাত্র অস্তিত্বশীল হলেও তার ভূখণ্ড, রাজস্ব, প্রশাসন ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেছিল।

২৫ ডিসেম্বর গর্বাচেভ পদত্যাগ করেন এবং পরদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি সম্পন্ন হয়। ভেঙে যাওয়া রাষ্ট্র থেকে জন্ম নেয় ১৫টি স্বাধীন দেশ—রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, মলদোভা, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান। রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্থায়ী আসন এবং অধিকাংশ বৈদেশিক সম্পদ ও দায়িত্ব গ্রহণ করে।

পারমাণবিক অস্ত্র রাশিয়ার পাশাপাশি ইউক্রেন, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের ভূখণ্ডেও ছিল। পরবর্তী চুক্তির মাধ্যমে তিনটি প্রজাতন্ত্র অস্ত্রগুলো রাশিয়ায় স্থানান্তর করে এবং পারমাণবিক অস্ত্রবিহীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যোগ দেয়। একই সময়ে সাবেক সোভিয়েত সেনাবাহিনী, সীমান্ত, ঋণ, জ্বালানি অবকাঠামো ও শিল্পসম্পদ ভাগ করা জটিল সমস্যায় পরিণত হয়। অনেক অঞ্চলে প্রশাসনিক সীমারেখা নতুন আন্তর্জাতিক সীমান্ত হওয়ায় জাতিগত ও ভূখণ্ডগত বিরোধও তীব্র হয়ে ওঠে।

পতনের পর সাধারণ মানুষের জীবন রাতারাতি উন্নত হয়নি। কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ায় উৎপাদন কমে যায়, মূল্যনিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার পর ব্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং বহু মানুষের সঞ্চয় মূল্যহীন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ দ্রুত বেসরকারীকরণের সুযোগে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি বিপুল সম্পদের মালিক হন। অন্যদিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, উন্মুক্ত সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়। একই ঘটনা কারও কাছে স্বাধীনতা ও জাতীয় পুনর্জন্ম, আবার কারও কাছে নিরাপত্তা, পরিচিত জীবনব্যবস্থা ও পরাশক্তির মর্যাদা হারানোর প্রতীক হয়ে ওঠে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কোনো একক নেতা, একটি সংস্কার কিংবা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের চাপের ফল ছিল না। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সামরিক ব্যয়ের বোঝা, কমিউনিস্ট পার্টির বৈধতা সংকট, জাতীয়তাবাদের উত্থান, গর্বাচেভের অসম্পূর্ণ সংস্কার, ইয়েলৎসিনের ক্ষমতার লড়াই এবং আগস্ট অভ্যুত্থানের ব্যর্থতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। যে সংস্কার রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করার জন্য শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং প্রজাতন্ত্রগুলোকে স্বাধীনতার বাস্তব সুযোগ এনে দেয়।

১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধের দুই-মেরুবিশ্বও শেষ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ইউরোপ ও এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যায়। কিন্তু সোভিয়েত পতনের উত্তরাধিকার তখনই শেষ হয়নি। নতুন রাষ্ট্রগুলোর সীমান্ত, রুশভাষী জনগোষ্ঠী, নিরাপত্তা, সামরিক জোট এবং মস্কোর হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা পরবর্তী বহু সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে। তাই ১৯৯১ শুধু একটি রাষ্ট্রের সমাপ্তি নয়; এটি এমন এক ঐতিহাসিক মোড়, যার প্রভাব আজও ইউরোপ, মধ্য এশিয়া এবং বিশ্বরাজনীতির গভীরে সক্রিয় রয়েছে।