অ্যাজটেক পতনের পর মেক্সিকো: স্প্যানিশ শাসন ও আদিবাসী উত্তরাধিকার
সিরিজ: অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন
টেনোচটিটলানের ধ্বংসাবশেষের ওপর নতুন নগরী, মানুষের জীবনে পুরোনো উত্তরাধিকার।
১৩ আগস্ট ১৫২১ সালে কুয়াউতেমোক বন্দি হওয়ার পর টেনোচটিটলানের সংগঠিত প্রতিরোধ থেমে গেলেও মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। আগের অধ্যায়ে যে বিধ্বস্ত রাজধানী রেখে এসেছি, সেখানে তখন আশ্রয়, খাদ্য, পানীয় জল এবং মৃতদের সৎকারের সমস্যা প্রকট। বিজয়ীদের সামনে ছিল সম্পদ উদ্ধার ও শাসন প্রতিষ্ঠার কাজ; বেঁচে থাকা অধিবাসীদের সামনে ছিল জীবন পুনর্গঠনের সংগ্রাম। অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের পতন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙেছিল, কিন্তু তার মানুষকে ইতিহাস থেকে মুছে দেয়নি। পরবর্তী মেক্সিকো গড়ে উঠবে তাদের শ্রম, প্রতিরোধ ও অভিযোজনের মধ্য দিয়েই।
ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর স্থানে নতুন রাজধানী নির্মাণ ছিল একই সঙ্গে ব্যবহারিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। পুরোনো টেনোচটিটলান উপত্যকার কেন্দ্রে অবস্থিত এবং সড়ক, জলপথ ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেই অবস্থান ধরে রেখে স্প্যানিশরা মেক্সিকো সিটি গড়ে তোলে। পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনার পাথর নতুন নির্মাণে ব্যবহৃত হয়; প্রশাসনিক ভবন ও গির্জা বিজেতাদের কর্তৃত্ব দৃশ্যমান করে। নতুন নগরী নির্মাণে আদিবাসী শ্রমিক ও কারিগরদের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। যাদের রাজধানী ধ্বংস করা হয়েছিল, তাদের অনেককেই পরিবর্তিত নগরীর নির্মাণ ও সরবরাহের কাজে যুক্ত হতে হয়।
তবে হ্রদ ও খাল এক দিনে অদৃশ্য হয়ে যায়নি। ঔপনিবেশিক যুগের শুরুতে ক্যানো চলাচল, কৃষিজমি এবং পানি নিয়ন্ত্রণের পুরোনো জ্ঞান এখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যুদ্ধের ক্ষতি, নতুন নির্মাণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জলব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বন্যা মোকাবিলায় নিষ্কাশন প্রকল্প এবং নগর সম্প্রসারণ হ্রদভূমির চরিত্র আরও বদলে দেয়। আজকের স্থলনির্ভর মেক্সিকো সিটিকে ১৫২১ সালের তাৎক্ষণিক ফল ভাবলে দীর্ঘ পরিবেশগত পরিবর্তন আড়াল হয়। পুরোনো জলনগরীর রূপান্তর ছিল বহু প্রজন্মের প্রক্রিয়া।
স্প্যানিশ কর্তৃত্বও প্রথমে স্থির ও একক ছিল না। কোর্তেস বিজেতা হিসেবে ক্ষমতা পেলেও রাজমুকুট তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাব সীমিত করতে চাইছিল। প্রশাসনিক ও বিচারিক পরিষদ আউদিয়েন্সিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়, তারপর ১৫৩৫ সালে নিউ স্পেনের ভাইসরয় শাসনব্যবস্থা গঠিত হয়। প্রথম ভাইসরয় ছিলেন আন্তোনিও দে মেন্দোসা। রাজধানীর প্রশাসন থেকে বিস্তৃত অঞ্চল শাসনের কাঠামো তৈরি হলেও সর্বত্র নিয়ন্ত্রণ সমান ছিল না। টেনোচটিটলানের পতনের পরও অন্যান্য অঞ্চলে অভিযান, বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ চলেছিল; পুরো বর্তমান মেক্সিকো একই দিনে বিজিত হয়নি।
প্রথম দিকের ঔপনিবেশিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ছিল এনকোমিয়েন্দা। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে কর ও সেবা গ্রহণের অধিকার কোনো স্প্যানিশ ব্যক্তিকে দেওয়া হতো। বিনিময়ে সুরক্ষা ও খ্রিস্টীয় শিক্ষার দায়িত্ব থাকার কথা ছিল। এনকোমিয়েন্দা আইনগতভাবে জমি বা মানুষের সরাসরি মালিকানা দেওয়ার সমার্থক নয়, কিন্তু বাস্তবে এটি গুরুতর শোষণের সুযোগ সৃষ্টি করে। খাদ্য, কাপড়, পণ্য এবং শ্রমের দাবি আদিবাসী পরিবারকে চাপে ফেলত। পুরোনো করসংগ্রহের কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে নতুন প্রভুদের সুবিধায় ব্যবহার করা হয়।
আদিবাসীদের শ্রমনিয়ন্ত্রণ শুধু এই একটি ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধবন্দিদের দাসত্ব, নির্মাণকাজ, কৃষি এবং খনির শ্রম বিভিন্ন সময়ে নানা নিয়মে সংগঠিত হয়। পরে পর্যায়ক্রমে বাধ্যতামূলক শ্রম সংগ্রহের রেপার্তিমিয়েন্তো ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়। স্প্যানিশ রাজমুকুটের ১৫৪২ সালের নতুন আইন আদিবাসী দাসত্ব ও বিজেতাদের ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নেয়, কিন্তু বাস্তবায়নে বাধা ছিল। আইন থাকা আর শোষণ বন্ধ হওয়া এক বিষয় নয়। স্থানীয় কর্মকর্তার স্বার্থ, দূরত্ব এবং অভিযোগ জানানোর অসুবিধা মানুষের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত করতে পারত।
জনসংখ্যার বিপর্যয় এই সমাজকে আরও দুর্বল করে। ১৫২০ সালের গুটিবসন্তের পর হামসহ নতুন সংক্রমণ এবং পরবর্তী মহামারি বারবার আঘাত হানে। বিশেষভাবে ১৫৪৫ ও ১৫৭৬ সালের কোকোলিৎসতলি মহামারি ব্যাপক প্রাণহানি ঘটায়; তবে ওই নামের রোগগুলোর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে গবেষণা এখনও বিতর্কিত। সব মহামারিকে গুটিবসন্ত বলা ভুল। প্রাক্বিজয় জনসংখ্যা ও পরবর্তী ক্ষতির অনুমানেও বড় পার্থক্য আছে। তা সত্ত্বেও ষোড়শ শতকে আদিবাসী জনসংখ্যার ভয়াবহ পতন নিয়ে সন্দেহ নেই।
এই পতনকে শুধু অপরিচিত জীবাণুর ফল বললেও ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থাকে। যুদ্ধ, খাদ্যাভাব, শ্রমের চাপ, স্থানচ্যুতি এবং পরিচর্যার ব্যাঘাত রোগের ক্ষতি বাড়িয়েছিল। জনগণ কমে গেলে চাষ ও খাদ্য সরবরাহ দুর্বল হতো; সেই দুর্বলতা আবার অসুস্থতা ও অপুষ্টি বাড়াত। প্রশাসনের উদ্যোগে মানুষকে কেন্দ্রীভূত বসতিতে স্থানান্তরও সামাজিক সম্পর্ক ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। মহামারি ও ঔপনিবেশিক শোষণ পরস্পরের ক্ষতি বাড়াতে পারত। এটি কোনো জনগোষ্ঠীর সহজাত দুর্বলতার ইতিহাস নয়; বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার ইতিহাস।
ধর্মীয় পরিবর্তন ছিল শাসন প্রতিষ্ঠার আরেকটি প্রধান ক্ষেত্র। ১৫২৪ সালে ফ্রান্সিসকান ধর্মপ্রচারকদের গুরুত্বপূর্ণ দল আসে; পরে ডোমিনিকান ও অগাস্টিনিয়ানরাও কাজ শুরু করেন। মন্দির ধ্বংস, দেবমূর্তি অপসারণ, গির্জা নির্মাণ এবং ব্যাপক ধর্মান্তরের মাধ্যমে পুরোনো ধর্মীয় কর্তৃত্ব ভাঙার চেষ্টা চলে। কিন্তু খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ মানেই সব পূর্ববিশ্বাস সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হওয়া নয়। পরিবার, উৎসব ও স্থানীয় আচারে পুরোনো ধারণা রূপান্তরিত হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে অনেকে নতুন ধর্মকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিল; অভিজ্ঞতা সবার এক ছিল না।
ধর্মযাজকদের ভূমিকাও একরকম ছিল না। কেউ স্থানীয় আচার দমন করতেন, কেউ ভাষা শিখে শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রচার চালাতেন; আবার কিছু ব্যক্তি আদিবাসীদের ওপর অত্যাচারের বিরোধিতা করেন। ত্লাতেলোলকোর শিক্ষাকেন্দ্রে নাহুয়া শিক্ষার্থীরা লাতিন অক্ষর, ধর্মীয় পাঠ ও নতুন লেখার পদ্ধতি শেখে। এই শিক্ষাকে শুধু মুক্তির সুযোগ কিংবা শুধু সাংস্কৃতিক ধ্বংস—কোনোটিই এককভাবে বলা যায় না। উপনিবেশের লক্ষ্য পূরণের জন্য তৈরি প্রতিষ্ঠান থেকেই আদিবাসী লেখকেরা নিজেদের ভাষা, ইতিহাস ও সমাজের বিবরণ সংরক্ষণের উপায় পান।
পুরোনো নগররাষ্ট্র আলতেপেতল এবং স্থানীয় নেতৃত্বও সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়নি। বহু জায়গায় আদিবাসী শাসক ও অভিজাত পরিবার নতুন প্রশাসনে ভূমিকা রাখে। কর সংগ্রহ, জমির ব্যবহার ও জনসমাজ পরিচালনায় তাদের জ্ঞান দরকার ছিল। স্প্যানিশদের যুদ্ধকালীন মিত্রদের কেউ কেউ বিশেষ সুবিধা বা স্বীকৃতি দাবি করে। তবে কিছু অভিজাতের অবস্থান টিকে থাকা মানেই সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ থাকা নয়। রাজমুকুটের অধীনতা, করের দাবি ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে এই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনভাবে কাজ করছিল।
আদিবাসীরা নিজেদের অধিকার রক্ষায় ঔপনিবেশিক আদালতও ব্যবহার করেছে। জমির দলিল, বংশপরিচয় এবং চিত্রলিপির নথি দিয়ে কর ও শ্রমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হতো। ১৫৩১ সালের হুয়েহোৎসিনকো কোডেক্স অতিরিক্ত দাবির বিরুদ্ধে আইনি বিরোধের পরিচিত নিদর্শন। ১৫৭১ সালের সান সালভাদোর হুয়েহোৎসিনকোর নথিতেও নির্যাতন ও কম পারিশ্রমিকের অভিযোগ রয়েছে। তারা শুধু শাসনের শিকার ছিল না; উপলব্ধ সুযোগ ব্যবহার করে দাবিও জানিয়েছে। এসব মামলা ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকে ন্যায়সংগত প্রমাণ করে না, বরং তার ভেতরে প্রতিরোধের উপায় দেখায়।
অ্যাজটেক সমাজ সম্পর্কে আজকের জ্ঞানের বড় অংশেও আদিবাসী মানুষের কাজ রয়েছে। ফ্রান্সিসকান বের্নার্দিনো দে সাহাগুনের সঙ্গে নাহুয়া প্রবীণ, লেখক ও শিল্পীরা যে বিশাল গ্রন্থ প্রস্তুত করেন, তা ফ্লোরেন্টাইন কোডেক্স নামে পরিচিত। ১৫৭৭ সালে সম্পূর্ণ হওয়া এই রচনায় নাহুয়াতল ও স্প্যানিশ পাঠের পাশাপাশি বহু চিত্র রয়েছে। এটি শুধু একজন ইউরোপীয়ের লেখা নয়; নাহুয়া জ্ঞান ও স্মৃতির সম্মিলিত নথি। তবে ঔপনিবেশিক পরিস্থিতি ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যের প্রভাব থাকায় এর বিবরণও বিচার করে পড়তে হয়।
ভাষা, খাদ্য ও দৈনন্দিন অভ্যাসে উত্তরাধিকার আরও গভীরভাবে টিকে থাকে। নাহুয়াতলের বিভিন্ন রূপ এখনও ব্যবহৃত হয়; ভুট্টাভিত্তিক খাবার, বয়ন এবং আঞ্চলিক কৃষিজ্ঞানও ধারাবাহিকতা বহন করে। আধুনিক মেক্সিকোতে ঈগল ও ক্যাকটাসের প্রতীক টেনোচটিটলানের প্রতিষ্ঠাকথাকে জাতীয় পরিচয়ের অংশ করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান পুরোনো রাজধানীর স্থাপত্য ও উৎসর্গসামগ্রী উন্মোচন করছে। কিন্তু জাতীয় প্রতীকে অ্যাজটেক অতীতকে সম্মান জানানো আর জীবিত আদিবাসীদের ভাষা ও অধিকার রক্ষা করা একই কাজ নয়। ইতিহাসের উত্তরাধিকার পাথরের নিদর্শনের বাইরেও মানুষের জীবনে রয়েছে।
এই ধারাবাহিকের শুরুতে হ্রদের দ্বীপে যে নগরীর উত্থান দেখেছিলাম, তার স্বাধীন সাম্রাজ্যিক অধ্যায় শেষ হয় ১৫২১ সালে। এরপর ঔপনিবেশিক শাসন প্রায় তিন শতাব্দী ধরে সমাজকে বদলে দেয়; ১৮২১ সালে মেক্সিকোর স্বাধীনতা আসে, যদিও পুরোনো বৈষম্য সব শেষ হয়নি। ‘হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা’ কথাটি রাষ্ট্র ও নগরীর ধ্বংস বোঝাতে পারে, জীবিত উত্তরসূরিদের অনুপস্থিতি নয়। টেনোচটিটলান আজ ধ্বংসাবশেষ, দলিল ও স্মৃতিতে ফিরে আসে; আর নাহুয়া মানুষের ভাষা, শ্রম ও সাংস্কৃতিক চর্চা জানায়, সাম্রাজ্যের পতনের পরও তাদের ইতিহাস চলেছে।
কোর্তেস ও মোকতেজুমার সাক্ষাৎ: সম্রাটের বন্দিত্ব ও অ্যাজটেক সংঘাত
কোর্তেসের মেক্সিকো অভিযান: ১৫১৯ সালের আগমন ও স্থানীয় জোট
অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের উত্থান: টেনোচটিটলান ও দ্বিতীয় মোকতেজুমার মেক্সিকো
নানকিং চুক্তি ও হংকং: চীনে ব্রিটিশ প্রভাব ও অসম চুক্তির সূচনা
প্রথম আফিম যুদ্ধ: ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কাছে চিং সাম্রাজ্য কেন পরাজিত হয়েছিল?
লিন জেশু ও হুমেনে আফিম ধ্বংস: প্রথম আফিম যুদ্ধের সূচনা