বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

১৯৮৯ সালের বিপ্লব ও বার্লিন প্রাচীরের পতন: পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান

সিরিজ: স্নায়ুযুদ্ধ: দুই পরাশক্তির বিশ্বসংঘাত

১৯৮৯ সালের বিপ্লব ও বার্লিন প্রাচীরের পতন: পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান
বার্লিন প্রাচীরের পতন ও মুক্ত পূর্ব ইউরোপ

১৯৮৯ সালের শুরুতে পূর্ব ইউরোপের মানচিত্র বাইরে থেকে স্থিতিশীল মনে হলেও ভেতরে তার রাজনৈতিক ভিত্তি দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছিল। পোল্যান্ড, পূর্ব জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরিয়া, বুলগেরিয়া ও রোমানিয়ায় চার দশকের বেশি সময় ধরে কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল। একদলীয় শাসন, গোপন পুলিশ, সেন্সরশিপ এবং সোভিয়েত সামরিক শক্তি এসব সরকারকে টিকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু বছরের শেষ নাগাদ প্রায় পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। ১৯৮৯ সালের বিপ্লবগুলো দেখিয়েছিল, ভয়ভিত্তিক শাসন শক্তিশালী মনে হলেও জনগণের আনুগত্য হারালে এবং বাইরের সামরিক রক্ষাকবচ সরে গেলে তা অত্যন্ত দ্রুত পতিত হতে পারে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে মস্কোপন্থী সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। এসব রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন হলেও তাদের পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর সোভিয়েত প্রভাব ছিল প্রবল। ১৯৫৩ সালে পূর্ব জার্মানির শ্রমিক বিদ্রোহ, ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরীয় বিপ্লব এবং ১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগ স্প্রিং সোভিয়েত সামরিক শক্তিতে দমন করা হয়। এর মাধ্যমে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, কোনো দেশ মস্কোর নির্ধারিত সীমার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে সোভিয়েত বাহিনী হস্তক্ষেপ করবে।

এই নীতি পরে ব্রেজনেভ নীতি নামে পরিচিত হয়। এর মূল বক্তব্য ছিল, একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবর্তন পুরো সমাজতান্ত্রিক শিবিরের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে; তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রয়োজনে সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারে। পূর্ব ইউরোপের নেতাদের জন্য এটি ছিল ক্ষমতায় টিকে থাকার নিশ্চয়তা। বিরোধী আন্দোলনকারীদের জন্য এটি ছিল এক নির্মম বাস্তবতা—নিজেদের সরকারের পাশাপাশি তাদের সোভিয়েত ট্যাংকের সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হতো।

১৯৮০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় পরিকল্পিত অর্থনীতি পশ্চিম ইউরোপের প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে তাল রাখতে পারছিল না। অনেক দেশে বৈদেশিক ঋণ বেড়ে যায়, শিল্পকারখানা পুরোনো হয়ে পড়ে এবং খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। রাষ্ট্র নাগরিকদের কর্মসংস্থান ও মৌলিক নিরাপত্তা দিলেও রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিতে পারেনি; একই সঙ্গে উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতিও ক্রমে বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। পশ্চিমা টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে মানুষ সীমান্তের ওপারের জীবন সম্পর্কে জানতে পারছিল, ফলে সরকারি প্রচারণা আর আগের মতো কার্যকর থাকেনি।

পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তৈরি করেন মিখাইল গর্বাচেভ। ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত নেতৃত্ব গ্রহণের পর তিনি গ্লাসনস্ত, পেরেস্ত্রোইকা এবং পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের নীতি গ্রহণ করেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তিনি পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট সরকার টিকিয়ে রাখতে সামরিক শক্তি ব্যবহারে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘে তিনি বিভিন্ন দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক পথ বেছে নেওয়ার অধিকারের কথা বলেন। পরে সোভিয়েত মুখপাত্র রসিকতার সঙ্গে এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে সিনাত্রা নীতি বলেন—অর্থাৎ প্রতিটি দেশ নিজের পথে চলবে।

পরিবর্তনের প্রথম বড় অগ্রগতি ঘটে পোল্যান্ডে। সেখানে স্বাধীন ট্রেড ইউনিয়ন সলিডারিটি ১৯৮০ সাল থেকেই শ্রমিক ও বিরোধী শক্তির প্রধান সংগঠন হয়ে উঠেছিল। লেচ ওয়ালেসার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে দমন করতে ১৯৮১ সালে সামরিক আইন জারি করা হয় এবং সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু সলিডারিটির ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক, ক্যাথলিক চার্চের সমর্থন এবং পোপ দ্বিতীয় জন পলের নৈতিক প্রভাব আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখে। অর্থনৈতিক সংকট ও ধর্মঘটের মুখে সরকার শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিরোধীদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে বসে।

সমঝোতা অনুযায়ী জুনে আংশিক মুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের বেশির ভাগ আসন কমিউনিস্ট পার্টি ও তার মিত্রদের জন্য সংরক্ষিত থাকলেও উন্মুক্ত আসনগুলোতে সলিডারিটি প্রায় নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। ফলাফল দেখিয়ে দেয়, ক্ষমতাসীন সরকারের জনসমর্থন প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। আগস্টে তাদেউস মাজোভিয়েস্কি পূর্ব ইউরোপের সোভিয়েত প্রভাবাধীন অঞ্চলে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম অকমিউনিস্ট সরকারপ্রধান হন। পোল্যান্ড প্রমাণ করেছিল, মস্কো হস্তক্ষেপ না করলে আলোচনা ও নির্বাচনের মাধ্যমেও একদলীয় শাসনের অবসান সম্ভব।

হাঙ্গেরিয়ার পরিবর্তন ওপর ও নিচ—দুই দিক থেকেই এসেছিল। কমিউনিস্ট পার্টির সংস্কারপন্থীরা অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বহুদলীয় রাজনীতির দিকে অগ্রসর হয়। ১৯৫৬ সালের বিদ্রোহের নেতা ইমরে নাদকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে দেখানোর পুরোনো সরকারি ব্যাখ্যা বদলে তাঁকে জাতীয় বীর হিসেবে পুনর্বাসিত করা হয়। ১৯৮৯ সালের জুনে তাঁর পুনঃসমাধি অনুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগম হয়। এটি শুধু একজন নিহত নেতার সম্মান পুনরুদ্ধার ছিল না; সোভিয়েত দমন ও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের সরকারি ইতিহাসের প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানও ছিল।

১৯৮৯ সালের মে মাসে হাঙ্গেরি অস্ট্রিয়ার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া সরাতে শুরু করে। আগস্টের প্যান-ইউরোপিয়ান পিকনিক চলাকালে শত শত পূর্ব জার্মান নাগরিক সীমান্ত অতিক্রম করে অস্ট্রিয়ায় চলে যান। সেপ্টেম্বরে হাঙ্গেরি আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ব জার্মান শরণার্থীদের পশ্চিমে যাওয়ার অনুমতি দিলে হাজার হাজার মানুষ সেই পথ ব্যবহার করে। পূর্ব জার্মান সরকার নিজের নাগরিকদের দেশত্যাগ ঠেকাতে ব্যর্থ হয় এবং বার্লিন প্রাচীরের কার্যকারিতাও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

পূর্ব জার্মানিতে অসন্তোষ শুধু দেশত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। লাইপজিগের নিকোলাই গির্জাকে কেন্দ্র করে সোমবারের প্রার্থনা ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিক্ষোভে পরিণত হয়। অংশগ্রহণকারীরা “আমরাই জনগণ” স্লোগান দিয়ে ভ্রমণের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কার দাবি করেন। ১৯৮৯ সালের ৯ অক্টোবর লাইপজিগে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। নিরাপত্তা বাহিনী প্রস্তুত থাকলেও গণহত্যার আশঙ্কা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত গুলি চালায়নি। এই সংযম আন্দোলনের জন্য একটি নির্ধারক বিজয় ছিল।

পূর্ব জার্মান নেতা এরিখ হোনেকার কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গর্বাচেভ পূর্ব বার্লিন সফরে এসে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দেন। জনবিক্ষোভ, নাগরিকদের গণদেশত্যাগ এবং পার্টির অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে অক্টোবর মাসে হোনেকারকে সরিয়ে এগন ক্রেঞ্জকে ক্ষমতায় আনা হয়। নেতৃত্ব বদলালেও আন্দোলন থামেনি। ৪ নভেম্বর পূর্ব বার্লিনের আলেকজান্ডারপ্লাৎসে কয়েক লাখ মানুষ স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবিতে সমবেত হয়।

১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় পূর্ব জার্মান কর্মকর্তা গ্যুন্টার শাবোভস্কি এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন ভ্রমণবিধির ঘোষণা দেন। তিনি বিধিটি কখন থেকে কার্যকর হবে—এ প্রশ্নের উত্তরে অস্পষ্টভাবে বলেন, তাঁর জানা মতে এটি “অবিলম্বে” কার্যকর। বাস্তবে সীমান্তরক্ষীদের জন্য তখনো কোনো স্পষ্ট নির্দেশ পৌঁছায়নি। টেলিভিশনে ঘোষণা শোনার পর হাজার হাজার পূর্ব বার্লিনবাসী সীমান্তচৌকিতে ভিড় করতে শুরু করে। ক্রমবর্ধমান জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ না পেয়ে বোর্নহোলমার স্ট্রাসের কর্মকর্তারা রাতের দিকে ফটক খুলে দেন।

মানুষ যখন সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিম বার্লিনে প্রবেশ করে, তখন অচেনা লোকেরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, নাচে এবং আনন্দে কাঁদতে থাকে। অনেকে হাতুড়ি ও ছেনি দিয়ে প্রাচীর ভাঙতে শুরু করে। যে প্রাচীর ২৮ বছর ধরে ইউরোপের বিভাজন, বন্দিত্ব ও স্নায়ুযুদ্ধের প্রতীক ছিল, সেটি এক রাতের গণসমাবেশ এবং প্রশাসনিক বিভ্রান্তির সামনে অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রাচীরের পতন পূর্ব জার্মান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেয় এবং ১৯৯০ সালের অক্টোবরে জার্মান পুনরেকত্রীকরণের পথ খুলে দেয়।

চেকোস্লোভাকিয়ায় পরিবর্তন আসে দ্রুত ও প্রায় সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে। ১৯৮৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্রাগে ছাত্রদের বিক্ষোভে পুলিশের হামলার পর বৃহত্তর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। নাট্যকার ও ভিন্নমতাবলম্বী ভাচলাভ হাভেলের নেতৃত্বে সিভিক ফোরাম গঠিত হয়। প্রাগের ওয়েন্সেসলাস স্কয়ারে লাখো মানুষ চাবির গোছা ঝনঝনিয়ে শাসকদের বিদায়ের সময় হয়েছে বলে প্রতীকী বার্তা দেয়। ধর্মঘট ও ধারাবাহিক সমাবেশের চাপে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতার একচেটিয়া অধিকার ত্যাগ করে। ডিসেম্বরের শেষে হাভেল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রক্তপাত ছাড়াই দ্রুত পরিবর্তনের কারণে ঘটনাটি ভেলভেট বিপ্লব নামে পরিচিত হয়।

বুলগেরিয়ায় বিপ্লব তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। দীর্ঘদিনের নেতা তদোর ঝিভকভকে ১৯৮৯ সালের ১০ নভেম্বর তাঁর নিজের দলের নেতারাই সরিয়ে দেন। তুর্কি সংখ্যালঘুদের জোরপূর্বক নাম পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক অধিকার দমনের নীতি সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়িয়েছিল। ঝিভকভের পতনের পর বিক্ষোভ ও বিরোধী সংগঠন শক্তিশালী হয়, কমিউনিস্ট পার্টি নিজের নাম ও কাঠামো পরিবর্তন করে এবং বহুদলীয় নির্বাচনের পথ খুলে দেয়।

রোমানিয়ার ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিকোলাই চাউশেস্কুর ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসন, সেকুরিতাতে নামের গোপন পুলিশ এবং কঠোর অর্থনৈতিক নীতির কারণে দেশটিতে গভীর আতঙ্ক ও দারিদ্র্য তৈরি হয়েছিল। বৈদেশিক ঋণ দ্রুত পরিশোধের জন্য খাদ্য, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করা হয়, অথচ শাসকের ব্যক্তিপূজা চলতে থাকে। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে তিমিশোয়ারায় এক হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত যাজককে উচ্ছেদের প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়। হতাহতের খবর সারা দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয়।

২১ ডিসেম্বর বুখারেস্টে চাউশেস্কুর পক্ষে আয়োজিত সমাবেশ সরাসরি সম্প্রচারের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে পরিণত হয়। পরদিন সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ শাসকের পক্ষ ত্যাগ করে। চাউশেস্কু ও তাঁর স্ত্রী এলেনা পালানোর চেষ্টা করলেও ধরা পড়েন। সংক্ষিপ্ত সামরিক বিচারের পর ২৫ ডিসেম্বর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। রোমানিয়ার বিপ্লবে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য পরিবর্তন প্রধানত শান্তিপূর্ণ হলেও রোমানিয়া দেখিয়েছিল, শাসক যদি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সহিংসতার ওপর নির্ভর করেন, তবে পতনও রক্তক্ষয়ী হতে পারে।

এই সরকারগুলো এত দ্রুত ভেঙে পড়ার পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না। অর্থনৈতিক স্থবিরতা তাদের সাফল্যের দাবি দুর্বল করেছিল, সেন্সরশিপ বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছিল এবং বিরোধী সংগঠনগুলো বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করেছিল। পোল্যান্ডের নির্বাচন এক দেশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখায়, হাঙ্গেরির উন্মুক্ত সীমান্ত পূর্ব জার্মানিকে সংকটে ফেলে, বার্লিন প্রাচীরের পতন অন্য দেশের আন্দোলনকারীদের সাহস জোগায়। টেলিভিশনের যুগে একটি দেশের ঘটনা দ্রুত অন্য দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে যাচ্ছিল। ১৯৮৯ সালের বিপ্লব ছিল বিচ্ছিন্ন জাতীয় বিদ্রোহের পাশাপাশি পারস্পরিক অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠা আঞ্চলিক ঢেউ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতি। ১৯৫৬ বা ১৯৬৮ সালের মতো ট্যাংক পাঠানো হবে না—এই ধারণা স্পষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব ইউরোপের শাসকদের ভয়ের প্রধান অস্ত্রটি হারিয়ে যায়। একই সময়ে সেনাবাহিনী ও সরকারি কর্মকর্তারাও বুঝতে পারেন, অজনপ্রিয় সরকার রক্ষার জন্য মস্কো এগিয়ে আসবে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর চূড়ান্ত দমন চালানোর পরিবর্তে সমঝোতা, নিষ্ক্রিয়তা অথবা ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ বেছে নেয়।

১৯৮৯ সালের বিপ্লবগুলো শুধু কয়েকটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নির্মিত ইউরোপীয় বিভাজনকেই ভেঙে দেয়। ওয়ারশ চুক্তি ও পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত আধিপত্যের ভিত্তি অল্প সময়ের মধ্যে বিলীন হয়। বহুদলীয় নির্বাচন, বাজার অর্থনীতি এবং পশ্চিম ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নতুন যুগের সূচনা করে। তবে পরিবর্তনের পর বেকারত্ব, বৈষম্য, শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া এবং জাতিগত উত্তেজনার মতো নতুন সমস্যাও দেখা দেয়। তবু বার্লিন প্রাচীরের ওপর দাঁড়ানো আনন্দিত মানুষের দৃশ্য ইতিহাসে এমন এক মুহূর্তের প্রতীক হয়ে আছে, যখন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভয় ভেঙে পড়েছিল এবং পূর্ব ইউরোপের জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার পুনরুদ্ধার করেছিল।