বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লেইফ এরিকসন ও ভিনল্যান্ড: কলম্বাসের প্রায় ৫০০ বছর আগে ভাইকিংরা কীভাবে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিল?

সিরিজ: ভাইকিং যুগ: অভিযান, বিজয় ও নর্স সভ্যতার ইতিহাস

লেইফ এরিকসন ও ভিনল্যান্ড: কলম্বাসের প্রায় ৫০০ বছর আগে ভাইকিংরা কীভাবে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিল?
উত্তর আমেরিকায় নর্স অভিযাত্রীদের পদচিহ্ন

১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছানোর বহু শতাব্দী আগেই ইউরোপ থেকে আসা নাবিকেরা উত্তর আমেরিকার মাটিতে পা রেখেছিল। তারা ছিল উত্তর আটলান্টিকের নর্স অভিযাত্রী। আনুমানিক ১০০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে গ্রিনল্যান্ড থেকে পশ্চিমে যাত্রা করে তারা বর্তমান কানাডার ভূখণ্ডে পৌঁছায় এবং সেখানে অন্তত একটি ঘাঁটি নির্মাণ করে। এই অভিযানের সঙ্গে সবচেয়ে বিখ্যাতভাবে যুক্ত নামটি হলো লেইফ এরিকসন, গ্রিনল্যান্ডে নর্স উপনিবেশ প্রতিষ্ঠাকারী এরিক দ্য রেডের ছেলে।

দীর্ঘ সময় ধরে উত্তর আমেরিকায় ভাইকিং উপস্থিতির ইতিহাস মূলত মধ্যযুগীয় সাগার কাহিনি হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডে ল'আন্স অক্স মেডোজে নর্স বসতির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার হওয়ার পর বিষয়টি আর শুধু সাহিত্যিক ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্তমানে নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে নর্সরা কলম্বাসের যাত্রার প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে উত্তর আমেরিকায় উপস্থিত ছিল।

তবে ইতিহাসটি বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। লেইফ এরিকসনের অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ এসেছে মূলত দুটি মধ্যযুগীয় আইসল্যান্ডীয় রচনা—Saga of the Greenlanders এবং Saga of Erik the Red থেকে। এগুলো অভিযানের অনেক পরে লিখিত হয়েছিল এবং একই ঘটনার কিছু বিবরণে একে অপরের সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে। ফলে সাগায় বর্ণিত প্রতিটি ঘটনা বা ব্যক্তিগত সংলাপকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে নেওয়া যায় না। অন্যদিকে ল'আন্স অক্স মেডোজের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ উত্তর আমেরিকায় নর্স উপস্থিতির বাস্তবতা নিশ্চিত করেছে।

লেইফের জন্ম সম্ভবত দশম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। তাঁর বাবা এরিক দ্য রেড আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর গ্রিনল্যান্ড অনুসন্ধান করেন এবং আনুমানিক ৯৮৫ বা ৯৮৬ সালের দিকে সেখানে স্থায়ী নর্স বসতি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন। ফলে লেইফ এমন একটি পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যেখানে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা, নতুন ভূমি অনুসন্ধান এবং কঠিন পরিবেশে বসতি স্থাপন ছিল জীবনের বাস্তব অংশ।

নর্সরা যখন গ্রিনল্যান্ডে বসতি গড়ে তুলেছিল, তখন তাদের পশ্চিমে আরও ভূমি থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে কিছু ধারণা তৈরি হয়েছিল। Saga of the Greenlanders অনুযায়ী, বিয়ার্নি হেরইয়লফসন নামের এক নর্স নাবিক গ্রিনল্যান্ডে যাওয়ার পথে ঝড় ও প্রতিকূল বাতাসের কারণে পথ হারিয়ে পশ্চিমে অজানা ভূমি দেখতে পান। তিনি সেখানে অবতরণ করেননি, কিন্তু তাঁর দেখা বনাচ্ছন্ন উপকূলের বিবরণ পরে লেইফকে আকৃষ্ট করেছিল বলে সাগায় বলা হয়েছে।

এই কাহিনি যদি মূলত সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে উত্তর আমেরিকার উপকূল প্রথম দেখা নর্স ব্যক্তি লেইফ নন; বরং বিয়ার্নি হতে পারেন। কিন্তু লেইফ এরিকসনের নাম গুরুত্বপূর্ণ কারণ সাগার ঐতিহ্যে তিনিই পরিকল্পিতভাবে পশ্চিমের ভূমি অনুসন্ধান করতে গিয়ে সেখানে অবতরণ ও অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত।

Saga of the Greenlanders অনুযায়ী, লেইফ বিয়ার্নির জাহাজ কিনে নেন এবং প্রায় ৩৫ জনের একটি দল নিয়ে পশ্চিমে যাত্রা করেন। সাগার এই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব নয়, কিন্তু এমন অভিযানের জন্য তুলনামূলক ছোট কিন্তু দক্ষ নাবিকদলই বাস্তবসম্মত ছিল।

গ্রিনল্যান্ড থেকে পশ্চিমে যাত্রা করলে নর্স অভিযাত্রীরা প্রথম যে অঞ্চলটির মুখোমুখি হয়েছিল বলে সাগায় বর্ণিত হয়েছে, তার নাম হেলুল্যান্ড। পুরোনো নর্স ভাষায় নামটির অর্থের সঙ্গে সমতল পাথর বা পাথুরে ভূমির ধারণা যুক্ত। অধিকাংশ গবেষক হেলুল্যান্ডকে বর্তমান কানাডার ব্যাফিন দ্বীপের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। তবে সাগার ভূগোলকে আধুনিক মানচিত্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ নির্ভুলভাবে মিলিয়ে দেওয়া সবসময় সম্ভব নয়।

আরও দক্ষিণে তারা পৌঁছায় মার্কল্যান্ডে, যার নামের অর্থ মোটামুটি “বনের ভূমি”। এটিকে সাধারণত কানাডার ল্যাব্রাডর অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। গ্রিনল্যান্ডের নর্সদের জন্য এমন বনাঞ্চলের বিশেষ গুরুত্ব ছিল, কারণ তাদের নিজস্ব বসতিতে বড় নির্মাণকাজের উপযোগী কাঠের অভাব ছিল। উত্তর আমেরিকার বন তাই তাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হতে পারত।

এরপর তারা আরও দক্ষিণে এমন এক অঞ্চলে পৌঁছায়, যাকে সাগায় ভিনল্যান্ড বলা হয়েছে। এই নামের ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক হয়েছে। জনপ্রিয় ব্যাখ্যায় Vinland-কে “আঙুরের দেশ” বলা হয়, কারণ সাগায় বুনো আঙুর বা আঙুরজাতীয় ফলের উল্লেখ রয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং সাগার বিবরণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে, তবে নামটির সঙ্গে আঙুরের সম্পর্কই ঐতিহাসিকভাবে বহুল স্বীকৃত ব্যাখ্যা।

সমস্যা হলো, ভিনল্যান্ড ঠিক কোথায় ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। সাগার ভৌগোলিক বিবরণ বর্তমান নিউফাউন্ডল্যান্ড, সেন্ট লরেন্স উপসাগর এবং আরও দক্ষিণের অঞ্চল নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করেছে। ল'আন্স অক্স মেডোজে নর্স ঘাঁটি পাওয়া গেছে বলে সেটিই সাগার পুরো ভিনল্যান্ড অঞ্চল—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। এটি সম্ভবত নর্সদের বৃহত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় অনুসন্ধান ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল।

নর্সদের জন্য উত্তর আমেরিকার আকর্ষণ শুধু নতুন ভূমি আবিষ্কারের রোমাঞ্চ ছিল না। গ্রিনল্যান্ডে কাঠ ছিল সীমিত, আর উত্তর আমেরিকার উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বন ছিল প্রচুর। পশুর চামড়া, খাদ্য, শিকার এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত। তাই পশ্চিমের যাত্রাকে শুধু অভিযাত্রার ইতিহাস হিসেবে নয়, সম্পদ অনুসন্ধান ও গ্রিনল্যান্ডীয় নর্স অর্থনীতির সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখা দরকার।

সাগায় লেইফের একটি শীতকাল উত্তর আমেরিকায় কাটানোর কথা বলা হয়েছে। তাঁর দলের তৈরি স্থাপনাকে Leifsbúðir বা “লেইফের ঘর” নামে উল্লেখ করা হয়। তারা পরবর্তী গ্রীষ্মে গ্রিনল্যান্ডে ফিরে যায় এবং সঙ্গে মূল্যবান কাঠসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে যায় বলে কাহিনিতে বলা হয়েছে।

কিন্তু লেইফের অভিযান ছিল নর্সদের পশ্চিমমুখী যাত্রার শেষ অধ্যায় নয়। তাঁর পর পরিবারের অন্য সদস্য এবং গ্রিনল্যান্ডের আরও নর্স অভিযাত্রী উত্তর আমেরিকার দিকে যাত্রা করেন বলে সাগাগুলো বর্ণনা করে।

লেইফের ভাই থরভাল্ড এরিকসন একটি পরবর্তী অভিযানের সঙ্গে যুক্ত। সাগায় তাঁর দল ও স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষের বিবরণ রয়েছে এবং থরভাল্ড নিহত হন বলে বলা হয়েছে। আবার থরফিন কার্লসেফনি নামে এক আইসল্যান্ডীয় বণিক ও অভিযাত্রীর নেতৃত্বে আরও বড় একটি দল ভিনল্যান্ডে স্থায়ী বসতি তৈরির চেষ্টা করেছিল বলে সাগায় উল্লেখ আছে।

এই অভিযানে নারী ও গবাদিপশু থাকার বিবরণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যদি সাগার মূল কাঠামো সঠিক হয়, তাহলে এটি শুধু মৌসুমি শিকার বা কাঠ সংগ্রহের অভিযান ছিল না; অন্তত কিছু নর্স স্থায়ী উপনিবেশ তৈরির সম্ভাবনা পরীক্ষা করেছিল।

এই কাহিনির সঙ্গে যুক্ত আরেক বিখ্যাত চরিত্র গুডরিড থরবিয়ারনারদোত্তির। সাগা অনুযায়ী, তিনি থরফিন কার্লসেফনির স্ত্রী ছিলেন এবং ভিনল্যান্ড অভিযানে অংশ নেন। তাঁদের ছেলে স্নোরি থরফিনসন সেখানে জন্মেছিল বলে মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যে উল্লেখ রয়েছে। যদি এই বিবরণ ঐতিহাসিকভাবে সঠিক হয়, তবে সে উত্তর আমেরিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম দিকের পরিচিত ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত শিশুদের একজন।

নর্স উৎসে উত্তর আমেরিকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সাধারণত স্ক্রেলিং নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই শব্দটি বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে এবং আধুনিক পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক নয়। নর্সদের মুখোমুখি হওয়া জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট পরিচয় অঞ্চল ও সময়ের ওপর নির্ভর করেছিল।

সাগায় প্রথমে বাণিজ্য এবং পরে সংঘর্ষের বিবরণ পাওয়া যায়। নর্সরা স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কাপড় ও অন্যান্য পণ্যের বিনিময়ে পশুর চামড়া গ্রহণ করেছিল বলে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সম্পর্ক দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। সংখ্যায় তুলনামূলক কম নর্সদের জন্য দূরবর্তী গ্রিনল্যান্ড থেকে সাহায্য ছাড়া বড় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষ চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন ছিল।

এটিই সম্ভবত ভিনল্যান্ডে স্থায়ী নর্স উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণগুলোর একটি। তবে শুধু সংঘর্ষকে কারণ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। গ্রিনল্যান্ড নিজেই ছিল ছোট জনসংখ্যার একটি দূরবর্তী উপনিবেশ। সেখান থেকে আরও কয়েক শত কিলোমিটার পশ্চিমে নতুন উপনিবেশকে নিয়মিত মানুষ, খাদ্য, সরঞ্জাম ও জাহাজ দিয়ে সহায়তা করা কঠিন ছিল।

এ ছাড়া নর্সদের হয়তো উত্তর আমেরিকায় স্থায়ী রাষ্ট্র বা বৃহৎ উপনিবেশ তৈরির প্রয়োজনই ছিল না। কাঠ ও অন্যান্য সম্পদ সংগ্রহের জন্য মৌসুমি অভিযান এবং অস্থায়ী ঘাঁটি তাদের উদ্দেশ্যের জন্য যথেষ্ট হতে পারত।

এই সমস্ত সাহিত্যিক কাহিনির বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণটি পাওয়া যায় বিংশ শতাব্দীতে। ১৯৬০-এর দশকে নরওয়েজীয় অভিযাত্রী ও গবেষক হেলগে ইংস্তাদ এবং প্রত্নতত্ত্ববিদ আনে স্তিনে ইংস্তাদ কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের উত্তর প্রান্তে ল'আন্স অক্স মেডোজ এলাকায় একটি নর্স প্রত্নস্থল শনাক্ত করেন।

খননে ঘাসের চাপড়ে তৈরি একাধিক ভবনের ভিত্তি পাওয়া যায়, যেগুলোর নির্মাণরীতি গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের নর্স স্থাপত্যের সঙ্গে স্পষ্টভাবে মিলে যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল লোহা প্রক্রিয়াকরণের প্রমাণ। সেখানে একটি ছোট চুল্লিতে স্থানীয় জলাভূমি থেকে সংগৃহীত লৌহ আকরিক প্রক্রিয়াকরণের নিদর্শন পাওয়া গেছে।

এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উত্তর আমেরিকার সেই অঞ্চলের সমসাময়িক আদিবাসী সংস্কৃতিতে এই ধরনের নর্স লোহা উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতো না। পাশাপাশি নর্স ধরনের ধাতব বস্তু ও অন্যান্য নিদর্শন স্থানটির পরিচয় আরও শক্তভাবে নিশ্চিত করে।

পরবর্তী বৈজ্ঞানিক গবেষণা ঘটনাটিকে আরও নির্দিষ্ট করেছে। গাছের বলয়ে সংরক্ষিত একটি পরিচিত মহাজাগতিক বিকিরণজনিত চিহ্ন ব্যবহার করে গবেষকেরা ল'আন্স অক্স মেডোজে নর্সদের কাটা কাঠের নমুনা বিশ্লেষণ করেন। এর মাধ্যমে ১০২১ খ্রিষ্টাব্দে নর্সরা সেখানে কাঠ কাটছিল—এমন নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এটি উত্তর আমেরিকায় ইউরোপীয় উপস্থিতির প্রথম নির্ভুলভাবে নির্ধারিত তারিখগুলোর একটি।

তবে ১০২১ সালকে লেইফ এরিকসনের ব্যক্তিগত আগমনের সুনির্দিষ্ট বছর বলা যাবে না। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ দেখায় যে সেই বছরে নর্সরা ল'আন্স অক্স মেডোজে উপস্থিত ছিল; কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি তখন সেখানে ছিলেন, তা প্রত্নতত্ত্ব থেকে জানা যায় না। লেইফের সঙ্গে ভিনল্যান্ড অভিযানের সংযোগ মূলত সাগা থেকে আসে।

ল'আন্স অক্স মেডোজও সম্ভবত বিশাল স্থায়ী শহর ছিল না। প্রত্নস্থলের আকার ও কাঠামো দেখে ধারণা করা হয়, এটি একটি ছোট নর্স ঘাঁটি ছিল যেখানে কয়েক ডজন মানুষ অবস্থান করতে পারত। সেখানে জাহাজ মেরামত, কাঠের কাজ, লোহা প্রক্রিয়াকরণ এবং আরও দক্ষিণে অনুসন্ধানের প্রস্তুতি নেওয়া হতে পারে।

আরও আকর্ষণীয় হলো, স্থানটিতে এমন কিছু উদ্ভিদজাত উপাদানের প্রমাণ পাওয়া গেছে যেগুলো স্বাভাবিকভাবে নিউফাউন্ডল্যান্ডের ওই উত্তরের এলাকায় জন্মায় না, কিন্তু আরও দক্ষিণে পাওয়া যায়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে নর্স অভিযাত্রীরা ল'আন্স অক্স মেডোজে বসে ছিল না; তারা সম্ভবত আরও দক্ষিণের অঞ্চলও অনুসন্ধান করেছিল।

এই কারণে ভিনল্যান্ডকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দু হিসেবে না দেখে নর্সদের পরিচিত বৃহত্তর উত্তর আমেরিকান অঞ্চল হিসেবে ভাবা বেশি যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। ল'আন্স অক্স মেডোজ ছিল সেই নেটওয়ার্কের একটি নিশ্চিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, কিন্তু সাগায় বর্ণিত সব ঘটনা সেখানেই ঘটেছিল—এমন প্রমাণ নেই।

লেইফের অভিযানের ইতিহাসে “কলম্বাসের ৫০০ বছর আগে আমেরিকা আবিষ্কার” কথাটিও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা দরকার। উত্তর আমেরিকা তখন কোনো জনশূন্য “অনাবিষ্কৃত” মহাদেশ ছিল না। আদিবাসী জনগোষ্ঠী হাজার হাজার বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করছিল। ফলে নর্সরা আমেরিকার প্রথম মানুষ বা প্রকৃত অর্থে প্রথম আবিষ্কারক ছিল না।

ঐতিহাসিকভাবে আরও নির্ভুলভাবে বলা যায়, নর্সরা হলো বর্তমানে নিশ্চিত প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে পরিচিত প্রথম ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী যারা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছে সেখানে বসতি বা ঘাঁটি নির্মাণ করেছিল।

কলম্বাসের অভিযানের সঙ্গেও একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ১৪৯২ সালের পর ইউরোপ ও আমেরিকার মধ্যে স্থায়ী আটলান্টিক যোগাযোগ তৈরি হয় এবং এর পরিণতিতে ব্যাপক ইউরোপীয় উপনিবেশ, জনসংখ্যাগত বিপর্যয়, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। নর্সদের ভিনল্যান্ড অভিযান সেই ধরনের স্থায়ী আন্তঃমহাদেশীয় যোগাযোগ সৃষ্টি করেনি।

নর্সরা কিছু সময় উত্তর আমেরিকায় অবস্থান করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ঘাঁটি পরিত্যক্ত হয়। গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভবত কিছু সময় চলেছিল এবং কাঠ সংগ্রহের জন্য মার্কল্যান্ডে পরবর্তী নর্স যাত্রার ইঙ্গিত মধ্যযুগীয় নথিতেও পাওয়া যায়। কিন্তু উত্তর আমেরিকায় স্থায়ী নর্স রাষ্ট্র বা বৃহৎ উপনিবেশ গড়ে ওঠেনি।

তবু এই অভিযানের প্রযুক্তিগত গুরুত্ব অসাধারণ। নর্সদের কাছে আধুনিক দিকনির্দেশক, সুনির্দিষ্ট মানচিত্র বা যান্ত্রিক ইঞ্জিন ছিল না। তাদের কাঠের জাহাজ, পাল, দাঁড়, সমুদ্রের অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণের দক্ষতার ওপর নির্ভর করেই গ্রিনল্যান্ড থেকে উত্তর আমেরিকার দিকে যাত্রা করতে হয়েছিল।

এটি কোনো একক অবিশ্বাস্য লাফও ছিল না। নর্স সম্প্রসারণ ধাপে ধাপে এগিয়েছিল—স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জ ও উত্তর আটলান্টিকের দ্বীপগুলো, সেখান থেকে আইসল্যান্ড, আইসল্যান্ড থেকে গ্রিনল্যান্ড এবং অবশেষে গ্রিনল্যান্ড থেকে উত্তর আমেরিকা। প্রতিটি নতুন বসতি পরবর্তী সমুদ্রযাত্রার দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছিল এবং নাবিকদের পশ্চিমের সমুদ্র সম্পর্কে নতুন জ্ঞান দিয়েছিল।

এই ধারাবাহিকতার কারণেই লেইফ এরিকসনের গল্পকে বিচ্ছিন্ন কোনো দুঃসাহসিক অভিযান হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর যাত্রা ছিল কয়েক প্রজন্ম ধরে চলা নর্স সামুদ্রিক সম্প্রসারণের ফল। তাঁর বাবা এরিক দ্য রেড গ্রিনল্যান্ডে বসতি গড়ে না তুললে উত্তর আমেরিকায় নিয়মিত নর্স অভিযান চালানো অনেক বেশি কঠিন হতো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাহিত্য ও প্রত্নতত্ত্ব এখানে এক অসাধারণ জায়গায় এসে মিলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাগাগুলো পশ্চিমের হেলুল্যান্ড, মার্কল্যান্ড ও ভিনল্যান্ডের কথা বলেছিল। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব সাগার প্রতিটি বিবরণ প্রমাণ করেনি, কিন্তু ল'আন্স অক্স মেডোজ দেখিয়ে দিয়েছে যে এর কেন্দ্রীয় দাবিটি সত্য—মধ্যযুগীয় নর্স নাবিকেরা সত্যিই আটলান্টিক পেরিয়ে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছেছিল।

আজ লেইফ এরিকসনের নাম তাই শুধু ভাইকিং অভিযাত্রার ইতিহাসে নয়, বিশ্ব সমুদ্রযাত্রার ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। আনুমানিক এক হাজার বছর আগে গ্রিনল্যান্ডের ছোট নর্স সমাজ থেকে পশ্চিমে যাত্রা করা অভিযাত্রীরা এমন একটি মহাদেশের উপকূলে পৌঁছেছিল, যা ইউরোপীয়দের বৃহত্তর জগতের কাছে তখনও কার্যত অজানা ছিল।

তাদের উত্তর আমেরিকান উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া পদচিহ্ন হারিয়ে যায়নি। নিউফাউন্ডল্যান্ডের মাটিতে সংরক্ষিত ঘরের ভিত্তি, লোহা প্রক্রিয়াকরণের চিহ্ন এবং নর্সদের কাটা কাঠ আজ প্রমাণ করে যে কলম্বাসের ক্যারিবীয় যাত্রার প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে উত্তর আটলান্টিকের নর্স অভিযাত্রীরা উত্তর আমেরিকায় পৌঁছে সেখানে কাজ করেছিল এবং অস্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল।

লেইফ এরিকসন ও ভিনল্যান্ডের ইতিহাস তাই শুধু “কে প্রথম আমেরিকায় পৌঁছেছিল”—এই প্রতিযোগিতার গল্প নয়। এটি মানুষের সমুদ্রজ্ঞান, অভিযোজন, সম্পদের অনুসন্ধান এবং পরিচিত পৃথিবীর সীমানা অতিক্রম করার ইতিহাস। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয় যে ভাইকিং যুগের নর্সদের জগৎ স্ক্যান্ডিনেভিয়া বা ইউরোপের উপকূলে সীমাবদ্ধ ছিল না। পূর্বে তারা কনস্টান্টিনোপল পর্যন্ত পৌঁছেছিল, আর পশ্চিমে তাদের জাহাজ পৌঁছে গিয়েছিল উত্তর আমেরিকার উপকূলে—মধ্যযুগীয় বিশ্বের বিস্ময়কর এক সামুদ্রিক বিস্তারের দুই প্রান্তে।


আপনার পছন্দ হতে পারে