মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড ১৯৪৮: শান্তি ও অহিংসার প্রতীক হারানোর মর্মান্তিক ইতিহাস
৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮—অহিংসার এক বিশ্বজনীন কণ্ঠ স্তব্ধ হওয়ার দিন
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারির সন্ধ্যা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এমন এক মুহূর্ত নিয়ে এসেছিল, যার অভিঘাত শুধু একটি দেশের রাজনৈতিক জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেদিন নয়াদিল্লির বিড়লা ভবনে সন্ধ্যার প্রার্থনাসভায় যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে অহিংস প্রতিরোধ, সত্যাগ্রহ ও নৈতিক প্রতিবাদের যে ধারণাকে তিনি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিয়েছিলেন, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাস পর সেই মানুষটির হত্যাকাণ্ড নতুন রাষ্ট্রটির সামনে এক গভীর প্রশ্ন রেখে যায়—রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক ঘৃণা কত দ্রুত সহিংসতায় পরিণত হতে পারে।
গান্ধীর হত্যাকাণ্ডকে বুঝতে হলে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারির কয়েকটি মুহূর্তের দিকে তাকালেই যথেষ্ট নয়। এর পেছনে ছিল দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, উদ্বাস্তু সংকট এবং ভারত ও পাকিস্তানের জন্মকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা। ১৯৪৭ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম নেয়। স্বাধীনতার বহু প্রত্যাশিত মুহূর্ত আনন্দের পাশাপাশি নিয়ে আসে ভয়াবহ রক্তপাত। পাঞ্জাব, বাংলা, দিল্লিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হিন্দু, মুসলমান ও শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ সহিংসতার শিকার হন। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে বাধ্য হন। স্বাধীনতার উৎসবের সময় গান্ধী তাই রাজধানীর আনুষ্ঠানিক উদ্যাপনের কেন্দ্রে ছিলেন না; সাম্প্রদায়িক শান্তি প্রতিষ্ঠাই তখন তাঁর প্রধান উদ্বেগে পরিণত হয়েছিল।
১৯৪৬ সালের শেষ দিকে পূর্ব বাংলার নোয়াখালীতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পর গান্ধী সেখানে গিয়েছিলেন এবং গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বিহার, কলকাতা ও দিল্লির উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও একই ধরনের ভূমিকা নেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ শুধু বিদেশি শাসনের অবসান ছিল না; স্বাধীন ভারত যদি ধর্মীয় বিদ্বেষে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই স্বাধীনতার নৈতিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যাবে—তাঁর কর্মকাণ্ডে এই উদ্বেগ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
দেশভাগের পর দিল্লির পরিস্থিতি বিশেষভাবে অস্থির হয়ে ওঠে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা বহু হিন্দু ও শিখ উদ্বাস্তু সেখানে আশ্রয় নেন। তাঁদের অনেকেই পরিবার, সম্পদ ও পরিচিত জীবন হারিয়ে এসেছিলেন। অন্যদিকে দিল্লির মুসলমানদের একটি অংশ প্রতিশোধমূলক আক্রমণ, ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে। গান্ধী এই পরিস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে সহিংসতাকে বিচার না করে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তার পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু তাঁর এই অবস্থানই কিছু উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী মহলে প্রবল ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে।
১৯৪৮ সালের ১৩ জানুয়ারি গান্ধী দিল্লিতে অনশন শুরু করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা শান্তি রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর ১৮ জানুয়ারি তিনি অনশন ভাঙেন। এই অনশনকে ঘিরে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীগুলোর বিরোধিতা আরও তীব্র হয়। বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রাপ্য অর্থ হস্তান্তরের বিষয়টি তাঁর বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারে ব্যবহার করেছিল। তবে গান্ধীর বিরুদ্ধে সহিংস বিরোধিতার ইতিহাস কেবল এই অর্থ হস্তান্তরের প্রশ্নে শুরু হয়নি; তাঁর জীবনের ওপর এর আগেও একাধিক আক্রমণ ও আক্রমণের চেষ্টা হয়েছিল।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেতটি আসে হত্যাকাণ্ডের মাত্র দশ দিন আগে। ২০ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে বিড়লা ভবনে গান্ধীর প্রার্থনাসভার সময় একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। গান্ধী প্রাণে বেঁচে যান এবং মদনলাল পাহওয়া ঘটনাস্থলে ধরা পড়েন। পরবর্তী তদন্তে স্পষ্ট হয়, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা ছিল না; গান্ধীকে হত্যার বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে এর যোগ ছিল। এত বড় সতর্কতার পরও দশ দিনের মধ্যে হত্যাকারীরা আবার তাঁর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
এই ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর গান্ধীর নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল। বিড়লা ভবনের আশপাশে পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশও মোতায়েন ছিল। কিন্তু প্রার্থনাসভায় আসা প্রত্যেক ব্যক্তির দেহ তল্লাশির ব্যবস্থা করা হয়নি। গান্ধী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে থাকতে অনিচ্ছুক ছিলেন। ফলে ৩০ জানুয়ারি তাঁর হত্যাকারীর পক্ষে অস্ত্রসহ প্রার্থনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হয়।
হত্যাকারী নাথুরাম বিনায়ক গডসে ছিলেন মহারাষ্ট্রের একজন রাজনৈতিক কর্মী ও সম্পাদক। তিনি গান্ধীর নীতি, বিশেষ করে মুসলমানদের নিরাপত্তার পক্ষে তাঁর অবস্থান এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর বিরোধী ছিলেন। গডসে ও তাঁর সহযোগীদের রাজনৈতিক চিন্তায় গান্ধীকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো, যিনি তাঁদের মতে হিন্দুদের স্বার্থের ক্ষতি করছিলেন। হত্যার পর আদালতে গডসে নিজের কর্মকাণ্ডের পক্ষে রাজনৈতিক যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর বক্তব্য হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝার একটি উৎস হলেও তা ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ বিবরণ নয়; সেটি ছিল হত্যাকারীর নিজের কর্মকাণ্ডকে ব্যাখ্যা ও ন্যায্য প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা।
৩০ জানুয়ারির দিনটিও গান্ধীর জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত ছিল। স্বাধীনতার পর ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর চিন্তা তখনও থেমে ছিল না। কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও তিনি নতুন ধারণা লিখছিলেন। একই সঙ্গে স্বাধীন ভারতের দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা জওহরলাল নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেলের সম্পর্ক নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। দুজনের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার স্বার্থে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করা জরুরি বলে গান্ধী মনে করতেন। সেদিন বিকেলেও প্যাটেলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল।
আলোচনার কারণে সন্ধ্যার প্রার্থনাসভায় যেতে তাঁর কিছুটা দেরি হয়ে যায়। গান্ধী সময়নিষ্ঠ ছিলেন, তাই বিলম্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি দ্রুত প্রার্থনাস্থলের দিকে এগোতে থাকেন। তাঁর দুই পাশে ছিলেন মনু গান্ধী ও আভা গান্ধী। দুর্বল শরীর নিয়ে তিনি তাঁদের ওপর ভর দিয়ে বিড়লা ভবনের বাগানের মধ্য দিয়ে প্রার্থনাস্থলের দিকে হাঁটছিলেন। সেখানে প্রতিদিনের মতো বহু মানুষ তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
এই জনতার মধ্যেই অপেক্ষা করছিলেন নাথুরাম গডসে। গান্ধী কাছে এলে তিনি সামনে এগিয়ে আসেন। প্রত্যক্ষ বিবরণ অনুযায়ী, তিনি প্রথমে অভিবাদনের ভঙ্গিতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর খুব কাছ থেকে একটি পিস্তল দিয়ে পরপর তিনটি গুলি করেন। গান্ধী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটেছিল যে উপস্থিত মানুষের পক্ষে আগে থেকে প্রতিরোধ করার সুযোগ প্রায় ছিল না। গডসে ঘটনাস্থলেই আটক হন।
গান্ধী মৃত্যুর মুহূর্তে “হে রাম” উচ্চারণ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। তাঁর জীবনী ও গান্ধী-সংক্রান্ত কিছু প্রতিষ্ঠিত বিবরণে এই কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে, আবার ঘটনাস্থলের সাক্ষ্য ও পরবর্তী গবেষণায় এ বিষয়ে সম্পূর্ণ ঐকমত্য নেই। ফলে এটিকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত শেষ বাক্য হিসেবে না দেখে গান্ধীকে ঘিরে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক স্মৃতির একটি বহুল প্রচলিত অংশ হিসেবে দেখা অধিক সতর্ক। গান্ধীর মৃত্যু সম্পর্কে যে বিষয়টি নিশ্চিত, তা হলো খুব কাছ থেকে তিনটি গুলি করার পর তাঁর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
হত্যার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত স্তব্ধ হয়ে যায়। দেশটি তখন স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাস পার করেছে। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন, দেশভাগের শরণার্থী সংকট, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমনিতেই নাজুক ছিল। এর মধ্যে গান্ধীর হত্যাকাণ্ড শুধু একজন জাতীয় নেতার মৃত্যু ছিল না; স্বাধীনতা আন্দোলনের নৈতিক প্রতীকের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে তা অনুভূত হয়েছিল।
জওহরলাল নেহরু জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে গান্ধীর মৃত্যুকে ভারতের জীবন থেকে আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে একই সঙ্গে ছিল গভীর ব্যক্তিগত শোক এবং একটি বিপর্যস্ত জাতিকে স্থির রাখার চেষ্টা। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, গান্ধীর শারীরিক মৃত্যু হলেও তাঁর নীতি ও আদর্শের প্রভাব শেষ হয়ে যায়নি। সেই রাতেই ভারতের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে স্বাধীনতা অর্জনের পরও ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শেষ হয়নি।
পরদিন, ৩১ জানুয়ারি, গান্ধীর শেষযাত্রায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। তাঁর মরদেহ দিল্লির রাজঘাট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। যে মানুষ জীবদ্দশায় সাধারণ পোশাক, সংযম ও ব্যক্তিগত সরলতাকে রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন, তাঁর শেষযাত্রা পরিণত হয়েছিল এক বিশাল জাতীয় শোকের দৃশ্যে। রাজঘাট পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতির অন্যতম প্রধান স্থান হয়ে ওঠে।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তে গডসের পাশাপাশি তাঁর সহযোগীদের ভূমিকাও সামনে আসে। বিচারপ্রক্রিয়ায় নাথুরাম গডসে ও নারায়ণ আপ্তেসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। দীর্ঘ বিচার ও আপিলের পর গডসে ও আপ্তের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে এবং ১৯৪৯ সালে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্য কয়েকজন বিভিন্ন মেয়াদের সাজা পান। বিনায়ক দামোদর সাভারকরও মামলায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের মতো প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে তিনি খালাস পান। পরবর্তী দশকগুলোতে ষড়যন্ত্রের বিস্তার ও বিভিন্ন ব্যক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে।
গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝার জন্য তাঁর জীবনের শেষ মাসগুলোর দিকে বিশেষভাবে তাকানো জরুরি। তিনি তখন আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন না। ব্রিটিশরা চলে গেছে, ভারত স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু গান্ধীর সামনে নতুন প্রশ্ন ছিল—স্বাধীন রাষ্ট্রটি কেমন হবে? সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় কি রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণ করবে, নাকি ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিক সমান মর্যাদা পাবে? রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক ন্যায়, ধর্মীয় সহাবস্থান ও মানুষের মর্যাদার সম্পর্ক কী হবে? তাঁর শেষ দিনের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে এসব প্রশ্নই ছিল।
এ কারণেই তাঁর হত্যাকাণ্ডের তাৎপর্য কেবল একজন বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামীর মৃত্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে ব্যক্তি কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য অহিংস পদ্ধতির কথা বলেছেন, তাঁকেই রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনাটির এই বৈপরীত্য বিশ্বজুড়ে গান্ধীর মৃত্যুকে আরও প্রতীকী করে তোলে। তাঁর অহিংসার ধারণা নিয়ে সমালোচনা ছিল, তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক ছিল এবং তাঁর বিভিন্ন অবস্থানের সঙ্গে বহু সমসাময়িক নেতা দ্বিমত পোষণ করেছেন। কিন্তু মতবিরোধ ও রাজনৈতিক হত্যার মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, ৩০ জানুয়ারির ঘটনা তা অত্যন্ত নির্মমভাবে সামনে নিয়ে আসে।
গান্ধীর অহিংসা নিছক নিষ্ক্রিয়তা ছিল না। তাঁর সত্যাগ্রহের ধারণায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতে হতো, কিন্তু প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করাকে লক্ষ্য করা হতো না। অসহযোগ আন্দোলন, লবণ সত্যাগ্রহ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রদায়িক শান্তির প্রচেষ্টায় তিনি বিভিন্নভাবে এই নীতি প্রয়োগ করেছিলেন। তাঁর পদ্ধতির কার্যকারিতা, সীমাবদ্ধতা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে এর প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আজও রয়েছে। তবু রাজনৈতিক সংগ্রামে অহিংস গণআন্দোলনকে একটি শক্তিশালী পদ্ধতি হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অসাধারণ।
তাঁর মৃত্যু তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও গভীর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন নাগরিক অধিকার ও অহিংস আন্দোলনে গান্ধীর চিন্তার প্রভাব দেখা যায়। তাঁর জীবন ও মৃত্যুর স্মৃতি এমন একটি রাজনৈতিক ধারণাকে শক্তিশালী করে, যেখানে ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ মানেই অস্ত্রধারণ নয়। নৈতিক অবস্থান, গণঅংশগ্রহণ, অসহযোগ এবং অহিংস প্রতিবাদও ক্ষমতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে—গান্ধীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে এই ধারণা।
তবে গান্ধীকে শুধু নিখুঁত শান্তির প্রতীক হিসেবে দেখলে তাঁর ঐতিহাসিক চরিত্রের জটিলতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। তাঁর রাজনৈতিক কৌশল, জাতপাত নিয়ে তাঁর চিন্তার বিবর্তন, দেশভাগ সম্পর্কে তাঁর অবস্থান, ধর্মীয় ভাষার ব্যবহার এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যান্য নেতার সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও সমালোচনা রয়েছে। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে বোঝার জন্য এসব বিতর্কও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁর হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে একটি বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন—রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জবাব হিসেবে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ব্যবহার।
৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮ তাই একই সঙ্গে একজন মানুষের মৃত্যুর দিন এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম দিককার সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক সংকেতগুলোর একটি। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ভারত নিজের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, কিন্তু স্বাধীনতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক সহনশীলতা বা সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করেনি। গান্ধীর হত্যা দেখিয়ে দেয়, স্বাধীনতার পর একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য আরেকটি সংগ্রাম শুরু হয়—ভিন্নমতকে সহ্য করা, ধর্মীয় বিদ্বেষ নিয়ন্ত্রণ করা এবং রাজনৈতিক সংঘাতকে সহিংসতায় রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখা।
বিড়লা ভবন, যেখানে গান্ধী জীবনের শেষ ১৪৪ দিন কাটিয়েছিলেন, পরে গান্ধী স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষিত হয়। সেখানে তাঁর শেষ পদযাত্রার পথ আজও স্মৃতির অংশ। যে পথ ধরে তিনি সন্ধ্যার প্রার্থনায় যাচ্ছিলেন, সেই পথের শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছিল এমন এক ঘটনা, যা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসকে স্থায়ীভাবে বদলে দেয়।
মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা সম্ভবত তাঁর ব্যক্তিত্বকে ঘিরে নয়, বরং রাজনৈতিক সমাজের একটি মৌলিক সমস্যাকে ঘিরে। কোনো নেতা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, কোনো রাজনৈতিক দর্শন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয় এবং ইতিহাসের কোনো ব্যক্তিকে নিখুঁত হিসেবে গ্রহণ করারও প্রয়োজন নেই। কিন্তু যখন মতবিরোধ যুক্তি, আলোচনা ও গণতান্ত্রিক বিরোধিতার সীমা ছেড়ে প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার ধারণায় পৌঁছে যায়, তখন রাজনৈতিক সহাবস্থানের ভিত্তিই বিপন্ন হয়।
১৯৪৮ সালের সেই জানুয়ারির সন্ধ্যায় তিনটি গুলি গান্ধীর জীবন শেষ করেছিল, কিন্তু তাঁর মৃত্যু অহিংসা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে বিতর্ক শেষ করেনি। বরং হত্যাকাণ্ডটি এসব প্রশ্নকে আরও স্থায়ী করে দিয়েছে। একজন মানুষ হিসেবে গান্ধীর জীবন ছিল জটিল, তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল বিতর্কিত এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তবু তাঁর হত্যার মুহূর্তটি ইতিহাসে একটি নির্মম বৈপরীত্য হয়ে আছে—যিনি জীবনের বড় অংশ জুড়ে রাজনৈতিক সংঘাতকে সহিংসতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই রাজনৈতিক ঘৃণা থেকে জন্ম নেওয়া সহিংসতার শিকার হন। সেই কারণেই ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮ শুধু ভারতের একজন নেতাকে হারানোর দিন নয়; এটি বিশ্ব ইতিহাসে শান্তি ও অহিংসার সঙ্গে যুক্ত অন্যতম পরিচিত কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার দিন।
অ্যামাজন রেইনফরেস্ট: পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় বন কতটা বিশাল?
আরাল সাগর: পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ হ্রদ কয়েক দশকের মধ্যে প্রায় অদৃশ্য হলো কীভাবে?
গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ: মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান বলে পরিচিত বিশ্বের বৃহত্তম প্রবালপ্রাচীর কতটা বিশাল?
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ১৯৯১: বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তির ভাঙন ও একটি সাম্রাজ্যের অবসান
চীনের এক-সন্তান নীতি: ১৯৮০ সালের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বদলে দিয়েছিল একটি জাতির ভবিষ্যৎ?
ক্রিমিয়ার রুশ অন্তর্ভুক্তি ২০১৪: ইউক্রেনের ভূখণ্ড দখল, বিতর্কিত গণভোট ও ইউরোপের সীমান্ত বদলের সংকট