বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মিউনিখ চুক্তি ১৯৩৮: চেম্বারলেইনের তোষণনীতি, হিটলারের সুদেতেন দাবি ও যুদ্ধ ঠেকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা

মিউনিখ চুক্তি ১৯৩৮: চেম্বারলেইনের তোষণনীতি, হিটলারের সুদেতেন দাবি ও যুদ্ধ ঠেকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা
মিউনিখ চুক্তি—শান্তির আশায় হিটলারকে ছাড় দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তি ইউরোপীয় কূটনীতির ইতিহাসে এমন একটি ঘটনা, যেখানে যুদ্ধ এড়ানোর আকাঙ্ক্ষা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি, সামরিক দুর্বলতার আশঙ্কা, জাতীয় স্বার্থ, একটি ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং আডলফ হিটলারের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন একই মুহূর্তে এসে মিলেছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইনের নাম এই ঘটনার সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত যে পরবর্তী সময়ে তাঁর তোষণনীতি প্রায় মিউনিখ চুক্তির সমার্থক হয়ে ওঠে। কিন্তু ঘটনাটি শুধু একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ভুল সিদ্ধান্তের সরল কাহিনি ছিল না। এর পেছনে ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী ইউরোপের গভীর ক্ষত, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সামরিক ও রাজনৈতিক হিসাব, জার্মান জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং হিটলারের পরিকল্পিত চাপ সৃষ্টির কৌশল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর গঠিত রাষ্ট্রগুলোর একটি ছিল চেকোস্লোভাকিয়া। নতুন রাষ্ট্রটির জনসংখ্যা জাতিগতভাবে একরূপ ছিল না। চেক ও স্লোভাকদের পাশাপাশি সেখানে বিপুলসংখ্যক জার্মানভাষী মানুষ বাস করতেন। বিশেষ করে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সীমান্তসংলগ্ন সুদেতেন অঞ্চলে জার্মানভাষী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিটলার ক্ষমতায় আসার পর এই জনগোষ্ঠীকে তাঁর বৃহত্তর জার্মান জাতীয়তাবাদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন।

হিটলারের উদ্দেশ্য শুধু জার্মানভাষী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা ছিল না। তিনি ভার্সাই-পরবর্তী ইউরোপীয় ব্যবস্থাকে ভেঙে জার্মানির ভূখণ্ড ও সামরিক শক্তি সম্প্রসারণ করতে চেয়েছিলেন। ১৯৩৬ সালে জার্মান সেনাবাহিনী রাইনল্যান্ডে প্রবেশ করে। ব্রিটেন ও ফ্রান্স সামরিকভাবে বাধা দেয়নি। ১৯৩৮ সালের মার্চে জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে। এই ঘটনাও বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সামরিক প্রতিরোধ ছাড়াই সম্পন্ন হয়। এর পর হিটলারের দৃষ্টি পড়ে চেকোস্লোভাকিয়ার দিকে।

চেকোস্লোভাকিয়া অস্ট্রিয়ার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের লক্ষ্য ছিল। দেশটির নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল, উন্নত অস্ত্রশিল্প ছিল এবং জার্মান সীমান্তবর্তী এলাকায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। সুদেতেন অঞ্চল শুধু জাতিগত প্রশ্নের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; চেকোস্লোভাকিয়ার সীমান্ত প্রতিরক্ষার বড় অংশও এই অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। ফলে সুদেতেন অঞ্চল হারানোর অর্থ ছিল দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানো। একই সঙ্গে চেকোস্লোভাকিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সম্পর্ক থাকায় সংকটটি সহজেই বৃহত্তর ইউরোপীয় যুদ্ধে পরিণত হতে পারত।

হিটলার সুদেতেন জার্মানদের অসন্তোষকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। কনরাড হেনলাইনের নেতৃত্বাধীন সুদেতেন জার্মান রাজনৈতিক আন্দোলন ক্রমশ প্রাগ সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে। স্বায়ত্তশাসন ও অধিকারের দাবির সঙ্গে জার্মান সরকারের প্রত্যক্ষ উৎসাহ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হিটলারের কৌশল ছিল এমন একটি সংকট সৃষ্টি করা, যাতে সুদেতেন প্রশ্নকে আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় এবং শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটি জার্মানির হাতে তুলে দেওয়ার জন্য ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে চাপ দেওয়া সম্ভব হয়।

এই পরিস্থিতিতে নেভিল চেম্বারলেইনের তোষণনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে তোষণ বলতে নিছক হিটলারের প্রতি সহানুভূতি বোঝালে ইতিহাসের বাস্তবতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ মনে করতেন, জার্মানির কিছু অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে এবং সীমিত পরিবর্তনের মাধ্যমে ইউরোপীয় ব্যবস্থাকে সংশোধন করা গেলে বৃহৎ যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হতে পারে। চেম্বারলেইন বিশেষভাবে বিশ্বাস করতেন যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে হিটলারের দাবির সীমা বোঝা এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব।

এর পেছনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সেই যুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্স বিপুলসংখ্যক মানুষ হারিয়েছিল। একটি প্রজন্ম তখনও পরিখাযুদ্ধ, কামানের গোলাবর্ষণ, বিষাক্ত গ্যাস এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর স্মৃতি বহন করছিল। নতুন একটি ইউরোপীয় যুদ্ধ শুরু হলে আধুনিক বোমারু বিমান সরাসরি শহরের ওপর আক্রমণ করবে—এমন আশঙ্কাও ছিল প্রবল। ব্রিটেনে বিমান হামলা ও বিষাক্ত গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভীতি ছিল। তাই কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা তখনকার রাজনৈতিক পরিবেশে অস্বাভাবিক ছিল না।

সামরিক হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ব্রিটেন পুনরায় অস্ত্রসজ্জার কাজ চালাচ্ছিল, বিশেষ করে বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা হচ্ছিল। ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সামরিক মূল্যায়নের একটি অংশে এমন ধারণাও ছিল যে জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য হলে কয়েক মাস সময় পাওয়া ব্রিটেনের প্রতিরক্ষার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। অর্থাৎ মিউনিখের পেছনে শুধু শান্তিবাদী আবেগ নয়, সময় কেনার কৌশলগত চিন্তাও কাজ করেছিল। তবে এর বিপরীত সমস্যাটি ছিল গুরুতর—চেকোস্লোভাকিয়াকে দুর্বল করলে জার্মানিও আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত।

১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। চেম্বারলেইন প্রচলিত কূটনৈতিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তিগতভাবে হিটলারের সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত নেন। ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি বিমানে জার্মানিতে গিয়ে বের্খটেসগাডেনে হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন চেম্বারলেইনের বয়স ঊনসত্তর বছর এবং এর আগে তিনি এ ধরনের দীর্ঘ বিমানযাত্রায় অভ্যস্ত ছিলেন না। ইউরোপে যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য তাঁর এই ব্যক্তিগত উদ্যোগ সেই সময়ে অত্যন্ত নাটকীয় ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।

বের্খটেসগাডেনের আলোচনায় হিটলার সুদেতেন জার্মানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি সামনে আনেন। চেম্বারলেইন মূলনীতির দিক থেকে জার্মান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল জার্মানির কাছে হস্তান্তরের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে সম্মত হন। এরপর ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার চেকোস্লোভাক সরকারের ওপর সুদেতেন অঞ্চলের একটি বড় অংশ ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। প্রাগের সামনে কঠিন বাস্তবতা দাঁড়ায়—প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে জার্মান আক্রমণের মুখে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কার্যকর সমর্থন পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

কিন্তু চেম্বারলেইনের ধারণা ছিল না যে একবার মূল দাবিটি মেনে নেওয়ার পরও হিটলার নতুন শর্ত তুলবেন। ২২ ও ২৩ সেপ্টেম্বর গডেসবার্গে দ্বিতীয় বৈঠকে হিটলার আগের আলোচনার তুলনায় আরও কঠোর দাবি উত্থাপন করেন। তিনি দ্রুত জার্মান দখল প্রতিষ্ঠার দাবি জানান এবং পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে যুদ্ধ প্রায় আসন্ন বলে মনে হতে থাকে। চেকোস্লোভাকিয়া সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করে। ব্রিটেনেও যুদ্ধের সম্ভাবনা সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু হয়। ইউরোপজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

চেম্বারলেইনের জন্য এই মুহূর্তটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন যে ছাড় দেওয়ার পরও হিটলারের দাবি থামছে না। তারপরও তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কূটনৈতিক পথ খোলা রাখেন। ইতালির বেনিতো মুসোলিনির মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত মিউনিখে চার শক্তির সম্মেলন আয়োজন করা হয়। ১৯৩৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হিটলার, চেম্বারলেইন, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এদুয়ার দালাদিয়ে এবং মুসোলিনি সেখানে মিলিত হন।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ছিল, যে রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল সেই চেকোস্লোভাকিয়ার প্রতিনিধিরা মূল আলোচনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। সোভিয়েত ইউনিয়নও সম্মেলনে ছিল না। জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইতালি কার্যত চেকোস্লোভাকিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছিল। এই কারণে পরবর্তী সময়ে চেক ও স্লোভাক ঐতিহাসিক স্মৃতিতে মিউনিখের ঘটনা গভীর বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

২৯ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের রাতে সম্পন্ন মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে সুদেতেন অঞ্চল জার্মানির কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। ১ অক্টোবর থেকে জার্মান বাহিনী নির্ধারিত অঞ্চল দখল করতে শুরু করে। এর ফলে চেকোস্লোভাকিয়া গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তভূমি, প্রতিরক্ষা স্থাপনা, জনগোষ্ঠী এবং অর্থনৈতিক সম্পদের একটি অংশ হারায়। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেশটির অবস্থান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

চেম্বারলেইনের দৃষ্টিতে বিনিময়ে পাওয়া বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—তাৎক্ষণিক ইউরোপীয় যুদ্ধ এড়ানো গেছে এবং হিটলার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সুদেতেন প্রশ্ন মীমাংসার পর তাঁর আর ভূখণ্ডগত দাবি থাকবে না। মিউনিখের মূল সমঝোতার পাশাপাশি চেম্বারলেইন ও হিটলার একটি পৃথক অ্যাংলো-জার্মান ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন, যেখানে দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ বিরোধ শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়।

চেম্বারলেইন ব্রিটেনে ফিরে এলে তাঁকে বিপুল স্বস্তির পরিবেশে স্বাগত জানানো হয়। যুদ্ধের আশঙ্কায় আতঙ্কিত বহু মানুষ বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন যে তিনি ইউরোপকে আরেকটি মহাযুদ্ধ থেকে রক্ষা করেছেন। চেম্বারলেইনও তাঁর বিখ্যাত ঘোষণায় নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করেন যে এই সমঝোতা তাঁর সময়ের জন্য শান্তি এনে দিতে পারে। আজ এই বক্তব্যকে প্রায়ই বিদ্রূপের সঙ্গে স্মরণ করা হয়, কিন্তু ১৯৩৮ সালের সেপ্টেম্বরের পরিবেশ বুঝতে হলে মনে রাখতে হয় যে তখন বহু সাধারণ মানুষ সত্যিই যুদ্ধ এড়ানোয় স্বস্তি অনুভব করেছিলেন।

তবে ব্রিটেনে সবাই মিউনিখকে সাফল্য হিসেবে দেখেননি। উইনস্টন চার্চিলসহ তোষণনীতির সমালোচকেরা যুক্তি দেন যে হিটলারকে বারবার ছাড় দেওয়া তাঁর আগ্রাসন থামাবে না, বরং পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে অনিচ্ছুক—এমন ধারণা জার্মান নেতৃত্বের মধ্যে শক্তিশালী করতে পারে। তাঁদের আরও একটি যুক্তি ছিল, চেকোস্লোভাকিয়া সামরিক ও শিল্পশক্তির দিক থেকে সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল; তাকে দুর্বল করে দেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতের যুদ্ধে জার্মানির অবস্থানই শক্তিশালী করা হলো।

এখানেই মিউনিখ চুক্তির সবচেয়ে বড় কৌশলগত দ্বন্দ্বটি দেখা যায়। চেম্বারলেইন যদি সময় কিনে থাকেন, জার্মানিও সেই সময় এবং চেকোস্লোভাকিয়ার দুর্বলতা থেকে সুবিধা পেয়েছিল। ব্রিটেন বিমান প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র উৎপাদনে অগ্রগতি করার সুযোগ পায়, কিন্তু অন্যদিকে হিটলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে মধ্য ইউরোপে নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বাড়িয়ে নেন। ফলে মিউনিখের ফলাফলকে শুধু কয়েক মাসের শান্তি দিয়ে বিচার করলে এর সম্পূর্ণ কৌশলগত প্রভাব বোঝা যায় না।

চুক্তির স্থায়িত্ব খুব দ্রুতই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ১৯৩৯ সালের মার্চে জার্মান বাহিনী প্রাগে প্রবেশ করে এবং বোহেমিয়া ও মোরাভিয়ার ওপর জার্মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর তাৎপর্য ছিল গভীর। সুদেতেন অঞ্চলের ক্ষেত্রে হিটলার জাতিগত জার্মানদের আত্মনিয়ন্ত্রণের যুক্তি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু চেক ভূখণ্ড দখলের ক্ষেত্রে সেই যুক্তিও আর প্রযোজ্য ছিল না। ফলে ব্রিটিশ সরকারের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে হিটলারের লক্ষ্য শুধু জার্মানভাষী জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে একত্র করা নয়; তাঁর সম্প্রসারণবাদী নীতি আরও বিস্তৃত।

প্রাগ দখলের পর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। পোল্যান্ডের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়লে ব্রিটেন ও ফ্রান্স তার নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ব্রিটেন সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করে এবং সীমিত বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও গ্রহণ করে। অর্থাৎ ১৯৩৮ সালের মিউনিখে যে নীতি যুদ্ধ এড়ানোর জন্য ভূখণ্ডগত ছাড়কে গ্রহণযোগ্য মনে করেছিল, ১৯৩৯ সালের বসন্তে তার সীমাবদ্ধতা ব্রিটিশ সরকারের কাছেই অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে পরিস্থিতি আর কূটনৈতিক ছাড়ের মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। ৩ সেপ্টেম্বর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। মিউনিখের মাত্র এগারো মাসের মধ্যে ইউরোপ সেই বৃহৎ যুদ্ধে প্রবেশ করল, যা চেম্বারলেইন এত মরিয়া হয়ে এড়াতে চেয়েছিলেন।

তাই চেম্বারলেইনের তোষণনীতিকে বিচার করতে গেলে দুটি বাস্তবতাকে পাশাপাশি রাখতে হয়। প্রথমত, মিউনিখ চুক্তি হিটলারের সম্প্রসারণ থামাতে পারেনি এবং চেকোস্লোভাকিয়াকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পূর্ণ সুযোগ না দিয়েই তার গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড অন্য রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, ১৯৩৮ সালের ব্রিটিশ নেতৃত্ব এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করছিল, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয়ের স্মৃতি তখনও জীবন্ত, নতুন যুদ্ধের জন্য পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি এবং আকাশপথে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা জনমনে প্রবল ছিল। এই পরিস্থিতিই ব্যাখ্যা করে কেন এমন একটি নীতি তখন রাজনৈতিকভাবে সম্ভব এবং বহু মানুষের কাছে সাময়িকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল।

মিউনিখ চুক্তির আরও গভীর শিক্ষা হলো, কূটনৈতিক সমঝোতা তখনই কার্যকর হতে পারে যখন উভয় পক্ষই সমঝোতাকে চূড়ান্ত বা অন্তত বাধ্যতামূলক সীমা হিসেবে গ্রহণ করে। চেম্বারলেইন মনে করেছিলেন সীমিত অভিযোগ মেটানোর মাধ্যমে হিটলারকে বিদ্যমান ইউরোপীয় ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব। হিটলার সেই ছাড়কে শেষ সমঝোতা হিসেবে দেখেননি; বরং পরবর্তী সম্প্রসারণের পথে একটি অর্জন হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। দুই পক্ষের উদ্দেশ্যের এই মৌলিক অসামঞ্জস্যই মিউনিখের কূটনীতিকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ভিত্তিতে পরিণত হতে দেয়নি।

একই সঙ্গে ঘটনাটি ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন প্রশ্ন সামনে আনে। চেকোস্লোভাকিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাতেই চেকোস্লোভাক নেতৃত্বের কার্যকর অংশগ্রহণ ছিল না। বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের যুদ্ধ ও শান্তির হিসাবের ভিত্তিতে একটি ছোট রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাই মিউনিখ শুধু তোষণনীতির ইতিহাস নয়; এটি বৃহৎ শক্তির কূটনীতিতে ছোট রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কতটা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ।

চেম্বারলেইনের ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধ এড়ানো। তিনি এমন একটি প্রজন্মের রাজনীতিবিদ ছিলেন, যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেছিল এবং আরেকটি সর্বগ্রাসী সংঘাত ঠেকানোকে গুরুতর দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রনায়কের উদ্দেশ্য এবং নীতির ফলাফল সব সময় এক হয় না। মিউনিখে তিনি যুদ্ধ এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন—কিন্তু কেবল সাময়িকভাবে। সেই সাময়িক শান্তির মূল্য দিয়েছিল মূলত চেকোস্লোভাকিয়া, আর হিটলার পেয়েছিলেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সাফল্য।

এই কারণেই ১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তি আজও ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত কূটনৈতিক ঘটনা। এটি দেখায়, শান্তি রক্ষার আকাঙ্ক্ষা নিজে কোনো দুর্বলতা নয়, কিন্তু প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য ভুলভাবে মূল্যায়ন করলে শান্তির জন্য দেওয়া ছাড়ই কখনো কখনো পরবর্তী সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। চেম্বারলেইনের তোষণনীতি যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে বাস্তব উপলব্ধি থেকে জন্মেছিল, কিন্তু হিটলারের সম্প্রসারণবাদী লক্ষ্য সম্পর্কে যে ধারণার ওপর সেই নীতি দাঁড়িয়েছিল, ১৯৩৯ সালের ঘটনাপ্রবাহ সেটিকে ভেঙে দেয়। মিউনিখ তাই শুধু একটি ব্যর্থ চুক্তির নাম নয়; এটি যুদ্ধ ও শান্তির মাঝখানে কূটনীতি, সামরিক প্রস্তুতি, প্রতিরোধ, সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্য বোঝার জটিল সম্পর্কের এক স্থায়ী ঐতিহাসিক অধ্যায়।


আপনার পছন্দ হতে পারে