বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ভিয়েনার দ্বিতীয় অবরোধ ১৬৮৩: অটোমান পরাজয় ও ইউরোপে সাম্রাজ্যের পশ্চাদপসরণের সূচনা

সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস

ভিয়েনার দ্বিতীয় অবরোধ ১৬৮৩: অটোমান পরাজয় ও ইউরোপে সাম্রাজ্যের পশ্চাদপসরণের সূচনা
১৬৮৩: ভিয়েনায় অটোমান সম্প্রসারণের মোড় ঘুরে যায়

১৫২৯ সালে সুলতান সুলেমানের বাহিনী প্রথমবার ভিয়েনার প্রাচীরে পৌঁছেছিল। খারাপ আবহাওয়া, দীর্ঘ সরবরাহপথ, ভারী অবরোধ কামানের ঘাটতি এবং শক্তিশালী প্রতিরোধের কারণে সেই অভিযান ব্যর্থ হয়। এরপর দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় কেটে যায়। এই দীর্ঘ সময়ে অটোমান ও হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের মধ্যে মধ্য ইউরোপের সীমান্ত বারবার বদলেছে, যুদ্ধ হয়েছে, শান্তিচুক্তি হয়েছে এবং হাঙ্গেরির বিশাল অংশ দীর্ঘদিন অটোমান শাসনে থেকেছে। কিন্তু ১৬৮৩ সালে অটোমানরা যখন আবার ভিয়েনা অবরোধ করে, তখন সেই অভিযান শুধু আরেকটি ব্যর্থ অবরোধে শেষ হয়নি—এটি মধ্য ইউরোপে অটোমান শক্তির ভবিষ্যৎ গতিপথ বদলে দেওয়া এক ঐতিহাসিক মোড়ে পরিণত হয়।

১৬৮৩ সালের অটোমান সাম্রাজ্য সুলেমানের যুগের সাম্রাজ্য থেকে অনেক দিক দিয়ে আলাদা। সপ্তদশ শতাব্দীর রাজনৈতিক অস্থিরতা, জানিসারি বিদ্রোহ এবং প্রাসাদীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের পর কোপ্রুলু পরিবারের গ্র্যান্ড ভিজিয়াররা কেন্দ্রীয় প্রশাসন ও সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। তাদের অধীনে অটোমানরা আবারও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সাফল্য অর্জন করে।

১৬৬৯ সালে দীর্ঘ অবরোধের পর ভেনিসের কাছ থেকে কান্দিয়া বা ক্রিটের প্রধান দুর্গ দখল করা হয়। পোলিশ-লিথুয়ানীয় কমনওয়েলথের বিরুদ্ধেও অটোমানরা যুদ্ধ করে এবং ১৬৭২ সালে পোদোলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ কামিয়ানেতস-পোদিলস্কি দখল করে। ফলে ১৬৮৩ সালের আগে অটোমান সাম্রাজ্যকে নিঃশেষিত বা সামরিকভাবে অকার্যকর শক্তি বলা যায় না। বরং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে তার সম্প্রসারণক্ষমতা তখনও বাস্তব ছিল।

এই পরিস্থিতিতে সাম্রাজ্যের অন্যতম ক্ষমতাবান ব্যক্তি হয়ে ওঠেন মেরজিফোনলু কারা মুস্তাফা পাশা। তিনি ১৬৭৬ সালে গ্র্যান্ড ভিজিয়ার হন এবং অটোমান পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী অবস্থান অর্জন করেন। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং মধ্য ইউরোপে অটোমান প্রভাব আরও বিস্তারের পরিকল্পনা ১৬৮৩ সালের অভিযানের কেন্দ্রে ছিল।

অভিযানের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক পটভূমি ছিল হাবসবুর্গ শাসিত হাঙ্গেরিতে অসন্তোষ। হাঙ্গেরীয় প্রোটেস্ট্যান্ট ও অভিজাতদের একটি অংশ হাবসবুর্গ কেন্দ্রীকরণ এবং ধর্মীয় নীতির বিরোধিতা করছিল। তাদের অন্যতম নেতা ইমরে থোকোলি হাবসবুর্গদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং অটোমান সমর্থন গ্রহণ করেন।

অটোমানদের কাছে থোকোলির আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে। হাবসবুর্গদের নিয়ন্ত্রিত রয়্যাল হাঙ্গেরিতে চাপ বাড়িয়ে মধ্য ইউরোপে অটোমান প্রভাব আরও বিস্তার করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিযানটি সীমান্তের দুর্গ দখলের পরিবর্তে আরও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়—ভিয়েনা।

সুলতান চতুর্থ মেহমেদ ১৬৮৩ সালের অভিযানের অনুমোদন দেন এবং বিশাল বাহিনী সংগঠিত হয়। সুলতান নিজে অভিযানের চূড়ান্ত পর্যায়ে ভিয়েনার সামনে যাননি; সেনাবাহিনীর কার্যকর নেতৃত্ব ছিল গ্র্যান্ড ভিজিয়ার কারা মুস্তাফা পাশার হাতে।

অটোমান মূল বাহিনীর পাশাপাশি ক্রিমিয়ান তাতার, বিভিন্ন অটোমান প্রদেশের সৈন্য এবং অধীনস্থ বা সহযোগী বাহিনী অভিযানে অংশ নেয়। সমসাময়িক ও পরবর্তী সূত্রে সৈন্যসংখ্যা নিয়ে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট বিশাল সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে এটি ছিল একটি অত্যন্ত বড় বহুজাতিক সামরিক অভিযান, যার পেছনে অটোমান সাম্রাজ্যের বিপুল সম্পদ ব্যবহৃত হয়েছিল।

হাবসবুর্গ সম্রাট প্রথম লিওপোল্ড বিপদের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। ভিয়েনা সরাসরি হুমকির মুখে পড়লে সম্রাট ও রাজদরবার শহর ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু শহরকে পরিত্যাগ করা হয়নি। এর প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেন অভিজ্ঞ সেনাপতি আর্নস্ট রুডিগার ফন স্টারহেমবার্গ

১৫২৯ সালের ভিয়েনা এবং ১৬৮৩ সালের ভিয়েনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল দুর্গপ্রতিরক্ষা। ষোড়শ শতাব্দীর পর ইউরোপে কামানের যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দুর্গ নির্মাণের প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে উন্নত হয়েছিল। ১৬৮৩ সালের ভিয়েনা শক্তিশালী বুরুজ, নিচু ও মোটা প্রতিরক্ষা কাঠামো এবং জটিল দুর্গব্যবস্থায় সুরক্ষিত ছিল, যা কামানের গোলার বিরুদ্ধে পুরোনো মধ্যযুগীয় উঁচু প্রাচীরের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।

অটোমান বাহিনী ১৬৮৩ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি ভিয়েনার সামনে উপস্থিত হয়। দ্রুত শহর ঘিরে বিশাল শিবির স্থাপন করা হয়। অটোমানদের সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন—দীর্ঘ অবরোধের মাধ্যমে শহরের প্রতিরক্ষা ধ্বংস করা হবে, নাকি দ্রুত সর্বাত্মক আক্রমণ চালানো হবে?

কারা মুস্তাফা পাশা অবরোধ ও মাইনিংয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করেন। অটোমান সামরিক প্রকৌশলীরা দুর্গের দিকে পরিখা ও যোগাযোগপথ খুঁড়তে থাকে। এরপর প্রাচীর ও বুরুজের নিচে মাইন বা সুড়ঙ্গ তৈরি করে বিস্ফোরণের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ধসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

অটোমানরা এই কাজে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। ধীরে ধীরে তারা ভিয়েনার বাইরের প্রতিরক্ষা ভেদ করে মূল দুর্গের দিকে এগিয়ে যায়। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে শহরের অবস্থা ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

ভিয়েনার ভেতরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ ছিল। দীর্ঘ অবরোধে খাদ্য ও গোলাবারুদের ওপর চাপ বাড়ছিল। অসুস্থতা ছড়াচ্ছিল। প্রতিরক্ষাকারীদের সংখ্যা কমছিল। অটোমান মাইনিং প্রতিরোধে শহরের সৈন্যরা পাল্টা সুড়ঙ্গ খুঁড়ছিল এবং মাটির নিচে এক অদ্ভুত প্রকৌশল যুদ্ধ চলছিল।

স্টারহেমবার্গের নেতৃত্বে প্রতিরক্ষাকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে দ্রুত নতুন বাঁধ ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষা তৈরি করত। সাধারণ নাগরিকদেরও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শুরুতে অটোমানরা এমন অবস্থানে পৌঁছে যায় যেখানে আরও কয়েকটি সফল বিস্ফোরণ ও আক্রমণ ভিয়েনার প্রতিরক্ষাকে ভেঙে দিতে পারত।

তাহলে কারা মুস্তাফা কেন দ্রুত সর্বাত্মক আক্রমণ চালাননি—এই প্রশ্ন ইতিহাসে দীর্ঘদিন আলোচিত। জনপ্রিয় একটি ব্যাখ্যা হলো, তিনি শহরটি অক্ষত অবস্থায় দখল করতে চেয়েছিলেন যাতে সম্পদ লুণ্ঠনের পরিবর্তে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে আসে। এই ব্যাখ্যার কিছু ভিত্তি থাকলেও একটি মাত্র ব্যক্তিগত লোভ বা সিদ্ধান্ত দিয়ে অবরোধের পুরো গতিপথ ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

শক্তিশালী দুর্গে সরাসরি আক্রমণ করলে বিপুল সৈন্যক্ষতির আশঙ্কা ছিল। অটোমানরা মাইনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা আরও দুর্বল করে তারপর সিদ্ধান্তমূলক আঘাত হানতে চেয়েছিল। কিন্তু এই ধীর পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল—ভিয়েনাকে সাহায্য করতে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী সংগঠিত হওয়ার সময় পাওয়া যাচ্ছিল।

হাবসবুর্গরা ইতোমধ্যে সাহায্যের জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের দিকে হাত বাড়িয়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়ার রাজা তৃতীয় ইয়ান সোবিয়েস্কির সঙ্গে সমঝোতা। হাবসবুর্গ ও পোল্যান্ডের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার চুক্তি ছিল এবং ভিয়েনার সংকট সেই চুক্তিকে বাস্তব যুদ্ধে রূপ দেয়।

পোপও অটোমানবিরোধী সহযোগিতা উৎসাহিত করেন। পোলিশ বাহিনীর পাশাপাশি হাবসবুর্গ সাম্রাজ্যের সেনা এবং বাভারিয়া, স্যাক্সনি ও অন্যান্য জার্মান রাজ্য থেকে বাহিনী যোগ দেয়। ডিউক চার্লস অব লরেন হাবসবুর্গ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সেনানায়ক ছিলেন।

এই সম্মিলিত বাহিনী ভিয়েনার দিকে এগিয়ে আসে। অটোমানদের জন্য পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক। সামনে এখনও প্রতিরোধরত শহর, আর পেছনের দিকে এগিয়ে আসছে একটি বড় ত্রাণবাহিনী।

অটোমান শিবিরের আরেকটি সমস্যা ছিল তাদের বাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয়। বিশেষ করে ক্রিমিয়ান তাতারদের ভূমিকা নিয়ে পরে অনেক বিতর্ক ও অভিযোগ তৈরি হয়। তাতার বাহিনী সাধারণত দ্রুত অশ্বারোহী অভিযান, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং শত্রুর চলাচল ব্যাহত করার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল। কিন্তু ভিয়েনার কাছে আসা সম্মিলিত বাহিনীকে থামাতে অটোমানরা যথেষ্ট কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

১৬৮৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ শুরু হয়। সম্মিলিত খ্রিষ্টান বাহিনী ভিয়েনার পশ্চিমের পাহাড়ি অঞ্চল ও ভিয়েনা উডসের দিক থেকে অটোমান অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়।

যুদ্ধের জনপ্রিয় চিত্রে প্রায়ই শুধু পোলিশ উইংড হুসারদের বিশাল অশ্বারোহী আক্রমণ দেখানো হয়। সেই আক্রমণ নিঃসন্দেহে যুদ্ধের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্তগুলোর একটি, কিন্তু পুরো যুদ্ধকে শুধু হুসারদের একক আক্রমণ হিসেবে দেখা ভুল।

সকাল থেকেই জার্মান, হাবসবুর্গ এবং পোলিশ পদাতিক ও অন্যান্য বাহিনী অটোমান অবস্থানের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই চালায়। কয়েক ঘণ্টার ধারাবাহিক পদাতিক অগ্রযাত্রা অটোমান প্রতিরক্ষাকে দুর্বল ও বিশৃঙ্খল করে দেওয়ার পরই বৃহৎ অশ্বারোহী আক্রমণের উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।

অটোমানদের একটি বড় অসুবিধা ছিল যে তাদের সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ তখনও শহরের অবরোধে ব্যস্ত ছিল। একই সঙ্গে বিশাল অবরোধ শিবিরকে একটি শক্তিশালী ত্রাণবাহিনীর বিরুদ্ধে কার্যকর যুদ্ধবিন্যাসে রূপান্তর করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিকেলের দিকে সোবিয়েস্কির নেতৃত্বাধীন পোলিশ অশ্বারোহী বাহিনী এবং মিত্র অশ্বারোহীরা অটোমান অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়। এরপর সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত বৃহৎ অশ্বারোহী আক্রমণ। উইংড হুসারসহ হাজার হাজার অশ্বারোহীর সম্মিলিত আক্রমণ ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া অটোমান অবস্থান ভেঙে দেয়।

মিত্রবাহিনী অটোমান শিবিরে প্রবেশ করে। কারা মুস্তাফা বুঝতে পারেন যে যুদ্ধ ধরে রাখা সম্ভব নয়। অটোমান বাহিনী পশ্চাদপসরণ শুরু করে এবং প্রায় দুই মাসের ভিয়েনা অবরোধ ভেঙে পড়ে।

শহর রক্ষা পায়। ইউরোপে বিজয়টি বিপুল প্রতীকী গুরুত্ব লাভ করে। সোবিয়েস্কি দ্রুত ভিয়েনার রক্ষাকর্তা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। কিন্তু অটোমানদের জন্য সবচেয়ে গুরুতর বিষয় ছিল শুধু একটি অবরোধ হারানো নয়—১৬৮৩ সালের পর শত্রুরা পাল্টা আক্রমণে চলে যায়।

কারা মুস্তাফা পাশা পশ্চাদপসরণের পরও কিছু সময় সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ইস্তাম্বুলে ব্যর্থতার জন্য তাকে দায়ী করা হয়। সুলতানের নির্দেশে ১৬৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে বেলগ্রেডে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

যদি ঘটনা এখানেই শেষ হতো, তাহলে ১৬৮৩ হয়তো ১৫২৯ সালের মতো আরেকটি ব্যর্থ অবরোধ হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যেত। কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে এগোয়।

ভিয়েনার বিজয়ে উৎসাহিত হয়ে হাবসবুর্গ ও তাদের মিত্ররা অটোমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করে। ১৬৮৪ সালে পোপের উদ্যোগে হোলি লিগ গঠিত হয়। এতে হাবসবুর্গ রাজতন্ত্র, পোল্যান্ড-লিথুয়ানিয়া ও ভেনিস প্রধান সদস্য ছিল; পরে রাশিয়াও অটোমানবিরোধী যুদ্ধে যুক্ত হয়।

এখন অটোমান সাম্রাজ্যকে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হয়। হাবসবুর্গ বাহিনী হাঙ্গেরিতে অগ্রসর হয়, ভেনিসীয়রা ভূমধ্যসাগরীয় ও গ্রিক অঞ্চলে আক্রমণ করে এবং উত্তরদিকে নতুন চাপ সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে প্রতীকী আঘাত আসে ১৬৮৬ সালে বুদার পতনে। ১৫৪১ সাল থেকে বুদা অটোমান মধ্য হাঙ্গেরির প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। প্রায় দেড় শতাব্দী পর হাবসবুর্গ নেতৃত্বাধীন বাহিনী শহরটি পুনর্দখল করে।

বুদার পতনের অর্থ ছিল শুধু একটি দুর্গ হারানো নয়। মধ্য হাঙ্গেরিতে অটোমান শাসনের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করে। একের পর এক দুর্গ ও অঞ্চল হাবসবুর্গদের হাতে যেতে থাকে।

১৬৮৭ সালের দ্বিতীয় মোহাচের যুদ্ধ অটোমানদের জন্য আরেকটি বড় পরাজয় নিয়ে আসে। ইতিহাসের ব্যঙ্গাত্মক দিক হলো, ১৫২৬ সালের প্রথম মোহাচ যেখানে সুলেমানের হাতে হাঙ্গেরীয় শক্তির পতনের প্রতীক ছিল, ১৬৮৭ সালের দ্বিতীয় মোহাচ সেখানে হাবসবুর্গ অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকে পরিণত হয়।

যুদ্ধের ব্যর্থতা ইস্তাম্বুলের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে। ১৬৮৭ সালে চতুর্থ মেহমেদ ক্ষমতাচ্যুত হন। আবারও স্পষ্ট হয় যে সামরিক ব্যর্থতা, জানিসারি ও দরবারের রাজনীতি এবং রাজবংশীয় ক্ষমতা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

অটোমানরা অবশ্য পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। পরবর্তী বছরগুলোতে তারা পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং কিছু অঞ্চল পুনর্দখল করে। বিশেষ করে কোপ্রুলু ফাজিল মুস্তাফা পাশা প্রশাসন ও সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। ১৬৯০ সালে অটোমানরা বেলগ্রেড পুনরুদ্ধার করতেও সক্ষম হয়।

এটি আবারও দেখায় যে ১৬৮৩ সালের পর “অটোমান পতন” কোনো তাৎক্ষণিক সামরিক ধস ছিল না। সাম্রাজ্য এখনও বড় বাহিনী গঠন, দুর্গ পুনর্দখল এবং দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখত।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি শক্তির ভারসাম্য ক্রমেই অটোমানদের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছিল। হাবসবুর্গ সামরিক সংগঠন শক্তিশালী হচ্ছিল এবং ইউরোপীয় মিত্ররা একাধিক ফ্রন্টে চাপ সৃষ্টি করছিল। অটোমানদের একই সঙ্গে বিপুল অর্থ, সৈন্য ও রসদ ব্যয় করতে হচ্ছিল।

এই দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে সিদ্ধান্তমূলক সংঘর্ষগুলোর একটি ঘটে ১৬৯৭ সালের জেন্টার যুদ্ধে। প্রিন্স ইউজিন অব সাভয়ের নেতৃত্বাধীন হাবসবুর্গ বাহিনী তিসা নদী পার হওয়ার সময় অটোমান সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত হানে এবং ভয়াবহ পরাজয় ঘটায়।

জেন্টার বিপর্যয়ের পর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অটোমানদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে ১৬৯৯ সালের কার্লোভিৎস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

কার্লোভিৎস ছিল অটোমান-ইউরোপীয় সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক মোড়। অটোমানরা হাবসবুর্গদের কাছে হাঙ্গেরির অধিকাংশ অঞ্চল ও ট্রান্সিলভানিয়ার ওপর তাদের দাবি কার্যত ছেড়ে দেয়, যদিও বানাতের একটি অংশ তখনও অটোমানদের হাতে থাকে। ভেনিস ও পোল্যান্ডও বিভিন্ন ভূখণ্ড লাভ করে।

অটোমান ইতিহাসে এর আগে বহু যুদ্ধে সাময়িকভাবে ভূখণ্ড হারানো হয়েছিল। কিন্তু কার্লোভিৎসের গুরুত্ব ছিল ভিন্ন। এবার সাম্রাজ্যকে একটি বড় আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের স্থায়ী ক্ষতি স্বীকার করতে হয়।

এই কারণেই ১৬৮৩ সালের ভিয়েনা অবরোধকে প্রায়ই ইউরোপে অটোমান সম্প্রসারণ থেকে দীর্ঘমেয়াদি পশ্চাদপসরণের দিকে মোড় ঘোরার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে “ভিয়েনায় হারল এবং সেদিন থেকেই অটোমান সাম্রাজ্যের পতন শুরু হলো”—এই সরল ব্যাখ্যাও যথেষ্ট নয়।

অটোমান সাম্রাজ্য ১৬৮৩ সালের পর আরও দুই শতাব্দীর বেশি সময় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক শক্তি হিসেবে টিকে ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতেও তারা যুদ্ধ জিতেছে, ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করেছে এবং ইউরোপীয় কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাই ভিয়েনা কোনো তাৎক্ষণিক সাম্রাজ্যিক পতনের মুহূর্ত নয়।

বরং এর গুরুত্ব ছিল কৌশলগত উদ্যোগের পরিবর্তনে। ১৬৮৩ সালের আগে মধ্য ইউরোপে বড় আক্রমণ পরিচালনার উদ্যোগ অনেক সময় অটোমানদের হাতে ছিল। ভিয়েনার পর হাবসবুর্গরা দীর্ঘ সময়ের জন্য আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে যায় এবং অটোমানরা হাঙ্গেরিতে নিজেদের পুরোনো অবস্থান রক্ষার যুদ্ধে বাধ্য হয়।

অবরোধের ব্যর্থতার কারণও এক ব্যক্তির ভুলে সীমাবদ্ধ ছিল না। কারা মুস্তাফার সিদ্ধান্ত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল—বিশেষ করে ত্রাণবাহিনীর হুমকিকে যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারা এবং দীর্ঘ অবরোধের ঝুঁকি। কিন্তু এর পাশাপাশি ভিয়েনার শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, মিত্রবাহিনীর সফল সমন্বয়, হাবসবুর্গদের কূটনৈতিক সহযোগিতা, অটোমান বাহিনীর কমান্ড ও সমন্বয়ের সমস্যা এবং একই সঙ্গে অবরোধ ও মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কঠিন বাস্তবতা পরাজয়ের পেছনে কাজ করেছিল।

একইভাবে উইংড হুসারদের বিখ্যাত আক্রমণ ছিল যুদ্ধের সিদ্ধান্তমূলক শেষ পর্যায়ের একটি অসাধারণ ঘটনা, কিন্তু ভিয়েনা শুধু একটি অশ্বারোহী চার্জে রক্ষা পায়নি। শহরের প্রায় দুই মাসের প্রতিরোধ, স্টারহেমবার্গের নেতৃত্ব, অটোমান অবরোধকে বিলম্বিত করা, জার্মান ও হাবসবুর্গ পদাতিকের দীর্ঘ লড়াই এবং সোবিয়েস্কির নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক ত্রাণবাহিনীর সমন্বিত আক্রমণ—সবকিছু মিলেই ফল নির্ধারণ করেছিল।

১৬৮৩ সালের আরেকটি গভীর তাৎপর্য ছিল ইউরোপীয় শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন। হাবসবুর্গরা শুধু ভিয়েনাকে রক্ষা করেনি; পরবর্তী কয়েক দশকে তারা দানিয়ুব অববাহিকা ও হাঙ্গেরিতে নতুন সাম্রাজ্যিক শক্তি হিসেবে বিস্তার লাভ করে। একই সময়ে রাশিয়াও ধীরে ধীরে অটোমানদের উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছিল।

ফলে অটোমানদের সামনে এখন আগের চেয়ে জটিল ভূরাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়। পশ্চিমে হাবসবুর্গ, উত্তরে ক্রমশ শক্তিশালী রাশিয়া এবং ভূমধ্যসাগরে ভেনিসসহ অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তির চাপ সামলাতে হয়। সাম্রাজ্যকে ভবিষ্যতে শুধু নতুন অঞ্চল জয়ের জন্য নয়, নিজের বিদ্যমান সীমান্ত রক্ষার জন্যও ক্রমবর্ধমান সম্পদ ব্যয় করতে হবে।

এই কারণেই ১৫২৯ এবং ১৬৮৩ সালের দুই ভিয়েনা অবরোধের ফল একই হলেও ঐতিহাসিক প্রভাব এক ছিল না। ১৫২৯ সালের ব্যর্থতার পর সুলেমানের অটোমান সাম্রাজ্য আরও বিস্তার লাভ করেছিল; ১৬৮৩ সালের ব্যর্থতার পর অটোমানরা মধ্য ইউরোপে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধে ঢুকে পড়ে।

প্রথম ভিয়েনা ছিল সম্প্রসারণশীল সাম্রাজ্যের সীমাবদ্ধতার পরীক্ষা। দ্বিতীয় ভিয়েনা ছিল পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের সতর্কসংকেত।

১৬৮৩ সালের জুলাইয়ে কারা মুস্তাফার বিশাল শিবির যখন ভিয়েনাকে ঘিরে ফেলেছিল, তখন অটোমানদের সামনে মধ্য ইউরোপে আরেকটি বড় সাফল্যের সম্ভাবনা ছিল। মাত্র দুই মাস পর সেই বাহিনী পশ্চাদপসরণ করছিল। পাঁচ বছরের মধ্যে বুদা হারিয়ে যায়। ষোলো বছরের মধ্যে কার্লোভিৎসে অটোমানদের হাঙ্গেরির অধিকাংশ অঞ্চল ছেড়ে দিতে হয়।

এই ধারাবাহিকতাই ১৬৮৩ সালের ভিয়েনাকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। একটি শহরের ব্যর্থ অবরোধ দ্রুত বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনা করেছিল; সেই যুদ্ধ মধ্য ইউরোপে অটোমান সীমান্তকে পিছিয়ে দিয়েছিল এবং হাবসবুর্গদের শক্তিশালী করেছিল।

তাই ভিয়েনার দ্বিতীয় অবরোধকে অটোমান সাম্রাজ্যের “শেষ” বলা ভুল, কিন্তু ইউরোপে অটোমান সম্প্রসারণের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী মোড়। ১৫২৬ সালের মোহাচ থেকে যে অগ্রযাত্রা হাঙ্গেরির হৃদয়ে অটোমান শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল, ১৬৮৩ সালের ভিয়েনা এবং তার পরবর্তী মহাযুদ্ধ সেই অগ্রযাত্রার দিক উল্টে দেয়। সাম্রাজ্য তখনও শক্তিশালী, বিশাল এবং বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী—কিন্তু মধ্য ইউরোপে তার সামনে শুরু হয়ে গেছে এক নতুন বাস্তবতা: জয়ের পরিবর্তে ক্রমশ ভূখণ্ড রক্ষা এবং হারানো সীমান্ত পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম।


আপনার পছন্দ হতে পারে