গ্রিক স্বাধীনতা থেকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ: জাতীয়তাবাদ ও ইউরোপীয় হস্তক্ষেপে অটোমান সাম্রাজ্যের সংকট
সিরিজ: অটোমান সাম্রাজ্য: উত্থান, স্বর্ণযুগ ও পতনের ইতিহাস
জাতীয়তাবাদ ও ইউরোপীয় হস্তক্ষেপে অটোমান সংকট
উনিশ শতকের শুরুতে অটোমান সাম্রাজ্য এখনও ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল ভূখণ্ডের ওপর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিল। ইস্তাম্বুলের সুলতানের অধীনে বলকানের অধিকাংশ অঞ্চল, আনাতোলিয়া, সিরিয়া, ইরাক, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা নামমাত্র বা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিল। কিন্তু মানচিত্রের এই বিশালতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আড়াল করছিল—সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা অসম ছিল, ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ছিল এবং বলকানে নতুন ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে নাটকীয় প্রকাশ ঘটে গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধে। তবে গ্রিক বিপ্লবকে হঠাৎ ১৮২১ সালে জন্ম নেওয়া একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে এর গভীর পটভূমি বোঝা যায় না। অটোমান শাসনের অধীনে গ্রিকভাষী অর্থোডক্স জনগোষ্ঠী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করছিল। তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী, নাবিক, কৃষক, ধর্মীয় নেতা, প্রশাসনিক মধ্যস্থতাকারী এবং উচ্চশিক্ষিত অভিজাত—সব ধরনের মানুষ ছিল।
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও উনিশ শতকের শুরুতে ইউরোপীয় আলোকায়ন, ফরাসি বিপ্লব, জাতীয় সার্বভৌমত্বের ধারণা এবং প্রাচীন গ্রিসের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার শিক্ষিত গ্রিকদের একটি অংশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একই সময়ে ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্যে সমৃদ্ধ গ্রিক ব্যবসায়ী সম্প্রদায় শিক্ষা ও প্রকাশনার বিস্তারে অর্থায়ন করে।
১৮১৪ সালে ওডেসায় প্রতিষ্ঠিত গোপন সংগঠন ফিলিকি এতেরিয়া অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে একটি গ্রিক বিদ্রোহ সংগঠনের চেষ্টা শুরু করে। তাদের পরিকল্পনা ছিল শুধু স্থানীয় বিদ্রোহ নয়; বৃহত্তর অর্থোডক্স সমর্থন এবং সম্ভব হলে রাশিয়ার সাহায্য লাভ করা।
১৮২১ সালে আলেকজান্দ্রোস ইপসিলান্তিস দানিয়ুবীয় প্রিন্সিপ্যালিটিতে বিদ্রোহের চেষ্টা করেন। এই অভিযান দ্রুত ব্যর্থ হয় এবং রাশিয়াও আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে সমর্থন করেনি। কিন্তু একই বছর পেলোপনিস বা মোরিয়ায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে, এবং সেখান থেকেই গ্রিক স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
গ্রিক বিদ্রোহীরা দ্রুত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখল করে। সেপ্টেম্বর ১৮২১-এ ত্রিপোলিৎসা দখলের পর মুসলিম ও ইহুদি বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ঘটে। অন্যদিকে অটোমান কর্তৃপক্ষও বিদ্রোহ দমনে কঠোর প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। ইস্তাম্বুলে অর্থোডক্স প্যাট্রিয়ার্ক গ্রেগরি পঞ্চমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যদিও তিনি বিদ্রোহকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেননি।
এই সহিংসতার চক্র পরবর্তী বছরগুলোতে আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ১৮২২ সালে খিওস দ্বীপে অটোমান বাহিনীর হত্যাকাণ্ড, দাসত্ব ও ব্যাপক জনস্থানচ্যুতি ইউরোপে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সংবাদপত্র, সাহিত্য ও চিত্রকলার মাধ্যমে গ্রিক সংগ্রাম পশ্চিম ইউরোপীয় জনমতের একটি বড় বিষয়ে পরিণত হয়।
ইউরোপে ফিলহেলেনিজম বা গ্রিকপ্রীতির শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে ওঠে। প্রাচীন গ্রিক সভ্যতাকে ইউরোপীয় সংস্কৃতির ভিত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতার কারণে অনেক বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও স্বেচ্ছাসেবক আধুনিক গ্রিকদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে বিশেষ আবেগের সঙ্গে গ্রহণ করেন। ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রন গ্রিক আন্দোলনের অন্যতম বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সমর্থকে পরিণত হন এবং ১৮২৪ সালে মিসোলঙ্গিতে মারা যান।
কিন্তু ইউরোপীয় সরকারগুলোর অবস্থান প্রথমে এত সরল ছিল না। ১৮১৫ সালের নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পর অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, প্রুশিয়া এবং অন্যান্য রাজতান্ত্রিক শক্তি ইউরোপে বিপ্লবী আন্দোলন দমন করতে আগ্রহী ছিল। তাই একটি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জাতীয় বিদ্রোহকে সমর্থন করা তাদের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারত।
অন্যদিকে গ্রিক প্রশ্নের সঙ্গে রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে ছিল। রাশিয়া নিজেকে অর্থোডক্স শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করত এবং বলকান ও অটোমান প্রণালির দিকে তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত আগ্রহ ছিল। ব্রিটেন ও অস্ট্রিয়া আবার রাশিয়ার অতিরিক্ত সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল।
ফলে গ্রিক প্রশ্ন দ্রুত শুধু অটোমান সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের বিষয় থাকেনি; এটি ইউরোপীয় শক্তির ভারসাম্যের সমস্যায় পরিণত হয়।
প্রথম দিকে অটোমান সরকার গ্রিক বিদ্রোহ পুরোপুরি দমন করতে ব্যর্থ হয়। তখন সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ মিশরের শক্তিশালী শাসক মুহাম্মদ আলীর সাহায্য চান। মুহাম্মদ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে অটোমান সুলতানের অধীন গভর্নর হলেও বাস্তবে মিশরে প্রায় স্বাধীন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলছিলেন।
তার পুত্র ইব্রাহিম পাশা আধুনিকভাবে প্রশিক্ষিত মিশরীয় বাহিনী নিয়ে গ্রিসে অভিযান করেন। ১৮২৫ সালের পর তার বাহিনী পেলোপনিসে গ্রিক বিদ্রোহীদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। মনে হচ্ছিল অটোমান-মিশরীয় বাহিনী শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হতে পারে।
কিন্তু এখানেই ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ সিদ্ধান্তমূলক হয়ে ওঠে।
ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া গ্রিক প্রশ্নে সমঝোতায় পৌঁছায়। তারা যুদ্ধ বন্ধ এবং গ্রিসের জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। অটোমান সরকার বাইরের চাপ প্রত্যাখ্যান করলে পরিস্থিতি সামরিক সংঘর্ষের দিকে যায়।
১৮২৭ সালের ২০ অক্টোবর নাভারিনোর যুদ্ধে ব্রিটিশ, ফরাসি ও রুশ সম্মিলিত নৌবহর অটোমান-মিশরীয় নৌবহরের মুখোমুখি হয়। সংঘর্ষের ফলে অটোমান-মিশরীয় বহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়।
নাভারিনো ছিল অটোমান ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এখানে একটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের ফল নির্ধারণে তিনটি ইউরোপীয় মহাশক্তি সরাসরি সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল। অটোমান সরকার বুঝতে পারে যে এখন তাকে শুধু বিদ্রোহীদের নয়, ইউরোপীয় কূটনীতি ও সামরিক শক্তিকেও মোকাবিলা করতে হবে।
এরপর রাশিয়ার সঙ্গে নতুন যুদ্ধ শুরু হয়। ১৮২৮–১৮২৯ সালের রুশ-অটোমান যুদ্ধে রুশ বাহিনী বলকান ও ককেশাস—দুই দিক থেকেই অগ্রসর হয়। বলকানে তারা শেষ পর্যন্ত এদির্নের কাছে পৌঁছে যায়।
১৮২৯ সালের এদির্নে চুক্তি অটোমানদের জন্য কঠিন ছিল। এর মাধ্যমে গ্রিক প্রশ্নের সমাধানের পথ আরও পরিষ্কার হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮৩০ সালে গ্রিসকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, এবং পরবর্তী ব্যবস্থায় একটি স্বাধীন গ্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
এটি ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের জন্য এক ঐতিহাসিক মোড়। বলকানে একটি খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর জাতীয় আন্দোলন প্রথমবার সফলভাবে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি করল।
তবে গ্রিসই প্রথম অটোমান বলকান অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেনি। সার্বিয়ায় ১৮০৪ সাল থেকেই বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক পরিবর্তন শুরু হয়েছিল। কারাদোর্দে এবং পরে মিলোশ ওব্রেনোভিচের নেতৃত্বে সার্বরা ধীরে ধীরে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করে।
ফলে উনিশ শতকের শুরুতেই অটোমান শাসকেরা বুঝতে পারছিলেন যে বলকানের পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলাচ্ছে। ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক আনুগত্যের পাশাপাশি ভাষা, ইতিহাস ও জাতিগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু জাতীয়তাবাদ একা অটোমান সাম্রাজ্যকে ভাঙেনি। জাতীয় আন্দোলনের সাফল্য অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করেছে স্থানীয় সামরিক সংগঠন, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, অটোমান প্রশাসনের দুর্বলতা এবং বিশেষ করে ইউরোপীয় শক্তির হস্তক্ষেপের ওপর।
গ্রিক স্বাধীনতার ঠিক আগের বছরগুলোতেই দ্বিতীয় মাহমুদ আরেকটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন—জানিসারি বাহিনী। একসময় অটোমান সামরিক শক্তির প্রধান ভিত্তি হওয়া জানিসারিরা তখন সামরিক সংস্কারের বড় বাধা হয়ে উঠেছিল।
দ্বিতীয় মাহমুদ বুঝতে পেরেছিলেন যে ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করতে হবে। কিন্তু অতীতে দ্বিতীয় ওসমান ও তৃতীয় সেলিমের সংস্কারের প্রচেষ্টা জানিসারিদের বিরোধিতায় বিপর্যস্ত হয়েছিল।
১৮২৬ সালে মাহমুদ সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নেন। নতুন সামরিক ব্যবস্থা গঠনের ঘোষণার পর জানিসারিরা বিদ্রোহ করলে সুলতানের অনুগত বাহিনী তাদের ব্যারাক আক্রমণ করে। জানিসারি বাহিনী বিলুপ্ত করা হয়। অটোমান ইতিহাসে ঘটনাটি ভাকা-ই হায়রিয়্যে বা “শুভ ঘটনা” নামে পরিচিত।
এর মাধ্যমে শতাব্দীপ্রাচীন একটি সামরিক প্রতিষ্ঠান শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় মাহমুদ এরপর নতুন সেনাবাহিনী, প্রশাসন, পোশাক, মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই সংস্কার যখন চলছে, তখনই গ্রিক যুদ্ধ, রাশিয়ার আক্রমণ এবং প্রাদেশিক শক্তির উত্থান সাম্রাজ্যের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছিল।
সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাদেশিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন মিশরের মুহাম্মদ আলী পাশা। গ্রিক বিদ্রোহ দমনে সাহায্যের বিনিময়ে তিনি ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক পুরস্কার প্রত্যাশা করেছিলেন। প্রত্যাশা পূরণ না হলে তার সঙ্গে ইস্তাম্বুলের সম্পর্ক ভেঙে পড়ে।
১৮৩১ সালে মুহাম্মদ আলীর পুত্র ইব্রাহিম পাশা সিরিয়ায় অভিযান শুরু করেন। তার আধুনিক মিশরীয় বাহিনী দ্রুত অটোমান বাহিনীকে পরাজিত করে এবং আনাতোলিয়ার গভীরে প্রবেশ করে। ১৮৩২ সালের কোনিয়ার যুদ্ধে অটোমান বাহিনীর বড় পরাজয়ের পর মিশরীয় সেনারা ইস্তাম্বুলের দিকে অগ্রসর হওয়ার অবস্থানে পৌঁছে যায়।
সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদ এমন পরিস্থিতিতে পড়েন যে তাকে নিজের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ার সাহায্য চাইতে হয়। রুশ বাহিনী বসফরাস অঞ্চলে এসে উপস্থিত হয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্স এতে উদ্বিগ্ন হয়ে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করে।
এই ঘটনা অটোমান দুর্বলতার একটি নতুন মাত্রা প্রকাশ করে। সাম্রাজ্যের একটি নামমাত্র অধীন প্রাদেশিক শাসক এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন যে রাজধানী রক্ষার জন্য সুলতানকে রুশ সামরিক সহায়তা চাইতে হচ্ছে।
১৮৩৩ সালের হুনকার ইস্কেলেসি চুক্তি রাশিয়া ও অটোমানদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে এবং ইউরোপে বিশেষ উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বসফরাস ও দারদানেলিসের ভবিষ্যৎ এখন শুধু অটোমান বিষয় নয়; ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এই বৃহত্তর সমস্যাই ইউরোপীয় কূটনীতিতে “ইস্টার্ন কোয়েশ্চেন” বা প্রাচ্য প্রশ্ন নামে পরিচিত হতে শুরু করে। প্রশ্নটি মোটামুটি ছিল—অটোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা দুর্বল হলে তার ভূখণ্ড, প্রণালি এবং অধীন জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ কী হবে, এবং কোন ইউরোপীয় শক্তি সেই পরিবর্তন থেকে কতটা লাভ করবে?
১৮৩৯ সালে মিশরের সঙ্গে নতুন যুদ্ধে অটোমান বাহিনী আবারও নিজিপের যুদ্ধে পরাজিত হয়। একই সময় দ্বিতীয় মাহমুদ মারা যান। অল্পবয়সী আবদুলমেজিদ প্রথম সিংহাসনে বসেন এবং পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কিন্তু এবার ব্রিটেন, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া ও প্রুশিয়া মুহাম্মদ আলীর অতিরিক্ত সম্প্রসারণ ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করে। শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদ আলীকে মিশরের বংশানুক্রমিক শাসন দেওয়া হলেও সিরিয়াসহ অধিকাংশ নতুন দখল ছেড়ে দিতে হয়।
এখানে অটোমান ইতিহাসের একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়—ইউরোপীয় শক্তিগুলো কখনো অটোমান ভূখণ্ড নিতে চাইছে, আবার কখনো নিজেদের পারস্পরিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য অটোমান সাম্রাজ্যকেই বাঁচিয়ে রাখছে।
একই সময়ে সাম্রাজ্যের ভেতরে বৃহৎ সংস্কার শুরু হয়। ১৮৩৯ সালে গুলহানে ফরমান ঘোষণার মাধ্যমে তানজিমাত যুগের সূচনা ঘটে। সরকারের লক্ষ্য ছিল করব্যবস্থা, সামরিক নিয়োগ, প্রশাসন, আইন ও প্রজাদের নিরাপত্তাকে আরও নিয়মিত ও কেন্দ্রীভূত করা।
তানজিমাত শুধু ইউরোপকে খুশি করার প্রকল্প ছিল না। অটোমান শাসকেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে রাষ্ট্রকে কেন্দ্রীভূত, কার্যকর এবং আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোয় রূপান্তর না করলে সাম্রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করা কঠিন হবে।
নতুন মন্ত্রণালয়, আধুনিক বিদ্যালয়, সামরিক শিক্ষা, আমলাতন্ত্র, আইনসংহতি এবং যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশ ঘটে। একই সঙ্গে মুসলিম ও অমুসলিম প্রজাদের রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা শুরু হয়।
কিন্তু সংস্কার সহজ ছিল না। মুসলিম সমাজের একটি অংশ পুরোনো বিশেষাধিকার হারানোর আশঙ্কা করছিল, আবার অনেক খ্রিষ্টান সম্প্রদায় আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতা চাইছিল। ইউরোপীয় শক্তিগুলোও অমুসলিমদের অধিকার প্রশ্নকে নিজেদের কূটনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করত।
এই জটিলতার কেন্দ্রে আবার উঠে আসে রাশিয়া। জার প্রথম নিকোলাস অটোমান সাম্রাজ্যের দুর্বলতাকে গভীর উদ্বেগ ও সুযোগ—দুইভাবেই দেখতেন। রাশিয়ার জন্য কৃষ্ণসাগর, বলকানের অর্থোডক্স জনগোষ্ঠী এবং বসফরাস-দারদানেলিস ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৮৫০-এর দশকের শুরুতে জেরুজালেম ও পবিত্র ভূমির খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর অধিকার নিয়ে ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স শক্তির মধ্যে বিরোধ নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। কিন্তু ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ শুধু পবিত্র স্থানের বিরোধ ছিল না। এর পেছনে ছিল রুশ-অটোমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রণালির নিরাপত্তা এবং ইউরোপীয় শক্তির ভারসাম্য।
রাশিয়া অটোমান সাম্রাজ্যের অর্থোডক্স প্রজাদের বিষয়ে বিস্তৃত রাজনৈতিক অধিকার দাবি করার চেষ্টা করলে ইস্তাম্বুল তা প্রত্যাখ্যান করে। ১৮৫৩ সালে রুশ বাহিনী মোলদাভিয়া ও ওয়ালাচিয়া দখল করলে সংকট যুদ্ধে রূপ নেয়।
অটোমানরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। প্রথম দিকে দানিয়ুব ও ককেশাসে যুদ্ধ চলে। কিন্তু ১৮৫৩ সালের নভেম্বরে সিনোপে রুশ নৌবাহিনী একটি অটোমান নৌবহর ধ্বংস করলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সে রুশ সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
ব্রিটেনের জন্য রাশিয়ার ভূমধ্যসাগরের দিকে অগ্রসর হওয়া তার সামুদ্রিক ও ভারতমুখী কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকি হতে পারত। ফ্রান্সেরও ভূমধ্যসাগর ও ইউরোপীয় মর্যাদার প্রশ্নে স্বার্থ ছিল। ফলে ১৮৫৪ সালে ব্রিটেন ও ফ্রান্স অটোমান সাম্রাজ্যের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে।
এই দৃশ্যটি মাত্র কয়েক দশক আগের গ্রিক যুদ্ধের সঙ্গে বিস্ময়কর বৈপরীত্য তৈরি করে। নাভারিনোতে ব্রিটিশ, ফরাসি ও রুশ নৌবহর একসঙ্গে অটোমান-মিশরীয় নৌবহর ধ্বংস করেছিল। এখন ব্রিটেন ও ফ্রান্স অটোমানদের সঙ্গে মিলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।
এই পরিবর্তনের কারণ কোনো স্থায়ী বন্ধুত্ব ছিল না। ইউরোপীয় মহাশক্তির প্রধান বিবেচনা ছিল নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য।
যুদ্ধের প্রধান অভিযান শেষ পর্যন্ত ক্রিমিয়ায় কেন্দ্রীভূত হয়। ব্রিটিশ, ফরাসি ও অটোমান বাহিনী রুশ কৃষ্ণসাগরীয় নৌঘাঁটি সেভাস্তোপোল আক্রমণ করে। দীর্ঘ অবরোধ, রোগ, শীত, দুর্বল সরবরাহব্যবস্থা এবং আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার ক্রিমিয়ার যুদ্ধকে উনিশ শতকের সবচেয়ে কঠিন সংঘর্ষগুলোর একটিতে পরিণত করে।
এ যুদ্ধে রেলপথ, টেলিগ্রাফ, সংবাদপত্রের যুদ্ধসংবাদ, উন্নত রাইফেল এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রাথমিক ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধ পুরোনো সাম্রাজ্যিক যুদ্ধ এবং আধুনিক শিল্পযুগের যুদ্ধের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু।
১৮৫৫ সালে দীর্ঘ অবরোধের পর সেভাস্তোপোলের প্রধান প্রতিরক্ষাস্থলগুলো মিত্রবাহিনীর হাতে চলে যায় এবং রাশিয়া শান্তির দিকে এগোতে বাধ্য হয়।
১৮৫৬ সালের প্যারিস চুক্তি ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অবসান ঘটায়। অটোমান সাম্রাজ্যের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে ইউরোপীয় শক্তির বৃহত্তর কূটনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং কৃষ্ণসাগরের সামরিক ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়।
দেখতে এটি অটোমানদের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য। রাশিয়ার অগ্রযাত্রা থামানো হয়েছে এবং ব্রিটেন ও ফ্রান্স অটোমান সাম্রাজ্যের পক্ষে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু এই বিজয়ের মধ্যেও একটি গভীর দুর্বলতা প্রকাশ পায়—সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা ক্রমশ আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধ অটোমান অর্থনীতির ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য ১৮৫৪ সালে অটোমান সরকার প্রথম বড় বিদেশি ঋণ গ্রহণ করে। পরবর্তী দশকগুলোতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা দ্রুত বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তা গুরুতর আর্থিক সংকটে পরিণত হবে।
১৮৫৬ সালে নতুন সংস্কার ফরমান ইসলাহাত ফরমানি ঘোষণা করা হয়। এতে অমুসলিম প্রজাদের আইনগত অবস্থান ও সমতার প্রশ্নে আরও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এটি তানজিমাতের ধারাবাহিকতা হলেও ইউরোপীয় কূটনৈতিক চাপের প্রভাবও এতে স্পষ্ট ছিল।
এই সময়ের ইতিহাস তাই একটি আপাতবিরোধী চিত্র তৈরি করে। একদিকে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে না; বরং সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করছে, নতুন মন্ত্রণালয় তৈরি করছে, আইন সংস্কার করছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ছে এবং আন্তর্জাতিক জোটে অংশ নিচ্ছে। অন্যদিকে তার ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলো ক্রমশ সরাসরি সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে।
গ্রিক স্বাধীনতা এই পরিবর্তনের একটি বড় সূচনা। এটি দেখিয়েছিল যে একটি অটোমান প্রদেশে জাতীয় বিদ্রোহ ইউরোপীয় হস্তক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হলে স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি হতে পারে। এরপর সার্বিয়া, রোমানীয় অঞ্চল, বুলগেরিয়া এবং অন্যান্য বলকান জনগোষ্ঠীর রাজনীতিতেও জাতীয় পরিচয় ক্রমে শক্তিশালী হয়।
তবে বলকানের জাতীয়তাবাদকে আজকের জাতিরাষ্ট্রের মানচিত্র দিয়ে অতীতে ফিরিয়ে দেখা উচিত নয়। উনিশ শতকের অটোমান বলকান ছিল ভাষা, ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের দিক থেকে অত্যন্ত মিশ্র অঞ্চল। একই শহর বা গ্রামে গ্রিক, স্লাভ, আলবেনীয়, তুর্কি, ভ্লাখ, ইহুদি এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠী পাশাপাশি বসবাস করতে পারত।
জাতীয় আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বহুমাত্রিক পরিচয়গুলোকে ক্রমে নির্দিষ্ট জাতীয় শ্রেণিতে ভাগ করার চেষ্টা শুরু হয়। গির্জা, বিদ্যালয়, ভাষা, ইতিহাস এবং মুদ্রিত সাহিত্য এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অটোমান সরকার এর জবাবে শুধু সামরিক দমন ব্যবহার করেনি। তানজিমাতের মাধ্যমে তারা “অটোমান” রাজনৈতিক পরিচয়ের অধীনে বিভিন্ন ধর্মের প্রজাদের একটি আধুনিক সাম্রাজ্যিক নাগরিক কাঠামোতে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। পরবর্তী সময়ে এই ধারণা অটোমানবাদ নামে আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ পায়।
কিন্তু এর সামনে বড় বাধা ছিল। স্থানীয় জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হচ্ছিল, ইউরোপীয় শক্তি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করছিল এবং মুসলিম ও অমুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে অসন্তোষ ছিল।
গ্রিক স্বাধীনতা থেকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ পর্যন্ত মাত্র তিন দশকের ইতিহাস তাই অটোমান সাম্রাজ্যকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। ১৮২১ সালে সাম্রাজ্য একটি প্রাদেশিক বিদ্রোহ দমন করার চেষ্টা করছিল; ১৮৫৬ সালের মধ্যে তার অভ্যন্তরীণ সংস্কার, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অধিকার, সীমান্ত এবং এমনকি তার অস্তিত্বও ইউরোপীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তনের জন্য শুধু অটোমান সামরিক দুর্বলতা দায়ী ছিল না। ইউরোপে জাতীয়তাবাদের বিস্তার, রাশিয়ার দক্ষিণমুখী উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ব্রিটিশ সামুদ্রিক স্বার্থ, ফরাসি রাজনীতি, অস্ট্রিয়ার বলকান উদ্বেগ এবং মিশরের মুহাম্মদ আলীর উত্থান—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করেছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল সার্বভৌমত্বের প্রকৃতিতে। আগে ইস্তাম্বুল কোনো প্রদেশে বিদ্রোহকে প্রধানত নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে পারত। এখন সেই বিদ্রোহ নিয়ে লন্ডন, প্যারিস, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও ভিয়েনায় আলোচনা হচ্ছে; বিদেশি নৌবহর পাঠানো হচ্ছে; শান্তিচুক্তিতে প্রজাদের অধিকার নির্ধারিত হচ্ছে।
এভাবেই অটোমান সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে তথাকথিত প্রাচ্য প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে আসে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো একদিকে অটোমান দুর্বলতা থেকে লাভ করতে চাইত, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো শক্তি যেন অতিরিক্ত লাভ না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে চাইত।
ফলে অটোমান সাম্রাজ্যের ভাঙন কোনো সোজা বা অনিবার্য প্রক্রিয়া ছিল না। যে ব্রিটেন ও ফ্রান্স গ্রিক স্বাধীনতার পথে অটোমানদের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছিল, তারাই ক্রিমিয়ার যুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য রক্ষায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়েছিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই বৈপরীত্যই উনিশ শতকের অটোমান ইতিহাস বোঝার চাবিকাঠি।
গ্রিক স্বাধীনতা সাম্রাজ্যের বলকান কাঠামোয় প্রথম বড় ফাটলগুলোর একটি সৃষ্টি করেছিল। দ্বিতীয় মাহমুদের সংস্কার পুরোনো সামরিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে নতুন রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা করেছিল। মুহাম্মদ আলীর বিদ্রোহ দেখিয়েছিল কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রাদেশিক শক্তি কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। তানজিমাত সাম্রাজ্যকে আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের চেষ্টা করেছিল। আর ক্রিমিয়ার যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছিল যে অটোমান সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ এখন ইউরোপের বৃহত্তর শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
তাই ১৮২১ থেকে ১৮৫৬ সালের সময়কে শুধু “অটোমান পতনের” অধ্যায় বলা যথেষ্ট নয়। এটি ছিল একই সঙ্গে ভাঙন, সংস্কার, জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের যুগ। অটোমানরা এখনও বিশাল রাষ্ট্র, এখনও যুদ্ধ করতে সক্ষম এবং এখনও ইউরোপীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি—কিন্তু তারা আর নিজেদের সাম্রাজ্যের প্রতিটি সংকট একা নির্ধারণ করতে পারছে না।
এই পরিবর্তনই ভবিষ্যতের আরও বড় সংকটের ভিত্তি তৈরি করে। বলকানের জাতীয় আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে, রাশিয়া আবার অটোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে, বিদেশি ঋণ সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে দুর্বল করবে এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো অটোমান ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও সরাসরি প্রতিযোগিতায় জড়াবে।
গ্রিক স্বাধীনতা থেকে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে তাই অটোমান সাম্রাজ্য একদিনে ভেঙে পড়েনি—বরং তার পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো ধীরে ধীরে ফাটতে শুরু করেছিল। জাতীয়তাবাদ সেই ফাটলকে গভীর করেছে, রাশিয়ার চাপ তাকে বিপজ্জনক করেছে এবং ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সমস্যাকে আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ দিয়েছে। এই তিন শক্তির সম্মিলিত প্রভাবেই উনিশ শতকের অটোমান রাষ্ট্র এমন এক নতুন যুগে প্রবেশ করে, যেখানে সাম্রাজ্যকে শুধু সীমান্ত রক্ষা নয়, নিজের জনগণ, প্রশাসন, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্ব—সবকিছুকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হয়েছিল।
প্যারিসে ভাইকিং আক্রমণ ও নরম্যান্ডির জন্ম: রোলো থেকে নরম্যান শক্তির উত্থানের ইতিহাস
আলফ্রেড দ্য গ্রেট বনাম ভাইকিং: এডিংটনের যুদ্ধ, গুথরুম ও ডেনল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
গ্রেট হিথেন আর্মি: বিশাল ভাইকিং বাহিনী কীভাবে ইংল্যান্ডের রাজ্যগুলো একে একে দখল করেছিল?
ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড ও ফ্রান্সে ভাইকিং অভিযান: লুটপাট থেকে স্থায়ী বসতি ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস
ভাইকিং লংশিপ ও নৌযাত্রা: যে প্রযুক্তি নর্স যোদ্ধাদের ইউরোপের আতঙ্কে পরিণত করেছিল
লিন্ডিসফার্ন আক্রমণ ৭৯৩: যে ভয়াবহ হামলা ইউরোপে ভাইকিং যুগের সূচনা করেছিল