বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

চীনের ঝাংজিয়াজির পাথরের স্তম্ভ: প্রকৃতি কীভাবে তৈরি করেছে ‘ভাসমান পাহাড়ের’ বিস্ময়কর জগৎ?

  • Author: Admin
  • August 31, 2026
চীনের ঝাংজিয়াজির পাথরের স্তম্ভ: প্রকৃতি কীভাবে তৈরি করেছে ‘ভাসমান পাহাড়ের’ বিস্ময়কর জগৎ?
কুয়াশার রাজ্যে ঝাংজিয়াজির বিস্ময়কর পাথরের স্তম্ভ

চীনের হুনান প্রদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এমন এক ভূদৃশ্য রয়েছে, যাকে প্রথম দেখায় বাস্তব পৃথিবীর অংশ বলেই বিশ্বাস করা কঠিন। গভীর সবুজ উপত্যকার বুক চিরে শত শত মিটার ওপরে উঠে গেছে অসংখ্য সরু পাথরের স্তম্ভ। কোনোটি বিশাল টাওয়ারের মতো, কোনোটি আবার নিচের দিকে সরু হয়ে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে দূর থেকে মনে হয় মেঘের মধ্যে ভেসে থাকা একটি বিচ্ছিন্ন পাহাড়। বৃষ্টি কিংবা কুয়াশার দিনে যখন এসব স্তম্ভের নিচের অংশ দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়, তখন সত্যিই মনে হয় পাহাড়গুলো যেন মাটির সঙ্গে যুক্ত নয়—আকাশের মধ্যে ভাসছে। এই অবিশ্বাস্য ভূদৃশ্যই চীনের ঝাংজিয়াজিকে পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর প্রাকৃতিক অঞ্চলে পরিণত করেছে।

কিন্তু ঝাংজিয়াজির সৌন্দর্যের চেয়েও বিস্ময়কর এর জন্মের গল্প। কোনো একটি আকস্মিক ভূতাত্ত্বিক ঘটনা এসব স্তম্ভ সৃষ্টি করেনি। বরং শিলা গঠন, ভূত্বকের পরিবর্তন, ফাটল সৃষ্টি, পানি, বৃষ্টি, তাপমাত্রার পরিবর্তন, উদ্ভিদের শিকড় এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়ের সম্মিলিত প্রভাবে অত্যন্ত ধীরে ধীরে বর্তমান ভূদৃশ্য তৈরি হয়েছে। আজ আমরা যে সুউচ্চ বিচ্ছিন্ন স্তম্ভ দেখি, সেগুলো আসলে একসময় অনেক বেশি বিস্তৃত ও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত শিলাস্তরের অংশ ছিল। প্রকৃতি কোটি কোটি বছর ধরে সেই বিশাল শিলাভূমির দুর্বল অংশগুলো সরিয়ে দিয়ে অপেক্ষাকৃত শক্ত অংশগুলোকে স্তম্ভ হিসেবে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

ঝাংজিয়াজির বিখ্যাত ভূদৃশ্য মূলত উলিংইউয়ান অঞ্চলের অংশ। এখানে হাজার হাজার পাথরের স্তম্ভ, চূড়া, খাড়া দেয়াল, গিরিখাত ও প্রাকৃতিক শিলা কাঠামো ছড়িয়ে রয়েছে। অনেক স্তম্ভই কয়েক শ মিটার উঁচু। দূর থেকে এগুলোকে পাশাপাশি দাঁড়ানো অসংখ্য প্রস্তর মিনারের মতো মনে হয়। কিন্তু এগুলো সাধারণ পাহাড়ের ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়। এদের প্রায় উল্লম্ব দেয়াল এবং সরু আকৃতির পেছনে রয়েছে এখানকার শিলার প্রকৃতি ও শিলার মধ্যে তৈরি হওয়া অসংখ্য ফাটলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

ঝাংজিয়াজির পাথরের স্তম্ভকে বোঝার জন্য প্রথমেই জানতে হয় এগুলো কী দিয়ে তৈরি। অঞ্চলটির বিখ্যাত স্তম্ভগুলোর বড় অংশ প্রধানত কোয়ার্টজসমৃদ্ধ বেলেপাথর দিয়ে গঠিত। অর্থাৎ বহু প্রাচীনকালে জমা হওয়া বালুকণা দীর্ঘ সময় ধরে চাপ ও প্রাকৃতিক সিমেন্টজাতীয় পদার্থের প্রভাবে শক্ত হয়ে এই শিলা তৈরি করেছিল। কোয়ার্টজ তুলনামূলকভাবে কঠিন ও ক্ষয়প্রতিরোধী খনিজ। ফলে কোয়ার্টজসমৃদ্ধ বেলেপাথর নির্দিষ্ট পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে বিশাল খাড়া কাঠামো হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

আজকের ঝাংজিয়াজির জায়গায় যখন এসব বালুকণার স্তর জমছিল, তখন পৃথিবীর ভূগোল বর্তমানের মতো ছিল না। দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়ে পলি ও বালু জমে পুরু স্তর তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে সেগুলো চাপের নিচে শক্ত শিলায় পরিণত হয়। কিন্তু শুধু শক্ত বেলেপাথর তৈরি হলেই এমন হাজারো বিচ্ছিন্ন স্তম্ভ সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। এর জন্য দরকার ছিল শিলাকে ভাগ করার মতো দুর্বল রেখা।

ভূত্বকের দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন ও চাপের ফলে বিশাল শিলাস্তরের মধ্যে অসংখ্য ফাটল বা সন্ধি সৃষ্টি হয়। এসব ফাটল শুরুতে হয়তো খুবই সরু ছিল। কিন্তু প্রকৃতির কাছে একটি সূক্ষ্ম ফাটলও ভবিষ্যতের বিশাল গিরিখাতের সূচনা হতে পারে। বৃষ্টির পানি সেই ফাটলের মধ্যে প্রবেশ করে, প্রবাহিত পানি দুর্বল অংশ ক্ষয় করে এবং উদ্ভিদের শিকড় ধীরে ধীরে ফাটলকে আরও প্রশস্ত করতে থাকে। ফলে একসময় পাশাপাশি থাকা শিলার অংশগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে।

ঝাংজিয়াজির স্তম্ভ তৈরির মূল রহস্য তাই নতুন পাথর তৈরি হওয়ার মধ্যে নয়, বরং পুরোনো বিশাল শিলাস্তর থেকে চারপাশের পাথর ধীরে ধীরে অপসারিত হওয়ার মধ্যে। ভূতাত্ত্বিক ভাষায় একে পার্থক্যমূলক ক্ষয়ের একটি অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। একই শিলাস্তরের সব অংশ সমান শক্ত নয়। কোথাও ফাটল বেশি, কোথাও শিলা অপেক্ষাকৃত দুর্বল, আবার কোথাও কোয়ার্টজসমৃদ্ধ শক্ত অংশ বেশি প্রতিরোধী। ফলে পানি ও আবহাওয়ার আক্রমণে দুর্বল অংশ দ্রুত ক্ষয় হয়, শক্ত অংশ দীর্ঘ সময় টিকে থাকে।

বৃষ্টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ঝাংজিয়াজি আর্দ্র জলবায়ুর অঞ্চল। প্রচুর বৃষ্টিপাত পাহাড়ের ওপর পড়ে অসংখ্য ক্ষুদ্র জলধারা তৈরি করে। সেই পানি শিলার ফাটল ধরে নিচে নামে। প্রতিবার বৃষ্টিতে অতি সামান্য পরিমাণ শিলা ক্ষয় হলেও লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সেই ক্ষুদ্র পরিবর্তন বিশাল আকার ধারণ করে। সরু ফাটল প্রশস্ত হয়ে নালা হয়, নালা আরও গভীর হয়ে গিরিখাত তৈরি করে এবং শেষ পর্যন্ত একটি বড় শিলাখণ্ড পাশের শিলা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

প্রবাহিত পানির কাজ শুধু ওপরের অংশেই সীমাবদ্ধ নয়। উপত্যকার তলদেশের নদী ও জলধারা ক্ষয়প্রাপ্ত পাথর, বালি ও মাটি সরিয়ে নিয়ে যায়। যদি ভাঙা উপাদানগুলো নিচেই জমে থাকত, তাহলে ভূদৃশ্য এত গভীরভাবে কেটে যাওয়া কঠিন হতো। কিন্তু পানি ক্রমাগত সেই ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে দেওয়ায় নতুন শিলা উন্মুক্ত হয় এবং ক্ষয় চলতে থাকে। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই গভীর উপত্যকা এবং উঁচু বিচ্ছিন্ন স্তম্ভের মধ্যে উচ্চতার নাটকীয় পার্থক্য তৈরি করেছে।

তাপমাত্রার পরিবর্তনও শিলা ভাঙার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। শিলার ফাটলে পানি প্রবেশ করে এবং উপযুক্ত ঠান্ডা অবস্থায় তা জমে বরফে পরিণত হলে আয়তন বৃদ্ধি পায়। বারবার এমন ঘটনা ঘটলে ফাটলের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তবে ঝাংজিয়াজির সম্পূর্ণ ভূদৃশ্যকে শুধু বরফ জমা ও গলার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়। এখানকার স্তম্ভ তৈরিতে বৃষ্টিজনিত ক্ষয়, প্রবাহিত পানি, রাসায়নিক পরিবর্তন, শিলার পূর্ববর্তী ফাটল এবং দীর্ঘমেয়াদি আবহবিকার সম্মিলিতভাবে কাজ করেছে।

উদ্ভিদও এই প্রক্রিয়ার নীরব সহযোগী। ঝাংজিয়াজির স্তম্ভগুলোর গায়ে এবং চূড়ায় গাছপালা জন্মাতে দেখা যায়। ক্ষুদ্র ফাটলে জমে থাকা মাটিতে কোনো বীজ অঙ্কুরিত হলে তার শিকড় ধীরে ধীরে শিলার ভেতরে প্রবেশ করে। শিকড় মোটা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফাটলের দুই পাশের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময়ে এতে ছোট শিলাখণ্ড আলগা হয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি পচে যাওয়া জৈব পদার্থ ও পানি শিলার কিছু খনিজের রাসায়নিক পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখে।

এই ক্ষয়ের প্রক্রিয়াকে যদি দ্রুতগতিতে দেখা সম্ভব হতো, তাহলে ঝাংজিয়াজির ইতিহাস অনেকটা একটি বিশাল পাথরের মালভূমিকে ধীরে ধীরে অসংখ্য অংশে কেটে ফেলার মতো দেখাত। প্রথমে বড় ফাটলগুলো প্রশস্ত হতো। তারপর তৈরি হতো দীর্ঘ শৈলপ্রাচীর। সেই প্রাচীরগুলো আরও ক্ষয়ের ফলে পৃথক চূড়ায় বিভক্ত হতো। চূড়াগুলোর চারপাশ ক্ষয় হতে হতে সেগুলো সরু স্তম্ভে পরিণত হতো। অর্থাৎ আজকের বিচ্ছিন্ন স্তম্ভগুলো ভূদৃশ্যের চূড়ান্ত স্থায়ী অবস্থা নয়; এগুলো একটি চলমান ভূতাত্ত্বিক রূপান্তরের বর্তমান মুহূর্তমাত্র।

এই কারণেই সব স্তম্ভের আকৃতি এক নয়। কোনোটি ওপরের দিকে তুলনামূলক চওড়া, কোনোটি লম্বা ও সরু, কোনোটি একাধিক খণ্ডের মতো, আবার কোনো কোনো স্থানে দুটি পাথরের অংশের মধ্যে প্রাকৃতিক সেতুও দেখা যায়। শিলার কোথায় ফাটল ছিল, কোন দিকে পানি প্রবাহিত হয়েছে, কোন অংশ কতটা শক্ত ছিল এবং কত দ্রুত ক্ষয় হয়েছে—এসব পার্থক্য প্রতিটি কাঠামোর আলাদা চেহারা তৈরি করেছে।

ঝাংজিয়াজির ভূদৃশ্যের আরেকটি বিস্ময় হলো এর খাড়া দেয়াল। সাধারণ পাহাড়ে ঢাল অনেক সময় ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। কিন্তু এখানে বহু স্তম্ভের পাশ প্রায় উল্লম্ব। এর কারণ বেলেপাথরের ফাটলগুলো অনেক ক্ষেত্রে উল্লম্বভাবে বিস্তৃত এবং ক্ষয় সেই দুর্বল রেখা অনুসরণ করেছে। শিলার বড় অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে পড়ে গেলে অপেক্ষাকৃত সোজা প্রস্তরপ্রাচীর উন্মুক্ত হতে পারে। পরে সেই দেয়াল আবার আবহবিকার ও ক্ষয়ের শিকার হয়।

তবে পাথরের স্তম্ভগুলো অমর নয়। আজও ঝাংজিয়াজির ভূদৃশ্য পরিবর্তিত হচ্ছে। বৃষ্টির পানি এখনও ফাটলের মধ্যে প্রবেশ করছে, ক্ষুদ্র শিলাখণ্ড এখনও ভেঙে পড়ছে, গাছের শিকড় এখনও পাথরের দুর্বল অংশে চাপ সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো স্তম্ভ ভবিষ্যতে ভেঙে পড়বে, কোনো শৈলপ্রাচীর বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন স্তম্ভের জন্ম দেবে এবং কোনো সরু চূড়া আরও ক্ষয় হয়ে একসময় হারিয়ে যাবে। মানুষের জীবনের তুলনায় এই পরিবর্তন এত ধীর যে পাহাড়গুলোকে স্থায়ী মনে হয়; ভূতাত্ত্বিক সময়ের বিচারে এগুলো ক্রমাগত পরিবর্তনশীল।

ঝাংজিয়াজিকে ‘ভাসমান পাহাড়ের’ জগৎ মনে হওয়ার পেছনে শুধু পাথরের আকৃতি নয়, এখানকার আবহাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। আর্দ্র বাতাস পাহাড়ের মধ্যে উঠে ঠান্ডা হলে ঘন কুয়াশা ও নিচু মেঘ তৈরি হতে পারে। তখন গভীর উপত্যকা সাদা কুয়াশায় ঢাকা পড়ে, কিন্তু উঁচু স্তম্ভগুলোর মাথা তার ওপর দৃশ্যমান থাকে। পর্যবেক্ষকের চোখ নিচের সংযোগস্থল দেখতে না পাওয়ায় চূড়াগুলোকে আকাশে বিচ্ছিন্নভাবে ভাসতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে পাহাড়গুলো ভাসছে না; কুয়াশা তাদের মাটির সঙ্গে দৃশ্যমান সংযোগটুকু লুকিয়ে দিয়ে এক অসাধারণ দৃষ্টিবিভ্রম তৈরি করছে।

ঘন বন এই দৃশ্যকে আরও নাটকীয় করে তোলে। অনেক পাথরের স্তম্ভের মাথায় এবং গায়ে গাছ জন্মেছে। শত শত মিটার উঁচু একটি সরু পাথরের চূড়ার মাথায় সবুজ গাছপালা এবং তার চারদিকে সাদা মেঘ থাকলে দৃশ্যটি পৃথিবীর পরিচিত ভূদৃশ্যের বদলে কল্পজগতের কোনো দ্বীপের মতো মনে হয়। সূর্যের আলো মেঘের ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করলে কাছের স্তম্ভগুলো স্পষ্ট দেখা যায়, আর দূরের স্তম্ভগুলো নীলচে বা ধূসর কুয়াশার স্তরে ক্রমশ মিলিয়ে যায়। এর ফলে ভূদৃশ্যের গভীরতা বাস্তবের চেয়েও বেশি বলে মনে হতে পারে।

ঝাংজিয়াজির একটি নির্দিষ্ট সুউচ্চ স্তম্ভ আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে দেখা কল্পিত ভাসমান পাহাড়ের সঙ্গে তুলনার কারণে। পরবর্তী সময়ে সেই স্তম্ভের নামও চলচ্চিত্রটির কাল্পনিক জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত করে পরিবর্তন করা হয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—ঝাংজিয়াজির পাথরের স্তম্ভগুলো কোনো চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি নয় এবং চলচ্চিত্রের কল্পিত পাহাড়ও ঝাংজিয়াজির হুবহু প্রতিরূপ নয়। বরং বাস্তব ভূদৃশ্যটির অস্বাভাবিক সৌন্দর্য মানুষের কল্পনায় ভাসমান পাহাড়ের ধারণার সঙ্গে সহজেই মিশে গেছে।

এ অঞ্চলের বৈজ্ঞানিক গুরুত্বও এর দৃশ্যমান সৌন্দর্যের মতোই অসাধারণ। ঝাংজিয়াজি দেখায় কীভাবে শিলার অভ্যন্তরীণ গঠন এবং বাইরের আবহাওয়া একসঙ্গে একটি ভূদৃশ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে। একই বৃষ্টি যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের শিলার ওপর পড়ত, তাহলে এমন স্তম্ভ তৈরি নাও হতে পারত। আবার একই বেলেপাথর যদি শুষ্ক অঞ্চলে থাকত অথবা এর মধ্যে উপযুক্ত ফাটল না থাকত, তাহলেও বর্তমান ঝাংজিয়াজির মতো দৃশ্য সৃষ্টি হওয়া কঠিন হতো। অর্থাৎ এখানে শিলার ধরন, ফাটলের বিন্যাস, ভূ-উত্থান, পানি, জলবায়ু, উদ্ভিদ ও সময়—সবকিছুর একটি বিশেষ সমন্বয় কাজ করেছে।

ঝাংজিয়াজির ভূতাত্ত্বিক পরিচয় নিয়ে একটি প্রচলিত ভুল ধারণাও রয়েছে। এর অস্বাভাবিক স্তম্ভ দেখে অনেকেই এগুলোকে চুনাপাথরের কার্স্ট ভূমির সঙ্গে এক করে ফেলেন। দক্ষিণ চীনের বহু অঞ্চলে পানি চুনাপাথর দ্রবীভূত করে বিখ্যাত কার্স্ট পাহাড়, গুহা ও চূড়া তৈরি করেছে। ঝাংজিয়াজির প্রধান স্তম্ভভূমি কিন্তু মূলত কোয়ার্টজসমৃদ্ধ বেলেপাথরের ক্ষয়জাত ভূদৃশ্য। তাই দেখতে কিছু মিল থাকলেও এর গঠনপ্রক্রিয়া সাধারণ চুনাপাথরের কার্স্ট অঞ্চলের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়।

পাথরের স্তম্ভগুলোর বর্তমান উচ্চতা বুঝতে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—উপত্যকা যত গভীর হয়েছে, স্তম্ভগুলো তত উঁচু বলে দৃশ্যমান হয়েছে। অর্থাৎ স্তম্ভের উচ্চতা শুধু ওপরের দিকে কোনো পাথর উঠে যাওয়ার ফল নয়। আশপাশের ভূমি এবং উপত্যকার অংশ ক্রমাগত নিচু হওয়ার কারণেও অবশিষ্ট শক্ত শিলাখণ্ডগুলো আরও নাটকীয়ভাবে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃতির ভাস্কর্য তৈরির মূল কৌশলই হলো কিছু যোগ করা নয়, বরং চারপাশ থেকে উপাদান সরিয়ে ফেলা।

একটি পাথরের স্তম্ভের জীবনচক্র কল্পনা করলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সহজে বোঝা যায়। প্রথমে সেটি বৃহৎ শিলামালার অংশ। ফাটল তার চারপাশকে দুর্বল করে। পানি সেই ফাটল প্রশস্ত করে এবং দুই পাশের উপত্যকা গভীর হতে থাকে। একসময় শিলাখণ্ডটি প্রায় বিচ্ছিন্ন টাওয়ারে পরিণত হয়। এরপর এর গা থেকে খণ্ড খণ্ড পাথর ভেঙে পড়ে, মাথা ক্ষয় হয় এবং স্তম্ভ ক্রমশ সরু হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কাঠামোগত ভারসাম্য হারালে বিশাল অংশ ধসে পড়তে পারে। ধ্বংসাবশেষ আবার পানি ও মাধ্যাকর্ষণের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়। অর্থাৎ যে প্রক্রিয়া একটি স্তম্ভকে দৃশ্যমান করেছে, সেই একই প্রক্রিয়া একদিন তাকে ধ্বংসও করবে।

এই দীর্ঘ পরিবর্তনের সামনে মানুষের ইতিহাস অত্যন্ত ক্ষুদ্র। কোনো সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতন, কোনো নগরীর কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস কিংবা মানুষের কয়েক প্রজন্ম—ঝাংজিয়াজির ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের তুলনায় মুহূর্তের মতো। যে ক্ষুদ্র ফাটলের মধ্যে আজ বৃষ্টির পানি ঢুকছে, সেটি মানুষের চোখে গুরুত্বহীন মনে হতে পারে; কিন্তু পর্যাপ্ত সময় পেলে সেই ফাটলই ভবিষ্যতের কোনো বিচ্ছিন্ন শৈলচূড়া বা গিরিখাতের সীমারেখা নির্ধারণ করতে পারে।

ঝাংজিয়াজির বনভূমি এই ভূদৃশ্যকে শুধু সৌন্দর্য দেয় না, এর পরিবেশগত চরিত্রও গঠন করে। পাথরের স্তম্ভ, গভীর গিরিখাত, ভিন্ন উচ্চতা, ছায়াযুক্ত আর্দ্র অঞ্চল এবং উন্মুক্ত চূড়া—সব মিলিয়ে খুব অল্প দূরত্বের মধ্যেই নানা ক্ষুদ্র পরিবেশ তৈরি হয়। কোথাও সূর্যের আলো বেশি, কোথাও সারাক্ষণ আর্দ্রতা, কোথাও বাতাস প্রবল, আবার কোনো গিরিখাত দীর্ঘ সময় ছায়াচ্ছন্ন থাকে। ফলে ভূতত্ত্ব ও জীববৈচিত্র্য এখানে একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

একই সঙ্গে এত বিখ্যাত প্রাকৃতিক অঞ্চলে পর্যটনের চাপও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর জন্য পথ, সেতু, পরিবহন ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্র তৈরি করতে হয়। কিন্তু এমন ভঙ্গুর ভূদৃশ্যে মানুষের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করা হলে মাটি ক্ষয়, উদ্ভিদের ক্ষতি, আবর্জনা, শব্দ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর চাপ বাড়তে পারে। তাই ঝাংজিয়াজির মতো অঞ্চলের প্রকৃত মূল্য শুধু সুন্দর ছবি তোলার জায়গা হিসেবে নয়; দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ও জীবন্ত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার একটি সংরক্ষিত ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করা জরুরি।

ঝাংজিয়াজির সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত সময়ের শক্তি সম্পর্কে। একটি বৃষ্টির ফোঁটা পাথরের পাহাড় ভেঙে ফেলতে পারে না। একটি গাছের শিকড়ও বিশাল স্তম্ভ তৈরি করতে পারে না। একটি নদীর এক বছরের প্রবাহেও এমন ভূদৃশ্য জন্ম নেয় না। কিন্তু একই প্রক্রিয়া যখন অসংখ্যবার পুনরাবৃত্ত হয় এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয় মাধ্যাকর্ষণ, আবহবিকার, শিলার ফাটল ও দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক সময়, তখন কঠিন পাথরও ধীরে ধীরে নতুন আকার নিতে বাধ্য হয়।

আজ ঝাংজিয়াজির কোনো উঁচু স্থান থেকে সামনে তাকালে তাই আমরা শুধু কয়েক হাজার পাথরের স্তম্ভ দেখি না। আমরা আসলে পৃথিবীর দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের একটি চলমান অধ্যায় দেখি। প্রতিটি খাড়া দেয়াল কোনো পুরোনো ভাঙনের চিহ্ন বহন করে, প্রতিটি গিরিখাত দীর্ঘ ক্ষয়ের সাক্ষ্য দেয় এবং প্রতিটি বিচ্ছিন্ন স্তম্ভ মনে করিয়ে দেয় যে একসময় তার চারপাশেও পাথর ছিল।

আর যখন ঘন কুয়াশা নিচের উপত্যকাকে ঢেকে দেয়, শুধু সবুজে ঢাকা পাথরের মাথাগুলো মেঘের ওপরে জেগে থাকে এবং দূরের স্তম্ভগুলো একে একে সাদা অস্পষ্টতার মধ্যে হারিয়ে যায়, তখন ঝাংজিয়াজিকে ‘ভাসমান পাহাড়ের জগৎ’ মনে হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তব গল্পটি কল্পনার চেয়েও বিস্ময়কর। কোনো অদৃশ্য শক্তি এসব পাহাড়কে আকাশে ভাসিয়ে রাখেনি; বরং পাথর, পানি, বাতাস, উদ্ভিদ, মাধ্যাকর্ষণ এবং অকল্পনীয় দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাজ করে পৃথিবীর বুক থেকে এমন একটি ভূদৃশ্য খোদাই করেছে, যা আজও মানুষের চোখে অবাস্তব বলে মনে হয়।