বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

খানুয়ার যুদ্ধ ১৫২৭: রানা সাঙ্গাকে পরাজিত করে বাবর কীভাবে মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন?

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 18, 2026
খানুয়ার যুদ্ধ ১৫২৭: রানা সাঙ্গাকে পরাজিত করে বাবর কীভাবে মুঘল আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন?
খানুয়ার যুদ্ধ ১৫২৭

১৫২৬ সালের প্রথম পানিপথের যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লি ও আগ্রা দখল করার পর জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিজয় তখনো নিশ্চিত করেনি যে তিনি ভারতে স্থায়ী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। আফগান শক্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, বহু আঞ্চলিক শাসক স্বাধীনভাবে শক্তি ধরে রেখেছিল এবং উত্তর ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী সামরিক শক্তি রাজপুতদের বিশাল জোট তখন মেওয়ারের মহারানা সংগ্রাম সিংহ—রানা সাঙ্গার নেতৃত্বে সংগঠিত হচ্ছিল। ফলে ১৫২৬ সালের পানিপথ বাবরকে দিল্লির সিংহাসনের দরজা খুলে দিলেও, ১৫২৭ সালের খানুয়ার যুদ্ধ নির্ধারণ করবে সেই সিংহাসনে তিনি সত্যিই টিকে থাকতে পারবেন কি না।

রানা সাঙ্গা বা মহারানা সংগ্রাম সিংহ ছিলেন মেওয়ারের সিসোদিয়া রাজবংশের শক্তিশালী শাসক। তাঁর রাজধানী ছিল চিতোর। ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমদিকে তিনি শুধু মেওয়ারের রাজা ছিলেন না; উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজপুত রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। মালওয়া ও আশপাশের রাজনৈতিক সংঘাতে অংশ নিয়ে তিনি নিজের সামরিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং বিভিন্ন রাজপুত শাসককে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে আনতে সক্ষম হন। তাঁর নেতৃত্বে মেওয়ার এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল, যা দুর্বল হয়ে পড়া দিল্লি সালতানাতের বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা রাখত।

বাবর এবং রানা সাঙ্গার সম্পর্কের প্রাথমিক পর্যায় নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে মতপার্থক্য রয়েছে। বাবরের বিবরণ থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে অভিযানের সময় রানা সাঙ্গার সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা যোগাযোগ হয়েছিল। বাবরের অভিযোগ ছিল, রানা সাঙ্গা নির্ধারিতভাবে লোদির বিরুদ্ধে অগ্রসর হননি। অন্যদিকে পরবর্তী ইতিহাসে এই সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—পানিপথের পর দিল্লি-আগ্রায় বাবরের স্থায়ী উপস্থিতি রানা সাঙ্গার রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি করে।

সম্ভবত অনেক ভারতীয় শাসক শুরুতে বাবরকে মধ্য এশিয়া থেকে আসা আরেকজন আক্রমণকারী হিসেবেই দেখেছিলেন। এর আগে তিমুরসহ বহু বিজেতা উত্তর ভারতে আক্রমণ করে সম্পদ নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাবর দিল্লি ও আগ্রা দখলের পর কাবুলে ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে ভারতে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তই তাঁকে একজন সাময়িক আক্রমণকারী থেকে ভারতীয় রাজনীতির নতুন দাবিদারে পরিণত করে।

রানা সাঙ্গার জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। লোদি শক্তির পতনের ফলে উত্তর ভারতে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা রাজপুত শক্তির সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারত। কিন্তু সেই শূন্যস্থান দ্রুত বাবর পূরণ করতে শুরু করেন। ফলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ কার্যত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

রানা সাঙ্গা একা বাবরের বিরুদ্ধে অগ্রসর হননি। তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজপুত শাসক ও প্রধানদের একটি শক্তিশালী জোট গড়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হন মেওয়াতের শাসক হাসান খান মেওয়াতি। ইব্রাহিম লোদির আত্মীয় মাহমুদ লোদিও বাবরবিরোধী শক্তির সঙ্গে যুক্ত হন। ফলে খানুয়ার সংঘর্ষকে শুধু ‘মুঘল বনাম রাজপুত’ যুদ্ধ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক জটিলতা পুরোপুরি বোঝা যায় না। বাবরের বিরুদ্ধে রাজপুত শক্তির পাশাপাশি কিছু আফগান ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিও একত্রিত হয়েছিল।

বাবরের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। পানিপথের বিজয়ের পর তাঁর বাহিনী দীর্ঘ অভিযান, অপরিচিত আবহাওয়া এবং ভারতের পরিবেশে ক্লান্ত ছিল। সৈন্যদের একটি অংশ কাবুলে ফিরে যেতে আগ্রহী ছিল। তার ওপর রানা সাঙ্গার সামরিক খ্যাতি এবং তাঁর বিশাল জোটের খবর মুঘল শিবিরে উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

এই পরিস্থিতিতে বাবর তাঁর সৈন্যদের মনোবল পুনর্গঠনের জন্য নাটকীয় পদক্ষেপ নেন। তিনি নিজের মদ্যপানের পাত্র ভেঙে মদ্যপান ত্যাগের ঘোষণা দেন এবং সৈন্যদের সামনে যুদ্ধকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে তিনি মুসলিম ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত তামগা নামে পরিচিত একটি বাণিজ্যকর প্রত্যাহারের কথাও ঘোষণা করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সৈন্যদের বোঝানো যে সামনে থাকা যুদ্ধটি সাধারণ ভূখণ্ড দখলের সংঘর্ষের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বাবরের বিজয়ের প্রকৃত ভিত্তি শুধু আবেগ বা ধর্মীয় আহ্বান ছিল না। পানিপথের মতো খানুয়াতেও তিনি সুনির্দিষ্ট সামরিক পরিকল্পনা, ফিল্ড আর্টিলারি, আগ্নেয়াস্ত্র এবং গতিশীল অশ্বারোহী বাহিনীর সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। পানিপথের অভিজ্ঞতা তাঁকে ভারতীয় বৃহৎ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যূহ তৈরির কার্যকারিতা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা দিয়েছিল।

বাবর তাঁর সামনে গাড়ি বা আরাবা ব্যবহার করে প্রতিরক্ষামূলক রেখা তৈরি করেন। গাড়িগুলোকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে তাদের মধ্যবর্তী নির্দিষ্ট অংশ এমনভাবে রাখা হয় যাতে প্রয়োজনে অশ্বারোহী বাহিনী বেরিয়ে আক্রমণ করতে পারে। এর পেছনে বন্দুকধারী এবং কামান স্থাপন করা হয়। উস্তাদ আলী কুলি ও মুস্তফা রুমির মতো অভিজ্ঞ কামান বিশেষজ্ঞ তাঁর বাহিনীর বারুদভিত্তিক অস্ত্র ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এর পাশাপাশি বাবর তাঁর পরিচিত তুলুঘমা কৌশল ব্যবহার করেন। বাহিনীর কেন্দ্রীয় অংশ শত্রুকে সামনে আটকে রাখবে, আর দ্রুতগামী অশ্বারোহী দল দুই পাশ ঘুরে শত্রুর পার্শ্ব ও পশ্চাৎভাগে চাপ সৃষ্টি করবে—এই ছিল মূল ধারণা। মধ্য এশিয়ার উন্মুক্ত সমতলে বিকশিত অশ্বারোহী যুদ্ধের এই গতিশীলতা বাবরের সেনাবাহিনীর অন্যতম বড় শক্তি ছিল।

১৫২৭ সালের ১৬ মার্চ খানুয়ার প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। স্থানটি আগ্রার পশ্চিমে, বর্তমান রাজস্থানের ভরতপুর অঞ্চলের কাছে এবং ফতেহপুর সিক্রির নিকটবর্তী। সৈন্যসংখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে অত্যন্ত ভিন্ন পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের সংখ্যা অতিরঞ্জিত করে দেখানোর প্রবণতা সমসাময়িক বিজয়বৃত্তান্তে অস্বাভাবিক ছিল না। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। তবে রানা সাঙ্গার জোট যে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল এবং বাবর যুদ্ধটিকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে নিয়েছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

যুদ্ধ শুরু হলে রাজপুত বাহিনী প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। রাজপুত যুদ্ধসংস্কৃতিতে সরাসরি অশ্বারোহী আক্রমণ, ব্যক্তিগত বীরত্ব এবং নিকটবর্তী অস্ত্রযুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। রানা সাঙ্গার বাহিনীর আক্রমণ এতটাই তীব্র ছিল যে বাবরের সেনাবাহিনীর কিছু অংশ প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়ে।

কিন্তু বাবরের প্রতিরক্ষামূলক ব্যূহ রাজপুতদের জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি করে। গাড়ির সারির পেছনে অবস্থানরত কামান ও বন্দুকধারীরা নিরাপদ অবস্থান থেকে আক্রমণ চালাতে পারছিল। কামানের বিস্ফোরণ, ধোঁয়া এবং গুলিবর্ষণের মধ্যে রাজপুত বাহিনীর জন্য মুঘল কেন্দ্রীয় অবস্থান ভেঙে ফেলা কঠিন হয়ে ওঠে।

খানুয়ার যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বাবরের প্রতিরক্ষা ও আক্রমণকে একই পরিকল্পনার মধ্যে যুক্ত করা। তিনি শুধু দুর্গের মতো অবস্থান নিয়ে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করেননি। প্রতিপক্ষ যখন কেন্দ্রীয় ব্যূহের বিরুদ্ধে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন মুঘল অশ্বারোহী বাহিনীর বিভিন্ন অংশ পাশ থেকে আক্রমণ শুরু করে। ধীরে ধীরে রাজপুত জোট একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে পড়ে।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে রানা সাঙ্গা গুরুতর আহত হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়া হন। তাঁর অনুপস্থিতি জোটের নেতৃত্ব ও সমন্বয়ে বড় আঘাত সৃষ্টি করে। হাসান খান মেওয়াতি নিহত হন। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর রাজপুত নেতৃত্বাধীন বাহিনী ভেঙে পড়ে এবং বাবর নির্ণায়ক বিজয় অর্জন করেন।

এই বিজয় পানিপথের চেয়েও ভিন্ন অর্থ বহন করেছিল। পানিপথে বাবর এমন একটি লোদি রাষ্ট্রকে পরাজিত করেছিলেন যার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন ইতোমধ্যে গভীর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু খানুয়ায় তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন উত্তর-পশ্চিম ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন সামরিক জোটগুলোর একটির। ফলে রানা সাঙ্গার পরাজয় বাবরের নতুন শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি দূর করে দেয়।

তবে খানুয়ার ফলাফলকে ‘রাজপুত শক্তির সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হিসেবে দেখা ঐতিহাসিকভাবে ভুল হবে। মেওয়ার টিকে ছিল, বিভিন্ন রাজপুত রাজ্যও স্বাধীন বা আধা-স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিদ্যমান ছিল। পরবর্তী কয়েক দশকে মুঘল-রাজপুত সম্পর্ক যুদ্ধ, কূটনীতি, জোট এবং বিবাহসম্পর্কের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন রূপ নেবে। বিশেষ করে আকবরের সময় বহু রাজপুত রাজপরিবার মুঘল সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ও সামরিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে। আবার মেওয়ারের মতো কিছু শক্তি দীর্ঘ সময় প্রতিরোধও চালিয়ে যাবে।

খানুয়ার তাৎপর্য ছিল অন্য জায়গায়। এই যুদ্ধ বাবরের ভারতীয় সাম্রাজ্যকে টিকে থাকার বাস্তব সুযোগ দেয়। পানিপথের পর যদি রানা সাঙ্গা বাবরকে পরাজিত করতে পারতেন, তবে দিল্লিতে মুঘল শাসনের ইতিহাস সম্ভবত কয়েক মাস বা এক বছরের একটি ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় হয়ে থাকতে পারত। খানুয়ার বিজয়ের পর বাবরের অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

এর পরও তাঁর যুদ্ধ শেষ হয়নি। ১৫২৮ সালে চান্দেরি অভিযানে বাবর মেদিনী রায়ের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং গুরুত্বপূর্ণ দুর্গটি দখল করেন। এরপর পূর্বদিকে আফগান শক্তি আবার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। ১৫২৯ সালের ঘাঘরার যুদ্ধের মাধ্যমে বাবর পূর্ব উত্তর ভারতের আফগান প্রতিরোধের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেন। অর্থাৎ পানিপথ, খানুয়া, চান্দেরি এবং ঘাঘরা—এই ধারাবাহিক সামরিক অভিযানগুলো মিলেই বাবরের ভারত জয়ের প্রকৃত কাঠামো তৈরি করেছিল।

খানুয়ার যুদ্ধের সামরিক গুরুত্বও গভীর। পানিপথের পর আবারও প্রমাণিত হয় যে বারুদচালিত অস্ত্র তখন যুদ্ধের একটি নতুন যুগ সৃষ্টি করছিল, কিন্তু কামান একা বিজয়ের নিশ্চয়তা ছিল না। বাবরের সাফল্য এসেছিল কামান, বন্দুকধারী, প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান, অশ্বারোহী তীরন্দাজ এবং দ্রুত ফ্ল্যাঙ্কিং কৌশলকে একই কমান্ড কাঠামোর অধীনে ব্যবহারের মাধ্যমে।

একই সঙ্গে খানুয়া বাবরের মানসিক রূপান্তরেরও প্রতীক। মধ্য এশিয়ায় হারানো সমরখন্দ পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করা বাবর এখন বুঝতে শুরু করেছিলেন যে তাঁর ভবিষ্যৎ ভারতে। দিল্লি ও আগ্রা আর সাময়িক বিজয়ের সম্পদভাণ্ডার নয়; এগুলোই তাঁর নতুন রাজবংশের রাজনৈতিক কেন্দ্র। এই উপলব্ধি মুঘল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বাবর অবশ্য তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় সাম্রাজ্য দীর্ঘদিন শাসন করতে পারেননি। ১৫৩০ সালে তাঁর মৃত্যু হয় এবং পুত্র হুমায়ুন সিংহাসনে বসেন। পরবর্তী সময়ে মুঘল সাম্রাজ্য আবার ভয়াবহ সংকটে পড়বে, এমনকি হুমায়ুনকে ভারত থেকে নির্বাসিতও হতে হবে। কিন্তু বাবরের বিজয়গুলো এমন একটি রাজনৈতিক দাবি তৈরি করে দিয়েছিল, যার ওপর তাঁর উত্তরসূরিরা আবার সাম্রাজ্য নির্মাণ করতে সক্ষম হন।

১৫২৬ সালের পানিপথ বাবরকে দিল্লি দিয়েছিল, কিন্তু ১৫২৭ সালের খানুয়া তাঁকে ভারতে থাকার অধিকার সামরিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিল। রানা সাঙ্গার শক্তিশালী জোটকে পরাজিত করার মাধ্যমে বাবর দেখিয়ে দেন যে তিনি শুধু দুর্বল হয়ে পড়া লোদি রাজবংশের সুযোগ নেওয়া একজন বিদেশি আক্রমণকারী নন; তিনি উত্তর ভারতের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে টিকে থাকতে সক্ষম নতুন এক সাম্রাজ্যিক শক্তির প্রতিষ্ঠাতা। এই কারণেই খানুয়ার যুদ্ধ মুঘল সাম্রাজ্যের জন্মের পর তার প্রথম বড় অস্তিত্ব-পরীক্ষা এবং বাবরের ভারত জয়কে স্থায়ী রাজনৈতিক আধিপত্যে রূপ দেওয়ার অন্যতম নির্ধারক মুহূর্ত।