বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হুমায়ুনের উত্থান-পতন: শের শাহ সূরির কাছে সাম্রাজ্য হারিয়ে যেভাবে আবার দিল্লি জয় করেন

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 18, 2026
হুমায়ুনের উত্থান-পতন: শের শাহ সূরির কাছে সাম্রাজ্য হারিয়ে যেভাবে আবার দিল্লি জয় করেন
হুমায়ুনের উত্থান-পতন

বাবরের হাতে প্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস যদি কেবল ধারাবাহিক বিজয়ের গল্প হতো, তবে হয়তো তা এত নাটকীয় হয়ে উঠত না। সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট নাসিরউদ্দিন মুহাম্মদ হুমায়ুনের জীবন ছিল সিংহাসন লাভ, রাজনৈতিক ভুল, ভ্রাতৃবিরোধ, ভয়াবহ পরাজয়, দীর্ঘ নির্বাসন এবং অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের এক অসাধারণ অধ্যায়। তিনি এমন একজন সম্রাট, যিনি পিতার কাছ থেকে দিল্লির সিংহাসন পেয়েছিলেন, আফগান নেতা শের শাহ সূরির কাছে সেটি হারিয়েছিলেন, প্রায় পনেরো বছর ক্ষমতাচ্যুত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত আবার দিল্লি দখল করেছিলেন। অথচ পুনরুদ্ধার করা সাম্রাজ্য উপভোগ করার জন্য তাঁর হাতে সময় ছিল মাত্র কয়েক মাস।

হুমায়ুন জন্মগ্রহণ করেন ১৫০৮ সালের ৬ মার্চ কাবুলে। তিনি ছিলেন বাবরের জ্যেষ্ঠ পুত্র। অল্প বয়স থেকেই তাঁকে প্রশাসন ও সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা দেওয়া হয়েছিল। বাবরের ভারত অভিযানের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রথম পানিপথের যুদ্ধের পর আগ্রা দখলের অভিযানে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাবরের মৃত্যুর পর ১৫৩০ সালের ডিসেম্বর মাসে মাত্র বাইশ বছর বয়সে হুমায়ুন মুঘল সিংহাসনে বসেন।

কিন্তু তিনি যে সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন, সেটি বাইরে থেকে যতটা শক্তিশালী মনে হচ্ছিল, বাস্তবে ততটা সুসংহত ছিল না। বাবর মাত্র চার বছর আগে দিল্লি ও আগ্রা দখল করেছিলেন। উত্তর ভারতের বহু আফগান অভিজাত তখনো মুঘল কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি। রাজপুত শক্তিও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিল না। সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ভিত্তি তখনো দুর্বল এবং বিভিন্ন অঞ্চল নতুন শাসকদের সঙ্গে পুরোপুরি একীভূত হয়নি।

এর ওপর ছিল হুমায়ুনের নিজের পরিবারের সমস্যা। বাবরের অন্যান্য পুত্র কামরান মির্জা, আসকারি মির্জা ও হিন্দাল মির্জা প্রত্যেকেই ক্ষমতার সম্ভাব্য দাবিদার ছিলেন। তিমুরীয় রাজনৈতিক ঐতিহ্যে সাম্রাজ্যকে একক ব্যক্তির অবিভাজ্য সম্পত্তি হিসেবে দেখার ধারণা তখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজপরিবারের বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে অঞ্চল ভাগ করে দেওয়ার প্রবণতা ছিল। হুমায়ুনও তাঁর ভাইদের বিভিন্ন অঞ্চল শাসনের সুযোগ দেন।

বিশেষ করে কামরান মির্জার হাতে কাবুল ও কান্দাহার, পরে পাঞ্জাবের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায়। এর ফলে হুমায়ুনের সামরিক শক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল তাঁর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। ভবিষ্যতে যখন তিনি শের শাহের বিরুদ্ধে সংকটে পড়বেন, তখন এই পারিবারিক বিভাজন মারাত্মক দুর্বলতা হিসেবে দেখা দেবে।

প্রথমদিকে হুমায়ুনের সামনে একাধিক প্রতিপক্ষ ছিল। গুজরাটের শক্তিশালী সুলতান বাহাদুর শাহ রাজস্থান ও মালওয়ার দিকে প্রভাব বিস্তার করছিলেন। হুমায়ুন ১৫৩৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে গুজরাট ও মালওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করেন। সামরিকভাবে অভিযানটি চিত্তাকর্ষক হলেও বিজিত অঞ্চল ধরে রাখার জন্য কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে হুমায়ুন অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার পর দ্রুতই গুজরাটে মুঘল কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে।

এই সময় পূর্ব ভারতে আরও বিপজ্জনক এক শক্তি উঠে আসছিল। তাঁর নাম ফরিদ খান, যিনি পরবর্তীকালে শের খান এবং শেষে শের শাহ সূরি নামে পরিচিত হন। তিনি সূর বংশের একজন আফগান ছিলেন এবং বিহারের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছিলেন। দক্ষ প্রশাসক, বাস্তববাদী রাজনীতিক এবং বিচক্ষণ সামরিক নেতা হিসেবে তিনি দ্রুত প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে যান।

হুমায়ুন প্রথমদিকে শের খানের শক্তির প্রকৃত মাত্রা বুঝতে ব্যর্থ হন। এই ভুলের মূল্য তাঁকে অত্যন্ত কঠিনভাবে দিতে হয়। শের খান বিহারের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাংলার দিকেও অগ্রসর হন। বাংলার বিপুল সম্পদ তাঁর হাতে আসার পর তিনি আর কোনো সাধারণ আঞ্চলিক আফগান নেতা ছিলেন না; তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি হুমকিতে পরিণত হন।

হুমায়ুন শেষ পর্যন্ত পূর্বদিকে অভিযান করেন এবং চুনার দুর্গ অবরোধসহ বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ নেন। পরে তিনি বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করেন। কিন্তু এখানে তিনি কৌশলগতভাবে বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে যান। দীর্ঘ সময় বাংলায় অবস্থান করার ফলে দিল্লি-আগ্রার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যদিকে শের খান মুঘল বাহিনীর যোগাযোগপথ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ পান।

পরিস্থিতি বুঝতে পেরে হুমায়ুন পশ্চিম দিকে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৫৩৯ সালের ২৬ জুন চৌসার কাছে শের খানের বাহিনীর সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ হয়। বর্তমান বিহারের বক্সারের কাছাকাছি এই যুদ্ধে মুঘল বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। শের খান আকস্মিক ও কার্যকর আক্রমণের মাধ্যমে হুমায়ুনের বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেন।

চৌসার পরাজয় এতটাই ভয়াবহ ছিল যে হুমায়ুন নিজেই অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, তিনি গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং নিজাম নামে একজন পানিবাহক বা ভিস্তিওয়ালার সহায়তায় প্রাণরক্ষা করেন। ঘটনাটির কিছু অংশ কিংবদন্তিমিশ্রিত হলেও এতে সন্দেহ নেই যে সম্রাটের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক হয়ে উঠেছিল।

চৌসার বিজয়ের পর শের খান নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেন এবং শের শাহ উপাধি গ্রহণ করেন। কিন্তু হুমায়ুন তখনো দিল্লির সিংহাসন হারাননি। তিনি পশ্চিমে ফিরে নতুন বাহিনী সংগঠনের চেষ্টা করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর ভাইদের সঙ্গে বিরোধ এবং সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিভাজন তখনো চলছিল।

চূড়ান্ত সংঘর্ষ ঘটে ১৫৪০ সালের ১৭ মে কনৌজ বা বিলগ্রামের যুদ্ধে। এখানে শের শাহের বাহিনীর সামনে হুমায়ুন আবারও পরাজিত হন। চৌসার পরাজয় ছিল একটি বড় সামরিক বিপর্যয়; কিন্তু কনৌজের পরাজয় তাঁর সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত করে দেয়। দিল্লি ও আগ্রা শের শাহের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং ভারতে বাবরের প্রতিষ্ঠিত মুঘল শাসন সাময়িকভাবে ভেঙে পড়ে।

মাত্র দশ বছরের শাসনের পর হুমায়ুন কার্যত রাজ্যহীন সম্রাটে পরিণত হন।

শের শাহ দিল্লির ক্ষমতা দখল করে সূর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনকাল দীর্ঘ ছিল না, কিন্তু প্রশাসনিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, সড়ক ও সরাইখানা নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি এবং মুদ্রাব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করার মতো উদ্যোগ তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত। পরবর্তী মুঘল প্রশাসন, বিশেষ করে আকবরের সময়, এই ব্যবস্থাগুলোর অনেক দিক আরও বিকশিত হয়।

অন্যদিকে হুমায়ুনের জন্য শুরু হয় দীর্ঘ ও অপমানজনক নির্বাসন। তিনি সিন্ধু অঞ্চলে আশ্রয় ও সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু স্থায়ী ঘাঁটি গড়তে ব্যর্থ হন। একসময়ের দিল্লির সম্রাটকে এখন মরুভূমি ও দুর্গম অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছিল। তাঁর সঙ্গে থাকা লোকের সংখ্যাও ক্রমে কমে আসে।

এই দুর্দশার মধ্যেই হুমায়ুনের ব্যক্তিগত জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। তিনি হামিদা বানু বেগমকে বিয়ে করেন। নির্বাসিত অবস্থায় সিন্ধুর অমরকোটে ১৫৪২ সালের ১৫ অক্টোবর তাঁদের পুত্র আকবর জন্মগ্রহণ করেন। তখন কেউ জানত না যে এই নির্বাসিত সম্রাটের শিশুপুত্রই একদিন মুঘল সাম্রাজ্যকে ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করবেন।

ভারতে পর্যাপ্ত সমর্থন না পেয়ে হুমায়ুন শেষ পর্যন্ত পারস্যের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে তিনি সাফাভি সাম্রাজ্যের শাহ তাহমাসপ প্রথমের দরবারে আশ্রয় চান। মুঘল ইতিহাসে এটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত—তিমুরের বংশধর এবং ভারতের ক্ষমতাচ্যুত সম্রাট এখন অন্য এক সম্রাটের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।

শাহ তাহমাসপ তাঁকে সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করেন এবং সামরিক সহায়তা প্রদান করেন। এর বিনিময়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কিছু শর্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এই পারস্যবাস মুঘল রাজদরবারের ভবিষ্যৎ সংস্কৃতিতেও গভীর প্রভাব ফেলে। পারস্যের শিল্প, চিত্রকলা, পোশাক, দরবারি রীতি ও প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রভাব হুমায়ুনের প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে ভারতে আরও শক্তিশালীভাবে প্রবেশ করে।

পারস্যের সাহায্যে হুমায়ুন প্রথমে কান্দাহার দখল করেন এবং পরে কাবুলের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু এখানেও তাঁকে নিজের ভাই কামরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়। কামরান একাধিকবার ক্ষমতার জন্য প্রতিরোধ করেন। শেষ পর্যন্ত হুমায়ুন কাবুলের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন এবং উত্তর-পশ্চিমে একটি নতুন মুঘল শক্তিকেন্দ্র গড়ে ওঠে।

এদিকে ভারতে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছিল। ১৫৪৫ সালে কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধের সময় বারুদের বিস্ফোরণে শের শাহ সূরি মারাত্মক আহত হয়ে মারা যান। তাঁর পুত্র ইসলাম শাহ কিছু সময় দক্ষতার সঙ্গে সাম্রাজ্য পরিচালনা করলেও ১৫৫৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সূর রাজবংশে উত্তরাধিকার সংকট শুরু হয়।

বিভিন্ন সূর দাবিদার পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। যে আফগান শক্তি একসময় হুমায়ুনকে ভারত থেকে বিতাড়িত করেছিল, সেটিই এখন অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে দুর্বল হয়ে পড়ছিল। হুমায়ুন এই সুযোগটি এবার হারাননি।

তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি বৈরাম খানের সহযোগিতায় মুঘল বাহিনী ভারত পুনরুদ্ধারের অভিযান শুরু করে। ১৫৫৫ সালে তারা পাঞ্জাবের দিকে অগ্রসর হয়ে লাহোর দখল করে। এরপর মুঘল ও সূর বাহিনীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ ঘটে মচ্ছিওয়ারা ও সিরহিন্দ অঞ্চলে।

১৫৫৫ সালের ২২ জুন সিরহিন্দের যুদ্ধে মুঘল বাহিনী সিকান্দার শাহ সূরির বাহিনীকে পরাজিত করে। এই বিজয় দিল্লির পথ কার্যত খুলে দেয়। দীর্ঘ পনেরো বছরের নির্বাসনের পর হুমায়ুন আবার উত্তর ভারতের রাজনৈতিক কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যান।

১৫৫৫ সালের জুলাই মাসে হুমায়ুন পুনরায় দিল্লিতে প্রবেশ করেন এবং মুঘল সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন। ইতিহাসের এক অসাধারণ বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হলো। যে সম্রাট ১৫৪০ সালে শের শাহের কাছে পরাজিত হয়ে ভারত থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন, তিনি আবার সেই দিল্লিতেই সম্রাট হিসেবে ফিরে এলেন।

কিন্তু ভাগ্য তাঁকে পুনরুদ্ধার করা সাম্রাজ্য দীর্ঘদিন শাসনের সুযোগ দেয়নি। দিল্লিতে ফিরে আসার মাত্র কয়েক মাস পর ১৫৫৬ সালের জানুয়ারিতে পুরানা কিলার শের মণ্ডলের সিঁড়ি থেকে পড়ে তিনি গুরুতর আহত হন। কয়েক দিন পর, ২৭ জানুয়ারি, তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স ছিল মাত্র সাতচল্লিশ বছর।

হুমায়ুনের জীবনকে শুধু ব্যর্থতার ইতিহাস হিসেবে দেখা তাই বড় ভুল। সত্য যে তিনি বাবরের সাম্রাজ্য ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে দ্বিধা ছিল, ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং শের শাহের উত্থান যথাসময়ে প্রতিরোধ করতে পারেননি। কিন্তু একই সঙ্গে অবিশ্বাস্য প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের রাজবংশকে বিলুপ্ত হতে দেননি। পরাজয়ের পরও তিনি রাজনৈতিক বৈধতা ধরে রেখেছিলেন, পারস্যের সহায়তা অর্জন করেছিলেন, কান্দাহার ও কাবুল পুনর্দখল করেছিলেন এবং উপযুক্ত মুহূর্তে আবার ভারত আক্রমণ করেছিলেন।

তাঁর নির্বাসনের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ফল ছিল মুঘল সংস্কৃতিতে পারস্যের প্রভাবের গভীরতা বৃদ্ধি। হুমায়ুন পারস্য থেকে শিল্পী ও পণ্ডিতদের সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে আকবরের দরবারে যে অসাধারণ মুঘল মিনিয়েচার চিত্রকলার ঐতিহ্য বিকশিত হবে, তার প্রাথমিক বিকাশের সঙ্গে হুমায়ুনের পারস্য-অভিজ্ঞতার সরাসরি সম্পর্ক ছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুমায়ুনের পুনরুদ্ধার আকবরের জন্য একটি সাম্রাজ্যিক ভিত্তি রেখে যায়। হুমায়ুন যদি নির্বাসনেই মারা যেতেন অথবা দিল্লি পুনর্দখল করতে ব্যর্থ হতেন, তাহলে বাবরের প্রতিষ্ঠিত মুঘল রাজবংশ হয়তো ইতিহাসের একটি স্বল্পস্থায়ী অধ্যায়ে পরিণত হতো। ১৫৫৫ সালে তাঁর দিল্লি পুনর্জয়ই মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় জন্মের মতো কাজ করেছিল।

হুমায়ুন তাই মুঘল ইতিহাসের দুই মহান যুগের মধ্যবর্তী সেতু—একদিকে প্রতিষ্ঠাতা বাবর, অন্যদিকে সাম্রাজ্য নির্মাতা আকবর। তিনি একটি সাম্রাজ্য উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, সেটি হারিয়েছিলেন, নির্বাসনে প্রায় সবকিছু হারানোর পর আবার শূন্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের পুত্রের জন্য দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধার করে গিয়েছিলেন। হুমায়ুনের উত্থান-পতনের ইতিহাস তাই শুধু একজন পরাজিত সম্রাটের প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়; এটি মুঘল রাজবংশের বিলুপ্তির কিনারা থেকে ফিরে এসে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হওয়ার ভিত্তি তৈরির ইতিহাস।