বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নেপোলিয়নের ইতালি অভিযান: লোদি, আরকোল ও রিভোলির বিজয়ের ইতিহাস

সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন

নেপোলিয়নের ইতালি অভিযান: লোদি, আরকোল ও রিভোলির বিজয়ের ইতিহাস
ইতালির যুদ্ধক্ষেত্রেই গড়ে ওঠে নেপোলিয়নের বিজয়ী সেনাপতির পরিচয়।

প্যারিসের রাজপথে সরকার রক্ষার পর নেপোলিয়নের সামনে যে নতুন দায়িত্বের দরজা খুলেছিল, সেটি তাঁকে নিয়ে গেল উত্তর ইতালির যুদ্ধক্ষেত্রে। ১৭৯৬ সালের মার্চে ইতালির ফরাসি সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণের সময় তাঁর বয়স মাত্র ছাব্বিশ। তুলোঁ ও প্যারিসে সাফল্য পেলেও একটি দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিযান পরিচালনার অভিজ্ঞতা তখনো সীমিত। সামনে ছিল অস্ট্রিয়া ও সার্ডিনিয়া-পিয়েমন্তের বাহিনী; নিজের সৈন্যদের মধ্যে ছিল বেতন বকেয়া, খাদ্যের ঘাটতি এবং পোশাকের দুরবস্থা। এই বাহিনীকে কার্যকর আক্রমণযন্ত্রে পরিণত করাই ছিল তাঁর প্রথম পরীক্ষা।

ফরাসি ডিরেক্টরি সরকারের পরিকল্পনায় জার্মানির অভিযান বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। ইতালিতে নেপোলিয়নের কাজ ছিল অস্ট্রীয় শক্তিকে ব্যস্ত রাখা এবং সম্ভব হলে পিয়েমন্তকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু তিনি এই সীমিত দায়িত্বকে বড় সুযোগ হিসেবে দেখেন। তাঁর অধীনস্থ মাসেনা, অজেরো ও সেরুরিয়ের মতো অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের আস্থা অর্জন করাও জরুরি ছিল। নেপোলিয়নের প্রাথমিক শক্তি ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত, ছড়িয়ে থাকা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় স্থানে একত্র করা এবং শত্রুর দুই অংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা।

এপ্রিলের অভিযানে তিনি অস্ট্রীয় ও পিয়েমন্তীয় বাহিনীর সংযোগস্থলে আঘাত করেন। মন্তেনোত্তে, মিল্লেসিমো ও দেগোর লড়াইয়ে মিত্রদের সমন্বয় ভেঙে যায়। এরপর মন্দোভির কাছে পিয়েমন্তীয় প্রতিরোধ দুর্বল হলে সার্ডিনিয়ার রাজা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। ২৮ এপ্রিল চেরাস্কোর যুদ্ধবিরতি নেপোলিয়নকে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ ও চলাচলের সুবিধা দেয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি প্রতিপক্ষকে আলাদা করে নিষ্ক্রিয় করায় তিনি এখন অস্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অধিক মনোযোগ দিতে পারেন। অভিযানের গতি তাঁর সৈন্যদের আত্মবিশ্বাসও বদলে দেয়।

অস্ট্রীয় সেনাপতি বোলিউয়ের বাহিনীকে মোকাবিলায় নেপোলিয়ন পো নদী অতিক্রমের স্থান নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন। প্রত্যাশিত স্থানের পরিবর্তে পিয়াচেঞ্জার কাছে নদী পার হয়ে তিনি শত্রুর অবস্থান ঘুরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। অস্ট্রীয়রা পূর্বদিকে সরে গেলে ফরাসিরা তাদের অনুসরণ করে আদ্দা নদীর লোদিতে পৌঁছায়। ১৭৯৬ সালের ১০ মে সেখানে মূল অস্ট্রীয় বাহিনীর পশ্চাদপসরণ রক্ষাকারী সৈন্যরা সেতুর অপর প্রান্তে কামান বসিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সরু সেতু ধরে আক্রমণ ছিল বিপজ্জনক, কারণ অগ্রসর সৈন্যরা সরাসরি গোলাবর্ষণের মুখে পড়ছিল।

ফরাসি কামানের সহায়তা, পদাতিকদের আক্রমণ এবং নদীর অন্য অংশ দিয়ে অশ্বারোহীদের চলাচলের চাপে অস্ট্রীয় পশ্চাদরক্ষী বাহিনী সরে যায়। লোদি জয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেখানে অস্ট্রিয়ার প্রধান সেনাবাহিনী ধ্বংস হয়নি। লোদির সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল মনস্তাত্ত্বিক: সৈন্যদের চোখে নেপোলিয়ন সাহসী ও কার্যকর নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। পরবর্তী স্মৃতিচারণে তিনি এই যুদ্ধকে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করেন। বাস্তব সামরিক ফলের তুলনায় লোদির প্রতীকী গুরুত্ব তাই অনেক বড় হয়ে ওঠে।

১৫ মে ফরাসি বাহিনী মিলানে প্রবেশ করে। ইতালির সমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে খাদ্য, অর্থ ও সরঞ্জাম পাওয়ায় সেনাবাহিনীর সংকট কিছুটা কমে। তবে এই সাফল্যের বোঝা বহন করে স্থানীয় জনগণ। যুদ্ধকর, বাধ্যতামূলক সরবরাহ এবং শিল্পসম্পদ অপসারণ ফরাসি মুক্তির ঘোষণার সঙ্গে তীব্র বিরোধ তৈরি করে। পাভিয়ার বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করা হয়। নেপোলিয়নের অভিযান একদিকে পুরোনো শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করছিল, অন্যদিকে বিজিত সমাজের ওপর নতুন সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করছিল। এই দ্বৈত চরিত্র তাঁর জনপ্রিয়তার ইতিহাসেও মনে রাখা জরুরি।

এরপর অভিযানের কেন্দ্র হয়ে ওঠে মান্তুয়া। জলাভূমি ও হ্রদবেষ্টিত এই দুর্গ অস্ট্রিয়ার জন্য উত্তর ইতালিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল। দুর্গটি অস্ট্রীয় হাতে থাকলে ফরাসিদের যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ নিরাপদ হতো না। নেপোলিয়ন অবরোধ শুরু করেন, আর অস্ট্রিয়া বারবার বাহিনী পাঠায় সেটি মুক্ত করতে। ফলে অভিযান একটিমাত্র বিজয়ের বদলে ধারাবাহিক সংকটে পরিণত হয়। অবরোধ বজায় রাখা, নতুন শত্রুবাহিনী ঠেকানো এবং নিজের সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্যে তাঁকে প্রতিনিয়ত ভারসাম্য রাখতে হচ্ছিল।

১৭৯৬ সালের গ্রীষ্মে উর্মজারের বাহিনী বিভিন্ন পথে এগিয়ে এলে নেপোলিয়ন সাময়িকভাবে মান্তুয়ার অবরোধ তুলে নেন। কিছু ভারী অবরোধকামানও হারাতে হয়। কিন্তু বাহিনী বিচ্ছিন্নভাবে এগিয়ে আসায় তিনি তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে শক্তি কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ পান। লোনাতো ও কাস্তিলিওনের লড়াই পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেয়। সেপ্টেম্বরে বাসানোর সাফল্যের পর উর্মজার শেষ পর্যন্ত মান্তুয়ার ভেতরে আশ্রয় নেন। দুর্গে সৈন্যসংখ্যা বাড়লেও খাদ্যের চাহিদা ও রোগের চাপও বেড়ে যায়। বাইরে থেকে উদ্ধার না এলে এই শক্তিবৃদ্ধিই দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

নভেম্বরে আলভিনৎসির নেতৃত্বে নতুন অস্ট্রীয় অভিযান ফরাসিদের আবার বিপদে ফেলে। কালদিয়েরোতে নেপোলিয়ন প্রতিরোধের মুখে পড়েন। এরপর তিনি আদিজে নদী পেরিয়ে আরকোলের জলাভূমির মধ্য দিয়ে শত্রুর যোগাযোগের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। ১৫ থেকে ১৭ নভেম্বরের যুদ্ধ ছিল সরু বাঁধ, সেতু ও সীমিত চলাচলের ভূখণ্ডে কঠিন সংঘর্ষ। এমন স্থানে সংখ্যাধিক্য কাজে লাগানো কঠিন হলেও আক্রমণকারী বাহিনীর অগ্রসর হওয়াও বিপজ্জনক। একাধিক ব্যর্থ প্রচেষ্টা ও নতুন চালের মাধ্যমে ফরাসিরা চাপ বজায় রাখে।

আরকোলের সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যে নেপোলিয়ন পতাকা হাতে সৈন্যদের সামনে এগিয়ে যান। পরবর্তী চিত্রকলা ঘটনাটিকে একক বীরত্বের বিজয়ে রূপ দেয়। বাস্তবে তাঁর প্রচেষ্টা তখনই সেতু দখল করতে পারেনি; বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি বিপজ্জনক অবস্থায় পড়েছিলেন। শেষ সাফল্য আসে কয়েক দিনের লড়াই, বিকল্প পারাপার এবং অস্ট্রীয় অবস্থানের ওপর সম্মিলিত চাপ থেকে। আরকোলের ইতিহাস তাই ব্যক্তিগত সাহসের সঙ্গে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের উদ্যোগ ও সৈন্যদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ইতিহাসও। তবু পতাকা হাতে তরুণ সেনাপতির ছবি জনমনে অসাধারণ প্রভাব ফেলে।

১৭৯৭ সালের জানুয়ারিতে অস্ট্রিয়া আবার মান্তুয়া উদ্ধারের চেষ্টা করে। এবার রিভোলির উঁচু মালভূমি ও আদিজে উপত্যকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আলভিনৎসির বাহিনী কয়েকটি ভাগে অগ্রসর হওয়ায় পাহাড়ি ভূখণ্ডে তাদের পারস্পরিক সহায়তা কঠিন ছিল। নেপোলিয়ন জুবেরের বাহিনীকে শক্তিশালী করতে দ্রুত পৌঁছান এবং মাসেনার সৈন্যসহ অতিরিক্ত শক্তি এনে কেন্দ্রীয় অবস্থান ধরে রাখেন। ১৪ জানুয়ারির প্রধান লড়াইয়ে ফরাসি কামান, প্রতিরক্ষা এবং সময়মতো পাল্টা আক্রমণ অস্ট্রীয় অগ্রযাত্রা ভেঙে দেয়। পরবর্তী সংঘর্ষে বহু অস্ট্রীয় সৈন্য বন্দি হয়।

রিভোলির বিজয় মান্তুয়া উদ্ধারের শেষ বড় প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেয়। নেপোলিয়ন এরপর দ্রুত দক্ষিণে গিয়ে আরেকটি অস্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। এই দ্রুত স্থানান্তর দেখায়, তাঁর নেতৃত্ব শুধু একটি যুদ্ধের বিন্যাসে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি পরপর সংকট সামলাতে বাহিনীর গতি ব্যবহার করতেন। ২ ফেব্রুয়ারি মান্তুয়া আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘ অবরোধের অবসান হলে উত্তর ইতালিতে অস্ট্রিয়ার অবস্থান ভেঙে পড়ে এবং ফরাসিদের সামনে আরও পূর্বদিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

জনপ্রিয়তার পেছনে এসব বিজয়ের পাশাপাশি প্রচারণাও কাজ করেছিল। নেপোলিয়ন যুদ্ধের বিবরণ, সরকারি বার্তা এবং সেনাবাহিনীঘনিষ্ঠ সংবাদপত্রের মাধ্যমে নিজের নেতৃত্বকে সামনে আনেন। প্যারিসে পৌঁছানো বিজয়ের সংবাদ, বন্দি পতাকা ও অর্থ তাঁকে সফল প্রজাতন্ত্রী সেনাপতির প্রতীকে পরিণত করে। অন্যান্য ফরাসি সেনাপতিরও খ্যাতি ছিল, কিন্তু ইতালির ধারাবাহিক সাফল্য তাঁর পরিচিতিকে বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যায়। সৈন্যদের কাছে তিনি ছিলেন বিজয় ও পুরস্কারের সম্ভাবনা তৈরি করা নেতা; সরকারের কাছে অর্থ ও সামরিক সাফল্যের উৎস; সাধারণ মানুষের কাছে অস্থির সময়ের আত্মবিশ্বাসী মুখ।

ইতালির যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত শক্তি নেপোলিয়নকে কূটনীতিতেও স্বাধীন করে তোলে। অস্ট্রিয়ার দিকে অগ্রসর হয়ে তিনি এপ্রিলের লেওবেন সমঝোতা এবং অক্টোবরে কাম্পো ফর্মিও চুক্তির পথে যান। ভেনিস প্রজাতন্ত্রের অবসান ও ভূখণ্ড বিনিময় দেখায়, বিপ্লবের আদর্শের সঙ্গে ক্ষমতার হিসাবও তাঁর সিদ্ধান্ত চালাচ্ছিল। ১৭৯৭ সালের শেষে ফ্রান্সে ফেরার সময় তিনি আর শুধু সরকারের নিযুক্ত কর্মকর্তা নন; নিজস্ব খ্যাতি ও রাজনৈতিক ওজনসম্পন্ন সেনাপতি। এবার তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে মিসরের দিকে যাবে—যেখানে ব্রিটিশ শক্তিকে আঘাত করার পরিকল্পনা তাঁকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাবে।