রোমুলাস ও রেমাস: নেকড়ের দুধে বেঁচে যাওয়া দুই ভাই ও রোমের জন্ম
সিরিজ: রোমান পুরাণ: রোমের জন্ম থেকে দেবদেবীর কিংবদন্তি
টাইবারের তীরে দুই শিশুর জীবনরক্ষা থেকে রোমের জন্মকথা।
টাইবারের পিছু হটা জল দুই নবজাতককে মৃত্যুর মুখ থেকে সরিয়ে নিয়ে এসেছিল নদীতীরের এক নির্জন আশ্রয়ে। আলবা লঙ্গার সিংহাসন দখলকারী আমুলিয়ুস ভেবেছিলেন, নুমিতরের বংশের শেষ সম্ভাবনাও নদীর স্রোতে হারিয়ে যাবে। কিন্তু রেয়া সিলভিয়ার সন্তানদের নিয়ে কিংবদন্তি এখানেই নতুন মোড় নেয়। যে শিশুদের রাজশক্তি নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, তাদের বাঁচিয়ে রাখে অরণ্যের এক প্রাণী, তারপর আশ্রয় দেয় সাধারণ রাখালের পরিবার। রোমুলাস ও রেমাসের গল্পে রোমের জন্ম শুরু হয় রাজপ্রাসাদে নয়, পরিত্যক্ত শিশুদের অসহায়তা এবং অপ্রত্যাশিত জীবনরক্ষার মধ্য দিয়ে।
যমজদের জন্মপরিচয় তাদের ভবিষ্যৎ গুরুত্বের ভিত্তি তৈরি করে। মায়ের দিক থেকে তারা আলবা লঙ্গার বৈধ রাজা নুমিতরের নাতি এবং এনিয়াসের পৌরাণিক বংশধর। পিতা হিসেবে পরিচিত যুদ্ধদেবতা মার্স। আমুলিয়ুস রেয়া সিলভিয়াকে ভেস্তার পুরোহিত্রী করেছিলেন, যাতে সন্তান জন্মের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী উত্তরাধিকারী তৈরি না হয়। যমজদের জন্ম সেই পরিকল্পনা ভেঙে দেয়। তাদের নদীতে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ তাই ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনৈতিক কৌশল। তবে এই জন্মপরিচয় ও দৈবপিতৃত্ব কিংবদন্তির অংশ; ঐতিহাসিকভাবে যাচাই করা পারিবারিক তথ্য নয়।
প্রচলিত বিবরণে টাইবার তখন প্লাবিত ছিল। শিশুদের ফেলে দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকেরা নদীর মূল স্রোতে পৌঁছাতে না পেরে অগভীর জলে তাদের বহনকারী পাত্র রেখে যায়। জল নেমে গেলে সেটি স্থলভাগে আটকে পড়ে। পরবর্তী ঐতিহ্যে এই স্থান প্যালাটাইন পাহাড়ের পাদদেশ, লুপারকাল গুহা এবং রুমিনাল ডুমুরগাছের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হয়। বিভিন্ন বিবরণে স্থান ও ঘটনার সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ধারণা একই—মৃত্যুর জন্য ছেড়ে দেওয়া দুই শিশু এমন একটি ভূদৃশ্যে রক্ষা পায়, যা পরে রোমের পবিত্র জন্মস্থানের মর্যাদা পায়।
সেখানে আসে একটি স্ত্রী নেকড়ে। শিশুদের কান্না শুনে সে এগিয়ে এসে দুধ খাওয়ায় এবং তাদের শরীর চেটে পরিচর্যা করে—এমন দৃশ্য প্রাচীন কাহিনিতে বর্ণিত। কিছু সংস্করণে একটি কাঠঠোকরাও খাদ্য এনে সাহায্য করে; নেকড়ে ও কাঠঠোকরা উভয়ের সঙ্গে মার্সের সম্পর্ক ছিল। ফলে এই প্রাণীদের উপস্থিতি দৈবপিতার সুরক্ষার ইঙ্গিত হিসেবেও পড়া যায়। নেকড়েমার পরিচিত চিত্রে বন্য প্রাণীর শক্তি এবং মাতৃস্নেহ পাশাপাশি থাকে। রোমানদের কাছে ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠাতাদের এই আশ্রয় দেখায়, মানুষের নিষ্ঠুরতার মধ্যেও প্রকৃতি ও দেবতাদের পরিকল্পনা তাদের জীবন ধরে রেখেছিল।
নেকড়েমার ঘটনাটি নিয়ে প্রাচীনকালেই বিকল্প ব্যাখ্যা ছিল। লাতিন ভাষায় লুপা শব্দের অর্থ স্ত্রী নেকড়ে, আবার শব্দটি যৌনকর্মী বোঝাতেও ব্যবহৃত হতো। কিছু লেখক সেই দ্ব্যর্থকতার সঙ্গে আক্কা লারেন্তিয়ার পরিচয় যুক্ত করে গল্পটির মানবিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবে শব্দের এই ব্যবহার থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে নেকড়ের কাহিনি কেবল ভুল বোঝাবুঝি। অলৌকিক জীবনরক্ষা এবং যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা—দুই ধরনের বিবরণই প্রাচীন ঐতিহ্যে স্থান পেয়েছিল। রোমানরা নিজেদের প্রতিষ্ঠাকথা সব সময় একটিমাত্র অপরিবর্তনীয় সংস্করণে বলেনি।
রাখাল ফাউস্তুলুস শিশুদের খুঁজে পান এবং স্ত্রী আক্কা লারেন্তিয়ার কাছে নিয়ে যান। তাঁদের পরিবারে যমজরা বেড়ে ওঠে। এই পরিবর্তন কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক প্রকাশ করে: রাজবংশীয় সন্তানদের জীবন গড়ে দেয় সাধারণ মানুষের শ্রম ও স্নেহ। রোমুলাস ও রেমাস শৈশবে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় জানত না। পাহাড়, চারণভূমি এবং পশুপালকদের সমাজ ছিল তাদের জগৎ। বড় হয়ে তারা শিকার, পশুরক্ষা ও বিপদের মোকাবিলায় দক্ষ হয়। সাহস এবং সঙ্গীদের সংগঠিত করার ক্ষমতার কারণে অন্য তরুণেরা তাদের নেতৃত্ব মেনে নিতে থাকে।
তাদের কৈশোরের বর্ণনায় রাখালদের সংঘর্ষ ও দস্যুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঘটনা রয়েছে। একটি সংঘাতে রেমাস বন্দী হন এবং শেষ পর্যন্ত নুমিতরের সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যদিকে ফাউস্তুলুস রোমুলাসকে জন্মরহস্যের কথা জানান। নুমিতরও বন্দী তরুণের বয়স, চেহারা ও পরিস্থিতি দেখে সন্দেহ করতে শুরু করেন। এভাবে বিচ্ছিন্ন সূত্র একত্র হয়ে প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। কাহিনিতে এই আবিষ্কার শুধু হারানো পরিবারের পুনর্মিলন নয়; আমুলিয়ুসের শাসনের বিরুদ্ধে বৈধ উত্তরাধিকারীদের ফিরে আসা। রাখালদের নেতা হিসেবে অর্জিত ক্ষমতা এবার রাজবংশের দাবি পুনরুদ্ধারে ব্যবহৃত হয়।
দুই ভাই সহযোগীদের নিয়ে আমুলিয়ুসের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করেন। অত্যাচারী রাজা নিহত হন এবং নুমিতরকে আলবা লঙ্গার সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু যমজরা সেখানে থেকে রাজত্ব ভাগ করে নেওয়ার পথ বেছে নেন না। তারা ফিরে যেতে চান সেই অঞ্চলে, যেখানে তাদের পরিত্যাগ করা হয়েছিল এবং যেখানে তারা বড় হয়েছে। নতুন নগর প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা এখানে শৈশবের ভূমির সঙ্গে সম্পর্কিত। আলবা লঙ্গার সিংহাসন পুনরুদ্ধার তাদের বংশপরিচয় ফিরিয়ে দেয়; নতুন নগর গড়ার সিদ্ধান্ত তাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় তৈরি করে।
নগরের অবস্থান ও নেতৃত্ব নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। রোমুলাস প্যালাটাইন পাহাড়ের সঙ্গে এবং রেমাস আভেন্তাইন পাহাড়ের সঙ্গে যুক্ত হন। কে নগরের শাসক হবেন এবং কার নামে তার নাম হবে, তা নির্ধারণে তারা পাখির গতিবিধি দেখে দৈবলক্ষণ বিচার করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রচলিত বিবরণে রেমাস আগে ছয়টি শকুন দেখেন, পরে রোমুলাস বারোটি দেখেন। সংকেত পাওয়ার সময় নাকি সংখ্যার বেশি হওয়া—কোনটি শ্রেষ্ঠ, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। দেবতাদের সিদ্ধান্ত জানার আচারও মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেটাতে ব্যর্থ হয়।
রেমাসের মৃত্যুর বিবরণ একরকম নয়। কোনো ধারায় সমর্থকদের সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। সবচেয়ে পরিচিত সংস্করণে তিনি উপহাস করে রোমুলাসের তৈরি নিচু প্রাচীর বা সীমারেখা লাফিয়ে অতিক্রম করেন; ক্রুদ্ধ রোমুলাস তাঁকে হত্যা করেন। অন্য বিবরণে হত্যাকারী হিসেবে রোমুলাসের সহযোগীর নাম আসে। এই পার্থক্য মনে রাখা জরুরি, কারণ জনপ্রিয় গল্প প্রায়ই একটি সংস্করণকেই একমাত্র কাহিনি বানিয়ে দেয়। তবু সব প্রধান ধারায় রোমের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ভ্রাতৃসংঘাতের গভীর ছায়া যুক্ত থাকে। যে দুই ভাই একসঙ্গে বেঁচেছিল, নগরের কর্তৃত্ব তাদের বিচ্ছিন্ন করে।
প্রাচীর লঙ্ঘনের ঘটনাটি নগরের পবিত্র সীমানার গুরুত্ব বোঝায়। রোমান প্রতিষ্ঠার আচারে লাঙল দিয়ে সীমারেখা টানার ধারণা ছিল; বলদ ও গাভী ব্যবহার করে মাটিতে খাঁজ তৈরি করা হতো এবং প্রবেশপথের জন্য নির্দিষ্ট অংশ রাখা হতো। নগরের ধর্মীয় সীমানা, বা পোমেরিয়ুম, সাধারণ প্রতিরক্ষা প্রাচীরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও একেবারে একই বিষয় নয়। রেমাসের সীমা অতিক্রম তাই কাহিনিতে নবগঠিত নগরের কর্তৃত্ব অমান্য করার প্রতীক হতে পারে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা তাঁর মৃত্যুর বেদনা দূর করে না; প্রতিষ্ঠাতার বিজয়ের মধ্যে ভাই হারানোর অন্ধকার রয়ে যায়।
রোমুলাসের নামে নগরের নাম রোম হয়েছে—এটাই প্রচলিত পৌরাণিক ব্যাখ্যা। ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠাবর্ষ খ্রিস্টপূর্ব ৭৫৩ এবং প্রতিষ্ঠাদিবস ২১ এপ্রিল হিসেবে পরিচিত হয়। এসব তারিখ পরবর্তী রোমান কালগণনা ও স্মৃতিচর্চার অংশ। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, রোমের পাহাড়গুলোতে প্রাচীন বসতি ছিল এবং নগরায়ণ ধীরে ধীরে ঘটেছিল। তাই একদিনে দুই ভাইয়ের হাতে সম্পূর্ণ নগর প্রতিষ্ঠার কাহিনিকে সরাসরি প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস বলা যায় না। কিংবদন্তি দীর্ঘ সামাজিক পরিবর্তনকে কয়েকটি চরিত্র, সিদ্ধান্ত ও স্মরণীয় ঘটনার মধ্যে ধারণ করেছে।
নেকড়েমার নিচে দুই শিশুর ছবি শেষ পর্যন্ত রোমের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। মুদ্রা, ভাস্কর্য ও জনস্মৃতিতে এই দৃশ্য জানায়, নগরের সূচনা ছিল বিপন্ন জীবনকে রক্ষা করার মধ্যে। অথচ পরবর্তী ভ্রাতৃসংঘাত মনে করায়, রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্মে সহিংসতাও উপস্থিত। রোমুলাসের সামনে এখন একক নেতৃত্বে নতুন নগর গড়ার দায়িত্ব। সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু নগরের জন্য প্রয়োজন মানুষ, প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং প্রতিবেশীদের স্বীকৃতি। টাইবারের তীরে বেঁচে যাওয়া শিশুটি রাজা হয়েছেন; এবার তাঁর প্রতিষ্ঠিত রোমকে টিকে থাকার জন্য আশপাশের সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হবে—আর সেই সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়ও শান্তিপূর্ণ হবে না।
এনিয়াসের কিংবদন্তি: ট্রয় থেকে ইতালিতে রোমের পূর্বপুরুষের অভিযাত্রা
রোমান পুরাণের উৎপত্তি: ইতালীয় বিশ্বাস ও গ্রিক প্রভাবে দেবদেবীর জগৎ
হলোকাস্ট ও ফাইনাল সলিউশন: ঘেটো, আইনজাটসগ্রুপেন ও গণহত্যার ইতিহাস
নাৎসি সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তার: ১৯৪২ সালে হিটলারের ইউরোপীয় আধিপত্য
ব্রিটেনের যুদ্ধ থেকে অপারেশন বারবারোসা: হিটলারের দুই সামরিক ভুল