বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

১৮ ব্রুমেয়ারের অভ্যুত্থান: নেপোলিয়নের ক্ষমতা দখল ও ডিরেক্টরির পতন

সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন

১৮ ব্রুমেয়ারের অভ্যুত্থান: নেপোলিয়নের ক্ষমতা দখল ও ডিরেক্টরির পতন
আইনসভার সংকট ও সামরিক হস্তক্ষেপে শুরু হয় নেপোলিয়নের শাসন।

মিশরের অসমাপ্ত অভিযান পেছনে রেখে নেপোলিয়ন যখন ১৭৯৯ সালের অক্টোবরে ফ্রান্সে ফিরলেন, তখন তাঁর সামনে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র ছিল প্যারিসের রাজনীতি। ইতালির বিজয় তাঁকে জনপ্রিয় করেছিল, আর মিশরের বিপর্যয়ের সম্পূর্ণ বিবরণ তখনো সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট ছিল না। অনেকেই তাঁকে সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করতে সক্ষম সেনাপতি হিসেবে দেখছিল। কিন্তু জনপ্রিয়তা নিজে থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা এনে দেয় না। সেই ক্ষমতা অর্জনে তাঁকে যুক্ত হতে হয় এমন একটি পরিকল্পনায়, যার উদ্যোক্তারা ডিরেক্টরি সরিয়ে শক্তিশালী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

ডিরেক্টরি ব্যবস্থা চালু হয়েছিল ১৭৯৫ সালের সংবিধানের অধীনে। পাঁচজন পরিচালক নির্বাহী ক্ষমতা পরিচালনা করতেন; আইনসভা বিভক্ত ছিল পাঁচশ সদস্যের পরিষদ এবং প্রবীণদের পরিষদে। এই বিন্যাসের উদ্দেশ্য ছিল রাজতন্ত্র ও বিপ্লবী একনায়কত্বের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। কিন্তু ক্ষমতা ভাগ করার ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাজনৈতিক সমর্থন তৈরি করতে পারেনি। রাজতন্ত্রী, নবজ্যাকোবিন এবং মধ্যপন্থীদের সংঘাতে নির্বাচন ও সরকারের সম্পর্ক বারবার সংকটে পড়ে। যে শাসনব্যবস্থা স্বৈরশাসন ঠেকাতে তৈরি হয়েছিল, সেটিই নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় ক্রমে অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে থাকে।

১৭৯৭ সালের ফ্রুকতিদোর অভ্যুত্থানে রাজতন্ত্রী প্রভাব দমন করতে সেনাবাহিনী ব্যবহার করা হয়। ১৭৯৮ সালে বহু নির্বাচনী ফল বাতিল করা হয়, আবার ১৭৯৯ সালের জুনে রাজনৈতিক চাপে কয়েকজন পরিচালক সরে যান। ফলে সাংবিধানিক নিয়মের মর্যাদা আগেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল। যুদ্ধব্যয়, কর আদায়ের সমস্যা এবং দুর্নীতির অভিযোগ সরকারের ভাবমূর্তি দুর্বল করে। দ্বিতীয় জোটের বিরুদ্ধে প্রাথমিক সামরিক বিপর্যয় সংকট বাড়ালেও শরৎকালে ফরাসি বাহিনী কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পায়। তাই ব্রুমেয়ারের আগে ফ্রান্স সম্পূর্ণ সামরিক পতনের মুখে ছিল—এমন ধারণা সঠিক নয়; মূল সমস্যা ছিল সরকারের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা।

এই পরিস্থিতিতে পরিচালক ইমানুয়েল জোসেফ সিয়েস নতুন সংবিধান ও শক্তিশালী নির্বাহী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছিলেন। তিনি বিপ্লবের পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, কিন্তু জনসমর্থন ও সামরিক শক্তি একত্র করার ক্ষমতা তাঁর সীমিত ছিল। পরিকল্পনা কার্যকর করতে একজন গ্রহণযোগ্য সেনাপতির সহযোগিতা দরকার ছিল। নেপোলিয়নের প্রত্যাবর্তন সেই সুযোগ এনে দেয়। সিয়েস ভেবেছিলেন সামরিক সহায়তায় সরকার বদলে নিজের পরিকল্পিত সাংবিধানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবেন। নেপোলিয়ন একই ব্যবস্থার মধ্যে নিজের নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখছিলেন। তাঁদের সহযোগিতার ভিত্তি ছিল অভিন্ন প্রতিপক্ষ, অভিন্ন চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়।

পরিকল্পনায় যুক্ত হন পরিচালক রজে দ্যুকো, তালেইরাঁ এবং আইনসভার বিভিন্ন সমর্থক। নেপোলিয়নের ভাই লুসিয়েন তখন পাঁচশ সদস্যের পরিষদের সভাপতি; এই পদ পরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল প্রথমে আইনসম্মত সিদ্ধান্তের চেহারায় পরিষদগুলোকে প্যারিস থেকে সরানো, তারপর ডিরেক্টরিকে কার্যত অচল করে নতুন নির্বাহী কর্তৃপক্ষ গঠন করা। রাজধানীর জনতা ও রাজনৈতিক সংগঠন থেকে প্রতিনিধিদের দূরে রাখলে প্রতিরোধ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। সামরিক শক্তি প্রস্তুত থাকলেও শুরুতে পরিবর্তনটিকে সাংবিধানিক পুনর্গঠন হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

ফরাসি বিপ্লবী বর্ষপঞ্জির অষ্টম বছরের ১৮ ব্রুমেয়ার, অর্থাৎ ১৭৯৯ সালের ৯ নভেম্বর, প্রবীণদের পরিষদ সম্ভাব্য জ্যাকোবিন ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে উভয় পরিষদের অধিবেশন সাঁ-ক্লুতে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অভিযোগটি ছিল রাজনৈতিক পদক্ষেপের অজুহাত; ঘোষিত বিপদের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ সামনে আনা হয়নি। একই সিদ্ধান্তে নেপোলিয়নকে পরিষদগুলোর নিরাপত্তার জন্য সামরিক কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। তিনি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের সমর্থন নিশ্চিত করেন। এভাবে সরকারের বিরুদ্ধে পরিকল্পনাকারী সেনাপতি নিজেই আইনসভার রক্ষাকারী হিসেবে বৈধ নির্দেশের অধিকারী হন।

এরপর ডিরেক্টরির ভিত্তি সরিয়ে দেওয়া হয়। সিয়েস ও দ্যুকো পদত্যাগ করেন। বারাসকেও পদত্যাগে রাজি করানো হয়; তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টিতে তালেইরাঁ ভূমিকা রাখেন। বাকি দুই পরিচালক গোহিয়ে ও মূলাঁ অভ্যুত্থানে সহযোগিতা করেননি, কিন্তু সামরিক নজরদারি ও বাধার কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি। পাঁচ সদস্যের নির্বাহী সংস্থা প্রয়োজনীয় কার্যক্ষমতা হারায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নেপোলিয়ন প্রথম দিনেই সরাসরি একক শাসক ঘোষিত হননি। পুরোনো সরকারের কার্যকর প্রতিরোধের ক্ষমতা ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

পরিকল্পনাকারীরা আশা করেছিলেন, পরদিন পরিষদগুলো নতুন ব্যবস্থার অনুমোদন দেবে। কিন্তু ১৯ ব্রুমেয়ার, অর্থাৎ ১০ নভেম্বর, সাঁ-ক্লুতে পরিস্থিতি তাঁদের প্রত্যাশামতো এগোয়নি। প্রতিনিধিদের অনেকেই সন্দেহ করতে শুরু করেন যে নিরাপত্তার অজুহাতে তাঁদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। পাঁচশ সদস্যের পরিষদে সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের শপথ নেওয়ার দাবি ওঠে। এই প্রতিরোধ দেখায়, ডিরেক্টরি অজনপ্রিয় হলেও আইনসভার সবাই সামরিকভাবে পরিচালিত সরকার পরিবর্তনে প্রস্তুত ছিলেন না। অভ্যুত্থান সফল হওয়া তখনো নিশ্চিত ছিল না।

নেপোলিয়ন প্রথমে প্রবীণদের পরিষদে গিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের আত্মবিশ্বাস তাঁর রাজনৈতিক বক্তৃতায় একইভাবে প্রকাশ পায়নি। সংবিধান ও সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে তাঁর বক্তব্য প্রশ্নের মুখে পড়ে। এরপর তিনি পাঁচশ সদস্যের পরিষদের সভাকক্ষে প্রবেশ করলে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। প্রতিনিধিরা তাঁর সামরিক উপস্থিতিকে আইনসভার স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন। তাঁকে বহিষ্কার এবং আইনবহির্ভূত ঘোষণা করার দাবি ওঠে। ধাক্কাধাক্কি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে প্রহরীরা তাঁকে বাইরে নিয়ে যায়। ক্ষমতা দখলের নির্ণায়ক মুহূর্তে নেপোলিয়ন নিজেই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারানোর কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন।

পরবর্তী সরকারি বিবরণে তাঁর ওপর ছুরি নিয়ে হামলার অভিযোগ প্রচার করা হয়। এই নাটকীয় দাবির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে; নিশ্চিত বিষয় হলো, সভায় প্রবল বিরোধিতা ও শারীরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ঘটনাটিকে প্রতিনিধিদের হত্যাচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করলে সৈন্যদের হস্তক্ষেপ ন্যায্য দেখানো সহজ হয়। এখানে লুসিয়েন বোনাপার্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাঁর উপস্থিতি অভ্যুত্থানকারীদের এমন দাবি করার সুযোগ দেয় যে সামরিক পদক্ষেপ আইনসভাকে ধ্বংস করছে না, বরং অল্পসংখ্যক উগ্র সদস্যের হাত থেকে উদ্ধার করছে।

লুসিয়েন বাইরে সৈন্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে ভাইয়ের পক্ষে সমর্থন সংগঠিত করেন। প্রতিনিধিদের একটি অংশের আচরণকে তিনি পরিষদের স্বাধীন সিদ্ধান্তের বাধা হিসেবে তুলে ধরেন। এরপর সামরিক নির্দেশে গ্রেনাডিয়াররা সভাকক্ষে প্রবেশ করে পাঁচশ সদস্যের পরিষদ ছত্রভঙ্গ করে। সৈন্যদের সামনে প্রতিনিধিরা বেরিয়ে যান; ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের deliberation বা স্বাধীন আলোচনার পরিবর্তে অস্ত্রধারী সৈন্যের উপস্থিতিই রাজনৈতিক ফল নির্ধারণ করে। এই মুহূর্তে সাংবিধানিক সংস্কারের আড়াল সরিয়ে অভ্যুত্থানের সামরিক চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রাতে অবশিষ্ট ও সহযোগী প্রতিনিধিদের একত্র করে নতুন ব্যবস্থার অনুমোদন নেওয়া হয়। ডিরেক্টরি বিলুপ্ত করে তিনজন অস্থায়ী কনসুলের নির্বাহী কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়: নেপোলিয়ন, সিয়েস এবং দ্যুকো। নতুন সংবিধান প্রস্তুতের জন্য কমিশনও করা হয়। এই সিদ্ধান্তগুলো সামরিকভাবে ছত্রভঙ্গ হওয়া পূর্ণ আইনসভার স্বাধীন রায় ছিল না। তবু প্রশাসন চালু রাখা এবং ক্ষমতা পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অভ্যুত্থান শুধু পুরোনো সরকার অপসারণ করেনি; সঙ্গে সঙ্গে বিকল্প কর্তৃত্বও প্রতিষ্ঠা করেছিল।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে স্পষ্ট হয়, সিয়েস নেপোলিয়নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। ডিসেম্বরের অষ্টম বছরের সংবিধানে নেপোলিয়ন প্রথম কনসুল হন; অন্য দুই কনসুল হন কাঁবাসেরেস ও লেব্র্যাঁ। প্রথম কনসুলের হাতে মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং নির্বাহী সিদ্ধান্তের প্রধান ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। আইনপ্রণয়নের আলোচনা ও ভোট বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ভাগ করে দেওয়ায় প্রতিনিধিত্বমূলক বিরোধিতার শক্তি কমে। গণঅনুমোদনের মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থা বৈধতা দাবি করলেও সরকারি ভোটের ফল ব্যাপকভাবে সাজানো হয়েছিল। প্রজাতন্ত্রের নাম বজায় থাকলেও কার্যকর ক্ষমতার ভারসাম্য গভীরভাবে বদলে যায়।

১৮ ব্রুমেয়ার তাই এক দিনে নেপোলিয়নের একক কৃতিত্বে সম্পন্ন কোনো সহজ ক্ষমতা দখল ছিল না। রাজনৈতিক সহযোগীদের পরিকল্পনা, ডিরেক্টরির দুর্বলতা, লুসিয়েনের হস্তক্ষেপ এবং সৈন্যদের আনুগত্য মিলেই দুই দিনের সংকট পেরিয়ে অভ্যুত্থান সফল হয়। স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় অনেকে পরিবর্তন মেনে নেন, কিন্তু তার বিনিময়ে আইনসভার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। বিপ্লবের অর্জন রক্ষার প্রতিশ্রুতি এখন কেন্দ্রীভূত ব্যক্তিগত শাসনের ভিত্তি হয়ে ওঠে। প্রথম কনসুল হিসেবে নেপোলিয়নের সামনে পরবর্তী কাজ ছিল যুদ্ধের সাফল্য, প্রশাসনিক সংস্কার এবং নতুন আইনব্যবস্থার মাধ্যমে এই দখল করা ক্ষমতাকে স্থায়ী কর্তৃত্বে পরিণত করা।