বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

বাবর ও প্রথম পানিপথের যুদ্ধ ১৫২৬: যেভাবে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছিল

Series: মুঘল সাম্রাজ্য: উত্থান, ঐশ্বর্য ও পতনের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 18, 2026
বাবর ও প্রথম পানিপথের যুদ্ধ ১৫২৬: যেভাবে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের জন্ম হয়েছিল
বাবর ও প্রথম পানিপথের যুদ্ধ ১৫২৬

১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল, বর্তমান ভারতের হরিয়ানার পানিপথের সমতল ভূমিতে এমন একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যা শুধু দিল্লির একটি রাজবংশের পতন ঘটায়নি—ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সম্পূর্ণ নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। একদিকে ছিলেন দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদি, যাঁর হাতে ছিল সংখ্যায় বিশাল সেনাবাহিনী এবং বহু যুদ্ধহাতি। অন্যদিকে ছিলেন কাবুলের তিমুরীয় শাসক জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, যাঁর বাহিনী তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট হলেও ছিল অধিক সংগঠিত, গতিশীল এবং নতুন ধরনের বারুদভিত্তিক যুদ্ধকৌশলে দক্ষ। এই অসম লড়াইই ইতিহাসে পরিচিত প্রথম পানিপথের যুদ্ধ নামে।

পানিপথের যুদ্ধকে বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হয় কেন বাবর ভারতে এসেছিলেন। বাবর ছিলেন পিতৃসূত্রে তিমুরের বংশধর এবং মাতৃসূত্রে চাগতাই-মঙ্গোল রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় স্বপ্ন ছিল মধ্য এশিয়ার ঐতিহাসিক তিমুরীয় কেন্দ্র সমরখন্দ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি একাধিকবার শহরটি দখল করেছিলেন, আবার হারিয়েছিলেন। মুহাম্মদ শায়বানি খানের নেতৃত্বে উজবেক শক্তির উত্থানের ফলে মধ্য এশিয়ায় স্থায়ী সাম্রাজ্য গড়ার বাবরের আশা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসে।

১৫০৪ সালে কাবুল দখল করার পর বাবর প্রথমবারের মতো একটি অপেক্ষাকৃত স্থায়ী রাজনৈতিক ঘাঁটি পান। কিন্তু কাবুল ও আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। মধ্য এশিয়ায় ফিরে যাওয়ার পথ ক্রমে কঠিন হয়ে উঠলে তাঁর দৃষ্টি দক্ষিণ-পূর্বে ভারতের দিকে ঘুরে যায়। সমৃদ্ধ কৃষিভূমি, জনবহুল নগর, বিপুল রাজস্ব এবং একই সঙ্গে উত্তর ভারতের রাজনৈতিক বিভাজন তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।

তখন দিল্লিতে ক্ষমতায় ছিল আফগান লোদি রাজবংশ। ১৪৫১ সালে বাহলুল লোদি এই রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি সিকান্দার লোদি দিল্লি সালতানাতকে শক্তিশালী করলেও ১৫১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র ইব্রাহিম লোদি সিংহাসনে বসেন। ইব্রাহিম ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং কেন্দ্রীয় শাসন শক্তিশালী করতে আগ্রহী। কিন্তু আফগান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী অভিজাতদের নিজস্ব প্রভাব ছিল। তাঁদের অনেকেই সুলতানের কঠোর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন।

বিশেষ করে পাঞ্জাব অঞ্চলের শক্তিশালী লোদি অভিজাতদের সঙ্গে ইব্রাহিমের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। দৌলত খান লোদি এবং ইব্রাহিমের আত্মীয় আলম খান বাবরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাঁরা সম্ভবত আশা করেছিলেন, বাবরের সামরিক হস্তক্ষেপ ব্যবহার করে ইব্রাহিমকে সরিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করবেন। কিন্তু তাঁরা যে মধ্য এশীয় শাসককে আহ্বান করছিলেন, তিনি কেবল অন্যের হয়ে যুদ্ধ করে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বাবরের নিজেরই উত্তর ভারতে স্থায়ী রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।

বাবর এর আগেও ভারতীয় সীমান্ত অঞ্চলে অভিযান চালিয়েছিলেন। ১৫১৯ সাল থেকে তিনি উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিকে ধারাবাহিক অভিযান শুরু করেন। এসব অভিযানের মাধ্যমে তিনি পাঞ্জাবের ভূগোল, দুর্গ, যোগাযোগপথ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ফলে ১৫২৫ সালের অভিযান ছিল হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং কয়েক বছরের সামরিক পর্যবেক্ষণ ও রাজনৈতিক প্রস্তুতির পরিণতি।

১৫২৫ সালের শেষদিকে বাবর কাবুল থেকে তাঁর নির্ণায়ক ভারত অভিযান শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছিল অভিজ্ঞ মধ্য এশীয় অশ্বারোহী, তীরন্দাজ, পদাতিক এবং বারুদচালিত অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ সৈন্য। সিন্ধু নদ অতিক্রম করে তিনি পাঞ্জাবের দিকে অগ্রসর হন। পথে বিভিন্ন প্রতিরোধ মোকাবিলা করে শেষ পর্যন্ত দিল্লির দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন।

ইব্রাহিম লোদি বুঝতে পারেন, এবার বাবরের উদ্দেশ্য সীমান্তে লুটপাট করে ফিরে যাওয়া নয়। দিল্লির সুলতান তাই একটি বিশাল বাহিনী সংগঠিত করেন। যুদ্ধের সৈন্যসংখ্যা নিয়ে সমসাময়িক ও পরবর্তী বর্ণনায় ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। বাবরের নিজের বিবরণে লোদির বাহিনী অত্যন্ত বিশাল হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং প্রায় এক হাজার যুদ্ধহাতির কথাও উল্লেখ করা হয়। আধুনিক ইতিহাসবিদেরা এসব সংখ্যাকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করেন। তবে একটি বিষয় মোটামুটি পরিষ্কার—ইব্রাহিমের বাহিনী বাবরের বাহিনীর তুলনায় সংখ্যায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড় ছিল।

শুধু সৈন্যসংখ্যা বিবেচনা করলে বাবরের পরিস্থিতি বিপজ্জনক মনে হওয়ার কথা। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সংখ্যা সবসময় ফল নির্ধারণ করে না। বাবরের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল সমন্বিত সামরিক কৌশল, অভিজ্ঞ অশ্বারোহী বাহিনী এবং কার্যকর ফিল্ড আর্টিলারি

বাবরের সঙ্গে ছিলেন কামান পরিচালনায় দক্ষ উস্তাদ আলী কুলি এবং মুস্তফা রুমি। বিশেষ করে অটোমান যুদ্ধপদ্ধতির প্রভাব তাঁর সেনাবিন্যাসে দেখা যায়। বাবর যুদ্ধক্ষেত্রে কামানকে বিচ্ছিন্ন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান, বন্দুকধারী সৈন্য এবং অশ্বারোহী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত করেছিলেন। এটাই প্রথম পানিপথের যুদ্ধের অন্যতম নির্ধারক বৈশিষ্ট্য।

পানিপথে পৌঁছে বাবর তাঁর বাহিনীকে এমনভাবে অবস্থান করান যাতে সংখ্যায় বড় শত্রু সহজে তাঁকে ঘিরে ফেলতে না পারে। তিনি গাড়ি বা আরাবা সারিবদ্ধ করে চামড়ার দড়ি দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেন। গাড়িগুলোর মধ্যবর্তী নির্দিষ্ট ফাঁক দিয়ে অশ্বারোহীরা বেরিয়ে আক্রমণ করতে পারত। প্রতিরক্ষার সামনে কামান ও বন্দুকধারীদের এমনভাবে স্থাপন করা হয় যাতে অগ্রসরমান শত্রুর ওপর সংগঠিতভাবে গোলাবর্ষণ করা সম্ভব হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত ছিল মধ্য এশীয় তুলুঘমা কৌশল। এর মূল ধারণা ছিল বাহিনীর ডান ও বাম দিকের দ্রুতগামী অশ্বারোহী দলকে ব্যবহার করে শত্রুর পাশ ঘুরে পেছনের দিকে আক্রমণ করা। অর্থাৎ বাবরের পরিকল্পনা ছিল সামনে থেকে লোদির বিশাল বাহিনীকে আটকে রেখে একই সময়ে দুই পাশ থেকে তাকে সংকুচিত করা।

অন্যদিকে ইব্রাহিমের বাহিনীর শক্তি ছিল বিপুল জনবল এবং যুদ্ধহাতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারতীয় যুদ্ধক্ষেত্রে হাতি ভয়ংকর আক্রমণাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশাল হাতির ধাক্কায় শত্রুর পদাতিক সারি ভেঙে দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু পানিপথে বাবরের কামান ও আগ্নেয়াস্ত্র নতুন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বিস্ফোরণ, ধোঁয়া এবং প্রচণ্ড শব্দ হাতি ও ঘোড়ার ওপর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারত এবং ঘনবদ্ধ সৈন্যদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারত।

২১ এপ্রিল ১৫২৬-এর সকালে যুদ্ধ শুরু হয়। ইব্রাহিমের বিশাল বাহিনী বাবরের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু বাবরের সামনে তৈরি করা প্রতিবন্ধকতা এবং সংকুচিত যুদ্ধক্ষেত্রের কারণে লোদি বাহিনী তার সংখ্যাগত সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি। বিপুলসংখ্যক সৈন্য একসঙ্গে সামনে এগিয়ে এসে কার্যত নিজেদেরই চলাচলের জায়গা সীমিত করে ফেলে।

এরপর বাবরের কামান ও বন্দুকধারীরা আক্রমণ শুরু করে। গোলার বিস্ফোরণ, ধোঁয়া এবং আগ্নেয়াস্ত্রের আওয়াজের মধ্যে লোদি বাহিনীর অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। একই সময়ে বাবরের অশ্বারোহীরা দুই পাশ দিয়ে ঘুরে শত্রুকে চাপ দিতে থাকে। সামনের প্রতিরক্ষা, কামানের গোলাবর্ষণ এবং পাশ থেকে অশ্বারোহী আক্রমণ—এই তিনটির সমন্বয় ইব্রাহিমের বাহিনীকে ক্রমে সংকুচিত করে ফেলে।

ইব্রাহিম লোদি অবশ্য যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যাননি। তিনি নিজের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত নিহত হন। তাঁর চারপাশে বিপুলসংখ্যক সৈন্যও প্রাণ হারায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দিল্লি সালতানাতের কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী কার্যত ভেঙে পড়ে। একটি যুদ্ধেই তিন শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বিভিন্ন তুর্কি ও আফগান রাজবংশের অধীনে পরিচালিত দিল্লি সালতানাতের ইতিহাসে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।

বাবরের বিজয়ের কারণকে শুধু কামানের ব্যবহার দিয়ে ব্যাখ্যা করলে অবশ্য ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করা হবে। তাঁর সাফল্যের পেছনে সেনাবিন্যাস, যুদ্ধক্ষেত্র নির্বাচন, শৃঙ্খলা, অশ্বারোহী বাহিনীর গতিশীলতা, নেতৃত্ব এবং অস্ত্রের সমন্বিত ব্যবহার—সবকিছুই ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে ইব্রাহিমের বিশাল বাহিনী সংখ্যায় শক্তিশালী হলেও একই মাত্রায় সমন্বিত ছিল না।

পানিপথের পর বাবরের সামনে দিল্লি ও আগ্রার পথ খুলে যায়। তাঁর পুত্র হুমায়ুনসহ মুঘল বাহিনীর বিভিন্ন অংশ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিতে এগিয়ে যায়। আগ্রা দখলের মাধ্যমে বাবর লোদি রাজ্যের বিপুল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেই বিখ্যাত কোহিনূর হীরার ইতিহাসও বাবরের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত হয়; পরবর্তী বর্ণনা অনুযায়ী হুমায়ুনের হাতে হীরাটি আসে এবং তিনি তা বাবরকে দেন।

কিন্তু পানিপথ জয় মানেই তখনই একটি নিরাপদ মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়ে যাওয়া নয়। বাবরের সেনাদের অনেকেই সম্ভবত দীর্ঘ অভিযান শেষে কাবুলে ফিরে যেতে চেয়েছিল। উত্তর ভারতের আবহাওয়া ও পরিবেশ মধ্য এশীয় সৈন্যদের কাছে অপরিচিত ছিল। তার চেয়েও বড় সমস্যা ছিল—ইব্রাহিম লোদির মৃত্যু হলেও আফগান প্রতিরোধ শেষ হয়নি, আর পশ্চিম ও মধ্য ভারতের শক্তিশালী রাজপুত জোটও বাবরকে নতুন শাসক হিসেবে সহজে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।

বিশেষ করে মেওয়ারের শাসক রানা সাংগ্রাম সিংহ বা রানা সাঙ্গা বাবরের সামনে পরবর্তী বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৫২৭ সালের খানওয়ার যুদ্ধ তাই নির্ধারণ করবে বাবর সত্যিই ভারতে স্থায়ী হতে পারবেন, নাকি পানিপথের বিজয় তিমুরের ১৩৯৮ সালের দিল্লি অভিযানের মতো আরেকটি সাময়িক আক্রমণ হিসেবেই শেষ হবে।

এই কারণেই প্রথম পানিপথের যুদ্ধকে মুঘল সাম্রাজ্যের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা না বলে রাজনৈতিক জন্মমুহূর্ত বলা বেশি যথাযথ। ১৫২৬ সালে বাবর দিল্লির পুরোনো শাসককে সরিয়ে দিলেন এবং সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় সম্পদ ও রাজধানী অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পেলেন। কিন্তু সেই ক্ষমতাকে স্থায়ী সাম্রাজ্যে পরিণত করতে তাঁকে আরও কয়েকটি কঠিন যুদ্ধ করতে হয়েছিল।

প্রথম পানিপথের যুদ্ধ ভারতীয় সামরিক ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতীক। ভারতীয় উপমহাদেশে বারুদ ও কামান এর আগেও পরিচিত ছিল, কিন্তু বাবর মাঠের যুদ্ধে কামান, প্রতিরক্ষামূলক ব্যূহ এবং গতিশীল অশ্বারোহী বাহিনীকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে একত্রিত করেছিলেন। এর পরবর্তী যুগে আগ্নেয়াস্ত্র ও কামান ভারতীয় সাম্রাজ্যগুলোর যুদ্ধব্যবস্থায় ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

আরও গভীরভাবে দেখলে পানিপথ ছিল দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার সংঘর্ষও। একদিকে ছিল দিল্লির আফগান লোদি শাসন, অন্যদিকে মধ্য এশিয়া থেকে আগত একটি তিমুরীয় রাজবংশ, যা ভারতে এসে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চরিত্র গ্রহণ করবে। বাবরের উত্তরসূরি হুমায়ুন সাম্রাজ্য হারিয়ে আবার ফিরে পাবেন; আকবর সেটিকে সুবিশাল ও সুসংগঠিত সাম্রাজ্যে পরিণত করবেন; জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের সময় মুঘল রাজদরবার শিল্প ও স্থাপত্যের অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছাবে; আর আওরঙ্গজেবের সময় সাম্রাজ্যের ভূখণ্ড সর্বোচ্চ বিস্তার লাভ করবে।

কিন্তু সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সূচনাবিন্দু ছিল পানিপথের ধুলোময় প্রান্তর। ১৫২৬ সালের ২১ এপ্রিল বাবরের বিজয় শুধু ইব্রাহিম লোদির পরাজয় ছিল না; এটি উত্তর ভারতের ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের সূচনা করেছিল। মধ্য এশিয়ায় বারবার নিজের রাজ্য হারানো এক তিমুরীয় রাজপুত্র সেদিন দিল্লির দরজা খুলে দিয়েছিলেন এমন একটি রাজবংশের জন্য, যা পরবর্তী তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ভারতীয় ইতিহাসের কেন্দ্রীয় শক্তিগুলোর একটি হয়ে থাকবে। প্রথম পানিপথের যুদ্ধ তাই একটি সামরিক বিজয়ের চেয়েও বড় ঘটনা—এটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল যুগের জন্মমুহূর্ত।