নিক্সনের কম্বোডিয়া বোমাবর্ষণ ১৯৬৯–১৯৭০: ভিয়েতনাম যুদ্ধের গোপন সম্প্রসারণ
- Author: Admin
- August 18, 2026
নিক্সনের কম্বোডিয়া বোমাবর্ষণ ১৯৬৯–১৯৭০
১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে রিচার্ড নিক্সন যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ভিয়েতনাম যুদ্ধ ইতোমধ্যেই মার্কিন রাজনীতি ও সমাজের অন্যতম গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। লক্ষাধিক মার্কিন সেনা দক্ষিণ ভিয়েতনামে অবস্থান করছিল, বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছিল। নিক্সন নির্বাচনী প্রচারে যুদ্ধের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর প্রশাসন এমন একটি সিদ্ধান্ত নেয়, যা যুদ্ধকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে আরও বিস্তৃত করে। লক্ষ্য ছিল নিরপেক্ষ রাষ্ট্র কম্বোডিয়ার ভূখণ্ডে উত্তর ভিয়েতনামী বাহিনী ও ভিয়েত কংয়ের ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানা। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল, এই বোমাবর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মার্কিন জনগণ ও কংগ্রেসের কাছ থেকে গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের ভৌগোলিক বাস্তবতা বুঝতে না পারলে কম্বোডিয়ায় মার্কিন বোমাবর্ষণের কারণ বোঝা কঠিন। দক্ষিণ ভিয়েতনামের পশ্চিমে অবস্থিত কম্বোডিয়ার দীর্ঘ সীমান্ত উত্তর ভিয়েতনামী বাহিনী ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গেরিলা ভিয়েত কংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয় ও যোগাযোগ অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন ও দক্ষিণ ভিয়েতনামী বাহিনীর চাপ বাড়লে অনেক কমিউনিস্ট ইউনিট সীমান্ত অতিক্রম করে কম্বোডিয়ার দুর্গম জঙ্গলাঞ্চলে আশ্রয় নিতে পারত। সেখানে তারা বিশ্রাম, পুনর্গঠন, অস্ত্র ও খাদ্য সংগ্রহের পর আবার দক্ষিণ ভিয়েতনামে প্রবেশ করত।
কম্বোডিয়ার পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকা উত্তর ভিয়েতনামী সামরিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছিল। লাওস ও কম্বোডিয়ার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত যোগাযোগপথ দক্ষিণ ভিয়েতনামের যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্য ও সৈন্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের কাছে এর অর্থ ছিল একটি কঠিন সমস্যা: দক্ষিণ ভিয়েতনামের ভেতরে শত্রুকে আঘাত করা হলেও তারা সীমান্তের ওপারে গিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় পুনরায় সংগঠিত হতে পারছিল।
কম্বোডিয়া তখন আনুষ্ঠানিকভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধের অংশ ছিল না। দেশটির নেতা যুবরাজ নরোদম সিহানুক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখার চেষ্টা করছিলেন। বাস্তবে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত জটিল। একদিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সম্পূর্ণ নষ্ট করতে চাননি, অন্যদিকে উত্তর ভিয়েতনাম ও চীনের মতো শক্তির সঙ্গেও ভারসাম্য রক্ষা করতে হতো। কম্বোডিয়ার পূর্বাঞ্চলে উত্তর ভিয়েতনামী ও ভিয়েত কং বাহিনীর উপস্থিতি তাঁর সরকারের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করলেও সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে বৃহৎ সামরিক অভিযান চালানোর সামর্থ্য কম্বোডিয়ার ছিল না।
নিক্সন প্রশাসনের দৃষ্টিতে পরিস্থিতিটি ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছিল। নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বিশ্বাস করতেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসতে চায়, তাহলে উত্তর ভিয়েতনামের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনাবাহিনীকে ধীরে ধীরে যুদ্ধের প্রধান দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও চলছিল। এই নীতিই পরে ভিয়েতনামিকরণ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় উত্তর ভিয়েতনামী বাহিনী যেন সীমান্তবর্তী নিরাপদ ঘাঁটি ব্যবহার করে দক্ষিণ ভিয়েতনামের ওপর চাপ বাড়াতে না পারে, সেটিও ছিল ওয়াশিংটনের বড় উদ্বেগ।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৯ সালের মার্চে কম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি গোপন মার্কিন বোমাবর্ষণ অভিযান শুরু হয়। এর সাংকেতিক নাম ছিল অপারেশন মেনু। অভিযানের বিভিন্ন পর্যায়ের জন্য খাবারের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক সাংকেতিক নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে কম্বোডিয়ার পূর্বাঞ্চলে সন্দেহভাজন উত্তর ভিয়েতনামী ও ভিয়েত কং ঘাঁটি, সদর দপ্তর, সৈন্যসমাবেশ, সরবরাহকেন্দ্র এবং যোগাযোগব্যবস্থাকে লক্ষ্য করা হয়।
১৯৬৯ সালের ১৮ মার্চ প্রথম বড় আক্রমণগুলোর একটি পরিচালিত হয়। মার্কিন বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস ভারী বোমারু বিমান এই অভিযানের প্রধান অস্ত্র ছিল। এসব বিমান বিপুল পরিমাণ বোমা বহন করতে পারত এবং উচ্চ আকাশ থেকে বিস্তৃত এলাকায় একসঙ্গে অসংখ্য বোমা ফেলতে সক্ষম ছিল। মূলত বৃহৎ সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের জন্য তৈরি এই বিমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জঙ্গলযুদ্ধে ভয়াবহ শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
কম্বোডিয়ার ওপর বোমাবর্ষণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল শুধু সামরিক অভিযান নয়, বরং অভিযানটিকে গোপন রাখার জন্য গৃহীত ব্যবস্থা। মার্কিন সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে এমন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে প্রকৃত লক্ষ্যস্থলের তথ্য সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তার মধ্যে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক নথিতে প্রদর্শিত লক্ষ্য এবং বাস্তবে আঘাত করা স্থানের মধ্যে পার্থক্য রাখা হয়। এই গোপনীয়তার উদ্দেশ্য ছিল কম্বোডিয়ার নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও জনগণের সামনে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরির বিষয়টি আড়াল করা।
এখানেই নিক্সন প্রশাসনের সিদ্ধান্ত একটি গুরুতর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতার সীমা কতটুকু এবং কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া অন্য একটি রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে কত দূর পর্যন্ত সামরিক অভিযান পরিচালনা করা যায়—কম্বোডিয়ার গোপন বোমাবর্ষণ এই প্রশ্নগুলোকে আরও তীব্র করে তোলে। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, দক্ষিণ ভিয়েতনামে যুদ্ধরত মার্কিন সেনাদের সুরক্ষার জন্য সীমান্তের ওপারে শত্রু ঘাঁটিতে আঘাত করা সামরিকভাবে প্রয়োজনীয়। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল যুদ্ধকে গোপনে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে সম্প্রসারণ এবং গণতান্ত্রিক তদারকি এড়িয়ে যাওয়ার বিপজ্জনক নজির।
অপারেশন মেনুর সামরিক কার্যকারিতা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বোমাবর্ষণে উত্তর ভিয়েতনামী ও ভিয়েত কংয়ের কিছু ঘাঁটি, সরবরাহকেন্দ্র এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাদের কিছু ইউনিট সীমান্ত থেকে আরও গভীরে সরে যেতে বাধ্য হয়। মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করত, এর ফলে দক্ষিণ ভিয়েতনামের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু আকাশ থেকে পরিচালিত ব্যাপক বোমাবর্ষণের মৌলিক সীমাবদ্ধতাও ছিল। জঙ্গলাঞ্চলে ছোট ছোট ইউনিট দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারত। স্থায়ী সামরিক স্থাপনার পরিবর্তে ছড়িয়ে থাকা ঘাঁটি, সুড়ঙ্গ, অস্থায়ী গুদাম ও চলমান সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা কঠিন ছিল। একটি অঞ্চল বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত হলে কমিউনিস্ট বাহিনী অন্য এলাকায় সরে গিয়ে নতুন ঘাঁটি গড়ে তুলতে পারত। ফলে বিপুল ধ্বংস ঘটলেও যুদ্ধের মূল রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
আরও বড় সমস্যা ছিল কম্বোডিয়ার সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব। বোমাবর্ষণের লক্ষ্য সামরিক ঘাঁটি হলেও সীমান্তবর্তী অঞ্চল সম্পূর্ণ জনশূন্য ছিল না। সেখানে গ্রাম, কৃষিজমি এবং সাধারণ মানুষের বসতি ছিল। বিস্তৃত এলাকায় ভারী বোমাবর্ষণের কারণে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে, বাড়িঘর ও কৃষিজমি ধ্বংস হয় এবং বহু মানুষ নিরাপদ এলাকার সন্ধানে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। সুনির্দিষ্ট বেসামরিক মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, কারণ যুদ্ধকালীন তথ্য অসম্পূর্ণ এবং পরবর্তী সময়ের বৃহত্তর বোমাবর্ষণের সঙ্গে ১৯৬৯–১৯৭০ সালের গোপন অভিযানের ক্ষয়ক্ষতি আলাদা করা সবসময় সহজ নয়।
এই সময় কম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। যুবরাজ সিহানুকের নিরপেক্ষতার নীতি দেশের সব রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। ডানপন্থী ও সামরিক গোষ্ঠীগুলো উত্তর ভিয়েতনামী বাহিনীর উপস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ছিল, অন্যদিকে কমিউনিস্ট বিদ্রোহীরাও সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় হচ্ছিল। কম্বোডিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি অংশ পরবর্তীকালে খেমার রুজ নামে কুখ্যাত হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালের মার্চে সিহানুক বিদেশে অবস্থান করার সময় কম্বোডিয়ার জাতীয় পরিষদ তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় এবং প্রধানমন্ত্রী লন নল নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। লন নল উত্তর ভিয়েতনামী ও ভিয়েত কং বাহিনীকে কম্বোডিয়ার ভূখণ্ড ছেড়ে যাওয়ার দাবি জানান। এর ফলে এতদিন আংশিকভাবে গোপন ও সীমান্তকেন্দ্রিক থাকা সংঘাত দ্রুত কম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে রূপ নিতে শুরু করে।
পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর নিক্সন প্রশাসন আরও সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৭০ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে মার্কিন ও দক্ষিণ ভিয়েতনামী বাহিনী কম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থল অভিযান শুরু করে। উদ্দেশ্য ছিল উত্তর ভিয়েতনামী ও ভিয়েত কংয়ের ঘাঁটি, অস্ত্রভান্ডার এবং সরবরাহকেন্দ্র ধ্বংস করা। এই অভিযান আর আগের মতো সম্পূর্ণ গোপন রাখা সম্ভব ছিল না। নিক্সন জাতির উদ্দেশে ভাষণে অভিযানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন এবং দাবি করেন, দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিরাপদ করতে শত্রুর সীমান্তবর্তী ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা প্রয়োজন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এর প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ফোরক। বহু আমেরিকান মনে করেছিলেন, যে প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি বরং সেটিকে আরেকটি দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে এবং নিক্সন প্রশাসনের ওপর অবিশ্বাস বাড়তে থাকে।
এই উত্তেজনার সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৭০ সালের ৪ মে ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কেন্ট স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। কম্বোডিয়া অভিযানের প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভের সময় ওহাইও ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের দিকে গুলি চালালে চারজন নিহত এবং নয়জন আহত হন। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের জনমনে গভীর আঘাত সৃষ্টি করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ আর শুধু দূরবর্তী এশীয় যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনা ছিল না; তার রাজনৈতিক সহিংসতা যেন সরাসরি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেও এসে পৌঁছেছিল।
কম্বোডিয়ার ক্ষেত্রেও যুদ্ধের সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার অংশ হয়ে ওঠে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রয়োজন। মার্কিন বোমাবর্ষণই এককভাবে খেমার রুজের উত্থান ঘটিয়েছিল—এমন সরল ব্যাখ্যা ইতিহাসের জটিলতাকে আড়াল করে। খেমার রুজের শক্তিবৃদ্ধির পেছনে কম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ শ্রেণি ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, লন নল সরকারের দুর্বলতা, সিহানুকের ক্ষমতাচ্যুতি, উত্তর ভিয়েতনামের ভূমিকা, চীনের সহায়তা, গৃহযুদ্ধ এবং গ্রামীণ অসন্তোষসহ একাধিক কারণ কাজ করেছিল। তবে ব্যাপক যুদ্ধ, স্থানচ্যুতি এবং গ্রামীণ সমাজের বিপর্যয় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যা চরমপন্থী শক্তিগুলোর জন্য নতুন সদস্য সংগ্রহ ও সরকারবিরোধী ক্ষোভ কাজে লাগানো সহজ করে দেয়।
১৯৬৯–১৯৭০ সালের গোপন অভিযানকে পরবর্তী মার্কিন বোমাবর্ষণের পুরো ইতিহাসের সঙ্গে এক করে দেখাও সঠিক নয়। অপারেশন মেনু ছিল একটি নির্দিষ্ট পর্যায়। পরবর্তী বছরগুলোতে কম্বোডিয়ায় মার্কিন বিমান অভিযান আরও বিস্তৃত হয় এবং ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বোমাবর্ষণ চলতে থাকে। ফলে কম্বোডিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মোট বোমাবর্ষণের বিপুল পরিসংখ্যানকে শুধু নিক্সনের ১৯৬৯ সালের গোপন অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করলে ঘটনাটির কালানুক্রমিক বাস্তবতা বিকৃত হয়।
অপারেশন মেনুর গোপনীয়তা পরে নিক্সন প্রশাসনের বৃহত্তর বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। প্রশাসনের ভেতর থেকে গোপন তথ্য সংবাদমাধ্যমে পৌঁছাচ্ছে—এই আশঙ্কা নিক্সন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে প্রবল সন্দেহ তৈরি করেছিল। কম্বোডিয়ার বোমাবর্ষণসংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের তদন্তে সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগ অনুসন্ধানের জন্য গোপন নজরদারির আশ্রয় নেওয়া হয়। এই ধরনের আচরণ পরবর্তী সময়ে নিক্সন প্রশাসনের গোপনীয়তা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহারের বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
কম্বোডিয়া যুদ্ধের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তোলে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কম্বোডিয়া এবং নির্বাহী বিভাগের গোপন সামরিক সিদ্ধান্তের অভিজ্ঞতার পর কংগ্রেস প্রেসিডেন্টের একক সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা জোরদার করে। এরই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিণতির মধ্যে ১৯৭৩ সালের যুদ্ধক্ষমতা প্রস্তাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যার উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ভূমিকা আরও স্পষ্ট করা।
নিক্সনের কম্বোডিয়া নীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য ছিল তাঁর ঘোষিত লক্ষ্য ও ব্যবহৃত পদ্ধতির মধ্যে। তিনি ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই প্রত্যাহারকে সফল করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের ভৌগোলিক সীমা সম্প্রসারণ করেছিলেন। তাঁর প্রশাসনের যুক্তিতে এটি ছিল যুদ্ধ শেষ করার কৌশলের অংশ; সমালোচকদের চোখে এটি ছিল যুদ্ধ শেষ করার নামে আরেকটি রাষ্ট্রকে সংঘাতে টেনে আনা।
সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ফলাফল দ্ব্যর্থহীন ছিল না। কম্বোডিয়ার ঘাঁটিগুলোতে আঘাত উত্তর ভিয়েতনামী ও ভিয়েত কং বাহিনীর কিছু সম্পদ ধ্বংস করেছিল এবং তাদের কার্যক্রমে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল। কিন্তু এসব আক্রমণ উত্তর ভিয়েতনামের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ইচ্ছা ভেঙে দিতে পারেনি। বরং যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তার ইন্দোচীন অঞ্চলের সংঘাতকে আরও আন্তঃসংযুক্ত করে তোলে।
কম্বোডিয়ার জন্য পরবর্তী বছরগুলো ছিল আরও ভয়াবহ। লন নল সরকারের বাহিনী, উত্তর ভিয়েতনামী বাহিনী এবং ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা খেমার রুজের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালে খেমার রুজ রাজধানী নমপেন দখল করে। পল পটের নেতৃত্বাধীন নতুন শাসনব্যবস্থা এরপর গণহত্যা, অনাহার, জোরপূর্বক শ্রম, নির্যাতন ও মৃত্যুর এক ভয়াবহ অধ্যায় সৃষ্টি করে। এই বিপর্যয়ের কারণকে কোনো একটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, কিন্তু ১৯৬৯–১৯৭০ সালের যুদ্ধ সম্প্রসারণ সেই বৃহত্তর অস্থিতিশীলতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নিক্সনের কম্বোডিয়া বোমাবর্ষণ তাই শুধু ভিয়েতনাম যুদ্ধের একটি সামরিক অধ্যায় নয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্রক্ষমতা, গোপন যুদ্ধ, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং সামরিক কৌশলের অনিচ্ছাকৃত পরিণতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ। একটি সরকার যখন মনে করে যে সীমান্তের ওপারে থাকা শত্রুকে আঘাত না করলে চলমান যুদ্ধ জেতা বা সেখান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়, তখন সামরিক যুক্তি খুব দ্রুত রাজনৈতিক ও আইনগত সীমার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।
১৯৬৯ সালের মার্চে শুরু হওয়া গোপন বোমাবর্ষণ থেকে ১৯৭০ সালের প্রকাশ্য কম্বোডিয়া অভিযান পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছিল, যুদ্ধের সীমা মানচিত্রের একটি রেখা দিয়ে সবসময় আটকে রাখা যায় না। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছিল যে গোপন সামরিক সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন গোপন থাকলেও তার রাজনৈতিক পরিণতি গোপন থাকে না। কম্বোডিয়ার আকাশে নিক্ষিপ্ত বোমাগুলো শুধু জঙ্গল ও সামরিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরিত হয়নি; সেগুলোর প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছিল ওয়াশিংটনের ক্ষমতার কেন্দ্রে, মার্কিন কংগ্রেসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদে এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা নিয়ে জাতীয় বিতর্কে।
এই কারণেই নিক্সনের ১৯৬৯–১৯৭০ সালের কম্বোডিয়া অভিযান ভিয়েতনাম যুদ্ধের ইতিহাসে এক গভীর বিতর্কিত মোড়। যুদ্ধ শেষ করার কৌশলের অংশ হিসেবে শুরু করা পদক্ষেপটি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি বাড়িয়েছিল, কম্বোডিয়ার অস্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এবং মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশের কাছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও দুর্বল করেছিল। ইতিহাসে এর স্থায়ী শিক্ষা সম্ভবত এখানেই—গোপন সামরিক শক্তি তাৎক্ষণিক কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক, মানবিক ও সাংবিধানিক মূল্য অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রের হিসাবের চেয়েও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
বার্লিন প্রাচীরের পতন ১৯৮৯: পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির পুনর্মিলনের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
ব্রেক্সিট গণভোট ২০১৬: ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রশ্নে বিভক্ত যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত
ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি: যে রাজনৈতিক সংকটে পদত্যাগ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন
পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব ঘর: যেখানে নিজের হৃদস্পন্দনও অসহ্য জোরে শোনা যায়
সাহারা মরুভূমি একসময় সবুজ ছিল: কীভাবে বিশাল তৃণভূমি পরিণত হলো মরুভূমিতে?
ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও গোয়ালিয়রে কিংবদন্তির শেষ লড়াই