বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ডেথ ভ্যালি এত উষ্ণ কেন? মৃত্যু উপত্যকার প্রচণ্ড তাপের ভৌগোলিক ব্যাখ্যা

ডেথ ভ্যালি এত উষ্ণ কেন? মৃত্যু উপত্যকার প্রচণ্ড তাপের ভৌগোলিক ব্যাখ্যা
পাহাড়ঘেরা গভীর উপত্যকায় তাপের বিস্ময়

গ্রীষ্মের দুপুরে ডেথ ভ্যালির উপত্যকার তলায় দাঁড়ালে তাপ শুধু সূর্য থেকে আসছে বলে মনে হয় না; চারপাশের বাতাস, পাথর এবং মাটিও যেন উষ্ণতা ছড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও নেভাডাজুড়ে বিস্তৃত ডেথ ভ্যালি জাতীয় উদ্যানের এই অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত উষ্ণ স্থানগুলোর একটি। এখানে তাপমাত্রার রেকর্ড আকর্ষণীয়, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, একই অক্ষাংশের অন্য অনেক স্থানের তুলনায় এই উপত্যকা এত বেশি গরম হয় কেন। উত্তরটি একটি কারণের মধ্যে নেই; ভূমির গভীরতা, পাহাড়ের অবস্থান, শুষ্কতা এবং গ্রীষ্মের প্রবল রোদ একসঙ্গে কাজ করে।

ডেথ ভ্যালি একটি দীর্ঘ, সংকীর্ণ অববাহিকা। এর তলদেশের ব্যাডওয়াটার অববাহিকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছিয়াশি মিটার নিচে, যা উত্তর আমেরিকার সর্বনিম্ন স্থলভাগ। অথচ কাছেই মাথা তুলেছে অনেক উঁচু পর্বত। এত অল্প দূরত্বে গভীর নিম্নভূমি ও সুউচ্চ পাহাড়ের এই বৈপরীত্য অঞ্চলটির আবহাওয়া বোঝার চাবিকাঠি। উপত্যকার তলদেশ গ্রীষ্মে উত্তপ্ত হয়, আর চারপাশের খাড়া পর্বত বাতাসের চলাচল ও বৃষ্টির সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে নিচে থাকা মানেই যে কোনো স্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর উষ্ণতম হবে, তা নয়। উচ্চতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নিচের দিকে নামতে থাকা বায়ু সাধারণত বেশি চাপের মধ্যে পড়ে উষ্ণ হতে পারে। কিন্তু ডেথ ভ্যালির তাপ ব্যাখ্যা করতে শুধু এই ছিয়াশি মিটার গভীরতা যথেষ্ট নয়। গ্রীষ্মের সূর্য, দীর্ঘদিনের শুষ্কতা, উপত্যকার আকৃতি এবং পাহাড় পেরিয়ে আসা বাতাসের অবস্থা মিলিয়েই চরম তাপ তৈরি হয়। গভীর অববাহিকা এখানে বৃহত্তর ভৌগোলিক ব্যবস্থার একটি অংশ।

প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস ডেথ ভ্যালিতে পৌঁছানোর আগে একাধিক পর্বতশ্রেণির মুখোমুখি হয়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠলে বাতাস ঠান্ডা হতে পারে এবং তার জলীয় বাষ্পের একটি অংশ বৃষ্টি বা তুষার হয়ে ঝরে পড়ে। পাহাড় পেরিয়ে অন্য পাশে নামার সময় বাতাস তুলনামূলক শুষ্ক থাকে। ডেথ ভ্যালি এমন একাধিক বৃষ্টিচ্ছায়ার প্রভাব পায়। ফলে উপত্যকায় আর্দ্র বাতাস সহজে পৌঁছায় না, এবং এখানে বৃষ্টিপাত অত্যন্ত কম।

অল্প বৃষ্টি কেন তাপ বাড়াতে সাহায্য করে, তা ভেজা মাটি ও শুকনো মাটির পার্থক্য থেকে বোঝা যায়। ভেজা ভূমিতে সূর্যের শক্তির একটি অংশ জল বাষ্পীভূত করতে ব্যয় হয়। উদ্ভিদ থাকলে তারাও মাটি থেকে জল নিয়ে পাতার মাধ্যমে বাতাসে ছাড়ে। ডেথ ভ্যালির উপত্যকাতলে জল ও উদ্ভিদ দুটোই সীমিত। ফলে গ্রীষ্মের রোদে ভূমির উপরিভাগ দ্রুত গরম হয়। সেই উত্তপ্ত ভূমি তার সংস্পর্শের বাতাসকেও গরম করে। বৃষ্টি কম হওয়া তাই শুধু পানির অভাব নয়; এটি তাপ ছড়ানোর ধরনও বদলে দেয়।

শুষ্ক আকাশে মেঘ কম থাকলে দিনের বেলায় প্রবল সূর্যালোক সরাসরি ভূমিতে পৌঁছাতে পারে। ডেথ ভ্যালির গ্রীষ্ম দীর্ঘ এবং রোদ তীব্র। পাথুরে ঢাল, গাঢ় রঙের ভূমি ও খোলা উপত্যকাতল সূর্যের শক্তি গ্রহণ করে উষ্ণ হয়। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: ব্যাডওয়াটারের সাদা লবণভূমি অনেক আলো প্রতিফলিত করলেও গোটা ডেথ ভ্যালি সাদা লবণে ঢাকা নয়। বিভিন্ন রঙের শিলা, পলি, নুড়ি এবং বালুময় ভূমিও রয়েছে। তাই শুধু লবণভূমির রং দেখে সমগ্র উপত্যকার তাপের হিসাব করা যায় না।

উপত্যকার আকৃতি দিনের তাপকে আরও তীব্র অনুভব করায়। দীর্ঘ ও গভীর তলদেশের চারপাশে উঁচু পাহাড় রয়েছে। মাটি ও পাথর সূর্যে উত্তপ্ত হওয়ার পর আশপাশের বাতাসে তাপ ছাড়ে। পাহাড়ের ঢালও উত্তপ্ত হয়। উপত্যকার ভেতরে গরম বাতাস জমে থাকতে পারে, বিশেষ করে যখন আবহাওয়ার বৃহৎ পরিসরের অবস্থা বাতাসের কার্যকর মিশ্রণকে সীমিত করে। তবে পাহাড় একটি ঢাকনাযুক্ত পাত্রের মতো তাপকে পুরোপুরি বন্দী করে রাখে—এমন ব্যাখ্যা ঠিক নয়। বাতাস চলাচল করে; ভৌগোলিক অবস্থার সঙ্গে দিনের আবহাওয়াও তাপের মাত্রা নির্ধারণ করে।

পাহাড় থেকে নিচে নামা বাতাস কখনো তাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। বায়ু নিচু অঞ্চলে নামলে তার ওপর চাপ বাড়ে এবং সংকোচনের ফলে তা উষ্ণ হতে পারে। আগেই পাহাড়ের অন্য পাশে জলীয় বাষ্প হারানো বাতাস উপত্যকায় নেমে এলে শুষ্ক ও উষ্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়। অবশ্য প্রতিদিন একই দিকের বাতাস আসে না, আর ডেথ ভ্যালির প্রতিটি উত্তপ্ত দিনের কারণও অভিন্ন নয়। ভূমির স্থায়ী বৈশিষ্ট্য চরম তাপের পটভূমি তৈরি করে; নির্দিষ্ট দিনের বাতাস ও আবহাওয়া তার ওপর প্রভাব ফেলে।

ফার্নেস ক্রিক ডেথ ভ্যালির তাপমাত্রা পরিমাপের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। সেখানে ১৯১৩ সালের ১০ জুলাই বাতাসের তাপমাত্রা ৫৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস নথিবদ্ধ হয়, যা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার স্বীকৃত সর্বোচ্চ বায়ুতাপমাত্রার রেকর্ড। ঐতিহাসিক এই পরিমাপ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে পদ্ধতিগত আলোচনা থাকলেও এটি এখনও আনুষ্ঠানিক রেকর্ড হিসেবে তালিকাভুক্ত। এত বড় সংখ্যা দেখার সময় মনে রাখতে হবে, এটি নির্দিষ্ট স্থান ও নির্দিষ্ট দিনের পরিমাপ; গোটা জাতীয় উদ্যানের প্রতিটি অংশে একই সময়ে একই তাপমাত্রা ছিল, এমন নয়।

বায়ুর তাপমাত্রা ও মাটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রাও এক জিনিস নয়। আবহাওয়ার স্বীকৃত বায়ুতাপমাত্রা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে, সরাসরি সূর্যালোক থেকে সুরক্ষিত অবস্থায় মাপা হয়। অন্যদিকে রোদে পড়ে থাকা শিলা, নুড়ি বা রাস্তার উপরিভাগ বাতাসের চেয়েও অনেক বেশি গরম হতে পারে। পর্যটনকেন্দ্রের সামনে রোদে রাখা কোনো তাপমাত্রা প্রদর্শনী, গাড়ির যন্ত্রের পাঠ কিংবা খালি পায়ে অনুভূত মাটির তাপকে তাই আনুষ্ঠানিক বায়ুতাপমাত্রার রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা উচিত নয়। এই পার্থক্য বোঝা ডেথ ভ্যালির প্রচণ্ড গরমকে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে।

অনেকে ভাবেন, মরুভূমিতে রাত নামলেই সব সময় আরামদায়ক ঠান্ডা পড়ে। ডেথ ভ্যালির গ্রীষ্মে তা প্রায়ই ঘটে না। সারাদিন উত্তপ্ত থাকা ভূমি ও চারপাশের বাতাস রাতে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। বড় তাপপ্রবাহের সময় ভোরের কাছাকাছি সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও অস্বস্তিকর রকম উঁচু থাকতে পারে। ফলে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণী দিনের উত্তাপের পর রাতে যথেষ্ট স্বস্তি পায় না। একটি দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পাশাপাশি টানা কয়েক দিন ও রাত কতটা গরম থাকছে, সেটিও এই অঞ্চলের কঠিন আবহাওয়া বোঝার জন্য জরুরি।

ডেথ ভ্যালির পরিচিত ভূদৃশ্যের মধ্যে ব্যাডওয়াটার অববাহিকার লবণভূমি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এটি এক বদ্ধ নিম্নভূমি, যেখানে জল এলে সহজে সমুদ্রের দিকে বেরিয়ে যায় না। অতীতের আর্দ্র সময়ে এখানে বড় হ্রদ ছিল। জল শুকিয়ে যাওয়ার পর দ্রবীভূত লবণ ও খনিজ অবশিষ্ট থেকে লবণের আবরণ তৈরি হয়েছে। আজও বিরল ভারী বৃষ্টির পর অস্থায়ী জল জমতে পারে। অর্থাৎ ‘মৃত্যু উপত্যকা’ নাম থাকলেও ভূদৃশ্যটি চিরকাল একই রকম শুকনো ছিল না, এবং বর্তমানেও বৃষ্টি একেবারে অসম্ভব নয়।

বৃষ্টিপাত কম হলেও আকস্মিক বর্ষণ এখানে বিপজ্জনক হতে পারে। খাড়া পাহাড়ের ঢাল থেকে জল দ্রুত নিচে নামে। শুকনো খাত ও সরু গিরিখাতে সেই জল অল্প সময়ে প্রবল স্রোত তৈরি করতে পারে। দূরের পাহাড়ে বৃষ্টি হলে উপত্যকার কোনো অংশে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও নিচে হঠাৎ বন্যার জল পৌঁছাতে পারে। এই ঘটনা ডেথ ভ্যালির আবহাওয়ার একটি আপাতবিরোধী দিক দেখায়: অঞ্চলটি অত্যন্ত শুষ্ক, তবু আকস্মিক বন্যা তার বাস্তব ঝুঁকির অংশ। দীর্ঘ খরা ও স্বল্পস্থায়ী প্রচণ্ড বৃষ্টি একই মরুভূমির ইতিহাসে স্থান পায়।

ডেথ ভ্যালি কতটা উষ্ণ, তা বুঝতে পুরো জাতীয় উদ্যানকে একটি একরকম অঞ্চল ভাবলে ভুল হবে। নিচের ফার্নেস ক্রিক বা ব্যাডওয়াটার অববাহিকায় যে তাপ অনুভূত হয়, উঁচু পাহাড়ে তা অনেক কম হতে পারে। উচ্চতা বাড়লে সাধারণত বায়ু ঠান্ডা হয়; ফলে কাছাকাছি দূরত্বে ভিন্ন জলবায়ুর অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। জাতীয় উদ্যানের পাহাড়, গিরিখাত, বালিয়াড়ি ও লবণভূমি আলাদা স্থানীয় পরিবেশ তৈরি করেছে। ‘ডেথ ভ্যালির তাপমাত্রা’ বলার আগে তাই কোথায় পরিমাপ করা হয়েছে, তা জানা জরুরি।

নামের কারণে স্থানটিকে সম্পূর্ণ প্রাণহীন মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এখানে জীবন আছে। কিছু উদ্ভিদ দীর্ঘ শুকনো সময় পার করে অল্প বৃষ্টির সুযোগে দ্রুত ফুল ফোটায়। অন্য উদ্ভিদের শিকড়, পাতা বা বৃদ্ধি পাওয়ার সময় মরু পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। জলাধার ও ঝরনাসংলগ্ন ছোট আবাসস্থল কিছু বিশেষ মাছ ও অন্য প্রাণীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণীরা দিনের সবচেয়ে গরম সময় এড়িয়ে ছায়ায় থাকে বা রাতে সক্রিয় হয়। ডেথ ভ্যালির জীববৈচিত্র্য দেখায়, প্রচণ্ড তাপ একটি কঠিন সীমা তৈরি করলেও বিভিন্ন প্রাণী সেই সীমার মধ্যে টিকে থাকার পথ খুঁজেছে।

মানুষের জন্য এই তাপের প্রভাব আলাদা গুরুত্ব পায়। গরম ও শুষ্ক বাতাসে ঘাম দ্রুত বাষ্পীভূত হয়; ফলে শরীর থেকে কতটা জল বেরিয়ে যাচ্ছে, তা সব সময় বোঝা যায় না। রোদের মধ্যে হাঁটা, গাড়ি বিকল হওয়া কিংবা জনবসতি থেকে দূরের পথে আটকে পড়া দ্রুত গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাপমাত্রা বাড়লে শুধু বেশি জল পান করলেই সব ঝুঁকি শেষ হয় না; শরীরের বিশ্রাম, ছায়া এবং গরমের সময় বাইরে থাকার মেয়াদও গুরুত্বপূর্ণ। ডেথ ভ্যালির ভূগোলের সঙ্গে সেখানে চলাফেরার বাস্তব শর্ত সরাসরি যুক্ত।

ডেথ ভ্যালির প্রচণ্ড উষ্ণতা তাই কোনো একক ‘গরম পাথর’ বা রহস্যময় তাপের উৎসের ফল নয়। একাধিক পাহাড়ের বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলটিকে শুষ্ক রাখে; নিচু, দীর্ঘ অববাহিকা ও চারপাশের ঢাল তার স্থানীয় আবহাওয়া গড়ে; প্রবল গ্রীষ্মের রোদ জলশূন্য ভূমিকে উত্তপ্ত করে; আর নির্দিষ্ট আবহাওয়ার অবস্থায় তাপ আরও বেড়ে যায়। এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করায় ফার্নেস ক্রিকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্বীকৃত বায়ুতাপমাত্রা নথিবদ্ধ হয়েছে। মৃত্যু উপত্যকার রেকর্ড বিস্ময়কর, কিন্তু সেই রেকর্ডের পেছনের ভূগোলই স্থানটিকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ দেয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে