১১ সেপ্টেম্বরের হামলা: ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কী ঘটেছিল এবং বিশ্ব কীভাবে বদলে গেল?
১১ সেপ্টেম্বরের হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের ইতিহাস বদলে দেয়।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সকালে যুক্তরাষ্ট্রে চারটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই হয়। তার দুটিকে নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের দুই উঁচু ভবনে, একটিকে রাজধানী ওয়াশিংটনের কাছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সদর দপ্তর পেন্টাগনে আঘাত করা হয়। চতুর্থ উড়োজাহাজটি পেনসিলভানিয়ায় বিধ্বস্ত হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রাণ হারান ২ হাজার ৯৭৭ জন মানুষ, হামলাকারীদের বাদ দিয়ে।
ঘটনাটি সাধারণত ‘নাইন ইলেভেন’ নামে পরিচিত। কিন্তু নামের সংক্ষিপ্ততার আড়ালে রয়েছে চারটি আলাদা উড়োজাহাজের যাত্রী, অফিসে কর্মরত মানুষ, উদ্ধারকর্মী এবং তাঁদের পরিবারের অভিজ্ঞতা। হামলার ঘটনাক্রম বোঝার পাশাপাশি কারা এটি ঘটিয়েছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হয়েছিল এবং পরে কী বদলেছিল—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
চারটি উড়োজাহাজ কীভাবে হামলার অংশ হলো?
হামলাটি পরিচালনা করেছিল আল-কায়েদা নামের সশস্ত্র উগ্রপন্থী সংগঠন। সংগঠনটির নেতা ছিলেন ওসামা বিন লাদেন। মোট ১৯ জন হামলাকারী যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চারটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করে সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। উড়োজাহাজগুলো দীর্ঘ পথের যাত্রার জন্য প্রস্তুত ছিল এবং তাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি ছিল।
হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতীকগুলোকে লক্ষ্য করা। নিউইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল আন্তর্জাতিক ব্যবসার প্রতীক; পেন্টাগন ছিল মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। চতুর্থ উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে তদন্তে সম্ভাব্য সরকারি স্থাপনার কথা উঠে এসেছে, তবে সেটি লক্ষ্যে পৌঁছায়নি।
পরিকল্পনাটি এক দিনে তৈরি হয়নি। হামলাকারীদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে থেকে উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। বিভিন্ন সংস্থার কাছে কিছু বিচ্ছিন্ন সতর্কতামূলক তথ্য থাকলেও সেগুলো মিলিয়ে নির্দিষ্ট হামলাটি ঠেকানোর মতো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ১১ সেপ্টেম্বরের পর তদন্তে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা এবং ছিনতাই মোকাবিলার প্রস্তুতিতে গুরুতর দুর্বলতা চিহ্নিত হয়।
নিউইয়র্কে সেদিন সকাল থেকে কী ঘটেছিল?
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে ছিনতাই করা আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের উত্তর ভবনে আঘাত করে। প্রথম মুহূর্তে অনেকেই এটিকে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ভেবেছিলেন। ভবনের ওপরের অংশে আগুন ও ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। নিচের তলাগুলো থেকে বহু মানুষ সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করেন; অগ্নিনির্বাপক ও জরুরি সেবাকর্মীরা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন।
সকাল ৯টা ৩ মিনিটে দ্বিতীয় ছিনতাই করা উড়োজাহাজ দক্ষিণ ভবনে আঘাত করে। তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, ঘটনাটি দুর্ঘটনা নয়—সমন্বিত হামলা। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের কারণে বিশ্বের বহু মানুষ দ্বিতীয় আঘাত ও পরবর্তী ধ্বংস প্রত্যক্ষ করেন।
দক্ষিণ ভবনটি সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে এবং উত্তর ভবনটি সকাল ১০টা ২৮ মিনিটে ধসে পড়ে। উড়োজাহাজের আঘাতে কাঠামোর ক্ষতি এবং পরবর্তী বিস্তৃত আগুনে ভবনগুলোর ভারবহনক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ভবন ধসের সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের রাস্তায় ধুলা ও ধ্বংসাবশেষের ঘন মেঘ ছড়িয়ে পড়ে।
উত্তর ভবনে প্রথম আঘাতের পরে নিচের অংশের অনেক মানুষ বের হতে পেরেছিলেন। কিন্তু আঘাতপ্রাপ্ত তলার ওপরে থাকা মানুষদের জন্য পালানোর পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দক্ষিণ ভবনেও দ্বিতীয় আঘাতের আগে ও পরে কেউ কেউ বের হন, আবার অনেকে আটকা পড়েন। এই সময়ে ভবনের ভেতরে উদ্ধারকাজে থাকা বহু অগ্নিনির্বাপক, পুলিশ ও অন্য জরুরি সেবাকর্মী প্রাণ হারান।
পেন্টাগন ও পেনসিলভানিয়ায় কী ঘটেছিল?
নিউইয়র্কে হামলার মধ্যেই সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে তৃতীয় ছিনতাই করা উড়োজাহাজ পেন্টাগনে আঘাত করে। ভবনের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং উড়োজাহাজের যাত্রী ও কর্মীদের পাশাপাশি ভবনের ভেতরে থাকা মানুষ মারা যান। ফলে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কেন্দ্রের পাশাপাশি সামরিক সদর দপ্তরও হামলার শিকার হয়।
চতুর্থ উড়োজাহাজটির যাত্রীরা যোগাযোগের মাধ্যমে অন্য হামলার খবর জানতে পারেন। তাঁরা ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। সকাল ১০টা ৩ মিনিটে উড়োজাহাজটি পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে একটি খোলা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। উড়োজাহাজে থাকা যাত্রী ও কর্মীদের কেউ বেঁচে ছিলেন না। তবে সেটি কোনো জনবহুল ভবনে আঘাত করেনি।
চারটি ঘটনাকে একটি হামলা হিসেবে মনে রাখা হলেও প্রতিটি স্থানে জরুরি পরিস্থিতি আলাদা ছিল। নিউইয়র্কে উঁচু ভবন থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়া ও ধসের ধ্বংসস্তূপে অনুসন্ধান ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। পেন্টাগনে অগ্নিনির্বাপণ ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশে উদ্ধারকাজ চলেছিল। পেনসিলভানিয়ায় তদন্তকারীরা বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের ঘটনা ও যাত্রীদের প্রতিরোধের তথ্য সংগ্রহ করেন।
প্রাণহানির বাইরেও মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
হামলায় নিহত ২ হাজার ৯৭৭ জনের মধ্যে ছিলেন উড়োজাহাজের যাত্রী ও কর্মী, ভবনের কর্মী, দর্শনার্থী এবং উদ্ধারকর্মী। তাঁরা বহু দেশ থেকে এসেছিলেন। একই দিনে হাজার হাজার পরিবার প্রিয়জন হারায়; অনেকের কাছে শেষ ফোনালাপ বা উদ্ধার হওয়া সামান্য জিনিসই স্মৃতি হয়ে থাকে।
নিউইয়র্কে ভবন ধসের পরে উদ্ধার ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ দীর্ঘদিন চলেছিল। ধুলা, ধোঁয়া ও ক্ষতিকর পদার্থের সংস্পর্শে আসা উদ্ধারকর্মী এবং আশপাশে থাকা বহু মানুষের শ্বাসতন্ত্রের অসুখ, মানসিক আঘাত ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা নিয়ে পরে গবেষণা ও চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। তাই ১১ সেপ্টেম্বরের মানবিক ক্ষতি শুধু সেদিনের মৃত্যুর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।
মুসলিম পরিচয়ের মানুষ এবং দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত অনেক ব্যক্তিও হামলার পর সন্দেহ, হয়রানি ও বৈষম্যের মুখে পড়েন। হামলাকারীদের অপরাধকে কোনো ধর্ম বা জনগোষ্ঠীর সব সদস্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নিরপরাধ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। এই দিকটিও ঘটনার সামাজিক উত্তরাধিকারের অংশ।
হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব কীভাবে বদলায়?
যুক্তরাষ্ট্র বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরীক্ষা, যাত্রী শনাক্তকরণ এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে বদলে দেয়। পরে নতুন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও আইনগত ক্ষমতা তৈরি হয়। এসব পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নজরদারি এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমা নিয়ে বিতর্কও সৃষ্টি করে।
হামলার পর আল-কায়েদাকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে। পরবর্তী বছরগুলোতে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নামে পরিচিত নীতি বিভিন্ন দেশে সামরিক সংঘাত ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। ১১ সেপ্টেম্বরকে এই দীর্ঘ ইতিহাসের সূচনা হিসেবে দেখা যায়, কিন্তু পরবর্তী প্রতিটি যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণ আলাদাভাবে বিচার করা প্রয়োজন।
নিউইয়র্কের হামলাস্থলে আজ নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর রয়েছে। সেখানে মানুষের নাম সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্য কেবল একটি জাতীয় বিপর্যয়কে চিহ্নিত করা নয়; সংখ্যার আড়ালে থাকা পৃথক জীবনগুলোকে মনে রাখা। ১১ সেপ্টেম্বরের ইতিহাস তাই একই সঙ্গে সন্ত্রাসী হামলা, উদ্ধারকাজ, দীর্ঘস্থায়ী শোক এবং নিরাপত্তার নামে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর পরিণতির ইতিহাস।
ভারতের ২০১৬ সালের নোটবন্দি: মোদির আকস্মিক সিদ্ধান্তে অর্থনীতিতে কী ঘটেছিল?
চিলির ১৯৭৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থান: আলেন্দের পতন ও পিনোচেটের স্বৈরশাসন
জন এফ. কেনেডি হত্যাকাণ্ড: ১৯৬৩ সালের ডালাসের ঘটনা ও শোকে স্তব্ধ আমেরিকা
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ: ২০১১ সালের গণবিক্ষোভ থেকে বর্তমান মানবিক সংকট
চীনের গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড: ১৯৫৮ সালে মাও সে তুংয়ের পরিকল্পনা কীভাবে মহাদুর্ভিক্ষ ডেকে আনে
হিমালয়: পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা এখনো প্রতি বছর উঁচু হচ্ছে কেন?