বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

হাত্তিনের যুদ্ধ ১১৮৭: সালাহউদ্দিন কীভাবে ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন?

Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 17, 2026
হাত্তিনের যুদ্ধ ১১৮৭: সালাহউদ্দিন কীভাবে ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন?
হাত্তিনের যুদ্ধ ১১৮৭

১১৮৭ সালের ৪ জুলাই গ্যালিলি সাগরের পশ্চিমে হাত্তিনের শুষ্ক পাহাড়ে এমন একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেয়। জেরুজালেম রাজ্যের রাজা, প্রধান অভিজাত, নাইটস টেম্পলার ও নাইটস হসপিটালারের যোদ্ধা এবং রাজ্যের অধিকাংশ কার্যকর সামরিক শক্তি একই যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়েছিল। তাদের বিপরীতে ছিলেন সালাহউদ্দিন আইয়ুবি, যিনি বহু বছরের রাজনৈতিক ঐক্য, সামরিক প্রস্তুতি এবং কৌশলগত ধৈর্যের পর এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন যেখানে ক্রুসেডার বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি—ভারী অশ্বারোহী নাইটদের আক্রমণ—প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে।

হাত্তিনের যুদ্ধ শুধু একটি সাধারণ সামরিক পরাজয় ছিল না; এটি ছিল জেরুজালেম রাজ্যের প্রধান সেনাবাহিনীর কার্যত ধ্বংস। এর পর ক্রুসেডারদের বহু দুর্গ ও শহর রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য আর অবশিষ্ট ছিল না। মাত্র তিন মাসের মধ্যে সালাহউদ্দিন জেরুজালেম পুনর্দখল করতে সক্ষম হন। কিন্তু এই বিপর্যয় হঠাৎ ঘটেনি। এর পেছনে ছিল কয়েক দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং যুদ্ধের ঠিক আগের কয়েক দিনে নেওয়া কিছু মারাত্মক সিদ্ধান্ত।

১১৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্রুসেডারদের চারপাশের রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রথম ক্রুসেডের যুগের তুলনায় সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। সালাহউদ্দিন মিশর, দামেস্ক এবং সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফলে তিনি মিশরের অর্থনৈতিক সম্পদ এবং সিরিয়ার সামরিক জনবলকে একই বৃহত্তর কৌশলের অধীনে ব্যবহার করতে পারছিলেন।

অন্যদিকে জেরুজালেম রাজ্যের ভেতরে নেতৃত্বের সংকট চলছিল। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত দক্ষ রাজা চতুর্থ বাল্ডউইনের মৃত্যুর পর অল্প সময়ের মধ্যে উত্তরাধিকার পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত গি অব লুসিনিয়ান জেরুজালেমের রাজা হন। কিন্তু তাঁর কর্তৃত্ব সবাই স্বীকার করছিল না। বিশেষ করে ত্রিপোলির কাউন্ট রেমন্ড তৃতীয়ের সঙ্গে রাজদরবারের সম্পর্ক ছিল উত্তেজনাপূর্ণ।

এই অভ্যন্তরীণ বিভক্তির সঙ্গে যুক্ত হয় রেনাল্ড অব শাতিয়োঁর কর্মকাণ্ড। ট্রান্সজর্ডানের কেরাক ও মন্ট্রিয়াল দুর্গকে কেন্দ্র করে তিনি মুসলিম বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার পথের ওপর একাধিক আক্রমণ চালিয়েছিলেন। সালাহউদ্দিনের সঙ্গে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও তাঁর একটি মুসলিম কাফেলার ওপর হামলা নতুন সংঘর্ষের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে ওঠে।

সালাহউদ্দিন রেনাল্ডের আচরণকে শুধু সীমান্তের ডাকাতি হিসেবে দেখেননি। এটি তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছিল। ১১৮৭ সালে তিনি ক্রুসেডার রাজ্যের বিরুদ্ধে বৃহৎ অভিযান সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নেন। মিশর, সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈন্য তাঁর বাহিনীতে যোগ দেয়।

সালাহউদ্দিনের সামনে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল ক্রুসেডার দুর্গগুলো নয়, বরং তাদের প্রধান সেনাবাহিনী। শক্তিশালী দুর্গ একে একে অবরোধ করা দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল হতে পারত। কিন্তু যদি জেরুজালেম রাজ্যের কেন্দ্রীয় সামরিক বাহিনীকে একটি সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধে ধ্বংস করা যায়, তাহলে দুর্গ ও শহরগুলো রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত যোদ্ধাই থাকবে না।

অতএব তাঁর কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল ক্রুসেডারদের এমন একটি স্থানে টেনে আনা, যেখানে তারা নিজেদের সুবিধাজনক প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।

এই সুযোগ আসে তিবেরিয়াস শহরকে কেন্দ্র করে।

১১৮৭ সালের জুলাইয়ের শুরুতে সালাহউদ্দিনের বাহিনী গ্যালিলি সাগরের পশ্চিম তীরে অবস্থিত তিবেরিয়াস আক্রমণ করে। শহরটির সঙ্গে ত্রিপোলির কাউন্ট রেমন্ডের পরিবার যুক্ত ছিল এবং তাঁর স্ত্রী এশিভা সেখানে দুর্গে অবস্থান করছিলেন। সালাহউদ্দিন দ্রুত শহরের বড় অংশ দখল করেন, যদিও দুর্গ প্রতিরোধ চালিয়ে যায়।

এই সংবাদ ক্রুসেডারদের প্রধান শিবির সেফোরিসে পৌঁছায়। সেখানে জেরুজালেম রাজ্যের বিশাল বাহিনী জড়ো হয়েছিল। স্থানটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক ছিল, কারণ সেখানে পর্যাপ্ত পানি ছিল এবং ক্রুসেডাররা শক্তিশালী প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ছিল।

এখন তাদের সামনে প্রশ্ন—তিবেরিয়াসকে বাঁচাতে এগিয়ে যাবে, নাকি সেফোরিসে অপেক্ষা করবে?

একটি যুদ্ধপরিষদ বসে। আশ্চর্যজনকভাবে রেমন্ড নিজেই তিবেরিয়াসের দিকে যাওয়ার বিরোধিতা করেন, যদিও তাঁর স্ত্রী সেখানে অবরুদ্ধ ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী। সালাহউদ্দিন সম্ভবত ঠিক এটাই চাইছেন—ক্রুসেডার বাহিনী যেন পানিসমৃদ্ধ সেফোরিস ছেড়ে গ্রীষ্মের তীব্র উত্তাপে খোলা প্রান্তরে বেরিয়ে আসে।

প্রাথমিকভাবে রাজা গি এই পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত বদলে যায়। টেম্পলারদের গ্র্যান্ড মাস্টার জেরার্ড দ্য রিদফোরসহ আক্রমণপন্থী নেতারা তিবেরিয়াসের দিকে অগ্রসর হওয়ার পক্ষে চাপ দেন। পশ্চাদপসরণ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থানকে কাপুরুষতা হিসেবে দেখা হতে পারে—এমন রাজনৈতিক চাপও ছিল।

শেষ পর্যন্ত রাজা গি তিবেরিয়াসের দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন।

এই সিদ্ধান্তই হাত্তিনের বিপর্যয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি।

৩ জুলাই সকালে ক্রুসেডার বাহিনী সেফোরিসের পানিসমৃদ্ধ অবস্থান ছেড়ে তিবেরিয়াসের দিকে যাত্রা শুরু করে। তাদের সামনে ছিল প্রায় ত্রিশ কিলোমিটারের কঠিন পথ। জুলাইয়ের প্রচণ্ড গরমে ভারী বর্ম পরিহিত সৈন্য এবং ঘোড়াদের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর।

সালাহউদ্দিনের বাহিনী সরাসরি তাদের সঙ্গে ভারী সংঘর্ষে যায়নি। পরিবর্তে দ্রুতগতির অশ্বারোহী তীরন্দাজেরা ক্রুসেডার কলামের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তারা দূর থেকে তীর নিক্ষেপ করে, আবার ক্রুসেডার নাইটরা এগিয়ে গেলে দ্রুত সরে যায়।

এই কৌশলের উদ্দেশ্য শুধু মানুষ হত্যা করা ছিল না। ক্রুসেডার বাহিনীর অগ্রযাত্রার গতি কমানো, ঘোড়াগুলোকে ক্লান্ত করা এবং তাদের যুদ্ধবিন্যাস ভেঙে দেওয়াই ছিল প্রধান লক্ষ্য।

ক্রুসেডাররা যত এগোচ্ছিল, পানির সমস্যা তত গুরুতর হচ্ছিল। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল গ্যালিলি সাগরের পানি, কিন্তু সালাহউদ্দিনের বাহিনী সেই পথের ওপর চাপ বজায় রাখে। দিনের শেষে তারা তিবেরিয়াস বা গ্যালিলি সাগরের তীরে পৌঁছাতে পারেনি।

তারা হাত্তিনের কাছে শিবির করতে বাধ্য হয়।

এটি ছিল ভয়াবহ অবস্থান। তৃষ্ণার্ত মানুষ ও ঘোড়া, দিনের পর দিন যুদ্ধের চাপ এবং চারপাশে শত্রু বাহিনী—ক্রুসেডারদের মনোবল দ্রুত ভেঙে পড়ছিল। বিপরীতে সালাহউদ্দিনের সৈন্যরা পানির উৎসের ওপর তুলনামূলক ভালো নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল।

রাতটি ক্রুসেডারদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। মুসলিম বাহিনী চারদিকে চাপ বজায় রাখে। পরদিন, ৪ জুলাই, তারা আবার গ্যালিলি সাগরের দিকে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।

সালাহউদ্দিনের বাহিনী তখন তাদের আরও ঘনভাবে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। অশ্বারোহী তীরন্দাজেরা বারবার আক্রমণ চালাচ্ছিল। ক্রুসেডার পদাতিকরা তীরের আঘাত থেকে নাইট ও ঘোড়াগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে যুদ্ধবিন্যাস ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

সমকালীন বিবরণে শুকনো ঘাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কথাও পাওয়া যায়। ধোঁয়া ও গরম বাতাস ক্রুসেডারদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। তবে যুদ্ধের ফল শুধু আগুনের কারণে নির্ধারিত হয়নি; আসল সমস্যা ছিল পানি থেকে বিচ্ছিন্নতা, ক্লান্তি এবং ক্রমাগত আক্রমণের মধ্যে তাদের সংগঠন ভেঙে পড়া।

ক্রুসেডার বাহিনীর একটি অংশ ত্রিপোলির রেমন্ডের নেতৃত্বে মুসলিম অবস্থান ভেদ করার চেষ্টা করে। সালাহউদ্দিনের সৈন্যরা তাদের সামনে পথ খুলে দিয়ে পরে আবার সারি বন্ধ করে দেয় বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। রেমন্ড ও তাঁর সঙ্গে থাকা কিছু যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন।

কিন্তু মূল বাহিনী আটকা পড়ে।

ক্রুসেডারদের পদাতিক বাহিনীর বড় অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে হাত্তিনের পাহাড়ের দিকে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। নাইটদের কার্যকর ভারী অশ্বারোহী আক্রমণের জন্য পদাতিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই সমন্বয় ভেঙে যাওয়ায় ক্রুসেডার যুদ্ধব্যবস্থার কেন্দ্রটাই দুর্বল হয়ে পড়ে।

রাজা গি এবং তাঁর অভিজাতরা হর্নস অব হাত্তিন নামে পরিচিত আগ্নেয় পাহাড়ের কাছে শেষ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। রাজকীয় তাঁবু স্থাপন করা হয়। তাদের সঙ্গে ছিল খ্রিস্টধর্মের অন্যতম পবিত্র নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত ট্রু ক্রস বা সত্য ক্রুশ, যা বড় যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনীর মনোবল বাড়াতে বহন করা হতো।

এখনও ক্রুসেডার নাইটরা কয়েকবার আক্রমণের চেষ্টা করে। ভারী অশ্বারোহী বাহিনী সঠিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত বিধ্বংসী হতে পারত। কিন্তু ক্লান্ত ঘোড়া, অসম ভূখণ্ড, তৃষ্ণা এবং চারদিক থেকে আসা তীরের মধ্যে তাদের আক্রমণ আর আগের শক্তি অর্জন করতে পারেনি।

সালাহউদ্দিন তাঁর বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রেখে চাপ বজায় রাখেন। তিনি জানতেন, সময় তাঁর পক্ষেই কাজ করছে। ক্রুসেডারদের পানি নেই; প্রতিটি ঘণ্টা তাদের আরও দুর্বল করছে। তাই অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজের বাহিনীকে একটি বিশাল ফ্রাঙ্কিশ অশ্বারোহী আক্রমণের সামনে ঠেলে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না।

অবশেষে ক্রুসেডারদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। রাজকীয় তাঁবু পতিত হয় এবং ট্রু ক্রস মুসলিম বাহিনীর হাতে চলে যায়। মধ্যযুগীয় খ্রিস্টানদের কাছে এর প্রতীকী আঘাত ছিল বিপুল। যে পবিত্র নিদর্শনকে তারা যুদ্ধে ঈশ্বরীয় সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে বহন করেছিল, সেটিই এখন শত্রুর হাতে।

রাজা গি অব লুসিনিয়ান, তাঁর ভাই আমালরিক, রেনাল্ড অব শাতিয়োঁ এবং বহু উচ্চপদস্থ অভিজাত বন্দি হন। নাইটস টেম্পলার ও নাইটস হসপিটালারেরও বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা নিহত বা বন্দি হয়।

বন্দিদের মধ্যে রেনাল্ডের ভাগ্য ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সালাহউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন বলে মুসলিম সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। বন্দি রাজা গি ও রেনাল্ডকে সালাহউদ্দিনের সামনে আনা হয়।

একটি বিখ্যাত বিবরণ অনুযায়ী সালাহউদ্দিন তৃষ্ণার্ত রাজা গিকে পানীয় দেন। মধ্যযুগীয় আতিথেয়তার রীতিতে এটি তাঁর নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। পানীয় রেনাল্ডের কাছেও পৌঁছালে সালাহউদ্দিন স্পষ্ট করেন যে তিনি নিজে রেনাল্ডকে আতিথেয়তা দেননি।

এরপর রেনাল্ডকে হত্যা করা হয়। ঘটনাটির বিস্তারিত বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা ভিন্ন হলেও সালাহউদ্দিন তাঁর মৃত্যুর নির্দেশ বা সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে রাজা গিকে জীবিত রাখা হয়।

টেম্পলার ও হসপিটালার বন্দিদের অনেকের পরিণতিও কঠোর ছিল। তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাধারণ বন্দিদের অনেককে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয় বা মুক্তিপণের জন্য রাখা হয়।

হাত্তিনে জেরুজালেম রাজ্যের সামরিক নেতৃত্বের প্রায় পুরো কাঠামো এক আঘাতে ভেঙে পড়েছিল।

এখানেই সালাহউদ্দিনের বিজয়ের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায়। তিনি শুধু একটি যুদ্ধ জেতেননি; তিনি ক্রুসেডারদের এমন বাহিনী ধ্বংস করেছিলেন, যার ওপর তাদের দুর্গ ও শহরগুলোর প্রতিরক্ষা নির্ভর করত।

হাত্তিনের আগে লেভান্তে ক্রুসেডারদের অসংখ্য শক্তিশালী দুর্গ ছিল। কিন্তু দুর্গের দেয়াল যত শক্তিশালীই হোক, সেগুলো রক্ষার জন্য সৈন্য প্রয়োজন। হাত্তিনে রাজ্যের প্রধান ফিল্ড আর্মি হারিয়ে যাওয়ার পর বহু শহরে পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষাকারী ছিল না।

সালাহউদ্দিন দ্রুত এই সুযোগ কাজে লাগান। তিনি দীর্ঘ সময় নষ্ট না করে একের পর এক ক্রুসেডার শহর ও দুর্গের দিকে অগ্রসর হন। একর, নাবলুস, জাফা, সিডন, বৈরুত এবং আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থান অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে বা আত্মসমর্পণ করে।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উপকূলীয় বন্দরগুলোর পতন। ইউরোপ থেকে নতুন ক্রুসেডার বাহিনী ও সরবরাহ আসার জন্য এগুলো অপরিহার্য ছিল। যত বেশি বন্দর সালাহউদ্দিনের হাতে যাচ্ছিল, ক্রুসেডারদের পুনর্গঠনের সুযোগ তত কমছিল।

তবে টাইর দখল করতে সালাহউদ্দিন ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে এই শহরই পশ্চিমা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং তৃতীয় ক্রুসেডের সময় বড় ভূমিকা রাখে।

হাত্তিনে সালাহউদ্দিনের সাফল্যকে অনেক সময় শুধু ক্রুসেডারদের তৃষ্ণার ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে বিষয়টি আরও গভীর। পানি ছিল তাঁর বৃহত্তর কৌশলের একটি অংশ। তিনি প্রথমে এমন লক্ষ্য আক্রমণ করেন, যা ক্রুসেডারদের সেফোরিসের নিরাপদ অবস্থান ছাড়তে বাধ্য করতে পারে। এরপর তাদের পানির উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন রাখেন, দ্রুত অশ্বারোহী বাহিনী দিয়ে অগ্রযাত্রা ধীর করেন এবং এমন ভূখণ্ডে আটকে দেন যেখানে ভারী ফ্রাঙ্কিশ নাইটদের সুবিধা কমে যায়।

অন্যদিকে ক্রুসেডার নেতৃত্বের ভুলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেফোরিসে থেকে গেলে সালাহউদ্দিনকে তাদের সুবিধাজনক অবস্থানে আক্রমণ করতে হতো অথবা অভিযান প্রত্যাহার করতে হতো। তিবেরিয়াস উদ্ধারের সিদ্ধান্ত সালাহউদ্দিনকে নিজের পছন্দের যুদ্ধক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয়।

সালাহউদ্দিন এরপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন—বিজয়ের পর দ্রুত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অগ্রসর হন। অনেক মধ্যযুগীয় সেনাপতি বড় যুদ্ধ জয়ের পর লুট বা অভ্যন্তরীণ বিরোধে সময় হারাতেন। সালাহউদ্দিন বুঝেছিলেন, ক্রুসেডাররা ইউরোপ থেকে নতুন সাহায্য পাওয়ার আগেই তাদের প্রধান নগরীগুলো দখল করতে হবে।

হাত্তিনের মাত্র কয়েক মাস পর তাঁর বাহিনী জেরুজালেমের সামনে উপস্থিত হয়। শহরটির কাছে তখন হাত্তিনের আগের মতো শক্তিশালী রাজকীয় বাহিনী ছিল না। বালিয়ান অব ইবেলিন সীমিত জনবল নিয়ে প্রতিরক্ষা সংগঠিত করেন, কিন্তু সামরিক বাস্তবতা ছিল ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে।

অবশেষে ২ অক্টোবর ১১৮৭ জেরুজালেম সালাহউদ্দিনের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত লাতিন নিয়ন্ত্রণ প্রায় ৮৮ বছর পর শেষ হয়।

এই কারণে হাত্তিনের যুদ্ধকে জেরুজালেম পুনর্দখলের প্রকৃত সামরিক চাবিকাঠি বলা যায়। জেরুজালেমের দেয়াল ভাঙার আগে সালাহউদ্দিন হাত্তিনে সেই সেনাবাহিনীকে ভেঙেছিলেন, যারা দেয়ালটি রক্ষা করতে পারত।

১১৮৭ সালের ৪ জুলাইয়ের বিজয়ের পেছনে তাই কোনো একক কৌশল ছিল না। মুসলিম রাজনৈতিক সংহতি সালাহউদ্দিনকে বৃহৎ বাহিনী সংগঠনের সুযোগ দিয়েছিল; তিবেরিয়াস আক্রমণ ক্রুসেডারদের প্রলুব্ধ করেছিল; পানির উৎস নিয়ন্ত্রণ তাদের দুর্বল করেছিল; অশ্বারোহী তীরন্দাজেরা অগ্রযাত্রা ভেঙে দিয়েছিল; তীব্র গরম ও ধোঁয়া ক্লান্তি বাড়িয়েছিল; আর ক্রুসেডার নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্ত পুরো সংকটকে বিপর্যয়ে পরিণত করেছিল।

হাত্তিন ছিল এমন এক যুদ্ধ যেখানে সালাহউদ্দিন শুধু প্রতিপক্ষের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেননি—তিনি প্রতিপক্ষকে নিজের নির্বাচিত পরিস্থিতিতে যুদ্ধ করতে বাধ্য করেছিলেন। আর সেই কারণেই কয়েক ঘণ্টার এই পরাজয় একটি রাজ্যের বহু দশকের সামরিক শক্তিকে ভেঙে দিয়ে জেরুজালেম পুনর্দখলের দরজা খুলে দিয়েছিল।