বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নূর আল-দিন থেকে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি: মুসলিম শক্তির পুনরুত্থান ও জেরুজালেম পুনর্দখলের প্রস্তুতি

Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 17, 2026
নূর আল-দিন থেকে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি: মুসলিম শক্তির পুনরুত্থান ও জেরুজালেম পুনর্দখলের প্রস্তুতি
মুসলিম শক্তির পুনরুত্থান ও জেরুজালেম পুনর্দখলের প্রস্তুতি

১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডের মাধ্যমে জেরুজালেম দখল এবং লেভান্তে একাধিক ক্রুসেডার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক দুর্বলতা ছিল পশ্চিমা লাতিন শক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা। মুসলিম শাসকেরা কোনো ঐক্যবদ্ধ সাম্রাজ্যের অধীনে ক্রুসেডারদের মোকাবিলা করছিলেন না। মসুল, আলেপ্পো, দামেস্ক, মিশর এবং অন্যান্য অঞ্চলের শাসকেরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যস্ত ছিলেন। কখনো মুসলিম শাসক অন্য মুসলিম প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের সঙ্গেও সমঝোতা করতেন। এই বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতাই প্রথম ক্রুসেডের সাফল্য এবং পরবর্তী কয়েক দশক ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর টিকে থাকার অন্যতম কারণ ছিল।

দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। এই পরিবর্তনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেন ইমাদ আল-দিন জেঙ্গি। মসুল ও আলেপ্পোকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তোলা জেঙ্গি ১১৪৪ সালে এডেসা দখল করে ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে প্রথম বড় মুসলিম বিজয় অর্জন করেন। কিন্তু ১১৪৬ সালে তাঁর হত্যার পর তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চলে আসে পুত্র নূর আল-দিন মাহমুদ জেঙ্গির হাতে।

নূর আল-দিন শুধু পিতার ভূখণ্ড রক্ষা করেননি; তিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে আরও সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর শাসনের প্রাথমিক কেন্দ্র ছিল আলেপ্পো। এখান থেকে তিনি উত্তর সিরিয়ায় নিজের ক্ষমতা দৃঢ় করতে থাকেন এবং একই সঙ্গে অ্যান্টিওকসহ ক্রুসেডার ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ সৃষ্টি করেন।

১১৪৯ সালে নূর আল-দিনের বাহিনী ইনাবের যুদ্ধে অ্যান্টিওকের শাসক রেমন্ড অব পোয়তিয়ের বাহিনীকে পরাজিত করে। রেমন্ড যুদ্ধে নিহত হন। এই বিজয় উত্তর সিরিয়ায় ক্রুসেডারদের অবস্থান দুর্বল করে এবং নূর আল-দিনকে মুসলিম প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য ছিল দামেস্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয় ক্রুসেডের সময় ১১৪৮ সালে পশ্চিমা ক্রুসেডাররা দামেস্ক আক্রমণ করে একটি বড় কৌশলগত ভুল করেছিল। কারণ শহরটির বুরিদ শাসকেরা এর আগে জেঙ্গিদের সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল এবং কখনো জেরুজালেম রাজ্যের সঙ্গে সহযোগিতাও করেছিল। ক্রুসেডার আক্রমণ সেই রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়।

শেষ পর্যন্ত ১১৫৪ সালে নূর আল-দিন দামেস্কের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। আলেপ্পো ও দামেস্ক একই শাসকের অধীনে আসার ফলে সিরিয়ায় মুসলিম শক্তির রাজনৈতিক সংহতি অনেক বৃদ্ধি পায়। ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর জন্য এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। আগে তারা মুসলিম শাসকদের পারস্পরিক বিরোধ কাজে লাগাতে পারত; এখন তাদের সামনে ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সমন্বিত শক্তি তৈরি হচ্ছিল।

নূর আল-দিন তাঁর শাসনকে শুধু সামরিক বিজয়ের ওপর দাঁড় করাননি। তিনি সুন্নি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, মসজিদ, হাসপাতাল ও বিচারব্যবস্থাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রচারে ন্যায়পরায়ণ শাসন এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ধর্মীয় বৈধতা তাঁকে বিচ্ছিন্ন মুসলিম অঞ্চলগুলোকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অধীনে আনার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

তবে জেরুজালেম রাজ্যকে সত্যিকার অর্থে কৌশলগতভাবে ঘিরে ফেলতে হলে শুধু সিরিয়া নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট ছিল না। দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল সম্পদশালী ফাতেমীয় মিশর। দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ফাতেমীয় খিলাফত গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়েছিল। দুর্বল খলিফা, ক্ষমতাশালী উজিরদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অভ্যন্তরীণ সংঘাত মিশরকে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়।

মিশরের গুরুত্ব নূর আল-দিন এবং জেরুজালেমের ক্রুসেডার শাসক—দুই পক্ষই বুঝতে পেরেছিল। যদি ক্রুসেডাররা মিশর দখল করত, তাহলে জেরুজালেম রাজ্য বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পদ লাভ করত। বিপরীতে সিরিয়া ও মিশর একই মুসলিম শক্তির অধীনে এলে ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলো উত্তর ও দক্ষিণ—দুই দিক থেকেই চাপে পড়ত।

এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে ছিলেন মিশরের উজির শাওয়ার। ক্ষমতা হারিয়ে তিনি নূর আল-দিনের কাছে সাহায্য চান। নূর আল-দিন তাঁর বিশ্বস্ত কুর্দি সেনাপতি আসাদ আল-দিন শিরকুহকে মিশরে পাঠান। শিরকুহর সঙ্গে ছিলেন তাঁর তরুণ ভাতিজা—সালাহ আল-দিন ইউসুফ ইবন আইয়ুব, যিনি ইতিহাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি বা পশ্চিমা বিশ্বে সালাদিন নামে বিখ্যাত হবেন।

১১৬০-এর দশকে মিশরকে কেন্দ্র করে একাধিক জটিল সামরিক অভিযান শুরু হয়। শাওয়ার কখনো নূর আল-দিনের সাহায্য নেন, আবার ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পর শিরকুহকে সরাতে জেরুজালেমের রাজা প্রথম আমালরিকের সাহায্য চান। ফলে মিশরের ভেতরে ফাতেমীয়, সিরীয় ও ক্রুসেডার বাহিনীর ত্রিমুখী রাজনৈতিক সংঘর্ষ তৈরি হয়।

শিরকুহ একাধিকবার মিশরে অভিযান পরিচালনা করেন। সালাহউদ্দিন তখনও সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন না; তিনি তাঁর চাচার অধীনে সামরিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করছিলেন। ১১৬৯ সালে শিরকুহ শেষ পর্যন্ত কায়রোতে প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে ফাতেমীয় উজির হন, কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটে।

অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত হন সালাহউদ্দিন। তখন তাঁর বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। ১১৬৯ সালে সালাহউদ্দিন ফাতেমীয় খলিফার উজির হন, যদিও রাজনৈতিকভাবে তিনি নূর আল-দিনের অধীন একজন সেনাপতি হিসেবেও বিবেচিত ছিলেন। এই দ্বৈত অবস্থান তাঁকে অত্যন্ত জটিল ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে বাধ্য করে।

মিশর তখন আনুষ্ঠানিকভাবে শিয়া ইসমাইলি ফাতেমীয় খিলাফতের অধীন ছিল, আর নূর আল-দিন ছিলেন সুন্নি আব্বাসীয় খলিফার কর্তৃত্ব স্বীকারকারী শাসক। সালাহউদ্দিন ধীরে ধীরে প্রশাসন ও সামরিক কাঠামোয় নিজের বিশ্বস্ত লোকদের বসাতে থাকেন এবং সুন্নি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করেন।

১১৭১ সালে শেষ ফাতেমীয় খলিফা আল-আদিদের মৃত্যুর পর কায়রোর খুতবায় আব্বাসীয় খলিফার নাম উচ্চারণ করা হয়। এর মাধ্যমে প্রায় দুই শতাব্দীর ফাতেমীয় খিলাফতের কার্যকর অবসান ঘটে। মিশর আনুষ্ঠানিকভাবে সুন্নি রাজনৈতিক জগতের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হয় এবং সালাহউদ্দিন সেখানে ক্রমশ স্বাধীন শক্তিশালী শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

এই পরিবর্তনের কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অসাধারণ। মিশরের কৃষি, নীলনদভিত্তিক অর্থনীতি, করব্যবস্থা এবং জনশক্তি সালাহউদ্দিনকে এমন সম্পদ দেয়, যা শুধু সিরিয়াভিত্তিক কোনো শাসকের পক্ষে সহজে অর্জন করা সম্ভব ছিল না। মিশরের সম্পদ পরবর্তী সময়ে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে সালাহউদ্দিনের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তবে নূর আল-দিন এবং সালাহউদ্দিনের সম্পর্ক ক্রমে জটিল হয়ে ওঠে। আনুষ্ঠানিকভাবে সালাহউদ্দিন নূর আল-দিনের অধীনস্থ হলেও মিশরে তাঁর ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। নূর আল-দিন চাইছিলেন মিশরের ওপর নিজের কার্যকর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে। অন্যদিকে সালাহউদ্দিন নিজের পরিবার ও অনুসারীদের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তুলছিলেন।

দুই নেতার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ হওয়ার আগেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ১১৭৪ সালে নূর আল-দিন মারা যান। তাঁর উত্তরাধিকারী আল-সালিহ ইসমাইল তখন অল্পবয়সী। ফলে নূর আল-দিনের তৈরি সিরীয় রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

সালাহউদ্দিন এই সুযোগ কাজে লাগান। তিনি নিজেকে নূর আল-দিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের শত্রু হিসেবে নয়, বরং তার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেন। ১১৭৪ সালে তিনি দামেস্কে প্রবেশ করেন এবং তুলনামূলকভাবে সহজেই শহরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সিরিয়ার অন্য অঞ্চলগুলো তাঁর নেতৃত্ব মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।

পরবর্তী কয়েক বছর সালাহউদ্দিনকে মুসলিম প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধেই ব্যাপক লড়াই করতে হয়। আলেপ্পো ও মসুলের জেঙ্গি শাসকেরা তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত। ফলে জনপ্রিয় কাহিনিতে সালাহউদ্দিনকে যেন শুরু থেকেই শুধু ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ঐক্যবদ্ধ মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখানো হয়, তা ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। জেরুজালেম পুনর্দখলের আগে তাঁকে দীর্ঘ সময় মুসলিম রাজনৈতিক বিভাজন মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

১১৭৫ সালে সালাহউদ্দিন সিরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করেন এবং আব্বাসীয় খলিফার কাছ থেকেও তাঁর কর্তৃত্বের স্বীকৃতি লাভ করেন। ধীরে ধীরে তাঁর আইয়ুবি পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের প্রশাসন দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত আনুগত্য ও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি হয়।

তবে তাঁর অগ্রযাত্রা সবসময় সফল ছিল না। ১১৭৭ সালের মন্টগিসার্ডের যুদ্ধে জেরুজালেমের তরুণ রাজা চতুর্থ বাল্ডউইনের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার বাহিনী সালাহউদ্দিনকে মারাত্মকভাবে পরাজিত করে। এই পরাজয় দেখিয়ে দেয় যে মিশর ও সিরিয়ায় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোকে পরাজিত করা সহজ হবে না।

সালাহউদ্দিন এরপর আরও সতর্ক সামরিক কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি দুর্গ, সরবরাহব্যবস্থা এবং সীমান্ত প্রতিরক্ষায় মনোযোগ দেন। ক্রুসেডারদের সঙ্গে যুদ্ধের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমঝোতাও করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রতিটি সুযোগে সরাসরি জেরুজালেম আক্রমণ করা নয়; বরং এমন রাজনৈতিক ও সামরিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একটি বড় সিদ্ধান্তমূলক অভিযানের সাফল্যের সম্ভাবনা সর্বোচ্চ হবে।

এই বৃহত্তর পরিকল্পনার জন্য আলেপ্পো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপ ও আলোচনার পর ১১৮৩ সালে সালাহউদ্দিন আলেপ্পোর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মসুলের জেঙ্গি শাসকদের সঙ্গেও সমঝোতার মাধ্যমে তাঁর প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। ১১৮০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ মিশর, দামেস্ক, আলেপ্পো এবং সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।

এই রাজনৈতিক সংহতি ক্রুসেডারদের জন্য বিপজ্জনক ছিল। জেরুজালেম রাজ্য এখন এমন একটি শক্তির মুখোমুখি, যার হাতে মিশরের অর্থ, সিরিয়ার জনবল, গুরুত্বপূর্ণ নগর ও দুর্গ এবং বিস্তৃত সামরিক নিয়োগব্যবস্থা ছিল। প্রথম ক্রুসেডের সময় মুসলিম বিশ্বের যে রাজনৈতিক বিভক্তি পশ্চিমাদের সুবিধা দিয়েছিল, সেই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হচ্ছিল।

একই সময়ে জেরুজালেম রাজ্যের ভেতরে বিপরীত প্রক্রিয়া চলছিল। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত দক্ষ রাজা চতুর্থ বাল্ডউইনের উত্তরাধিকার নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়। তাঁর মৃত্যুর পর রাজদরবার বিভিন্ন অভিজাত গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। গি অব লুসিনিয়ান, রেমন্ড অব ত্রিপোলি এবং অন্যান্য প্রভাবশালী নেতার মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজ্যের ঐক্য দুর্বল করে দেয়।

আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন রেনাল্ড অব শাতিয়োঁ। তিনি ট্রান্সজর্ডানের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ কেরাক থেকে মুসলিম বাণিজ্য ও তীর্থযাত্রার পথের ওপর আক্রমণ চালাতেন। এমনকি লোহিত সাগরের দিকে অভিযান পরিচালনার চেষ্টা করেন। তাঁর কর্মকাণ্ড সালাহউদ্দিনের সঙ্গে বিদ্যমান সমঝোতাকে বারবার বিপন্ন করে।

১১৮৬–১১৮৭ সালের দিকে রেনাল্ড একটি মুসলিম কাফেলার ওপর আক্রমণ করে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেন। সালাহউদ্দিন ক্ষতিপূরণ ও বন্দিদের মুক্তির দাবি করেন, কিন্তু কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি। এই ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনাকে চূড়ান্ত সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেয়।

১১৮৭ সালের মধ্যে সালাহউদ্দিন এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছিলেন, যা নূর আল-দিনের যুগে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংহতির পূর্ণ বিকাশ। মিশর ও সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাহিনী সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। তাঁর উদ্দেশ্য শুধু কোনো সীমান্ত দুর্গে আক্রমণ করা নয়; এবার তিনি জেরুজালেম রাজ্যের প্রধান সামরিক শক্তিকে সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধে পরাজিত করতে চেয়েছিলেন।

এই পরিবর্তনকে কেবল একজন মহান সেনাপতির ব্যক্তিগত প্রতিভা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সালাহউদ্দিনের সাফল্যের ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন নূর আল-দিন এবং তারও আগে জেঙ্গি। এডেসার পতন মুসলিম পাল্টা আক্রমণের সম্ভাবনা দেখিয়েছিল, নূর আল-দিন আলেপ্পো ও দামেস্ককে একত্র করে সিরিয়ায় রাজনৈতিক সংহতির ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, আর সালাহউদ্দিন সেই কাঠামোর সঙ্গে মিশরের বিপুল সম্পদ যুক্ত করেন।

একই সঙ্গে সালাহউদ্দিন জিহাদের ধারণাকে রাজনৈতিক বৈধতা ও সামরিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত করেন। জেরুজালেম পুনর্দখল তাঁর শাসনের একটি শক্তিশালী ধর্মীয় লক্ষ্য হিসেবে প্রচারিত হয়। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত বাস্তববাদী—প্রথমে অর্থনৈতিক ভিত্তি, তারপর রাজনৈতিক ঐক্য, এরপর সামরিক শক্তি এবং সবশেষে উপযুক্ত সময়ে সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ।

এই দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল প্রকাশ পাবে ১১৮৭ সালের হাত্তিনের যুদ্ধে। সেখানে জেরুজালেম রাজ্যের প্রধান সেনাবাহিনী কার্যত ধ্বংস হওয়ার পর ক্রুসেডারদের দুর্গ ও শহরগুলো একের পর এক সালাহউদ্দিনের সামনে দুর্বল হয়ে পড়বে। শেষ পর্যন্ত একই বছরের অক্টোবরে জেরুজালেম আবার মুসলিম নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

তাই নূর আল-দিন থেকে সালাহউদ্দিনের উত্থানকে শুধু দুই বিখ্যাত শাসকের জীবনী হিসেবে দেখা যায় না। এটি ছিল প্রায় চার দশক ধরে মুসলিম মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পুনর্গঠন, যেখানে বিচ্ছিন্ন নগর ও রাজবংশ ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সামরিক শক্তির অধীনে আসে। প্রথম ক্রুসেডের সাফল্যের পেছনে যে মুসলিম বিভক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, সেই দুর্বলতাই ধীরে ধীরে দূর হতে থাকে।

১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা একটি বিভক্ত মুসলিম বিশ্বের মধ্যে জেরুজালেম দখল করেছিল। ১১৮৭ সালের দিকে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। নূর আল-দিন রাজনৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন; সালাহউদ্দিন সেই ভিত্তির সঙ্গে মিশর ও সিরিয়ার শক্তিকে যুক্ত করে জেরুজালেম পুনর্দখলের জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত পরিবেশ সৃষ্টি করেন। ফলে জেরুজালেমের ভাগ্য নির্ধারণের পরবর্তী যুদ্ধ আর বিচ্ছিন্ন সীমান্ত সংঘর্ষ হতে যাচ্ছিল না—এটি হতে যাচ্ছিল ক্রুসেডের ইতিহাসের অন্যতম সিদ্ধান্তমূলক সামরিক সংঘর্ষ।