বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সালাহউদ্দিনের জেরুজালেম বিজয়: ১১৮৭ সালে কীভাবে বদলে গেল পবিত্র ভূমির ক্ষমতার ভারসাম্য?

Series: ক্রুসেড: ধর্ম, সাম্রাজ্য ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস

  • Author: Admin
  • August 17, 2026
সালাহউদ্দিনের জেরুজালেম বিজয়: ১১৮৭ সালে কীভাবে বদলে গেল পবিত্র ভূমির ক্ষমতার ভারসাম্য?
সালাহউদ্দিনের জেরুজালেম বিজয়

১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর জেরুজালেম যখন সালাহউদ্দিন আইয়ুবির কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন ঘটনাটি ছিল শুধু একটি পবিত্র নগরীর মালিকানা বদলের মুহূর্ত নয়। এর মাধ্যমে প্রথম ক্রুসেডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অর্জন ভেঙে পড়ে এবং পবিত্র ভূমিতে প্রায় নয় দশক ধরে চলে আসা ক্ষমতার ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। ১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা যে জেরুজালেম দখল করেছিল, ১১৮৭ সালে সেই শহর আবার মুসলিম শাসনের অধীনে ফিরে আসে।

এই বিজয়ের পথ তৈরি হয়েছিল কয়েক মাস আগেই। ৪ জুলাই ১১৮৭ হাত্তিনের যুদ্ধে সালাহউদ্দিন জেরুজালেম রাজ্যের প্রধান সেনাবাহিনীকে কার্যত ধ্বংস করেন। রাজা গি অব লুসিনিয়ান বন্দি হন, রেনাল্ড অব শাতিয়োঁ নিহত হন, অসংখ্য অভিজাত নাইট বন্দি বা নিহত হয় এবং ক্রুসেডারদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ট্রু ক্রস মুসলিম বাহিনীর হাতে চলে যায়।

হাত্তিনের তাৎপর্য ছিল এই যে, জেরুজালেম রাজ্য শুধু একটি যুদ্ধ হারায়নি; তারা তাদের প্রধান চলমান সেনাবাহিনী হারিয়েছিল। ক্রুসেডার দুর্গ ও শহরগুলো শক্তিশালী হলেও সেগুলো রক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সৈন্য প্রয়োজন ছিল। হাত্তিনের পর সেই সামরিক জনবল আর ছিল না। সালাহউদ্দিন এই সুযোগ বুঝতে পেরে দ্রুত আক্রমণ শুরু করেন।

তিনি সরাসরি জেরুজালেমের দিকে ছুটে যাননি। প্রথমে উপকূলীয় এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নগরীগুলো দখল করতে শুরু করেন। একর, নাবলুস, জাফা, সিডন, বৈরুত এবং আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দ্রুত তাঁর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এর ফলে জেরুজালেম ক্রমশ সামরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এই উপকূলীয় নগরীগুলোর পতন শুধু ভূখণ্ডগত সাফল্য ছিল না। ইউরোপ থেকে নতুন সৈন্য, অর্থ এবং সামরিক সরঞ্জাম আসার প্রধান পথ ছিল ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলো। তাই প্রতিটি বন্দর হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলোর বাইরের সাহায্য গ্রহণের ক্ষমতাও কমে যাচ্ছিল।

তবে সব শহর সালাহউদ্দিনের হাতে যায়নি। টাইর গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম ছিল। কনরাড অব মন্টফেরাত সেখানে প্রতিরক্ষা সংগঠিত করেন এবং শহরটি মুসলিম আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হয়। ভবিষ্যতে টাইরই ক্রুসেডার প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠবে।

কিন্তু জেরুজালেমের অবস্থা ছিল আরও দুর্বল। শহরের অধিকাংশ অভিজ্ঞ যোদ্ধা হাত্তিনে নিহত বা বন্দি হয়েছিল। নগরীতে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল, কারণ আশপাশের অঞ্চল মুসলিম বাহিনীর হাতে চলে যাচ্ছিল। প্রতিরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত নাইটও ছিল না।

এই সংকটময় পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বালিয়ান অব ইবেলিন। তিনি হাত্তিনের বিপর্যয় থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং প্রথমে নিজের পরিবারকে জেরুজালেম থেকে বের করে আনার উদ্দেশ্যে সালাহউদ্দিনের কাছ থেকে নিরাপদ যাতায়াতের অনুমতি নিয়েছিলেন। শর্ত ছিল তিনি শহরে বেশি সময় থাকবেন না এবং সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না।

কিন্তু জেরুজালেমে পৌঁছে বালিয়ান সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। শহরের ধর্মীয় নেতা ও বাসিন্দারা তাঁকে থেকে গিয়ে প্রতিরক্ষা পরিচালনার অনুরোধ করেন। কার্যত সেখানে অভিজ্ঞ উচ্চপদস্থ সামরিক নেতা বলতে তিনিই ছিলেন।

বালিয়ান সালাহউদ্দিনকে পরিস্থিতি জানিয়ে তাঁর পূর্বের শপথ থেকে অব্যাহতি চান। উল্লেখযোগ্যভাবে, সালাহউদ্দিন শুধু তাঁকে প্রতিরক্ষা সংগঠনের অনুমতি দেননি; বালিয়ানের স্ত্রী ও সন্তানদের জেরুজালেম থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও করেন। এই ঘটনা দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের মধ্যেও ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আচরণের জটিলতা দেখায়।

বালিয়ান দ্রুত শহরের প্রতিরক্ষা পুনর্গঠন শুরু করেন। সমস্যাটি ছিল যোগ্য নাইটের সংখ্যা অত্যন্ত কম। তিনি তাই শহরের কিছু যোগ্য যুবক ও অভিজাতকে তাৎক্ষণিকভাবে নাইট উপাধি দিয়ে প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন। শহরের পুরুষদের অস্ত্র দেওয়া হয়, দেয়াল মেরামত করা হয় এবং সম্ভাব্য অবরোধের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

তবে সামরিক বাস্তবতা ছিল নির্মম। জেরুজালেমের ভেতরে বিপুলসংখ্যক মানুষ থাকলেও তাদের অধিকাংশ প্রশিক্ষিত যোদ্ধা ছিল না। সালাহউদ্দিনের বাহিনী ছিল অনেক বেশি সংগঠিত এবং হাত্তিনের পর তাদের মনোবলও অত্যন্ত উঁচু ছিল।

২০ সেপ্টেম্বর ১১৮৭ সালের দিকে সালাহউদ্দিনের বাহিনী জেরুজালেম অবরোধ শুরু করে। প্রথমে শহরের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণের চেষ্টা করা হয়। পরে মুসলিম বাহিনী অবস্থান পরিবর্তন করে এমন অংশে আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করে, যেখানে দেয়াল তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল।

অবরোধযন্ত্র, তীরন্দাজ ও প্রকৌশলী ব্যবহার করে মুসলিম বাহিনী ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব দিকের দেয়ালের নিচে সুড়ঙ্গ খনন এবং ভিত্তি দুর্বল করার চেষ্টা প্রতিরক্ষাকারীদের জন্য গুরুতর সমস্যা তৈরি করে।

শহরের রক্ষীরা প্রতিরোধ করলেও তারা জানত বাইরের কোনো বড় ক্রুসেডার সেনাবাহিনী তাদের সাহায্য করতে আসছে না। হাত্তিনের পর সেই বাহিনী কার্যত আর ছিলই না। তাই জেরুজালেমের অবরোধ ছিল শুধু দেয়ালের ওপর যুদ্ধ নয়; এটি ছিল ক্রমাগত ক্ষয়িষ্ণু প্রতিরোধ।

এদিকে শহরের ভেতরে আতঙ্ক বাড়ছিল। ১০৯৯ সালে প্রথম ক্রুসেডাররা জেরুজালেম দখলের পর মুসলিম ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর ওপর যে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, তার স্মৃতি এখনও রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে উপস্থিত ছিল। অনেক খ্রিস্টান বাসিন্দার আশঙ্কা ছিল, সালাহউদ্দিন শহর দখল করলে একই ধরনের প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।

পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠার পর বালিয়ান আলোচনার পথ বেছে নেন। প্রথম দিকে সালাহউদ্দিন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করেছিলেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বালিয়ান কঠোর অবস্থান নেন।

তিনি যুক্তি দেন, যদি শহরের বাসিন্দারা বুঝতে পারে তাদের সামনে নিশ্চিত মৃত্যু অপেক্ষা করছে, তাহলে তারা মরিয়া হয়ে প্রতিরোধ করবে। এমনকি বন্দি মুসলিমদের হত্যা, সম্পদ ধ্বংস এবং পবিত্র স্থানগুলো নষ্ট করার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে। এই হুমকি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য ছিল তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আলোচনায় এটি কার্যকর চাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত সালাহউদ্দিন আত্মসমর্পণের শর্ত নিয়ে সমঝোতায় রাজি হন। সিদ্ধান্ত হয়, শহরের খ্রিস্টান অধিবাসীদের একটি নির্ধারিত মুক্তিপণ প্রদান করে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, নারী এবং শিশুদের জন্য আলাদা মুক্তিপণ নির্ধারিত হয়েছিল।

সমস্যা ছিল জেরুজালেমের অসংখ্য দরিদ্র বাসিন্দার কাছে এই অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। বালিয়ান ও অন্যান্য নেতারা সমষ্টিগতভাবে দরিদ্রদের মুক্ত করার জন্য অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করেন। চার্চের সম্পদ এবং অন্যান্য উৎস থেকেও অর্থ ব্যবহার করা হয়।

২ অক্টোবর ১১৮৭ জেরুজালেম আনুষ্ঠানিকভাবে সালাহউদ্দিনের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ইসলামি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী দিনটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি নবী মুহাম্মদের মিরাজের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত সময়ের কাছাকাছি পড়েছিল বলে মুসলিম ঐতিহ্যে বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব পায়।

১০৯৯ সালের দৃশ্য এবার পুনরাবৃত্তি হয়নি। সালাহউদ্দিনের বাহিনী শহরে প্রবেশের পর ব্যাপক গণহত্যা চালায়নি। যারা নির্ধারিত অর্থ দিতে পেরেছিল তারা নিরাপদে শহর ত্যাগ করার সুযোগ পায়। বহু দরিদ্র মানুষের মুক্তির জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্মকর্তা অর্থ প্রদান করেন বা বন্দিদের ছেড়ে দেন।

তবে ঘটনাকে সম্পূর্ণ মানবিক ও রক্তপাতহীন বলে রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করাও ঠিক হবে না। যারা মুক্তিপণ দিতে পারেনি তাদের একটি অংশ দাসত্বের শিকার হয়েছিল। বিজয়ী মধ্যযুগীয় সামরিক ব্যবস্থার কঠোর বাস্তবতা এখানেও ছিল। কিন্তু ১০৯৯ সালের হত্যাকাণ্ডের তুলনায় ১১৮৭ সালের আত্মসমর্পণ ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রিত ও আলোচনাভিত্তিক।

শহর দখলের পর সালাহউদ্দিনের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল পবিত্র স্থানগুলোর ভবিষ্যৎ। ডোম অব দ্য রক ও আল-আকসা মসজিদ ক্রুসেডার আমলে খ্রিস্টান ব্যবহারের জন্য পরিবর্তিত হয়েছিল। মুসলিম নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসার পর এসব স্থানে ইসলামি ধর্মীয় কার্যক্রম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়।

আল-আকসা মসজিদ পরিষ্কার করা হয় এবং সেখানে পুনরায় জুমার নামাজ শুরু হয়। ডোম অব দ্য রকের ওপর স্থাপিত খ্রিস্টান প্রতীক সরিয়ে ফেলা হয়। এভাবে জেরুজালেমের হারাম আল-শরিফ আবার ইসলামী ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রে ফিরে আসে।

অন্যদিকে চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকার ধ্বংস করা হয়নি। খ্রিস্টানদের জন্য শহরের ধর্মীয় গুরুত্ব পুরোপুরি মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। পূর্বাঞ্চলীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি অংশ শহরে অবস্থান বা পরে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। লাতিন খ্রিস্টান তীর্থযাত্রাও পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়নি।

এই নীতি সালাহউদ্দিনের রাজনৈতিক বাস্তববাদের অংশ ছিল। জেরুজালেম শুধু সামরিক দুর্গ নয়; এটি মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি—তিন ধর্মের জন্যই অসাধারণ প্রতীকী শহর। শহরের ওপর নিয়ন্ত্রণকে স্থিতিশীল করতে হলে ধর্মীয় প্রতীক ও স্থানীয় সমাজকে সতর্কভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন ছিল।

ইহুদিদের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ক্রুসেডারদের ১০৯৯ সালের বিজয়ের পর জেরুজালেমের ইহুদি সম্প্রদায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সালাহউদ্দিনের বিজয়ের পর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইহুদিদের আবার শহরে বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়।

জেরুজালেম পুনর্দখলের ধর্মীয় মর্যাদা সালাহউদ্দিনকে মুসলিম বিশ্বে অসাধারণ সম্মান এনে দেয়। কয়েক দশক ধরে জেঙ্গি ও নূর আল-দিন যে জিহাদি রাজনৈতিক আদর্শকে শক্তিশালী করেছিলেন, জেরুজালেমের পুনর্দখল সেই আন্দোলনের সবচেয়ে প্রতীকী সাফল্যে পরিণত হয়।

কিন্তু সামরিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জয়ের তাৎপর্য আরও বিস্তৃত ছিল। প্রথম ক্রুসেডের পর লেভান্তে পশ্চিমা শক্তির কেন্দ্র ছিল জেরুজালেম রাজ্য। হাত্তিন ও জেরুজালেমের পতনের পর সেই রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে যায়।

সালাহউদ্দিন অল্প কয়েক মাসের মধ্যে ক্রুসেডারদের অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ অঞ্চল দখল করেন। ফলে ক্রুসেডার শক্তির কেন্দ্র ক্রমে জেরুজালেমের পাহাড়ি অভ্যন্তর থেকে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের কয়েকটি দুর্গ ও বন্দরে সরে যায়।

তবে এখানেই সালাহউদ্দিনের বিজয়ের সীমাও স্পষ্ট হয়। তিনি টাইর দখল করতে পারেননি। কনরাড অব মন্টফেরাতের নেতৃত্বে শহরটি প্রতিরোধ ধরে রাখে। এই একটি বন্দর পরবর্তীতে পশ্চিম ইউরোপীয় বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জেরুজালেম পতনের সংবাদ ইউরোপে পৌঁছালে তা তীব্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ধাক্কা সৃষ্টি করে। প্রথম ক্রুসেডের সবচেয়ে পবিত্র বিজয় হারিয়ে গেছে—এই ধারণা পশ্চিমা খ্রিস্টান জগতে নতুন বৃহৎ সামরিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

পোপ নতুন ক্রুসেডের আহ্বান জানান। এবার ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজাদের কয়েকজন সরাসরি অভিযানে অংশ নেবেন—ইংল্যান্ডের রিচার্ড প্রথম বা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট, ফ্রান্সের দ্বিতীয় ফিলিপ এবং পবিত্র রোমান সম্রাট ফ্রেডেরিক প্রথম বারবারোসা। এর ফল হবে তৃতীয় ক্রুসেড।

এই অর্থে সালাহউদ্দিনের জেরুজালেম বিজয় একই সঙ্গে মুসলিম শক্তির চূড়ান্ত সাফল্য এবং নতুন আন্তর্জাতিক যুদ্ধের সূচনা। তিনি জেরুজালেম পুনর্দখল করেছিলেন, কিন্তু এর ফলে ইউরোপীয় শক্তির আগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি; বরং আরও শক্তিশালী সামরিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

জেরুজালেমের পতন ক্রুসেডারদের রাজনৈতিক দুর্বলতাও প্রকাশ করে। তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ নির্ভর করত একটি কেন্দ্রীয় ফিল্ড আর্মির ওপর। হাত্তিনে সেই বাহিনী ধ্বংস হওয়ার পর শক্তিশালী দুর্গ থাকা সত্ত্বেও একের পর এক শহর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে সালাহউদ্দিনের সাফল্যের ভিত্তি ছিল মিশর ও সিরিয়ার রাজনৈতিক সংহতি, বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ, গতিশীল সেনাবাহিনী এবং বিজয়ের পর দ্রুত সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষমতা। তিনি হাত্তিনের বিজয়কে একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; কয়েক মাসের মধ্যেই তা বৃহৎ ভূখণ্ডগত পরিবর্তনে রূপ দিয়েছিলেন।

১১৮৭ সালের আগে ক্রুসেডাররা এখনও জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে পবিত্র ভূমির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি ছিল। বছরের শেষে সেই বাস্তবতা বদলে যায়। সালাহউদ্দিনের নিয়ন্ত্রণে জেরুজালেম, অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ অঞ্চল এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় নগরী চলে আসে।

ক্ষমতার ভারসাম্যের এই পরিবর্তনই ১১৮৭ সালের আসল তাৎপর্য। ক্রুসেডার রাষ্ট্রগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি, কিন্তু তারা আর প্রথম ক্রুসেডের পর প্রতিষ্ঠিত বিস্তৃত ভূখণ্ডের অধিপতি ছিল না। তাদের অস্তিত্ব এখন মূলত উপকূলীয় ঘাঁটি এবং ইউরোপ থেকে আসা সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের ক্ষেত্রেও জেরুজালেম বিজয় একটি নতুন রাজনৈতিক প্রতীক সৃষ্টি করে। সালাহউদ্দিন শুধু একজন সফল আঞ্চলিক শাসক নন, জেরুজালেম পুনর্দখলকারী নেতা হিসেবে ইতিহাসে স্থায়ী স্থান অর্জন করেন। তাঁর এই সাফল্যের পেছনে অবশ্য নূর আল-দিন ও জেঙ্গির যুগ থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক পুনর্গঠন ছিল।

সুতরাং ২ অক্টোবর ১১৮৭-কে শুধু একটি নগরীর আত্মসমর্পণের দিন হিসেবে দেখা যায় না। হাত্তিনে ক্রুসেডার সেনাবাহিনীর ধ্বংস, উপকূলীয় শহরগুলোর পতন এবং জেরুজালেমের পুনর্দখল মিলিয়ে পবিত্র ভূমির ক্ষমতার মানচিত্র নতুনভাবে আঁকা হয়েছিল। প্রথম ক্রুসেডের প্রায় ৮৮ বছর পর মুসলিম শক্তি আবার জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়—আর সেই বিজয়ের প্রতিক্রিয়াতেই শুরু হতে যাচ্ছিল ক্রুসেডের ইতিহাসের আরেকটি কিংবদন্তি অধ্যায়, তৃতীয় ক্রুসেড।