ব্ল্যাক ডেথের লক্ষণ ও মৃত্যুর কারণ: প্লেগের প্রকৃত বৈজ্ঞানিক ইতিহাস
সিরিজ: ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের ভয়াবহ মহামারি
প্রাচীন ডিএনএ ও আধুনিক বিজ্ঞানে ব্ল্যাক ডেথের জীবাণু শনাক্ত।
চতুর্দশ শতকের ইউরোপে হঠাৎ জ্বর, অসহনীয় দুর্বলতা এবং কুঁচকি বা বগলে বেদনাদায়ক ফোলা দেখা দেওয়া ছিল আতঙ্কের সংকেত। কোনো রোগীর শরীরে কালচে দাগ উঠত, কারও শ্বাসকষ্ট ও রক্তমিশ্রিত কাশি দেখা দিত। আবার কেউ দৃশ্যমান ফোলা ছাড়াই দ্রুত মারা যেতেন। সমকালীন মানুষের কাছে এসব লক্ষণ একই রহস্যময় বিপর্যয়ের অংশ ছিল। আধুনিক বিজ্ঞান দেখিয়েছে, ব্ল্যাক ডেথের প্রধান জীবাণু ছিল ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস নামের ব্যাকটেরিয়া, আর বিভিন্ন লক্ষণের পেছনে ছিল সংক্রমণ শরীরের কোন অংশে পৌঁছেছে, তার পার্থক্য।
ব্ল্যাক ডেথকে প্রায়ই শুধু বিউবনিক প্লেগ বলা হয়, কিন্তু এতে রোগের সম্পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। প্লেগের তিনটি প্রধান চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক রূপ হলো বিউবনিক, সেপটিসেমিক এবং নিউমোনিক প্লেগ। প্রথমটিতে লসিকাগ্রন্থির সংক্রমণ প্রধান, দ্বিতীয়টিতে রক্তপ্রবাহে ছড়ানো সংক্রমণ ও সেপসিস গুরুত্বপূর্ণ, তৃতীয়টিতে ফুসফুস আক্রান্ত হয়। এগুলো তিনটি আলাদা জীবাণুর রোগ নয়; একই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ভিন্ন প্রকাশ। একজন রোগীর বিউবনিক প্লেগ পরে রক্তপ্রবাহ ও ফুসফুসে ছড়িয়ে আরও জটিল অবস্থায় পরিণত হতে পারে।
ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস মূলত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে আসতে পারে এমন জীবাণু। প্রকৃতিতে কিছু অঞ্চলের বুনো কৃন্তক প্রাণী ও তাদের পিসুর মধ্যে এর সংক্রমণচক্র বজায় থাকে। আক্রান্ত প্রাণীর রক্ত খাওয়া পিসু অন্য প্রাণী বা মানুষকে কামড়ালে জীবাণু স্থানান্তরিত হতে পারে। প্রাণী মারা গেলে পিসু নতুন পোষকের সন্ধানও করতে পারে। তাই ইঁদুর নিজে এবং জীবাণু বহনকারী পিসুর ভূমিকা এক নয়। বন্দর, গুদাম, খাদ্যভান্ডার এবং বাসস্থানের পরিবেশ এই সংযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারত।
বিউবনিক প্লেগে সাধারণত সংক্রমণের কয়েক দিনের মধ্যে হঠাৎ জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা ও তীব্র দুর্বলতা দেখা দেয়। প্রাথমিক লক্ষণ অন্য অনেক সংক্রমণের মতো হওয়ায় শুধু জ্বর দেখে প্লেগ নির্ধারণ করা যায় না। শরীরে প্রবেশের পর ব্যাকটেরিয়া নিকটবর্তী লসিকাগ্রন্থিতে পৌঁছে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। লসিকাগ্রন্থি শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ, কিন্তু সেখানে তীব্র সংক্রমণ ও প্রদাহ হলে সেটিই অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে। রোগীর চলাফেরা, হাত নাড়ানো কিংবা ঘাড় ঘোরানোর মতো সাধারণ কাজও কষ্টকর হতে পারে।
এই অস্বাভাবিক ফোলা লসিকাগ্রন্থিকে বলা হয় বিউবো; সেখান থেকেই বিউবনিক নামটির উৎপত্তি। কুঁচকি, বগল ও ঘাড়ে এটি বেশি পরিচিত। তবে বিউবো মানে ত্বকের ওপর সাধারণ ফোঁড়া নয়—এটি ভেতরের লসিকাগ্রন্থির সংক্রমণ। মধ্যযুগীয় লেখায় ডিম বা ফলের সঙ্গে তুলনা করে যে ফোলার বিবরণ পাওয়া যায়, তার সঙ্গে এই লক্ষণের মিল রয়েছে। কিন্তু সব ফোলা গ্রন্থিই প্লেগ নয়, আর প্লেগের সব রোগীর দৃশ্যমান বিউবোও থাকে না। ঐতিহাসিক বিবরণ ব্যাখ্যা করার সময় এই সীমা মনে রাখা জরুরি।
সেপটিসেমিক প্লেগে ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এটি বিউবনিক প্লেগের জটিলতা হতে পারে, আবার স্পষ্ট বিউবো ছাড়াও শুরু হতে পারে। জ্বর, প্রচণ্ড দুর্বলতা, পেটব্যথা, বমি বা ডায়রিয়ার পাশাপাশি রক্তক্ষরণ ও শকের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এখানে বিপদ শুধু রক্তে জীবাণু থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংক্রমণের প্রতি শরীরের অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট করতে পারে, যাকে সেপসিস বলা হয়। গুরুতর অবস্থায় রক্তচাপ কমে যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছায় না।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত হয়। ক্ষুদ্র রক্তনালিতে অস্বাভাবিক জমাট তৈরি হলে আঙুল বা পায়ের আঙুলের মতো দূরবর্তী অংশে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ ঘটতে পারে। এর ফলে বেগুনি বা কালচে দাগ এবং টিস্যুর মৃত্যু দেখা দিতে পারে। তবে সব প্লেগরোগীর শরীর কালো হয়ে যেত—এ ধারণা ভুল। “ব্ল্যাক ডেথ” নামটিকেও কেবল এই লক্ষণের সরাসরি প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা নিরাপদ নয়; নামটির ব্যবহার ও ইতিহাস আলাদা বিষয়।
নিউমোনিক প্লেগে ফুসফুস আক্রান্ত হয় এবং দ্রুত নিউমোনিয়া তৈরি হতে পারে। জ্বরের সঙ্গে বুকব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং কখনো রক্তমিশ্রিত কফ দেখা দেয়। রক্তপ্রবাহ থেকে জীবাণু ফুসফুসে পৌঁছালে একে দ্বিতীয়িক নিউমোনিক প্লেগ বলা হয়। অন্যদিকে আক্রান্ত মানুষ বা প্রাণীর শ্বাসতন্ত্রের সংক্রামক ফোঁটা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেও সরাসরি ফুসফুসে সংক্রমণ শুরু হতে পারে। ফুসফুসের প্লেগ মানুষের মধ্যে সরাসরি সংক্রমণের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রূপ, যার জন্য সাধারণত কাছাকাছি সংস্পর্শ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই পার্থক্য থেকে আরেকটি ভুল ধারণা পরিষ্কার হয়: বিউবনিক প্লেগের রোগীর পাশে থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতাসের মাধ্যমে রোগ ছড়ায় না। ফুসফুস আক্রান্ত হওয়া এবং সংক্রামক শ্বাসতন্ত্রীয় ফোঁটার উপস্থিতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। আবার সংক্রমিত প্রাণীর টিস্যু বা দেহতরলের সংস্পর্শও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে শুধু “ছোঁয়াচে” শব্দ দিয়ে সব পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলে বিভ্রান্তি হয়। কোন পথে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করছে এবং কোন অঙ্গ আক্রান্ত হচ্ছে, তা সংক্রমণ বোঝার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
মৃত্যুর কারণও কেবল জ্বর বা ফোলা গ্রন্থি ছিল না। গুরুতর রোগে সেপটিক শক, রক্ত জমাট বাঁধার অস্বাভাবিকতা, একাধিক অঙ্গের বিকল হওয়া এবং শ্বাসযন্ত্রের ব্যর্থতা ঘটতে পারে। নিউমোনিক প্লেগে ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুস রক্তে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে ব্যর্থ হতে পারে। রোগ দ্রুত অগ্রসর হলে চিকিৎসার সুযোগ সংকুচিত হয়। চতুর্দশ শতকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক, আধুনিক নিবিড় পরিচর্যা বা জীবাণুভিত্তিক রোগনির্ণয় ছিল না, যা বিপুল মৃত্যুর পরিস্থিতি বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসাহীন বিউবনিক প্লেগে মৃত্যুহার আনুমানিক ৩০–৬০ শতাংশ হতে পারে; নিউমোনিক ও সেপটিসেমিক রূপে চিকিৎসা ছাড়া ঝুঁকি আরও বেশি। কিন্তু এসব রোগীভিত্তিক হারকে মধ্যযুগের কোনো দেশের মোট মৃত্যুহারের সঙ্গে সরাসরি মেলানো যায় না। কত মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের রোগের রূপ কী ছিল এবং অন্য কী দুর্ভোগ ছিল—এসব আলাদা প্রশ্ন। একইভাবে সমকালীন লেখায় “কয়েক ঘণ্টায় মৃত্যু” লেখা থাকলেই সংক্রমণ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সম্পূর্ণ সময় জানা যায় না; রোগের আগের পর্যায় অদৃশ্য থাকতে পারে।
মধ্যযুগীয় চিকিৎসকেরা জীবাণুর কথা জানতেন না। দূষিত বাতাস, শরীরের রসের ভারসাম্য কিংবা জ্যোতিষীয় প্রভাব দিয়ে রোগ ব্যাখ্যা করা হতো। তবে তাঁদের সব পর্যবেক্ষণ অর্থহীন ছিল না: রোগীর কাছাকাছি থাকা ও নতুন স্থানে যাওয়ার সঙ্গে রোগ ছড়ানোর সম্পর্ক মানুষ লক্ষ্য করেছিল। সমস্যাটি ছিল পর্যবেক্ষণ থেকে সঠিক কার্যকারণ নির্ধারণ করা। লক্ষণ চিনতে পারা এবং রোগের জীবাণু ও বাহক শনাক্ত করা বিজ্ঞানের দুটি পৃথক অর্জন, যাদের মধ্যে কয়েক শতাব্দীর ব্যবধান ছিল।
১৮৯৪ সালে হংকংয়ের প্লেগ প্রাদুর্ভাবের সময় আলেকজান্দ্র ইয়ারসাঁর গবেষণা জীবাণুটি শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। একই সময়ে শিবাসাবুরো কিতাসাতোও অনুসন্ধান চালাচ্ছিলেন। পরে জীবাণুর নাম হয় ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস। ১৮৯৮ সালে পল-লুই সিমোঁর পরীক্ষায় পিসুর মাধ্যমে সংক্রমণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আসে। এই আবিষ্কারগুলো রোগকে অভিশাপ বা দুর্গন্ধের ব্যাখ্যা থেকে পরীক্ষাযোগ্য জীববিজ্ঞানের মধ্যে নিয়ে আসে। তবে উনিশ শতকের সংক্রমণচক্র জানা মানেই মধ্যযুগের প্রতিটি প্রাদুর্ভাবের পথ একই ছিল বলে প্রমাণিত হওয়া নয়।
ব্ল্যাক ডেথের সঙ্গে জীবাণুটির সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে প্রাচীন ডিএনএ গবেষণায়। ২০১১ সালে লন্ডনের ইস্ট স্মিথফিল্ড সমাধিক্ষেত্রের দেহাবশেষ থেকে ইয়ারসিনিয়া পেস্টিসের প্রাচীন জিনোম পুনর্গঠিত হয়। দাঁতের ভেতরে সংরক্ষিত উপাদান জীবদ্দশায় রক্তপ্রবাহে থাকা জীবাণুর চিহ্ন ধরে রাখতে পারে। গবেষকেরা নমুনার বয়স, সমাধির প্রেক্ষাপট এবং আধুনিক দূষণের সম্ভাবনা পরীক্ষা করেন। এই জিনগত প্রমাণ ব্ল্যাক ডেথকে প্লেগ হিসেবে শনাক্ত করার ভিত্তিকে ঐতিহাসিক লক্ষণবর্ণনার চেয়ে অনেক শক্ত করেছে।
তবে জীবাণুর পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রধান বাহকের আপেক্ষিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। ইঁদুর ও তাদের পিসুর পাশাপাশি মানুষের দেহের উকুন বা পিসুর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে গাণিতিক মডেলভিত্তিক গবেষণা হয়েছে। কিছু ফল সেই সম্ভাবনাকে সমর্থন করেছে, আবার গবেষণার অনুমান ও অনিশ্চয়তা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। তাই “ইঁদুরের কোনো ভূমিকা ছিল না” কিংবা “সব সংক্রমণ ইঁদুর থেকেই এসেছে”—দুটিই অতিরিক্ত সরল দাবি। আজ প্লেগ চিকিৎসাযোগ্য হলেও দ্রুত শনাক্তকরণ জরুরি। এর বৈজ্ঞানিক ইতিহাস দেখায়, জীবাণু শনাক্ত করা দৃঢ় অর্জন; অতীতের প্রতিটি সংক্রমণপথ পুনর্গঠন এখনো চলমান অনুসন্ধান।
কাফা অবরোধ ও ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭ সালে জাহাজে ইউরোপে প্লেগের প্রবেশ
ব্ল্যাক ডেথের উৎপত্তি: এশিয়া থেকে ইউরোপে প্লেগ ছড়ানোর ইতিহাস
আমেরিকার গৃহযুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈন্য, নারী ও সাধারণ মানুষের ভূমিকা
ভিকসবার্গ অবরোধ: গ্রান্ট কীভাবে কনফেডারেসিকে দুই ভাগ করেছিলেন?
গেটিসবার্গের যুদ্ধ: তিন দিনের লড়াইয়ে রবার্ট ই. লি কেন পরাজিত হন?