বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

প্রাচীন মিশরের ফারাও রাজবংশ: নারমার থেকে ক্লিওপেট্রার উত্থান-পতন

সিরিজ: রাজবংশের উত্থান-পতন: ক্ষমতা, গৌরব ও পতনের ইতিহাস

প্রাচীন মিশরের ফারাও রাজবংশ: নারমার থেকে ক্লিওপেট্রার উত্থান-পতন
নারমারের একীভূত মিশর থেকে ক্লিওপেট্রার শেষ রাজত্ব।

নীল নদের তীরে প্রাচীন মিশরের রাজতন্ত্রের ইতিহাস কোনো একটি পরিবারের তিন হাজার বছরের শাসন নয়। এটি বহু রাজবংশের উত্থান, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভাঙন, পুনরেকত্রীকরণ এবং বিদেশি শাসকদের মিশরীয় রাজত্ব গ্রহণের দীর্ঘ ধারাবাহিকতা। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ সালের রাজনৈতিক একীকরণ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সালে রোমান দখল পর্যন্ত এই ইতিহাস বিস্তৃত। নারমার ও ক্লিওপেট্রার মধ্যে সরাসরি বংশগত ধারাবাহিকতা ছিল না; তাঁদের যুক্ত করেছিল মিশরের ভূখণ্ড, রাজকীয় প্রতিষ্ঠান ও ফারাওকেন্দ্রিক শাসনের ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্য কখনো শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়েছে, কখনো টিকে থেকেছে বিদেশি বিজেতার অধীনেও।

প্রাচীন মিশরের রাজাদের রাজবংশে ভাগ করার প্রচলিত কাঠামো মূলত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মিশরীয় পুরোহিত মানেথোর রচনার উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মূল গ্রন্থ অক্ষত নেই; পরবর্তী লেখকদের সংরক্ষিত অংশ থেকে তালিকা পরিচিত হয়েছে। আধুনিক ইতিহাসবিদেরা শিলালিপি, রাজতালিকা ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মিলিয়ে সেই কাঠামো সংশোধন করেন। ফলে সব রাজবংশের সীমানা বা শাসনকাল সমানভাবে নিশ্চিত নয়। কখনো একাধিক রাজপরিবার একই সময়ে ভিন্ন অঞ্চলে শাসন করেছে। আবার প্রাচীন, মধ্য ও নতুন রাজ্য নামের বৃহৎ যুগবিভাগগুলো আধুনিক বিশ্লেষণের সুবিধার্থে ব্যবহৃত হয়।

একীকরণের আগে নীল উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলীয় উচ্চ মিশর এবং উত্তরের বদ্বীপাঞ্চলীয় নিম্ন মিশরে বিভিন্ন রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল। নারমার প্যালেটে রাজাকে দুই অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত পৃথক মুকুটে দেখানো হয়েছে। এটি একীভূত রাজকীয় কর্তৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ, যদিও একীকরণ সম্ভবত এক দিনের যুদ্ধের ফল ছিল না। সামরিক সংঘর্ষ, বাণিজ্য ও প্রশাসনিক সম্প্রসারণ দীর্ঘদিন ধরে চলেছিল। পরবর্তী ঐতিহ্যের প্রতিষ্ঠাতা রাজা মেনেসকে নারমারের সঙ্গে অভিন্ন ধরা হয় কখনো, কিন্তু পরিচয়টি নিশ্চিত নয়। নারমারের গুরুত্ব একটি দীর্ঘ একীকরণপ্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় শাসক হিসেবে, শুধু কিংবদন্তির বিজেতা হিসেবে নয়।

প্রথম ও দ্বিতীয় রাজবংশের সময় রাজকীয় সমাধি, কর সংগ্রহ, লিখিত হিসাব এবং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শাসনের ভিত্তি শক্ত হয়। আবিডোসের রাজসমাধি প্রাথমিক রাজশক্তির গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। পরে মেমফিস অঞ্চল উত্তর ও দক্ষিণের সংযোগস্থলে প্রশাসনিক গুরুত্ব পায়। নীল নদের বন্যা কৃষিকে পুষ্ট করত, কিন্তু সেই সম্পদ রাজকোষে আনতে জরিপ, সংরক্ষণ ও পরিবহন দরকার হতো। শাসককে দেবতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং মাআত—ন্যায়, শৃঙ্খলা ও বিশ্বব্যবস্থা—রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে দেখা হতো। এই ধারণা রাজকীয় কর্তৃত্বকে ধর্মীয় মর্যাদা দিলেও বাস্তবে শাসন নির্ভর করত কৃষক, কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতাদের সহযোগিতার ওপর।

প্রাচীন রাজ্যে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিশাল পাথরের স্থাপত্য নির্মাণ সম্ভব হয়। তৃতীয় রাজবংশের জোসেরের সাক্কারার ধাপ পিরামিড ছিল গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। চতুর্থ রাজবংশের স্নেফেরুর নির্মাণপরীক্ষার পর খুফু, খাফরে ও মেনকাউরের গিজার পিরামিড গড়ে ওঠে। এগুলো শুধু সমাধি নয়; খাদ্য সরবরাহ, পাথর পরিবহন, দক্ষ শ্রম ও রাষ্ট্রের সাংগঠনিক ক্ষমতার নিদর্শন। পিরামিডের নির্মাতাদের সবাই দাস ছিলেন—এমন জনপ্রিয় ধারণা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণসম্মত নয়। শ্রমিক বসতি ও সমাধি সংগঠিত কর্মীবাহিনী এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শ্রমব্যবস্থার আরও জটিল চিত্র তুলে ধরে।

খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শেষদিকে প্রাচীন রাজ্যের কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রাদেশিক শাসকদের শক্তিবৃদ্ধি, রাজস্বের ওপর চাপ এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত সমস্যা এতে ভূমিকা রাখে। নীল নদের কম বন্যা ও আঞ্চলিক জলবায়ুগত সংকটও আলোচিত কারণ, তবে পতনকে শুধু খরার ফল বলা অতিসরলীকরণ। প্রথম অন্তর্বর্তী যুগে বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি কর্তৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই সময়কে সম্পূর্ণ অরাজকতার যুগ ভাবাও ঠিক নয়; কিছু অঞ্চলে স্থানীয় প্রশাসন ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চলেছিল। মূল পরিবর্তন ছিল, একটি সর্বমিশরীয় কেন্দ্রের পরিবর্তে ক্ষমতা একাধিক হাতে ছড়িয়ে পড়া।

একাদশ রাজবংশের দ্বিতীয় মেনতুহোতেপ আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০৫৫ সালের দিকে মিশর পুনরেকত্রিত করেন এবং মধ্য রাজ্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে। দ্বাদশ রাজবংশের আমেনেমহাত ও সেনুসরেত শাসকেরা প্রশাসন, কৃষি এবং দক্ষিণ সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন। নুবিয়ায় দুর্গ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিল নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও স্বর্ণসম্পদের ওপর কর্তৃত্ব। ফাইয়ুম অঞ্চলের উন্নয়নও এই যুগের উল্লেখযোগ্য দিক। রাজকীয় শক্তির পাশাপাশি সাহিত্য ও কর্মকর্তাদের সামাজিক অবস্থান বিকশিত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শাসনের বিভাজন দেখায়, কার্যকর প্রতিষ্ঠান থাকলেও কেন্দ্রের দুর্বলতা আবার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরিয়ে আনতে পারে।

দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী যুগে পশ্চিম এশীয় উৎসের হিকসোস শাসকেরা উত্তর মিশরে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন; আভারিস ছিল তাঁদের প্রধান কেন্দ্র। তাঁরা সমগ্র মিশর শাসন করেননি। দক্ষিণে থিবসের রাজপরিবার স্বাধীন শক্তি ধরে রাখে এবং শেষ পর্যন্ত আহমোস প্রথম হিকসোস কর্তৃত্বের অবসান ঘটান। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০ সালের কাছাকাছি অষ্টাদশ রাজবংশ ও নতুন রাজ্যের উত্থান ঘটে। এই সংঘর্ষের অভিজ্ঞতা মিশরের সামরিক নীতিকে বদলায়। সীমান্তের বাইরে অভিযান ও প্রভাব বিস্তার তখন রাজ্যের নিরাপত্তা এবং সম্পদ অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে ওঠে।

নতুন রাজ্যে মিশর নুবিয়া ও লেভান্তে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। নারী শাসক হাতশেপসুত রাজকীয় উপাধি ও প্রতীক গ্রহণ করে ক্ষমতা সুসংহত করেন; তাঁর দেইর এল-বাহরির মন্দির ও পুন্ত অভিযান বিখ্যাত। তৃতীয় থুতমোস সামরিক অভিযানে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করেন। কিন্তু অষ্টাদশ রাজবংশের মধ্যেই আখেনাতেন আতেনের উপাসনাকে বিশেষ প্রাধান্য দিয়ে ধর্মীয় ও দরবারি কাঠামো বদলানোর চেষ্টা করেন এবং আখেতাতেন নামে নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তুতানখামুনের সময় পুরোনো দেবতাদের উপাসনা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এই পর্ব দেখায়, ধর্মীয় পরিবর্তনও রাজবংশের ভেতরে ক্ষমতার ভারসাম্য নাড়িয়ে দিতে পারত।

উনবিংশ রাজবংশের দ্বিতীয় রামেসিস বিশাল নির্মাণকর্ম এবং হিত্তিতিদের সঙ্গে সংঘর্ষের জন্য পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ১২৭৪ সালের কাছাকাছি কাদেশের যুদ্ধকে তাঁর স্মারকে মহাবিজয় হিসেবে দেখানো হলেও মিশর সেখানে চূড়ান্ত কৌশলগত সাফল্য পায়নি। পরে হিত্তিতিদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি হয়। বিংশ রাজবংশে তৃতীয় রামেসিস বহিরাক্রমণ প্রতিহত করলেও অর্থনৈতিক সমস্যা তীব্র হয়। দেইর এল-মেদিনার কর্মীদের রেশন বিলম্বের প্রতিবাদ রাষ্ট্রের সরবরাহব্যবস্থার চাপ প্রকাশ করে। রাজত্বের শেষদিকে আমুনের পুরোহিতদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বিভাজন নতুন রাজ্যের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ক্ষয় করে।

পরবর্তী শতকগুলোতে মিশর লিবীয় উৎসের রাজপরিবার, নুবিয়ার কুশীয় শাসক এবং বহিরাগত সাম্রাজ্যের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। পঁচিশতম রাজবংশের কুশীয় রাজারা মিশরীয় ধর্ম ও রাজকীয় ঐতিহ্য গ্রহণ করেছিলেন। এরপর আসিরীয় আক্রমণ ঘটে; ষড়বিংশ রাজবংশে সাইসকেন্দ্রিক শাসকেরা পুনরায় শক্তি সংহত করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫২৫ সালে পারস্যের দ্বিতীয় ক্যাম্বাইসিস মিশর জয় করেন। মাঝে স্বাধীনতা ফিরলেও পারস্য আবার দখল করে। সর্বশেষ দেশীয় মিশরীয় ফারাও দ্বিতীয় নেকতানেবো খ্রিস্টপূর্ব ৩৪৩ সালে ক্ষমতা হারান। বিদেশি শাসন মানেই মিশরীয় রাজকীয় সংস্কৃতির অবসান ছিল না; বিজেতারাও প্রায়ই সেই ঐতিহ্য ব্যবহার করেছেন।

খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ সালে আলেকজান্ডার মিশর দখল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর প্রথম টলেমি ক্ষমতা সুসংহত করে খ্রিস্টপূর্ব ৩০৫ সালে রাজোপাধি গ্রহণ করেন। এই মাকেদোনীয়-গ্রিক রাজবংশ আলেকজান্দ্রিয়াকে কেন্দ্র করে শাসন করলেও মিশরীয় মন্দির ও ফারাওয়ের ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখে। শেষ প্রধান শাসক সপ্তম ক্লিওপেট্রা জুলিয়াস সিজার এবং পরে মার্ক অ্যান্টনির সঙ্গে জোট করে রাজ্যের অবস্থান রক্ষার চেষ্টা করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৩১ সালে আক্টিয়ামের পরাজয়ের পর পরের বছর অক্টাভিয়ান মিশর দখল করেন; ক্লিওপেট্রার মৃত্যু হয় এবং সিজারিয়নকে হত্যা করা হয়। স্বাধীন ফারাওতান্ত্রিক রাজত্বের অবসান ঘটে। তবে মিশরীয় ধর্ম, ভাষা ও শিল্পের দীর্ঘ উত্তরাধিকার রোমান শাসনের মধ্যেও বেঁচে থাকে।