বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কাফা অবরোধ ও ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭ সালে জাহাজে ইউরোপে প্লেগের প্রবেশ

সিরিজ: ব্ল্যাক ডেথ: ইউরোপের ভয়াবহ মহামারি

কাফা অবরোধ ও ব্ল্যাক ডেথ: ১৩৪৭ সালে জাহাজে ইউরোপে প্লেগের প্রবেশ
কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যপথ ধরে ভূমধ্যসাগরের বন্দরে প্লেগের আগমন।

১৩৪৭ সালের অক্টোবরে সিসিলির মেসিনা বন্দরে জেনোয়ীয় জাহাজের আগমন ভূমধ্যসাগরের ইতিহাসে এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণের প্রতীক। নৌবাণিজ্যের পরিচিত দৃশ্যের মধ্যেই উপস্থিত হয়েছিল অচেনা বিপদ: অসুস্থ নাবিক, দ্রুত মৃত্যু এবং মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক। কিন্তু এই বিপর্যয়ের ইতিহাস মেসিনার ঘাটে শুরু হয়নি। এর পেছনে ছিল কৃষ্ণসাগরের বন্দর, গোল্ডেন হোর্ডের সঙ্গে ইতালীয় বণিকদের সংঘাত এবং খাদ্যশস্য বহনকারী জাহাজের বিস্তৃত যোগাযোগ। ব্ল্যাক ডেথ ইউরোপে পৌঁছেছিল এমন এক বাণিজ্যব্যবস্থা ধরে, যার ওপর বহু শহরের দৈনন্দিন জীবন নির্ভর করত।

কাফা ছিল ক্রিমিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, যা বর্তমানে ফেওদোসিয়া নামে পরিচিত। ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগ থেকে সেখানে জেনোয়ার বাণিজ্যিক উপস্থিতি গড়ে ওঠে। শহরটি কৃষ্ণসাগরের স্থানীয় বাজারকে ভূমধ্যসাগরের দূরবর্তী বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করত। শস্য, চামড়া, মোমসহ বিভিন্ন পণ্যের পাশাপাশি দাসবাণিজ্যও এর অর্থনীতির অংশ ছিল। কাফাকে তাই বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্গ ভাবলে ভুল হবে। তার প্রাচীরের ভেতরে ছিল গুদাম, বাজার, বণিকসমাজ এবং সমুদ্রপথে নিয়মিত চলাচলের ব্যবস্থা।

এই বাণিজ্যিক উপস্থিতি টিকে ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতার ওপর। ক্রিমিয়া ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রভাবশালী ছিল গোল্ডেন হোর্ড। খান জানি বেগের শাসনামলে ইতালীয় বণিকদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ১৩৪৩ সালে আজভ সাগরের তানা বন্দরের সংঘর্ষ সেই সংকটের গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে কাফার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলে। অবরোধটি এক দিনের বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল কয়েক বছরব্যাপী রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিরোধের অংশ, যার প্রভাব অন্য বন্দরেও পড়েছিল।

১৩৪৬ সালের দিকে কৃষ্ণসাগরের উত্তরাঞ্চল ও গোল্ডেন হোর্ডের অধীন এলাকায় প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। অবরোধকারী বাহিনীও মহামারির কবলে পড়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণ জানায়। সৈন্যসমাবেশ, রসদ পরিবহন এবং মানুষের ঘনিষ্ঠ অবস্থান রোগের বিস্তারের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত। তবে সামরিক শিবিরে সংক্রমণ ঘটেছিল বলেই শহরের প্রতিটি সংক্রমণের উৎস শনাক্ত করা যায় না। কাফার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, খাদ্য সরবরাহ এবং সমুদ্রবাণিজ্যের সম্পর্কও বিবেচনায় রাখতে হয়।

কাফার সবচেয়ে বিখ্যাত কাহিনিটি এসেছে ইতালির পিয়াচেঞ্জার লেখক ও নোটারি গাব্রিয়েলে দে মুসির বিবরণ থেকে। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, অবরোধকারী বাহিনী প্লেগে মৃত মানুষের দেহ নিক্ষেপযন্ত্রের সাহায্যে শহরের প্রাচীরের ওপারে ছুড়ে দিয়েছিল। এই বিবরণ পরবর্তীকালে জীবাণুযুদ্ধের ইতিহাসে বহুল আলোচিত হয়। কিন্তু দে মুসি কাফায় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না। দূরবর্তী ঘটনার খবর, ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং বিপর্যয়ের নাটকীয় বর্ণনা তাঁর লেখায় একত্র হয়েছে। ফলে বিবরণটি গুরুত্ব দিয়ে পড়তে হলেও স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।

মৃতদেহ নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছিল কি না এবং ঘটে থাকলে সংক্রমণে কতটা ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে গবেষকদের মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো গবেষক ঘটনাটিকে সম্ভব বলে বিবেচনা করেছেন; অন্যরা বাণিজ্যিক নথি ও সময়ক্রম বিশ্লেষণ করে প্রচলিত ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছেন। মৃতদেহের দুর্গন্ধ ছড়ালেই প্লেগ হয়—এমন ধারণাও সঠিক নয়। একটি নাটকীয় যুদ্ধঘটনা দিয়ে সমগ্র ভূমধ্যসাগরীয় মহামারির ব্যাখ্যা করা যায় না। এর জন্য জীবাণু, বাহক, পরিবহন এবং একাধিক বন্দরের যোগাযোগ একসঙ্গে বিচার করতে হয়।

প্লেগের জীবাণু ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস কিছু প্রাণী ও পিসুর সংক্রমণচক্রে টিকে থাকতে পারে। জাহাজের খাদ্যভান্ডার, মালামাল ও লুকানোর জায়গা কৃন্তক প্রাণীর চলাচলের সুযোগ তৈরি করত। শস্য বহনকারী জাহাজ তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে শস্যকে নিজে সংক্রামক খাদ্য হিসেবে ভাবা ঠিক নয়; উদ্বেগের বিষয় ছিল তার পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে চলতে থাকা প্রাণী ও পরজীবী। আক্রান্ত মানুষও যাত্রা করতেন, আর রোগের কিছু রূপে কাছাকাছি অবস্থানে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ সম্ভব ছিল। প্রতিটি জাহাজে একই প্রক্রিয়া ঘটেছিল বলে নিশ্চিত করা যায় না।

কাফার পাশাপাশি তানা বন্দরের ভূমিকা বোঝাও জরুরি। সেখানে ভেনিসীয় বণিকদের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছিল এবং কৃষ্ণসাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হতো। জেনোয়া ও ভেনিস ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী সামুদ্রিক শক্তি, কিন্তু উভয়েই এই অঞ্চলের বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে প্লেগের বিস্তারকে শুধু জেনোয়ীয়দের পালিয়ে যাওয়ার গল্পে সীমিত করলে বৃহত্তর যোগাযোগ আড়ালে থাকে। কৃষ্ণসাগরের একাধিক বন্দর, বিভিন্ন বণিকগোষ্ঠী এবং পণ্যের চলাচল মিলে সংক্রমণের সুযোগ তৈরি করেছিল।

সংঘাতের সময় আরোপিত বাণিজ্যনিষেধ এই ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ। কিছু গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ১৩৪৬ সালে মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ না হলেও পণ্য পরিবহনে বড় বাধা ছিল। শস্যবাণিজ্য স্থবির হলে তার সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য বাহকের চলাচলও কমতে পারত। ১৩৪৭ সালে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার পর পণ্য পরিবহন আবার বাড়ে। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, মহামারি ছড়ানোর সুযোগ কেবল যুদ্ধের মধ্যে নয়, যুদ্ধের পর বাণিজ্য পুনরায় চালু হওয়ার মধ্যেও তৈরি হয়েছিল।

ভূমধ্যসাগরের খাদ্যচাহিদা সেই চলাচলকে উৎসাহিত করেছিল। জনবহুল ইতালীয় নগরগুলোর জন্য বাইরের শস্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ; স্থানীয় ফলন খারাপ হলে আমদানির প্রয়োজন আরও বাড়ত। জলবায়ু, ফসলের সংকট ও শস্যবাণিজ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা এই প্রেক্ষাপটকে সামনে এনেছে। তবে খাদ্যাভাবের সঙ্গে মহামারির সম্পর্ক মানে ক্ষুধাই প্লেগের জীবাণু সৃষ্টি করেছিল নয়। খাদ্যসংকট বাণিজ্যের দিক ও পরিমাণ বদলাতে পারে, আর সেই পরিবর্তিত পরিবহনব্যবস্থা সংক্রমণকে দূরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে পারে।

কৃষ্ণসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে যাওয়ার প্রধান সামুদ্রিক সংযোগ ছিল বসফরাস, মারমারা সাগর ও দারদানেলিস। এই পথে কনস্টান্টিনোপল ছিল প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। ১৩৪৭ সালে শহরটি প্লেগে আক্রান্ত হয়। সেখান থেকে নৌবাণিজ্যের অন্য সংযোগ ধরে রোগ এজিয়ান ও বৃহত্তর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। তবে সব জাহাজ একই বন্দর ছুঁয়ে একই ক্রমে চলেনি। মানচিত্রে একটি তীরচিহ্ন বিস্তারের সাধারণ দিক বোঝাতে পারে, কিন্তু তা প্রতিটি সংক্রমণের প্রমাণিত যাত্রাপথ নয়।

মেসিনার ঘটনায় সিসিলীয় লেখক মিকেলে দা পিয়াচ্চার বিবরণ বিশেষভাবে পরিচিত। তিনি ১৩৪৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে বারোটি জেনোয়ীয় গ্যালির আগমনের কথা লিখেছেন। তাঁর বিবরণে নাবিকদের অসুস্থতা ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া মৃত্যুর আতঙ্ক ফুটে ওঠে। কিন্তু লেখাটি ঘটনাপরবর্তী এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যায় প্রভাবিত। তাই জাহাজের সংখ্যা কিংবা প্রতিটি লক্ষণের বর্ণনাকে আধুনিক চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, মেসিনায় আসা প্রতিটি জাহাজ সরাসরি কাফা থেকেই এসেছিল—এ দাবিও নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

বন্দরবাসীর পক্ষে শুরুতেই বিপদের প্রকৃতি বোঝা কঠিন ছিল। নাবিকদের সঙ্গে বন্দরকর্মী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ ঘটত; মালামাল ওঠানামা করত এবং জাহাজে খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা হতো। অসুস্থ জাহাজকে চলে যেতে বাধ্য করলেও ইতোমধ্যে তৈরি হওয়া সংযোগ মুছে ফেলা সম্ভব ছিল না। পালিয়ে যাওয়া মানুষও নতুন স্থানে রোগ নিয়ে পৌঁছাতে পারতেন। মেসিনা থেকে সিসিলির অন্য জনপদ এবং প্রণালির ওপারের দক্ষিণ ইতালির সঙ্গে চলাচল তাই বিস্তারের পরবর্তী সুযোগ তৈরি করেছিল।

১৩৪৭ সালের শেষভাগ থেকে ১৩৪৮ সালের শুরুতে ভূমধ্যসাগরের আরও বন্দর আক্রান্ত হয়। মার্সেই, জেনোয়া, পিসা ও ভেনিসের মতো কেন্দ্র থেকে রোগ অভ্যন্তরের বাণিজ্যপথে পৌঁছায়। সব শহরে প্রথম আগমনের নির্ভুল তারিখ নিয়ে ঐকমত্য নেই, কিন্তু বিস্তারের বৃহত্তর চিত্র স্পষ্ট: মহামারি এক বন্দরে নেমে স্থির থাকেনি; সমুদ্র ও স্থলবাণিজ্যের সংযোগ ধরে বহু কেন্দ্রে ছড়িয়েছিল। নদীপথ, সড়ক, বাজার এবং আঞ্চলিক পরিবহন বন্দরকে দূরের জনপদের সঙ্গে যুক্ত রেখেছিল।

কাফা অবরোধ তাই ব্ল্যাক ডেথের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র ব্যাখ্যা নয়। কৃষ্ণসাগরের আঞ্চলিক মহামারি, সামরিক সংঘাত, বাণিজ্যনিষেধ, শস্যের চাহিদা এবং পুনরায় চালু হওয়া নৌযোগাযোগ একসঙ্গে এই বিপর্যয়ের পটভূমি তৈরি করেছিল। মেসিনা ছিল ইউরোপের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে তার অন্যতম স্মরণীয় প্রবেশদ্বার। ১৩৪৭ সালের শিক্ষা হলো, রোগ ছড়ানোর জন্য কোনো শহরের প্রাচীর ভাঙা আবশ্যক ছিল না—জীবিকা ও খাদ্যের প্রয়োজনে খোলা থাকা বন্দরই যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করতে পারত।