গ্রহগুলো কেন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে? মহাকর্ষ ও কক্ষপথের সহজ বিজ্ঞান
সূর্যের মহাকর্ষ গ্রহের চলার দিক বাঁকিয়ে তাকে কক্ষপথে রাখে।
পৃথিবী প্রতি সেকেন্ডে গড়ে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। অথচ তাকে চালানোর জন্য কোনো ইঞ্জিন নেই, জ্বালানি পোড়াতে হয় না, মহাকাশে কোনো দৃশ্যমান রেলপথও নেই। তাহলে এই চলাচল বজায় থাকে কীভাবে? উত্তরটির দুটি অংশ রয়েছে: গ্রহের আগে থেকেই থাকা গতি এবং সূর্যের মহাকর্ষ। গ্রহ সামনে এগিয়ে চলে, আর মহাকর্ষ তার চলার দিক ক্রমাগত বাঁকিয়ে দেয়। এই সমন্বয়েই তৈরি হয় কক্ষপথ।
মহাকর্ষ হলো ভরসম্পন্ন বস্তুর পারস্পরিক আকর্ষণ। পৃথিবী যেমন মাটির ওপরের বস্তুকে আকর্ষণ করে, তেমনি সূর্য পৃথিবীসহ সৌরজগতের অন্য বস্তুগুলোকে আকর্ষণ করে। সৌরজগতের মোট ভরের প্রায় নিরানব্বই দশমিক আট শতাংশ সূর্যের মধ্যে রয়েছে। ফলে গ্রহগুলোর সামগ্রিক কক্ষপথ নির্ধারণে সূর্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তবে আকর্ষণটি একমুখী নয়। পৃথিবীও সূর্যকে টানে; সূর্যের বিপুল ভরের কারণে সেই টানে তার গতির পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়।
শুধু সূর্যের আকর্ষণ থাকলেই অবশ্য প্রদক্ষিণের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ হয় না। সূর্যের তুলনায় কোনো বস্তুর প্রাথমিক গতি একেবারে শূন্য হলে এবং অন্য কোনো প্রভাব না থাকলে সেটি সরাসরি সূর্যের দিকে পড়তে থাকবে। গ্রহগুলোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। তাদের গতির একটি অংশ সূর্যের দিকে যাওয়ার রেখার আড়াআড়ি দিকে রয়েছে। ফলে মহাকর্ষ তাদের ভেতরের দিকে টানার সময়ও তারা পাশের দিকে অনেকটা এগিয়ে যায়। সরাসরি সূর্যে পতনের বদলে তাদের গতিপথ বাঁক নেয়।
বিষয়টি বোঝার জন্য পৃথিবীর ওপর থেকে একটি বল ছোড়ার কথা ভাবা যায়। বল সামনে এগোয়, আর পৃথিবীর মহাকর্ষ তাকে নিচের দিকে নামায়। আরও বেশি বেগে ছুড়লে সেটি আরও দূরে পড়বে। এবার বায়ুর বাধা নেই এবং বলটি যথেষ্ট উঁচুতে আছে ধরে নিন। উপযুক্ত বেগে চললে বলের নিচে নামার সঙ্গে পৃথিবীর গোল পৃষ্ঠও দূরে বেঁকে যেতে থাকবে। বলটি তখন মাটিতে না লেগে পৃথিবীকে ঘুরতে পারবে। গ্রহের কক্ষপথেও একই ধরনের মহাকর্ষীয় নীতি কাজ করে।
এই অর্থে পৃথিবী ক্রমাগত সূর্যের দিকে পড়ছে, কিন্তু তার চলার আড়াআড়ি গতির কারণে সূর্যে গিয়ে লাগছে না। এখানে মহাকর্ষ বন্ধ হয়ে যায়নি বা অন্য কোনো বাস্তব বহির্মুখী বল এসে সেটিকে বাতিল করেনি। বরং মহাকর্ষই পৃথিবীর গতির দিক পরিবর্তন করছে। বৃত্তাকার গতির জন্য ভেতরের দিকে যে ত্বরণ প্রয়োজন, তাকে কেন্দ্রমুখী ত্বরণ বলে। সূর্যের চারপাশে আদর্শ বৃত্তাকার কক্ষপথে এই ত্বরণ সরবরাহ করে সূর্যের মহাকর্ষ।
তাহলে গ্রহগুলোর প্রাথমিক গতি এল কোথা থেকে? প্রায় চারশ ষাট কোটি বছর আগে সৌরজগৎ তৈরি হয়েছিল গ্যাস ও ধুলোর একটি বিশাল ঘূর্ণায়মান মেঘ থেকে। মহাকর্ষের প্রভাবে মেঘটি সংকুচিত হয় এবং পদার্থের বড় অংশ কেন্দ্রে জমে সূর্য তৈরি করে। অবশিষ্ট পদার্থ একটি ঘূর্ণায়মান চাকতিতে ছড়িয়ে ছিল। সেই চাকতির কণা, পাথুরে খণ্ড ও বড় বস্তু একত্র হয়ে ধাপে ধাপে গ্রহ গড়ে তোলে। গ্রহগুলো তাই তৈরি হওয়ার সময় থেকেই সূর্যের চারপাশে গতিশীল পদার্থের অংশ ছিল।
সংকোচনের সময় ঘূর্ণন বজায় থাকার পেছনে রয়েছে কৌণিক ভরবেগ সংরক্ষণের নীতি। বাইরের ঘূর্ণন পরিবর্তনকারী প্রভাব যথেষ্ট ছোট হলে কোনো ব্যবস্থার মোট কৌণিক ভরবেগ বজায় থাকে। ঘূর্ণায়মান একজন মানুষ হাত শরীরের কাছে আনলে যেমন দ্রুত ঘোরেন, সংকুচিত মহাজাগতিক মেঘেও অনুরূপ নীতি কাজ করে। একই চাকতি থেকে জন্ম নেওয়ার কারণে সৌরজগতের আটটি গ্রহ সূর্যকে একই দিকে প্রদক্ষিণ করে এবং তাদের কক্ষপথ প্রায় একই সমতলে থাকে। তবে সব কক্ষপথ এক সমতলে নিখুঁতভাবে মিলে যায় না।
গ্রহগুলো চলতে চলতে থেমে যায় না কেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দৈনন্দিন জীবনে সাইকেলের প্যাডেল বন্ধ করলে গতি কমে, কারণ বায়ুর বাধা ও ঘর্ষণ কাজ করে। গ্রহের আন্তঃগ্রহীয় চলাচলে তেমন শক্তিশালী প্রতিরোধ নেই। গতিশীল বস্তু নিজের গতি বজায় রাখতে প্রতি মুহূর্তে নতুন ধাক্কা চায় না। সূর্যের মহাকর্ষ তার গতিপথ বাঁকায়; গতি চালু রাখার জন্য সূর্যকে ক্রমাগত সামনে ঠেলতে হয় না। তাই গ্রহের প্রদক্ষিণে ইঞ্জিন বা নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহের প্রয়োজন পড়ে না।
কক্ষপথের আকারও সব সময় নিখুঁত বৃত্ত নয়। জোহানেস কেপলার দেখিয়েছিলেন, গ্রহের পথ উপবৃত্তাকার এবং সূর্য থাকে উপবৃত্তের দুটি নাভির একটিতে। সহজভাবে বললে, উপবৃত্ত একটি বৃত্তের তুলনায় কিছুটা লম্বাটে হতে পারে। তবে সৌরজগতের অনেক গ্রহের কক্ষপথ বৃত্তের খুব কাছাকাছি। বইয়ের ছবিতে বোঝানোর সুবিধায় প্রায়ই পথগুলো অতিরিক্ত লম্বাটে করে আঁকা হয়। পৃথিবীর সূর্য থেকে দূরত্ব বছরের মধ্যে প্রায় চৌদ্দ কোটি একাত্তর লাখ থেকে পনেরো কোটি একুশ লাখ কিলোমিটারের মধ্যে বদলায়।
এই দূরত্ব বদলানোর সঙ্গে গতিও বদলায়। পৃথিবী সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকলে সেকেন্ডে প্রায় ত্রিশ দশমিক তিন কিলোমিটার বেগে চলে; সবচেয়ে দূরে থাকলে বেগ প্রায় ঊনত্রিশ দশমিক তিন কিলোমিটার। কাছে আসার সময় মহাকর্ষীয় স্থিতিশক্তি কমে এবং গতিশক্তি বাড়ে। দূরে যাওয়ার সময় উল্টো পরিবর্তন ঘটে। কেপলারের দ্বিতীয় সূত্র এই পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দেয়: গ্রহ ও সূর্যকে যুক্ত করা কাল্পনিক রেখা সমান সময়ে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রম করে।
ভিন্ন গ্রহের এক বছর সমান না হওয়ার কারণও কক্ষপথের সঙ্গে সম্পর্কিত। সূর্য থেকে দূরে গেলে মহাকর্ষের প্রভাব দুর্বল হয় এবং প্রায় বৃত্তাকার কক্ষপথে থাকার প্রয়োজনীয় বেগ কমে। পাশাপাশি প্রদক্ষিণের পথও বড় হয়। এই দুই কারণে দূরের গ্রহের সূর্যকে একবার ঘুরতে বেশি সময় লাগে। বুধের লাগে প্রায় আটাশি দিন, পৃথিবীর প্রায় তিনশ পঁয়ষট্টি দিন এবং শনির প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ বছর। নির্দিষ্ট সম্পর্ক অনুযায়ী প্রদক্ষিণকালের বর্গ কক্ষপথের অর্ধদীর্ঘ অক্ষের ঘনের সমানুপাতে বাড়ে।
কোনো গ্রহের বেগ বদলালে তার কক্ষপথও বদলাবে। তবে সামান্য ধীর হলেই সেটি সঙ্গে সঙ্গে সূর্যে পড়বে না; নতুন উপবৃত্তাকার পথে যেতে পারে। যথেষ্ট উপযুক্ত বেগ ও দিক পেলে কোনো বস্তু সূর্যের মহাকর্ষীয় বন্ধন ছেড়েও বেরিয়ে যেতে পারে। এখানে শুধু বেগের মান নয়, কোন দিকে চলছে এবং সূর্য থেকে কত দূরে আছে, সেটিও জরুরি। মহাকাশযানের পথ নির্ধারণে বিজ্ঞানীরা এই একই নীতি ব্যবহার করেন।
আরও নির্ভুলভাবে বললে, সূর্যও স্থির কেন্দ্র নয়। সূর্য ও গ্রহগুলো তাদের সম্মিলিত ভরকেন্দ্রকে ঘিরে চলে। বৃহস্পতির মতো ভারী গ্রহ সূর্যের অবস্থানে লক্ষণীয় দুলুনি ঘটায়। অন্য গ্রহের আকর্ষণেও প্রতিটি গ্রহের পথে ছোট পরিবর্তন আসে, তাই বাস্তব কক্ষপথ চিরস্থায়ী নিখুঁত উপবৃত্ত নয়। তবু সূর্যের প্রাধান্য এত বেশি যে গ্রহের আড়াআড়ি গতি এবং সূর্যের মহাকর্ষ দিয়েই প্রদক্ষিণের মূল কারণ বোঝা যায়। গ্রহের সামনে এগোনো বজায় থাকে, আর মহাকর্ষ সেই চলাকে বারবার সূর্যের চারপাশে বাঁকিয়ে দেয়।
চাঁদের বুকে প্রথম অভিযান: পতাকা, পাথর ও অ্যাপোলো ১১-এর বিজ্ঞান
চাঁদে প্রথম পদার্পণ: আর্মস্ট্রং ও অলড্রিনের ঐতিহাসিক অবতরণ
অ্যাপোলো ১১-এর অভিযান: ১৬ জুলাই ১৯৬৯ চাঁদের পথে তিন নভোচারী
মহাকাশ প্রতিযোগিতা ও অ্যাপোলো: যুক্তরাষ্ট্রের চাঁদ জয়ের প্রস্তুতি
চাঁদে পায়ের ছাপ কতদিন টিকে থাকে? ধুলোমাটিতে মানুষের পদচিহ্নের বিজ্ঞান
ব্ল্যাক হোল কি পুরো মহাবিশ্ব গিলে ফেলতে পারে? বিজ্ঞান কী বলে