গেটিসবার্গের যুদ্ধ: তিন দিনের লড়াইয়ে রবার্ট ই. লি কেন পরাজিত হন?
সিরিজ: আমেরিকার গৃহযুদ্ধ
গেটিসবার্গে থেমে যায় লির উত্তর অভিযান
মুক্তির ঘোষণার পর ইউনিয়নের যুদ্ধলক্ষ্যের সঙ্গে দাসমুক্তি যুক্ত হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সামরিক বিজয় প্রয়োজন ছিল। অথচ পূর্বাঞ্চলে ১৮৬৩ সালের শুরুটা উত্তরের জন্য আশাব্যঞ্জক হয়নি। ফ্রেডেরিক্সবার্গের পর মে মাসে চ্যান্সেলরসভিলেও ইউনিয়ন বাহিনী পরাজিত হয়। রবার্ট ই. লি সংখ্যায় বড় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিলেন। এবার তিনি আবার উত্তরের ভূখণ্ডে অভিযান চালিয়ে যুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্য বদলাতে চাইলেন।
লির উদ্দেশ্য ছিল একাধিক। ভার্জিনিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমিকে কিছুটা বিশ্রাম দেওয়া, পেনসিলভানিয়া থেকে খাদ্য ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করা এবং ইউনিয়ন বাহিনীকে সুবিধাজনক অবস্থানে এনে পরাজিত করা—সবই তাঁর পরিকল্পনায় ছিল। উত্তরের মাটিতে বড় বিজয় যুদ্ধবিরোধী জনমত শক্তিশালী করতে পারত। তবে গেটিসবার্গ শহরটিকে আগে থেকেই চূড়ান্ত যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়নি; বিভিন্ন সড়কের মিলনস্থলে দুই বাহিনীর অগ্রযাত্রা সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করে।
লির বাহিনীও কিছু দুর্বলতা নিয়ে এগোচ্ছিল। চ্যান্সেলরসভিলে আহত হয়ে স্টোনওয়াল জ্যাকসনের মৃত্যু হওয়ায় সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কাঠামো পুনর্গঠন করতে হয়। রিচার্ড ইউয়েল ও এ. পি. হিল নতুন কোরের দায়িত্ব পান। অন্যদিকে অশ্বারোহী কমান্ডার জে. ই. বি. স্টুয়ার্টের প্রধান বাহিনী অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে লির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বাইরে ছিল। লির কাছে অন্য অশ্বারোহী ইউনিট থাকলেও শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে সময়মতো পূর্ণ তথ্য পাওয়া কঠিন হয়।
ইউনিয়নের আর্মি অব দ্য পোটোম্যাকের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। ২৮ জুন জর্জ গর্ডন মিড জোসেফ হুকারের স্থলাভিষিক্ত হন। যুদ্ধ শুরু হতে তখন মাত্র তিন দিন বাকি। মিডকে একদিকে ওয়াশিংটন ও বাল্টিমোরের নিরাপত্তা বিবেচনা করতে হচ্ছিল, অন্যদিকে লির বাহিনীকে খুঁজে মোকাবিলা করতে হচ্ছিল। অভিজ্ঞ অধস্তন কমান্ডার ও আগে থেকে গড়ে ওঠা সামরিক কাঠামো তাঁকে দ্রুত দায়িত্ব সামলাতে সাহায্য করে।
১ জুলাই ১৮৬৩ সকালে গেটিসবার্গের পশ্চিমে হেনরি হেথের কনফেডারেট পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে জন বুফোর্ডের ইউনিয়ন অশ্বারোহীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। বুফোর্ডের লোকেরা ঘোড়া থেকে নেমে প্রতিরোধ করে পদাতিক বাহিনী আসার সময় তৈরি করেন। জেনারেল জন রেনল্ডসের সৈন্যরা এসে লড়াইয়ে যোগ দিলেও রেনল্ডস অল্প সময়ের মধ্যেই নিহত হন। ছোট সংঘর্ষ দ্রুত বড় যুদ্ধে পরিণত হয়।
প্রথম দিনের বিকেলে উত্তর ও পশ্চিম দিক থেকে কনফেডারেট চাপ বাড়লে ইউনিয়নের প্রথম ও একাদশ কোর পিছিয়ে যায়। বহু সৈন্য শহরের রাস্তা দিয়ে পালাতে গিয়ে বন্দি হন। কিন্তু বেঁচে যাওয়া বাহিনী দক্ষিণের সেমেটারি হিলে অবস্থান নেয়। শহর হারালেও ইউনিয়ন এমন উঁচু ভূমি ধরে রাখে, যা পরবর্তী দুই দিনের প্রতিরক্ষার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
লি ইউয়েলকে সম্ভব হলে ওই উচ্চভূমি দখল করতে বলেন। ইউয়েল তাৎক্ষণিক আক্রমণ করেননি। পরে সিদ্ধান্তটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়, কিন্তু তখন তাঁর সৈন্যরা ক্লান্ত, ইউনিয়নের শক্তি অনিশ্চিত এবং পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না। সুযোগ হারানোর সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু আক্রমণ করলেই নিশ্চিত বিজয় আসত—এমন দাবি করা যায় না। রাতের মধ্যে ইউনিয়নের আরও সৈন্য এসে অবস্থান শক্তিশালী করে।
২ জুলাই ইউনিয়নের প্রতিরক্ষারেখা কাল্পস হিল ও সেমেটারি হিল থেকে সেমেটারি রিজ ধরে দক্ষিণে বিস্তৃত হয়। বাঁকানো অবস্থানটিকে প্রায়ই মাছ ধরার বড়শির সঙ্গে তুলনা করা হয়। এর সুবিধা ছিল ভেতরের ছোট পথ দিয়ে বিপন্ন স্থানে দ্রুত সৈন্য পাঠানো। কনফেডারেটরা বাইরের দীর্ঘ রেখায় অবস্থান করায় আক্রমণগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা তুলনামূলক কঠিন হয়ে পড়ে।
লি দ্বিতীয় দিনে ইউনিয়নের দুই প্রান্তে আঘাত করার পরিকল্পনা করেন। জেমস লংস্ট্রিটের বাহিনী দক্ষিণ দিকে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়, আর ইউয়েলের ওপর উত্তর প্রান্তে চাপ সৃষ্টির দায়িত্ব থাকে। কিন্তু অবস্থান যাচাই, পথ পরিবর্তন এবং সৈন্য মোতায়েনে সময় লাগে। এই বিলম্বকে শুধু ব্যক্তিগত অবাধ্যতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তব সামরিক সমস্যাগুলো বাদ পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বিকেলে প্রধান আক্রমণ শুরু হয়।
ইউনিয়নের পক্ষেও গুরুতর ভুল হয়েছিল। তৃতীয় কোরের কমান্ডার ড্যানিয়েল সিকলস নির্ধারিত অবস্থান ছেড়ে সামনে পিচ অর্চার্ডের দিকে এগিয়ে যান। এতে তাঁর রেখা দীর্ঘ ও দুই পাশ থেকে আক্রমণযোগ্য হয়ে পড়ে। কনফেডারেটরা পিচ অর্চার্ড, হুইটফিল্ড ও ডেভিলস ডেন এলাকায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। মিডকে অন্য অংশ থেকে সৈন্য এনে ভেঙে পড়া অবস্থান সামলাতে হয়।
লিটল রাউন্ড টপেও তীব্র যুদ্ধ হয়। গুভার্নর ওয়ারেন বিপদ শনাক্ত করার পর সেখানে প্রতিরক্ষাকারী সৈন্য পৌঁছায়। স্ট্রং ভিনসেন্টের ব্রিগেড এবং অন্য ইউনিটগুলো আক্রমণ ঠেকায়। জোশুয়া চেম্বারলেইনের ২০তম মেইন রেজিমেন্টের প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণ বিখ্যাত হলেও পাহাড় রক্ষার কৃতিত্ব বহু ইউনিটের সম্মিলিত। একটি রেজিমেন্টকে পুরো যুদ্ধের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখলে বৃহত্তর প্রতিরক্ষার ভূমিকা আড়াল হয়।
সন্ধ্যায় কাল্পস হিল ও ইস্ট সেমেটারি হিলেও কনফেডারেট আক্রমণ হয়। কিছু অবস্থানে তারা সাময়িক সাফল্য পেলেও ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ভাঙতে পারেনি। দুই প্রান্তের আক্রমণ এমনভাবে একসঙ্গে কার্যকর হয়নি, যাতে মিড সবদিকে সমান সংকটে পড়েন। দ্বিতীয় দিনের পরও ইউনিয়নের মূল অবস্থান অক্ষত থাকে, যদিও উভয় পক্ষই প্রচুর সৈন্য হারায়।
৩ জুলাই সকালে কাল্পস হিলের লড়াই আবার তীব্র হয় এবং কনফেডারেটরা আগের দিনের অর্জিত অবস্থান থেকে বিতাড়িত হয়। এরপর লি ইউনিয়নের কেন্দ্র আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ধারণা ছিল, দুই প্রান্ত রক্ষা করতে গিয়ে কেন্দ্র দুর্বল হয়েছে। লংস্ট্রিট এই আক্রমণের সাফল্য নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন, কিন্তু চূড়ান্ত নির্দেশ বহাল থাকে। লক্ষ্য হয় সেমেটারি রিজে ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা ভেঙে দেওয়া।
পদাতিক আক্রমণের আগে কনফেডারেট কামানগুলো ব্যাপক গোলাবর্ষণ করে। উদ্দেশ্য ছিল ইউনিয়নের কামান ও পদাতিককে দুর্বল করা। কিন্তু ধোঁয়া, দূরত্ব নির্ধারণের সমস্যা এবং বহু গোলা লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত ফল আসেনি। ইউনিয়নের কিছু কামান গোলাবারুদ বাঁচাতে ও পুনর্বিন্যাসের জন্য থামলে আক্রমণকারীরা প্রতিরক্ষা দুর্বল হয়েছে বলে অতিরিক্ত আশাবাদী হয়ে পড়ে।
এরপর প্রায় ১২–১৩ হাজার কনফেডারেট সৈন্য খোলা মাঠ পেরিয়ে এগিয়ে যায়। আক্রমণটি ‘পিকেটস চার্জ’ নামে পরিচিত হলেও জর্জ পিকেটের ডিভিশনের পাশাপাশি জেমস পেটিগ্রু ও আইজ্যাক ট্রিম্বলের অধীন সৈন্যরাও অংশ নেন। তাঁদের প্রায় এক মাইল উন্মুক্ত ভূমি, বেড়া ও রাস্তা অতিক্রম করতে হয়। সামনে এবং পাশ থেকে কামানের গোলা, পরে কাছাকাছি দূরত্বে পদাতিকের গুলি আক্রমণকারী সারি ভেঙে দেয়।
কিছু সৈন্য পাথরের দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে অল্প সময়ের জন্য ইউনিয়নের রেখা ভেদ করেন। কিন্তু সেই প্রবেশপথ প্রশস্ত করার মতো সমন্বিত সহায়তা ছিল না। রক্ষাকারীরা পাল্টা আঘাতে তাঁদের হত্যা, বন্দি বা পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে। আক্রমণে অংশ নেওয়া বাহিনীর প্রায় অর্ধেক নিহত, আহত বা বন্দি হয়। সাহসিকতা খোলা ভূমিতে সুসংগঠিত প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে পরিকল্পনার দুর্বলতা পূরণ করতে পারেনি।
লির পরাজয়ের কারণ তাই শুধু পিকেটের আক্রমণ নয়। অসম্পূর্ণ গোয়েন্দাতথ্য, নতুন কমান্ড কাঠামো, আক্রমণের অসামঞ্জস্য এবং শত্রুর অবস্থান সম্পর্কে অতিরিক্ত আশাবাদ একসঙ্গে কাজ করেছিল। পাশাপাশি মিডের সিদ্ধান্ত, অধস্তন কর্মকর্তাদের উদ্যোগ, সুবিধাজনক ভূখণ্ড এবং বিপন্ন স্থানে অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর ক্ষমতা ছিল নির্ণায়ক। ইউনিয়ন শুধু লির ভুলের সুবিধা পায়নি; সক্রিয়ভাবে প্রতিরক্ষা সংগঠিত করে বিজয় অর্জন করেছে।
তিন দিনের যুদ্ধে দুই পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৫১ হাজার মানুষ নিহত, আহত, বন্দি বা নিখোঁজ হন; এটি মৃত্যুসংখ্যা নয়। ৪ জুলাই লি ভার্জিনিয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন শুরু করেন। মিড অনুসরণ করলেও ক্লান্ত বাহিনী, খারাপ আবহাওয়া ও কনফেডারেট প্রতিরক্ষার মধ্যে লির সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেননি। ফলে গেটিসবার্গ যুদ্ধ শেষ করেনি, কিন্তু লির উত্তর অভিযান ব্যর্থ করে দিয়েছিল।
এই বিজয় মুক্তির ঘোষণার পর ইউনিয়নের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসও বাড়ায়। নভেম্বরের গেটিসবার্গ ভাষণে লিংকন নিহতদের আত্মত্যাগকে স্বাধীনতা ও জনগণের শাসনের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করেন। তবে জুলাইয়ের সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে পূর্বের বিজয়ের পাশাপাশি পশ্চিমেও বড় পরিবর্তন ঘটছিল। ৪ জুলাই ভিক্সবার্গ আত্মসমর্পণ করে—মিসিসিপি নদীর নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে যে ঘটনা কনফেডারেসির ওপর আরেকটি গভীর আঘাত হানবে।
দাসপ্রথা বিলোপ আন্দোলনের সূচনা: কোয়েকার, আলোকায়ন ও মানবাধিকারের লড়াই
আটলান্টিক দাসবাণিজ্যের ইতিহাস: আফ্রিকার বন্দি মানুষ ও আমেরিকার দাসশ্রমের অর্থনীতি
দাসপ্রথার উৎপত্তি ও বিস্তার: প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও রোম থেকে আধুনিক যুগ
আলোকায়ন যুগের উত্তরাধিকার: আমেরিকার স্বাধীনতা, ফরাসি বিপ্লব ও আধুনিক গণতন্ত্র
আলোকিত স্বৈরতন্ত্র: ফ্রেডেরিক, ক্যাথরিন, জোসেফ ও অধিকার নিয়ে আলোকায়নের বিতর্ক
অ্যাডাম স্মিথ ও ইমানুয়েল কান্ট: মুক্তবাজার, নৈতিকতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার দর্শন