বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন? নীল গ্রহের রং, আলো ও বিস্ময়

মহাকাশ থেকে পৃথিবী দেখতে কেমন? নীল গ্রহের রং, আলো ও বিস্ময়
দূরত্ব ও আলোর অবস্থান বদলালে মহাকাশ থেকে পৃথিবীর চেহারাও বদলে যায়।

কালো মহাশূন্যের মধ্যে নীল একটি গোলক, তার ওপর সাদা মেঘের পাক, কোথাও বাদামি মরুভূমি, কোথাও সবুজ ভূমি। পৃথিবীর এমন ছবি আমাদের পরিচিত। কিন্তু মহাকাশে গেলেই কি পুরো পৃথিবীকে একসঙ্গে এভাবে দেখা যায়? উত্তর হলো, কোথা থেকে দেখা হচ্ছে তার ওপর দৃশ্যটি নির্ভর করে। পৃথিবীর কাছের কক্ষপথে গ্রহটি দৃষ্টির বিশাল অংশজুড়ে থাকে; অনেক দূরে গেলে সেটিই পূর্ণ গোলক হয়ে ওঠে। আরও দূরে পরিচিত মহাদেশ ও সমুদ্র মিলিয়ে যায় ক্ষুদ্র একটি আলোকবিন্দুতে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্র সাধারণত পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় চারশ কিলোমিটার ওপরে ঘোরে। পৃথিবীর ব্যাসের তুলনায় এই দূরত্ব খুব কম। ফলে সেখান থেকে খালি চোখে পুরো পৃথিবীকে ছোট বলের মতো দেখা যায় না। নিচে বিস্তৃত ভূদৃশ্য এবং দূরে বাঁকানো দিগন্ত চোখে পড়ে। জানালার অবস্থান, দেখার দিক এবং ক্যামেরার দৃশ্যক্ষেত্র অনুযায়ী ছবির চেহারা বদলায়। কাছের কক্ষপথের ছবি ও দূরের পূর্ণ পৃথিবীর ছবি তাই একই ধরনের দৃশ্য নয়।

দিনের আলোয় মহাকাশচারীরা নদীর আঁকাবাঁকা পথ, উপকূল, পর্বতমালা, মরুভূমি, বড় হ্রদ এবং মেঘের বিস্তার দেখতে পারেন। তবে কোনো বৈশিষ্ট্য চোখে ধরা পড়বে কি না, তা তার আকারের পাশাপাশি আশপাশের সঙ্গে রঙের পার্থক্য, মেঘ, আলোকসজ্জা ও দেখার কোণের ওপর নির্ভর করে। ক্যামেরার বড় করে দেখানোর ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। উপগ্রহের সূক্ষ্ম ছবিতে শনাক্ত করা যায় এমন সব বস্তু মহাকাশচারীর খালি চোখেও দেখা যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত রং নীল, কারণ তার পৃষ্ঠের বড় অংশ সমুদ্রে ঢাকা। সমুদ্রের নীল রংকে শুধু নীল আকাশের প্রতিফলন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পানি সূর্যালোকের লাল অংশ তুলনামূলক বেশি শোষণ করে; আলো ছড়িয়ে পড়া ও ফিরে আসার প্রক্রিয়ায় নীল অংশ দৃশ্যমানতায় গুরুত্ব পায়। গভীরতা, পানির স্বচ্ছতা এবং দেখার কোণও প্রভাব ফেলে। আবার সূর্যের আলো সরাসরি প্রতিফলিত হলে সমুদ্রের ওপর উজ্জ্বল ঝলক দেখা যেতে পারে।

সব সমুদ্র অবশ্য একই নীল নয়। অগভীর উপকূলে নিচের উজ্জ্বল বালি বা প্রবাল দেখা গেলে পানি ফিরোজা হতে পারে। নদীর পলি সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়লে বাদামি বা হলদে অঞ্চল তৈরি হয়। অণুজীবের ঘনত্ব বাড়লে সবুজাভ রং দেখা যেতে পারে। মহাকাশ থেকে এসব রঙের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা পলি পরিবহন, সামুদ্রিক জীবের বিস্তার এবং পানির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য পান। সুন্দর দৃশ্যের মধ্যেই তাই পরিবেশগত পরিবর্তনের সংকেত থাকে।

সাদা মেঘ পৃথিবীর ছবির আরেকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। মেঘের ক্ষুদ্র জলকণা ও বরফকণা দৃশ্যমান আলোর বিভিন্ন রং ছড়িয়ে দেয় বলে মেঘ সাধারণত সাদা দেখায়। ঘন মেঘ সূর্যের অনেক আলো মহাকাশে ফিরিয়ে দেয়, আবার তার ছায়ায় নিচের অংশ অন্ধকার হতে পারে। মহাকাশ থেকে ঘূর্ণিঝড়ের পাক, দীর্ঘ মেঘবলয় এবং বিস্তৃত বজ্রঝড়ব্যবস্থা স্পষ্ট বোঝা যায়। মেঘের এই পরিবর্তনশীল আবরণ পৃথিবীর চেহারাকে প্রতিনিয়ত নতুন করে সাজায়।

স্থলভাগে সবুজ ও বাদামির বিস্তার ভূপ্রকৃতি, উদ্ভিদ ও ঋতুর পরিচয় দেয়। ঘন বন, শুষ্ক তৃণভূমি ও মরুভূমি আলাদা দেখাতে পারে। মেরু অঞ্চলের বরফ এবং তুষারঢাকা ভূমি উজ্জ্বল সাদা হয়। তবে মানচিত্রের মতো দেশের সীমানা সাধারণত আঁকা রেখা হয়ে দেখা যায় না। কোথাও ভূমি ব্যবহারের পার্থক্যে সীমান্তের আভাস মিলতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ রাজনৈতিক বিভাজন দৃশ্যের অংশ নয়। মহাকাশের পৃথিবী মূলত ভূগোল ও আবহাওয়ার পৃথিবী।

দিগন্তের কাছে বায়ুমণ্ডল অনেক ছবিতে সরু নীল রেখা হিসেবে দেখা যায়। পৃথিবীর আকারের তুলনায় ঘন বায়ুমণ্ডলের স্তর খুবই পাতলা, তাই পাশ থেকে দেখলে এই আবরণকে বিশেষভাবে স্পষ্ট মনে হয়। সূর্যালোকের ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্য বায়ুর অণুতে বেশি ছড়িয়ে পড়ায় নীল আভা তৈরি হয়। তবে বায়ুমণ্ডল কোনো নির্দিষ্ট উচ্চতায় হঠাৎ শেষ হয়ে যায় না; ওপরে উঠতে উঠতে ক্রমে পাতলা হয়। ছবির দৃশ্যমান রেখাটি তার সম্পূর্ণ বিস্তারের সীমানা নয়।

পৃথিবীর পেছনে মহাশূন্য কালো দেখানোর কারণ সেখানে আমাদের পরিচিত আকাশের মতো আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ঘন বাতাস নেই। কিন্তু অনেক ছবিতে তারা দেখা যায় না কেন? প্রধান কারণ আলোকগ্রহণের ব্যবস্থা। সূর্যালোকিত পৃথিবী খুব উজ্জ্বল, তাই তার বিবরণ তুলতে ক্যামেরায় অল্প সময় আলো নেওয়া হয়। ক্ষীণ তারার আলো সেই সময়ে যথেষ্ট ধরা পড়ে না। দীর্ঘ সময় আলো সংগ্রহের উপযোগী পরিস্থিতি ও ব্যবস্থা ব্যবহার করলে মহাকাশের ছবি থেকেও তারা দেখা যায়।

রাতের দিকে পৃথিবীর চেহারা সম্পূর্ণ বদলে যায়। শহর, সড়ক ও শিল্পাঞ্চলের আলো অন্ধকারের মধ্যে মানুষের বসতির বিস্তার দেখায়। বড় জনবসতি উজ্জ্বল গুচ্ছের মতো এবং কিছু প্রধান সড়ক আলোর সরু পথের মতো দেখা যেতে পারে। পাশাপাশি বজ্রপাত, দাবানল ও বায়ুমণ্ডলের ক্ষীণ প্রাকৃতিক আভাও ধরা পড়ে। মেরুর দিকে মেরুজ্যোতি সবুজ বা লাল আলোর পর্দা তৈরি করতে পারে। তবে রাতের আলো কোনো অঞ্চলের জনসংখ্যার নিখুঁত মানচিত্র নয়; বিদ্যুৎব্যবহার ও আলোর ধরনও গুরুত্বপূর্ণ।

পৃথিবী সব দিক থেকে সব সময় পূর্ণ আলোকিত গোলক হিসেবে দেখা যায় না। সূর্য, পৃথিবী ও পর্যবেক্ষকের অবস্থান অনুযায়ী উজ্জ্বল অংশের পরিমাণ বদলায়। চাঁদের কলার মতো পৃথিবীকেও অর্ধচন্দ্রাকার বা আংশিক আলোকিত দেখা যেতে পারে। দিন ও রাতের বিভাজনরেখার কাছে দীর্ঘ ছায়া এবং সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের প্রভাব তৈরি হয়। ফলে একই দূরত্ব থেকেও আলোর অবস্থান বদলালে দুটি ছবির মধ্যে বড় পার্থক্য হতে পারে।

১৯৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর চাঁদের পথে অ্যাপোলো ১৭-এর মহাকাশচারীরা পৃথিবীর বিখ্যাত ‘নীল মার্বেল’ ছবিটি তোলেন। প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে নেওয়া ছবিতে পৃথিবীর প্রায় সম্পূর্ণ সূর্যালোকিত মুখ দেখা যায়। সেখানে আফ্রিকা, আশপাশের সমুদ্র, মেঘ এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফ একসঙ্গে ধরা পড়ে। এই ধরনের দূরত্বই পুরো পৃথিবীকে একটি গোলাকার বস্তু হিসেবে দেখার সুযোগ দেয়, যা কাছের মহাকাশকেন্দ্রের জানালা থেকে দেখা দৃশ্যের চেয়ে ভিন্ন।

আধুনিক পৃথিবীর সব ছবি অবশ্য এক মুহূর্তে তোলা একক আলোকচিত্র নয়। কিছু পূর্ণ পৃথিবীর ছবি বিভিন্ন সময় ও অবস্থান থেকে সংগৃহীত তথ্য জুড়ে তৈরি হয়। আবার কিছু যন্ত্র আলাদা লাল, সবুজ ও নীল আলোকতথ্য মিলিয়ে রঙিন দৃশ্য তৈরি করে। বৈজ্ঞানিক কাজে অবলোহিতসহ অদৃশ্য আলোর তথ্যকে দৃশ্যমান রং দিয়েও দেখানো হয়। এই প্রক্রিয়াকরণ মানেই ছবি কাল্পনিক নয়; তবে ছবিটি স্বাভাবিক রং, সমন্বিত দৃশ্য নাকি বিশেষ তথ্যের উপস্থাপনা, তা জানা দরকার।

অনেক দূর থেকে পৃথিবীর পরিচিত চেহারাও হারিয়ে যায়। ১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভয়েজার ১ প্রায় ছয়শ কোটি কিলোমিটার দূর থেকে পৃথিবীকে ক্ষুদ্র নীলচে বিন্দু হিসেবে ধারণ করে। সেই ছবিতে কোনো দেশ, সমুদ্র বা মেঘ আলাদা করা যায় না। কাছ থেকে যে গ্রহ দৃশ্যপটের প্রায় সবটুকু দখল করে, দূর থেকে তা এক বিন্দু আলো। মহাকাশ থেকে পৃথিবী কেমন দেখায়—এই প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর তাই একটি ছবি নয়; দূরত্ব, আলো, বায়ুমণ্ডল এবং পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি মিলিয়ে তৈরি অনেকগুলো বাস্তব দৃশ্য।