বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আবিষ্কারের যুগের উত্তরাধিকার: উপনিবেশবাদ ও আধুনিক বিশ্বের জন্ম

সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান

আবিষ্কারের যুগের উত্তরাধিকার: উপনিবেশবাদ ও আধুনিক বিশ্বের জন্ম
মহাসাগর পেরিয়ে গড়া যোগাযোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমৃদ্ধি, দখল, প্রতিরোধ ও বৈষম্যের ইতিহাস।

কলম্বিয়ান এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে খাদ্য, প্রাণী ও রোগ মহাসাগর পেরিয়েছিল; আটলান্টিক দাসবাণিজ্য লাখো মানুষকে জোরপূর্বক অন্য মহাদেশে নিয়ে গিয়েছিল। এই সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকেনি। এগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বাজার, শ্রমব্যবস্থা, সাম্রাজ্য ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আবিষ্কারের যুগের সবচেয়ে গভীর পরিণতি ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভাগ্যকে ক্রমশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা। কিন্তু এই সম্পর্কের মধ্যে সহযোগিতার পাশাপাশি দখল, বলপ্রয়োগ এবং অসম সুবিধা বণ্টনও ছিল।

‘আবিষ্কারের যুগ’ সাধারণত পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় সমুদ্র সম্প্রসারণকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এর কোনো সর্বসম্মত শেষদিন নেই। অনুসন্ধান, বাণিজ্য ও উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা পরস্পরের মধ্যে মিশে দীর্ঘকাল চলেছে। নামটির মধ্যেও ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে: অভিযাত্রীদের কাছে অপরিচিত ভূখণ্ডে আগে থেকেই মানুষ বসবাস করত। তাই এই ইতিহাস নতুন ভূখণ্ড চেনার পাশাপাশি আগে থেকে বিদ্যমান সমাজে বাইরের শক্তির প্রবেশের ইতিহাসও।

সমুদ্রপথের বিস্তার ইউরোপের অর্থনৈতিক ভূগোল বদলে দেয়। লিসবন ও সেভিয়ার মতো আটলান্টিকমুখী বন্দরের গুরুত্ব বাড়ে; পরে আমস্টারডাম ও লন্ডন শক্তিশালী বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য হঠাৎ বিলুপ্ত হয়নি। ভেনিসসহ পুরোনো কেন্দ্রগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যায়। পরিবর্তনটি ছিল বাণিজ্যের প্রধান পথ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হওয়া, যেখানে নতুন সমুদ্রপথ পুরোনো ব্যবস্থার পাশাপাশি কাজ করতে থাকে।

দূরপাল্লার বাণিজ্যের জন্য শুধু ভালো জাহাজ যথেষ্ট ছিল না। দরকার ছিল বিপুল বিনিয়োগ, ঋণ, বীমা, গুদাম এবং হিসাবরক্ষার ব্যবস্থা। একটি বহর হারালে বড় অঙ্কের পুঁজি নষ্ট হতে পারত। এই ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি বিকশিত হয়। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ডাচ ভিওসির মতো প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ, চুক্তি ও ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও পায়। ব্যবসা ও রাষ্ট্রক্ষমতার সম্পর্ক নতুন মাত্রা অর্জন করে।

আমেরিকার রুপা এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি ছিল। পোটোসি ও মেক্সিকোর খনিগুলো থেকে বিপুল রুপা উত্তোলিত হয়। তার একটি অংশ আটলান্টিক পেরিয়ে ইউরোপে যায়; আরেক অংশ প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথ ধরে এশিয়ায় পৌঁছায়। ম্যানিলা–আকাপুলকো যোগাযোগ আমেরিকার রুপাকে এশীয় পণ্যের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে। বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্র কেবল ইউরোপ ছিল না; চীনের রুপার চাহিদাও এই ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

রুপার প্রবাহ ইউরোপে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত ছিল, যদিও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। রাজদরবারগুলো নতুন সম্পদ পেয়েও সব সময় আর্থিক স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। যুদ্ধের ব্যয়, ঋণ এবং আমদানির চাহিদায় সম্পদ দ্রুত বেরিয়ে যেত। ফলে বিদেশি ধনসম্পদ পাওয়া মানেই দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধি নয়। উৎপাদন, রাজস্বব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করত সেই সম্পদ কীভাবে কাজে লাগবে।

উপনিবেশবাদও সর্বত্র একই রূপ নেয়নি। আমেরিকায় স্পেন বৃহৎ ভূখণ্ডে প্রশাসন, কর ও শ্রমনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গড়ে তোলে। পর্তুগিজরা এশিয়ার বহু স্থানে দুর্গ, বন্দর ও নৌপথের ওপর প্রভাব বিস্তারে জোর দেয়। উত্তর আমেরিকার কিছু অঞ্চলে ইউরোপীয় বসতি সম্প্রসারণ আদিবাসীদের জমি দখলের প্রধান মাধ্যম হয়। আবার স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে মিত্রতা ও চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাম্রাজ্যগুলো একই কৌশলে পুরো পৃথিবী দখল করেনি।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য পরিণতি বহু ক্ষেত্রে বিপর্যয়কর ছিল। গুটিবসন্ত ও অন্যান্য মহামারির সঙ্গে যুদ্ধ, অনাহার, বাধ্যতামূলক শ্রম এবং স্থানচ্যুতি যুক্ত হয়। জনসংখ্যা কমলে চাষাবাদ, পরিবার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ সেই দুর্বলতার মধ্যে জমি ও শ্রমের ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। রোগ ও শাসনব্যবস্থার চাপ পরস্পরকে তীব্র করেছিল, তাই বিপর্যয়কে কেবল প্রাকৃতিক মহামারি বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।

তবু আদিবাসী সমাজগুলো ইতিহাস থেকে হারিয়ে যায়নি। যুদ্ধ, বিদ্রোহ, স্থানান্তর, দর-কষাকষি এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তারা টিকে থাকে। অনেক জনগোষ্ঠী ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। ভাষা, কৃষি, ধর্মীয় চর্চা ও আত্মপরিচয় বিভিন্ন রূপে বজায় থাকে। তাঁদের শুধু পরাজিত মানুষ হিসেবে দেখলে প্রতিরোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইতিহাস অদৃশ্য হয়ে যায়।

আটলান্টিক দাসবাণিজ্য উপনিবেশিক অর্থনীতির আরেক ভিত্তি তৈরি করে। আখ, তামাক, কফি এবং পরবর্তী সময়ে তুলার উৎপাদনে দাসত্বে আবদ্ধ আফ্রিকানদের শ্রম ব্যবহার করা হয়। এর লাভ পৌঁছায় বাগানমালিক, ব্যবসায়ী, জাহাজমালিক ও অর্থদাতাদের কাছে। অন্যদিকে বন্দি মানুষ পরিবার ও স্বাধীনতা হারান। ক্রমে বহু উপনিবেশে বর্ণপরিচয় ও বংশানুক্রমিক দাসত্বকে আইন ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পরবর্তী সমাজেও থাকে।

খাদ্য ও পরিবেশের পরিবর্তন ছিল সমান গভীর। আলু, ভুট্টা ও কাসাভা বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ বাড়ায়; মরিচ ও টমেটো রান্নার পরিচিতি বদলে দেয়। আমেরিকায় গবাদিপশু ও আখের বিস্তার জমির ব্যবহার পাল্টায়। বাগান ও চারণভূমি তৈরিতে বন উজাড় হয়; নতুন প্রাণী ও উদ্ভিদ স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। বিশ্বের খাদ্যভান্ডার সমৃদ্ধ হওয়া এবং পরিবেশগত ক্ষতি একই যোগাযোগের ভিন্ন ফল হতে পারে।

ধর্ম ও সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আসে। খ্রিস্টীয় ধর্মপ্রচার কখনো শিক্ষা ও নতুন সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে, আবার বহু ক্ষেত্রে স্থানীয় উপাসনা দমন ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরের সঙ্গে যুক্ত হয়। আদিবাসী ও আফ্রিকান বিশ্বাস সম্পূর্ণ মুছে না গিয়ে নতুন ধর্মীয় চর্চার সঙ্গে মিশে যায়। ইউরোপীয়, আফ্রিকান ও আমেরিকান উপাদান মিলিয়ে সংগীত, ভাষা এবং খাদ্যসংস্কৃতির নতুন রূপ তৈরি হয়। এই সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতার পেছনের অসম ক্ষমতাসম্পর্কও মনে রাখা জরুরি।

সমুদ্রযাত্রা মানচিত্র, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা ও ভৌগোলিক জ্ঞান বাড়ায়। কিন্তু সেই জ্ঞান তৈরিতে স্থানীয় পথপ্রদর্শক, দোভাষী, চিকিৎসাজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ এবং অভিজ্ঞ নাবিকদের ভূমিকা প্রায়ই আড়াল হয়েছে। ইউরোপীয়রা বহু তথ্য সংগ্রহ করেছে অন্যদের কাছ থেকে, তারপর নিজেদের ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছে। জ্ঞান বিস্তার ছিল আন্তসাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া, যদিও তার প্রকাশনা, স্বীকৃতি ও ব্যবহার প্রায়ই সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে ছিল।

এই যুগকে বিশ্বায়নের সূচনা বলা হয়, তবে তার আগে পৃথিবী বিচ্ছিন্ন ছিল না। ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্য, সিল্ক রোড ও সাহারার বাণিজ্যপথ বহু অঞ্চলকে যুক্ত করেছিল। নতুন পরিবর্তন ছিল আমেরিকাসহ প্রধান মহাদেশগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমুদ্রসংযোগের বিস্তার। দূরের বাজারের চাহিদা এখন অন্য মহাদেশের জমি ও শ্রমকে প্রভাবিত করতে পারত। আধুনিক বিশ্বায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, সম্পূর্ণ ব্যবস্থা একবারে জন্মায়নি।

এই যোগাযোগ ইউরোপের পরবর্তী উত্থানে ভূমিকা রাখলেও ষোড়শ শতাব্দীতেই সমগ্র বিশ্ব ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায়নি। এশিয়ার বড় রাষ্ট্র ও উৎপাদনকেন্দ্রগুলো শক্তিশালী ছিল; ইউরোপীয়দের অনেক জায়গায় অনুমতি ও সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হতো। আধুনিক বৈষম্যও শুধু এই যুগের ফল নয়। পরবর্তী শিল্পায়ন, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তার রূপ নির্ধারণ করেছে। তবে ঔপনিবেশিক সম্পদ আহরণ এবং শ্রমের অসম সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছে।

পর্তুগিজদের আফ্রিকা অনুসন্ধান থেকে ম্যাগেলান–এলকানোর বিশ্বপরিক্রমা পর্যন্ত যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের খাবার, ভাষা, বসতি ও কাজের সম্পর্ক বদলে দেয়। আজকের আটলান্টিক সমাজ, বিশ্ববাজার এবং বহু দেশের ঔপনিবেশিক স্মৃতিতে সেই ইতিহাস রয়েছে। আবিষ্কারের যুগের উত্তরাধিকার তাই নৌদক্ষতার সাফল্য এবং আধিপত্যের মানবিক মূল্য—দুটিকেই একসঙ্গে বোঝার দাবি করে। মহাসাগর মানুষকে কাছে এনেছিল; সেই নৈকট্য কার জন্য সুযোগ, আর কার জন্য অধিকার হারানোর কারণ হবে, তা নির্ধারিত হয়েছিল মানুষের সিদ্ধান্তে।