বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কুসকো দখল ও মানকো ইনকার বিদ্রোহ: স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মহাপ্রতিরোধ

সিরিজ: ইনকা সাম্রাজ্যের পতন

কুসকো দখল ও মানকো ইনকার বিদ্রোহ: স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মহাপ্রতিরোধ
হারানো রাজধানী পুনরুদ্ধারে মানকো ইনকার নেতৃত্বে জেগে উঠেছিল প্রতিরোধ।

কাহামার্কায় আতাহুয়ালপার মৃত্যুর পর পিজারোর হাতে বিপুল সম্পদ এসেছিল, কিন্তু ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী তখনো তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কুসকো ছিল রাজবংশের স্মৃতি, ধর্মীয় মর্যাদা এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের কেন্দ্র। সেটি দখল ছাড়া বিজয়কে স্থায়ী করা কঠিন। তবে সম্রাটকে হত্যা করার পর স্প্যানিশরা নতুন সমস্যায় পড়ে: স্থানীয় জনগণের কাছে নির্দেশ কার্যকর করবে কে? পিজারো তাই ইনকা রাজবংশকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তার একটি অংশকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করার পথ বেছে নেন।

আতাহুয়ালপার পর প্রথমে তুপাক হুয়ালপাকে শাসক হিসেবে সামনে আনা হয়। কিন্তু দক্ষিণমুখী অভিযানের মধ্যেই হাউহা অঞ্চলে তাঁর মৃত্যু ঘটে। এদিকে আতাহুয়ালপার সেনাপতি কিসকিসের বাহিনী স্প্যানিশ অগ্রযাত্রার বিরোধিতা করছিল। পথের সংঘর্ষগুলো দেখায়, কাহামার্কার বন্দিত্ব সাম্রাজ্যের সব সেনাকে নিষ্ক্রিয় করেনি। স্প্যানিশদের স্থানীয় সহযোগী, খাদ্য ও পথের তথ্যের প্রয়োজন ছিল। এই পরিস্থিতিতে হুয়াইনা কাপাকের পুত্র মানকো ইনকা ইউপানকির আবির্ভাব পিজারোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মানকোর নিজেরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। আতাহুয়ালপার পক্ষের আধিপত্য ও দমন থেকে কুসকোর রাজবংশীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের সুযোগ তিনি দেখেছিলেন। স্প্যানিশদের সঙ্গে সহযোগিতা তাঁর কাছে সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরিয়ে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার উপায় ছিল। তাঁকে শুরু থেকেই নিছক অসহায় পুতুল ভাবলে এই হিসাবটি হারিয়ে যায়। দুই পক্ষের সহযোগিতা ছিল ভিন্ন প্রত্যাশার ওপর দাঁড়ানো অস্থায়ী সমঝোতা—মানকো চাইছিলেন রাজকীয় কর্তৃত্ব, আর পিজারো চাইছিলেন সেই কর্তৃত্বের মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করতে।

১৫৩৩ সালের ১৫ নভেম্বর স্প্যানিশরা কুসকোয় প্রবেশ করে। কিসকিসের বাহিনী সরে গেলেও রাজধানী দখল সমগ্র আন্দিজের আত্মসমর্পণ ছিল না। মানকোকে সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, কিন্তু সামরিক শক্তির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকে বিজেতাদের হাতে। রাজপ্রাসাদ ও গুরুত্বপূর্ণ ভবন নিজেদের মধ্যে বণ্টন করতে থাকে স্প্যানিশরা। মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ, ধর্মীয় স্থানে হস্তক্ষেপ এবং স্থানীয় সম্পদের ওপর দাবি নতুন শাসনের প্রকৃতি স্পষ্ট করে। রাজধানীর পুরোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর বিদেশি কর্তৃত্ব বসতে শুরু করে।

মানকো প্রথমদিকে স্প্যানিশদের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখেন। কিন্তু শিগগিরই বোঝেন, তাঁর মর্যাদা তাঁদের লোভ থেকে তাঁকে রক্ষা করছে না। বিশেষত পিজারোর ভাইদের আচরণ সম্পর্ক ভেঙে দেয়। তাঁকে অপমান, আটক এবং আরও সোনা দেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হয়। তাঁর প্রধান স্ত্রী কুরা ওক্লোর ওপর গনসালো পিজারোর জবরদস্তি এই নিপীড়নের গুরুতর উদাহরণ হিসেবে বিবরণে এসেছে। ব্যক্তিগত অপমানের সঙ্গে সার্বভৌম ক্ষমতা হারানোর অভিজ্ঞতা মিলেই মানকোর অবস্থান বদলে দেয়।

এ সময় স্প্যানিশ বাহিনী বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পিজারো উপকূলে নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ছিলেন; ১৫৩৫ সালে লিমা প্রতিষ্ঠিত হয়। আলমাগ্রো দক্ষিণে চিলি অভিযানে চলে যান। ফলে কুসকোয় ইউরোপীয় সৈন্যসংখ্যা তুলনামূলক কমে আসে, যদিও তাঁদের সঙ্গে বহু স্থানীয় সহযোগী ছিল। মানকো এই বিচ্ছিন্ন অবস্থাকে সুযোগ হিসেবে দেখেন। রাজবংশীয় যোগাযোগ ও প্রাদেশিক নেতাদের সাহায্যে তিনি প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেন। রাজধানীর ভেতরে বন্দি অবস্থায় থাকা থেকে বেরিয়ে আসাই ছিল প্রথম প্রয়োজন।

১৫৩৬ সালের এপ্রিলে ধর্মীয় আচার এবং মূল্যবান একটি মূর্তি আনার কথা বলে মানকো কুসকোর বাইরে যাওয়ার অনুমতি পান বলে প্রচলিত বিবরণ জানায়। বাইরে গিয়ে তিনি আর ফেরেননি; বরং সমর্থকদের সংগঠিত করেন। মে মাসের শুরুতে কুসকো ঘিরে বৃহৎ ইনকা বাহিনী সমবেত হয়। সৈন্যসংখ্যা নিয়ে বিবরণে ব্যাপক পার্থক্য আছে, তাই লক্ষাধিক যোদ্ধার দাবিকে নিশ্চিত গণনা বলা যায় না। তবে স্পষ্ট যে, এটি ছিল রাজধানী পুনরুদ্ধারের সুসংগঠিত ও বিপজ্জনক প্রচেষ্টা।

ইনকা বাহিনী আশপাশের উঁচু অবস্থান দখল করে কুসকোর ওপর আক্রমণ চালায়। শহরের বহু খড়ের ছাদে আগুন ধরে যায়। ধোঁয়া, জ্বলন্ত ভবন এবং গুলতির পাথরের মধ্যে স্প্যানিশরা প্রধান প্রাঙ্গণসংলগ্ন এলাকায় প্রতিরক্ষা কেন্দ্রীভূত করে। আগুন শহরকে বিপর্যস্ত করলেও খোলা জায়গা ও কিছু পাথরের ভবন রক্ষকদের আশ্রয় দেয়। ঘোড়ায় দ্রুত পাল্টা আক্রমণ করে তারা ইনকা যোদ্ধাদের সমাবেশ ভাঙার চেষ্টা করে। শহরটি অল্প সময়ের জন্য নয়, দীর্ঘ লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়।

অবরোধের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল সাকসাইওয়ামান। কুসকোর ওপর উঁচুতে অবস্থিত এই বিশাল পাথরের স্থাপনা ইনকাদের পর্যবেক্ষণ ও আক্রমণে সুবিধা দিত। স্প্যানিশরা সেটি পুনর্দখলের জন্য কঠিন অভিযান চালায়। সংঘর্ষে হুয়ান পিজারো গুরুতর আহত হয়ে মারা যান। শেষ পর্যন্ত অবস্থানটি হারানো অবরোধকারীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়। এর প্রতিরক্ষায় সাহসিকতার কাহিনি পরবর্তী স্মৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যদিও নির্দিষ্ট বীরের পরিচয় এবং ঘটনার নাটকীয় বিবরণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

কুসকোর প্রতিরক্ষা ব্যাখ্যা করতে স্থানীয় সহযোগীদের ভূমিকা অপরিহার্য। কানিয়ারি, চাচাপোয়া এবং অন্য গোষ্ঠীর যোদ্ধারা বিভিন্ন পর্যায়ে স্প্যানিশদের সহায়তা করেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে পুরোনো ইনকা আধিপত্য বা সাম্প্রতিক গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে মানকোর পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাননি। তাঁরা পাহারা, যুদ্ধ, খাদ্য ও যোগাযোগে সহায়তা দেন। সংঘাতটি তাই শুধু স্প্যানিশ বনাম ঐক্যবদ্ধ ইনকা জনগণের যুদ্ধ ছিল না; আন্দীয় সমাজের পুরোনো বিরোধও এর ফল নির্ধারণ করছিল।

মানকোর প্রতিরোধ রাজধানীর চারপাশেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। পাহাড়ি পথে স্প্যানিশ ত্রাণদলগুলোর ওপর হামলা হয়; কয়েকটি দল মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। সেনাপতি কিসু ইউপানকি মধ্য আন্দিজে অভিযান চালিয়ে উপকূলের দিকে অগ্রসর হন। ১৫৩৬ সালে লিমাও আক্রমণের মুখে পড়ে। উদ্দেশ্য ছিল বিচ্ছিন্ন স্প্যানিশ কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সাহায্য বন্ধ করা। কিন্তু লিমার অভিযানে কিসু ইউপানকি নিহত হন এবং আক্রমণ ব্যর্থ হয়। এতে বিদ্রোহের বৃহত্তর সমন্বয় দুর্বল হয়ে পড়ে।

সময় বাড়ার সঙ্গে অবরোধকারীদের সমস্যাও বাড়ে। এত বড় বাহিনীকে খাদ্য দেওয়া কঠিন; বহু যোদ্ধার কৃষিকাজে ফিরে যাওয়া দরকার ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলের নেতাদের স্বার্থও এক ছিল না। অন্যদিকে স্প্যানিশরা উপকূল ও বাইরের বসতি থেকে সাহায্য পাওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকে। কুসকোর লড়াই তাই একটানা একই তীব্রতায় চলেনি—প্রবল আক্রমণ, বিরতি এবং পুনরায় চাপের পর্যায় ছিল। শুধু সংখ্যাধিক্য দিয়ে সুরক্ষিত অবস্থান এবং অশ্বারোহী পাল্টা আক্রমণের সমস্যা সমাধান করা যায়নি।

এই যুদ্ধপর্বেই ওলান্তাইতাম্বো মানকোর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হয়ে ওঠে। ১৫৩৭ সালের জানুয়ারিতে এরনান্দো পিজারো অশ্বারোহী ও স্থানীয় সহযোগী বাহিনী নিয়ে সেখানে আক্রমণ করেন। ইনকারা উঁচু ধাপ ও পাথরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কাজে লাগায়। ওপর থেকে পাথর ও অন্যান্য নিক্ষেপাস্ত্র ছোড়া হয়; জল ছেড়ে নিচের জমি ভিজিয়ে অশ্বারোহীদের চলাচলও কঠিন করা হয়। প্রতিকূল অবস্থায় স্প্যানিশদের সরে যেতে হয়। এই বিজয় দেখায়, উপযুক্ত ভূগোল ও প্রস্তুতিতে ঘোড়ার সুবিধা ঠেকানো সম্ভব ছিল।

তবু ওলান্তাইতাম্বোর সাফল্য কুসকোর সামগ্রিক পরিস্থিতি বদলাতে পারেনি। ১৫৩৭ সালের প্রথমার্ধে দীর্ঘ অবরোধের চাপ কমতে থাকে। চিলি অভিযান থেকে আলমাগ্রোর প্রত্যাবর্তন মানকোর জন্য নতুন বিপদ সৃষ্টি করে। আলমাগ্রো ও পিজারোর মধ্যে কুসকোর মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও সেই বিভাজন ইনকাদের নিশ্চিত বিজয় এনে দেয়নি। আলমাগ্রো শেষ পর্যন্ত শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পিজারোর ভাইদের বন্দি করেন। মানকো স্প্যানিশদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেও নির্ভরযোগ্য সমাধান পাননি।

রাজধানী পুনরুদ্ধারের সুযোগ সংকুচিত হলে মানকো আরও দুর্গম ভিলকাবাম্বা অঞ্চলের দিকে সরে যান। এটি নিছক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন ছিল না; উন্মুক্ত কেন্দ্রে অসম লড়াইয়ের বদলে স্বাধীন রাজনৈতিক কেন্দ্র রক্ষার কৌশল হয়ে ওঠে। কুসকো ফিরে পাওয়া যায়নি, কিন্তু রাজবংশ, সমর্থক ও প্রতিরোধের সংগঠন টিকে থাকে। তাই ১৫৩৬–১৫৩৭ সালের ঘটনাকে ইনকাদের শেষ প্রতিরোধ বলা ভুল; এটি ছিল পুরোনো রাজধানী পুনর্দখলের শেষ বৃহৎ প্রচেষ্টার অন্যতম।

কুসকোর অবরোধ ব্যর্থ হলেও মানকোর বিদ্রোহ স্প্যানিশ বিজয়কে নিরাপদ ও সম্পূর্ণ হতে দেয়নি। সহযোগী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এক শাসক তাঁদের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছিলেন। আতাহুয়ালপার বন্দিত্বে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙেছিল, কিন্তু মানকোর নেতৃত্ব দেখিয়েছিল যে স্বাধীন শাসন পুনর্গঠনের ইচ্ছা নিঃশেষ হয়নি। এবার লড়াইয়ের কেন্দ্র সরে যাবে পাহাড় ও অরণ্যের ভেতরে। ভিলকাবাম্বায় সেই উত্তরাধিকার আরও কয়েক দশক টিকে থাকবে, যতক্ষণ না ১৫৭২ সালে স্প্যানিশরা শেষ স্বাধীন ইনকা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযান চালায়।